চার দশকের বেশি সময় ধরে কঠোর নিষেধাজ্ঞার মুখে থেকেও ইরান কীভাবে ড্রোন প্রযুক্তিতে বিশ্ব রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হয়ে উঠল—এই প্রশ্ন নতুন করে সামনে আসে ২০২২ সালের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে। তবে এর শিকড় অনেক পুরোনো, যার শুরু ১৯৭৯ সালের বিপ্লব-পরবর্তী সময় থেকে।
বিপ্লবের পর যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হলে ইরানের সামরিক অবকাঠামো ভেঙে পড়ে। আমেরিকান প্রযুক্তিবিদরা দেশ ছেড়ে চলে যান, যন্ত্রাংশ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়, ফলে আধুনিক যুদ্ধবিমানগুলো অকেজো হয়ে পড়ে। ঠিক এই সংকটই ইরানকে আত্মনির্ভরতার পথে হাঁটতে বাধ্য করে। বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভর না করে নিজেদের প্রকৌশলী ও গবেষকদের দিয়ে বিকল্প সমাধান খোঁজার সিদ্ধান্ত নেয় তেহরান।
১৯৮০ সালে ইরান-ইরাক যুদ্ধ শুরু হলে এই প্রয়োজন আরও তীব্র হয়। যুদ্ধের শুরুতে ইরাক আকাশপথে আধিপত্য বিস্তার করে এবং উন্নত গোয়েন্দা প্রযুক্তি ব্যবহার করে সুবিধা পায়। বিপরীতে ইরানের কাছে আধুনিক প্রযুক্তি ও সক্ষমতার ঘাটতি ছিল। তখনই ইরানি নেতৃত্ব সস্তা, সহজ এবং কার্যকর বিকল্প হিসেবে ছোট রিমোটচালিত উড়োজাহাজ বা ড্রোন তৈরির দিকে মনোযোগ দেয়।
১৯৮১ সালে ইসফাহান বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী ও তরুণ প্রকৌশলী একটি সাধারণ ওয়ার্কশপে এই কাজ শুরু করেন। সীমিত সম্পদ নিয়ে তারা প্রাথমিক ড্রোন তৈরি করেন—যার জ্বালানি ট্যাংক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল মেডিকেল আইভি ব্যাগ, আর প্রপেলার ছিল হাতে বানানো। প্রথমদিকে এই উদ্যোগকে অনেক সামরিক কর্মকর্তা গুরুত্ব না দিলেও কয়েক বছরের চেষ্টায় সফলতা আসে।
১৯৮৩ সালে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূর থেকে একটি প্রাথমিক ড্রোন ইরাকি সামরিক ঘাঁটির ওপর দিয়ে উড়ে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে ফিরে আসে। এটি ছিল ইরানের ড্রোন কর্মসূচির বড় সাফল্য। এরপর নিয়মিত ড্রোন ইউনিট গঠন করা হয় এবং আইআরজিসি (ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড) এই প্রকল্পের দায়িত্ব নেয়।
পরবর্তীতে ইরান আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সরাসরি প্রযুক্তি না পেয়ে বিকল্প উপায়ে যন্ত্রাংশ সংগ্রহের নেটওয়ার্ক তৈরি করে—দুবাই ও সিঙ্গাপুরের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ থেকে খুচরা যন্ত্রাংশ এনে দেশে সংযোজন করা হতো। ধীরে ধীরে ড্রোন প্রযুক্তিতে তাদের সক্ষমতা বাড়তে থাকে।
প্রথমদিকে এসব ড্রোন শুধুই নজরদারির কাজে ব্যবহৃত হলেও ১৯৮৭ সালের পর সেগুলোকে আক্রমণাত্মক অস্ত্রে রূপান্তরের চেষ্টা শুরু হয়। এই ধারাবাহিকতায় “মোহাজের” সিরিজের ড্রোন তৈরি হয়, যা সরাসরি হামলা চালাতে সক্ষম। ১৯৮৮ সালের মধ্যেই ইরান যুদ্ধক্ষেত্রে সশস্ত্র ড্রোন ব্যবহারের অন্যতম পথিকৃৎ হয়ে ওঠে।
যদিও ড্রোন প্রযুক্তির সূচনা আরও আগে ইসরায়েলের হাতে—বিশেষ করে ১৯৭৩ ও ১৯৮২ সালের যুদ্ধে তারা সফলভাবে ড্রোন ব্যবহার করে—ইরান সেই প্রযুক্তিকে ভিন্নভাবে কাজে লাগায়। তারা উচ্চপ্রযুক্তির বদলে কম খরচে বেশি সংখ্যক ড্রোন তৈরির কৌশল নেয়।
এই কৌশলই ইরানের ড্রোন শক্তির মূল ভিত্তি। একটি ড্রোন তৈরিতে যেখানে প্রায় ২০ হাজার ডলার খরচ হয়, সেখানে একটি ক্রুজ মিসাইলের দাম হতে পারে ২০ লাখ ডলার। ফলে একসঙ্গে বিপুল সংখ্যক ড্রোন পাঠিয়ে শত্রুর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চাপে ফেলা সম্ভব হয়। প্রতিপক্ষকে এসব ড্রোন ঠেকাতে ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হয়, যা অর্থনৈতিকভাবে বড় চাপ সৃষ্টি করে।
ড্রোনের আরেকটি বড় সুবিধা হলো এগুলো নিচু উচ্চতায় ও কম গতিতে উড়ায় রাডারে শনাক্ত করা কঠিন। একসঙ্গে অনেক ড্রোন পাঠালে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সবগুলো ঠেকাতে পারে না—যা আধুনিক যুদ্ধে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।
২০১৯ সালে সৌদি আরবের আরামকো তেল স্থাপনায় হামলায় এই কৌশলের কার্যকারিতা স্পষ্ট হয়। অল্প খরচের ড্রোন দিয়ে বড় অর্থনৈতিক ক্ষতি করা সম্ভব হয়েছে, যা সামরিক শক্তির প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে।
সর্বশেষ ২০২২ সালের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ইরানের তৈরি শাহেদ-১৩৬ (জেরেনিয়াম-২) ড্রোন ব্যবহারের মাধ্যমে বিষয়টি বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসে। এতে প্রমাণ হয়, দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরান ধৈর্য, কৌশল এবং স্বল্প খরচের উদ্ভাবনের মাধ্যমে আধুনিক যুদ্ধের নিয়ম বদলে দিতে সক্ষম হয়েছে।
সব মিলিয়ে, ইরানের ড্রোন কর্মসূচি দেখিয়েছে—প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা থাকলেও সঠিক কৌশল, ধারাবাহিকতা এবং কম খরচের উদ্ভাবন দিয়ে বৈশ্বিক সামরিক সমীকরণে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব।





































