শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে ব্যাংক খাতে নজিরবিহীন ঋণ কেলেঙ্কারি, লুটপাট ও টাকা পাচারের ঘটনা ঘটেছে—যার ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে আর্থিক খাতে। এর ফলে তারল্য সংকটে পড়েছে অনেক ব্যাংক, আমানতকারীদের চাহিদামতো টাকা ফেরত দিতে পারছে না, উদ্যোক্তারা পাচ্ছেন না প্রয়োজনীয় ঋণ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বার্ষিক ‘আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন ২০২৪’-এ এ তথ্য উঠে এসেছে। সোমবার রাতে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়, যেখানে দেশের সার্বিক অর্থনীতি, ব্যাংক খাত, ফাইন্যান্স কোম্পানি ও অন্যান্য আর্থিক খাতের ঝুঁকি বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালে ব্যাংক খাত রেকর্ড পরিমাণ খেলাপি ঋণ, প্রভিশন ঘাটতি ও মূলধন সংকটে পড়ে। সুদ থেকে নিট আয় কমেছে, বেড়েছে খরচ ও ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ। ফলে মূলধন সংরক্ষণের হার স্মরণকালের মধ্যে সর্বনিম্ন—৩ দশমিক ০৮ শতাংশে নেমে যায়, যেখানে ন্যূনতম ১০ শতাংশ এবং নিরাপদ পর্যায়ে থাকতে ১২ শতাংশ মূলধন রাখা প্রয়োজন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জালিয়াতি ও অদক্ষ উদ্যোক্তাদের কারণে ঋণ আদায় কমেছে। লুটপাট করা অর্থ ফেরত আসেনি; বরং বড় অংশ পাচার হয়ে গেছে। এগুলো এখন খেলাপি ঋণে পরিণত হওয়ায় ব্যাংকের আয় কমে গেছে, ব্যয় বেড়েছে এবং বিনিয়োগযোগ্য সম্পদ সংকুচিত হয়েছে।
গত সরকারের সময়ে সরকারি ও বেসরকারি অনেক ব্যাংক, বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকগুলো, তীব্র সংকটে পড়ে। এসব ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি বেড়ে দাঁড়ায় ৪ দশমিক ৯৫ শতাংশে, আর খেলাপি ঋণ ২৩ দশমিক ১৮ শতাংশে।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের এই অবস্থা প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি ভঙ্গুর। ২০২৪ সালে যেখানে শ্রীলংকার মূলধন সংরক্ষণের হার ছিল ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ, পাকিস্তানে ২০ দশমিক ৬ শতাংশ এবং ভারতে ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ—সেখানে বাংলাদেশের হার মাত্র ৩ দশমিক ০৮ শতাংশ।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ব্যাংক খাতে সংস্কার শুরু হয়েছে। তিনটি টাস্কফোর্স কাজ করছে এবং তাদের নেওয়া পদক্ষেপে সুশাসন ফিরতে শুরু করেছে। তারল্য পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বেড়েছে, টাকা পাচার ও লুটপাট বন্ধ হওয়ায় ব্যাংকগুলো পুনরুদ্ধারের সুযোগ পেয়েছে। তবে এ প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, ব্যাংকগুলো বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণে অতিমাত্রায় ঝুঁকি নিয়েছে। শীর্ষ দুটি বড় ঋণগ্রহীতা খেলাপি হলে পুরো খাতের মূলধন পর্যাপ্ততা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে। একই সঙ্গে জামানতের মান কমে গেলে ব্যাংকগুলো আরও সংকটে পড়বে।
সব মিলিয়ে প্রতিবেদনটি ব্যাংক খাতকে ‘পদ্ধতিগত ভঙ্গুরতা’র মধ্যে থাকা হিসেবে অভিহিত করেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ ভঙ্গুরতা কাটিয়ে উঠতে সময়, সুশাসন ও কড়াকড়ি প্রয়োগ প্রয়োজন।





































