গাজীপুরে বন্ধ হয়ে যাওয়া গার্মেন্টস শ্রমিকদের বকেয়া বেতন পরিশোধ
Advertisements

দেশের পোশাক খাত অভূতপূর্ব সংকটে পড়েছে। গ্যাস–বিদ্যুতের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, ব্যাংকঋণের চড়া সুদ এবং নীতি পরিবর্তনের ধাক্কায় একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে বেকার হচ্ছেন বিপুলসংখ্যক শ্রমিক। সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের শুরু থেকে চলতি বছরের (১০ নভেম্বর ২০২৫) মধ্যে ২২ মাস ১০ দিনে মোট ২২৬টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। এই সময়ে চাকরি হারিয়েছেন দুই লাখের বেশি শ্রমিক।

বস্ত্র ও পোশাক খাতের সংগঠন বিজিএমইএ, বিকেএমইএ এবং বিটিএমএ জানায়, ২০২৪ সালে ৭৭টি কারখানা বন্ধ হয়। এসব কারখানায় কর্মরত ছিলেন ৫১ হাজার ৯৬০ শ্রমিক। বন্ধ হওয়া কারখানার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—ক্রিয়েটিভ ডিজাইন, প্রিন্স গার্মেন্টস, সারোজ গার্মেন্টস, এনএইচ ফ্যাশন, জেনারেশন নেক্সট ফ্যাশন্স, নিয়াগারা টেক্সটাইল, টিআরজেড গার্মেন্টস ও আবান্তি কালার টেক্স।

২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত আরও ১৪৯টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। এতে চাকরি হারিয়েছেন প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার শ্রমিক। এর মধ্যে আছে—এনএইচ ফ্যাশন লিমিটেড, শামসের রেজিয়া ফ্যাশনস, ক্যাভরন লিমিটেড, ডিউ ফ্যাশন, ঢাকা নিক অ্যাপারেলস, মাল্টিভার্স অ্যাপারেলসহ আরও অনেক কারখানা।

গ্যাস–বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি: সংকটের মূল কারণ

উদ্যোক্তারা জানাচ্ছেন, সংকটের শুরু বিগত হাসিনা সরকারের সময়ে। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে শিল্পখাতে গ্যাসের দাম এক লাফে প্রায় ১৫০ শতাংশ বাড়ানো হয়। এর আগে ২০২২ সালের জুনেও দাম উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছিল। ২০২৪ সালেও দুটি ধাপে দাম বাড়ে। বর্তমানে শিল্পখাতে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম দাঁড়িয়েছে ৩১ টাকা ৫০ পয়সা, আর নতুন শিল্প সংযোগে মূল্য ৪০ টাকা।

বিদ্যুতের দামও ২০২৩ সালে এক লাফে ৫ টাকা ২ পয়সা থেকে ১৪ টাকায় উন্নীত করা হয়। পরে কয়েক দফা বৃদ্ধি পেয়ে এখন দাঁড়িয়েছে ১৫ টাকা ৫০ পয়সা। উদ্যোক্তাদের মতে, এই মূল্যবৃদ্ধি শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয়কে অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে।

ব্যাংকঋণের সুদ ও নীতির চাপ

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন মুদ্রানীতি অনুযায়ী ঋণের সুদহার ৯% থেকে বেড়ে ১৬–১৭% এ পৌঁছেছে। পাশাপাশি ঋণ খেলাপির সময়সীমা আগের তুলনায় অর্ধেকে নামিয়ে ছয় মাস থেকে তিন মাস করা হয়েছে। ফলে শত শত কারখানা মালিক অল্প সময়ের মধ্যেই খেলাপি হয়ে পড়েছেন।

বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, “হঠাৎ সুদহার বাড়ানো এবং তিন মাসে খেলাপি ঘোষণা—এই দুই সিদ্ধান্ত সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে। চড়া গ্যাস–বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে ব্যাংকের চাপ মিলে উদ্যোক্তারা টিকে থাকতে পারছেন না।”

বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “১৬ শতাংশ সুদে ব্যবসা চালানো অসম্ভব। নীতি সুদহার কমানো না হলে বিনিয়োগ থমকে যাবে। দুর্বল ব্যাংকগুলো আরও বেশি সুদ নিচ্ছে—এটি শিল্প খাতকে আরও বড় ঝুঁকিতে ফেলছে।”

মালিকদের দেশত্যাগ ও ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়া

সংগঠনগুলো জানায়, ঋণ খেলাপির কঠোর নীতি এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বহু উদ্যোক্তা ব্যবসা গুটিয়ে ফেলছেন। অনেক মালিক দেশ ছেড়েও চলে গেছেন। প্রতিদিনই নতুন করে কারখানা বন্ধের খবর সংগঠনগুলোর কাছে পৌঁছাচ্ছে।

ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা
শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, জ্বালানি ও সুদের ব্যয় স্বাভাবিক পর্যায়ে না এলে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি এবং শিল্প সম্প্রসারণ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। দেশের প্রধান রপ্তানি খাত হিসেবে পোশাক শিল্প দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।

Advertisements