সার ও জ্বালানি সংকটে দিশাহারা কৃষক
Advertisements

দেশে ডিজেল ও সারের তীব্র সংকটে কৃষি খাত গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। মাঠপর্যায়ে কৃষকরা অভিযোগ করছেন, প্রয়োজনীয় সার ও জ্বালানি সময়মতো না পাওয়ায় চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে, আর যা পাওয়া যাচ্ছে তা কিনতে হচ্ছে চড়া দামে। ভরা মৌসুমে বিদ্যুতের ভয়াবহ লোডশেডিং পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে, ফলে সেচ ব্যবস্থায় দেখা দিয়েছে বিপর্যয়।

সরকার নির্ধারিত দামে ৫০ কেজির এক বস্তা ইউরিয়া সারের মূল্য ১,৩৫০ টাকা হলেও বাস্তবে অনেক এলাকায় কৃষকদের তা কিনতে হচ্ছে ১,৮০০ থেকে ২,০০০ টাকায়। কোথাও কোথাও টিএসপি সার একেবারেই পাওয়া যাচ্ছে না। ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগও উঠেছে। কৃষকদের দাবি, জ্বালানি সংকটের অজুহাতে তাদের জিম্মি করা হচ্ছে।

গ্যাস সংকটের কারণে দেশের প্রায় ৯৯ শতাংশ সার কারখানা বন্ধ রয়েছে, ফলে উৎপাদনে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। বর্তমানে কেবল নরসিংদীর ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া কারখানায় সীমিত উৎপাদন চলছে, যেখানে প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদন হচ্ছে। শাহজালাল, চট্টগ্রাম ইউরিয়া (সিইউএফএল), যমুনা ও আশুগঞ্জসহ বাকি কারখানাগুলো গ্যাস সরবরাহের অপেক্ষায় বন্ধ রয়েছে।

সরকারি তথ্যে দেশে সারের পর্যাপ্ত মজুত থাকার দাবি করা হলেও মাঠপর্যায়ে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, বোরো মৌসুমে বর্তমানে সারের চাহিদা কম থাকায় সংকটের আশঙ্কা নেই এবং কোথাও বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় কৃষক ও ডিলাররা সারের ঘাটতির কথা জানিয়েছেন।

ঝিনাইদহে ডিলাররা জানিয়েছেন, চাহিদার তুলনায় খুব কম সার সরবরাহ পাচ্ছেন। মার্চ মাসে যেখানে ৬৬ টন ইউরিয়া পাওয়ার কথা, সেখানে পাওয়া গেছে মাত্র ৬ টন। অনেক ডিলার পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় ব্যবসা কমিয়ে দিয়েছেন। কৃষকরা বলছেন, প্রয়োজন অনুযায়ী সার না পাওয়ায় চাষাবাদে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে নীলফামারীতে সরবরাহ তুলনামূলক স্বাভাবিক থাকলেও গ্রামীণ বাজারে বাকিতে সার কিনতে গেলে বেশি দাম দিতে হচ্ছে।

ডিজেলের দাম বৃদ্ধি ও সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সরকার সম্প্রতি ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা নির্ধারণ করেছে। অনেক এলাকায় পর্যাপ্ত ডিজেল না থাকায় সেচ পাম্প বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলায় প্রায় ৩ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ ব্যাহত হওয়ায় ধানক্ষেতে ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কৃষকরা বলছেন, সময়মতো সেচ না দিতে পারলে ফলন মারাত্মকভাবে কমে যাবে এবং ঋণের বোঝা বাড়বে।

ডিজেলের দাম বাড়ায় সেচ, চাষাবাদ ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। পণ্য পরিবহন ভাড়া ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সরাসরি খাদ্যপণ্যের বাজারমূল্যে প্রভাব ফেলছে। কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ সেচ এখনো ডিজেলনির্ভর হওয়ায় জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং কৃষকের লাভ কমিয়ে দিচ্ছে।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের মে মাস পর্যন্ত মোট সারের চাহিদা প্রায় ২৬ লাখ মেট্রিক টন, যার মধ্যে ১০ লাখ টন দেশে উৎপাদিত হয় এবং বাকিটা আমদানি করতে হয়। বর্তমানে দেশে কয়েক লাখ টন সার মজুত রয়েছে, তবে নিরাপত্তা মজুতের তুলনায় ইউরিয়ায় ঘাটতি রয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নতুন করে ৫ লাখ টন সার আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং ইতোমধ্যে আংশিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, সময়মতো আমদানি না হলে আগামী আমন মৌসুমে সারের সংকট তৈরি হতে পারে। এ অবস্থায় সরকার চাহিদা নির্ধারণ ও সরবরাহ নিশ্চিত করতে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে।

সব মিলিয়ে সরকারি আশ্বাস ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে বড় ফারাক দেখা যাচ্ছে। সার ও ডিজেলের সংকট, উচ্চমূল্য এবং বিদ্যুতের লোডশেডিং একসঙ্গে কৃষি খাতে চাপ তৈরি করেছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে উৎপাদন কমে যাওয়া, খাদ্যদ্রব্যের দাম বৃদ্ধি এবং খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে।

Advertisements