বাংলাদেশে ‘মিডিয়া’ শব্দটি আমরা প্রায়ই ভুলভাবে অনুবাদ করি ‘গণমাধ্যম’ হিসেবে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মিডিয়া মানে ‘প্রচারমাধ্যম’—যা কেবল তথ্য পরিবেশন করে না, বরং জনমত ও জনসংস্কৃতি গঠনের একটি শক্তিশালী হাতিয়ারও। আর এই মিডিয়াই বিগত প্রায় দেড় দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি ও সমাজে একধরনের গণবিরোধী ভূমিকা পালন করে আসছে।
আজকের মিডিয়া যে শুধু তথ্য দেয় তা নয়, বরং তারা মতামত গড়ে, সংস্কৃতি তৈরি করে, বিশ্বাস ও চেতনা নির্মাণ করে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, এই মিডিয়া ফ্যাসিবাদী রাজনীতির সহায়ক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। তারা কখনো প্রকাশ্যে আবার কখনো পরোক্ষভাবে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শের বাহক হিসেবে কাজ করে চলেছে—তা যতই তারা নিরপেক্ষতার মুখোশ পরুক না কেন।
সবচেয়ে ভয়াবহ সত্যটি হলো—মিডিয়ার নিজের ভেতরের যে সংস্কৃতি, সেই সংস্কৃতিই মূলত একধরনের দলীয় দাসত্ব, মানসিক গোলামি ও চিন্তার দৈন্যতায় আক্রান্ত। কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে, বাংলাদেশের মিডিয়া কাঠামো আওয়ামী সংস্কৃতির বর্ধিতাংশ হিসেবে কাজ করছে। এরা সংকটে অন্য পক্ষের দিকে দৌড়ায়, কিন্তু চিন্তা-মননে ‘লীগ’ এতটাই গেঁথে বসে আছে যে, তারা নিজেরাও বুঝতে পারে না—কোন অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে।
আজকের বাস্তবতায় মিডিয়া ব্যবহৃত হচ্ছে গোষ্ঠীস্বার্থের হাতিয়ার হিসেবে। বড় বড় মাফিয়ারা এখন আর কুকুর পোষে না—তারা সাংবাদিক পোষে। তাদের কাজ একটাই—প্রভুর পক্ষে মত গড়ে তোলা, এবং যারা এই মাফিয়াতন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তাদের বিরুদ্ধে লাগাতার চরিত্রহনন চালানো। সেইসব তথাকথিত মিডিয়া যোদ্ধারা দেশপ্রেমিক, প্রতিবাদী ও ভিন্নমতাবলম্বী যে কাউকে হেয় করতে এক মুহূর্তও দ্বিধা করে না। আর যখন তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা হয়, তখন তারা “সাংবাদিকতার স্বাধীনতা”র বুলি আওড়াতে থাকে।
কিন্তু এই স্বাধীনতার সঙ্গে তো জড়িত থাকে সততা ও নৈতিকতা। সেটি কোথায়? তারা ভুলে যায়—বাংলাদেশে একটি বিপ্লব-স্কেলের অভ্যুত্থান ইতোমধ্যেই ঘটে গেছে, যার ধাক্কা কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং সংস্কৃতি ও চিন্তার কাঠামোকেও নাড়িয়ে দেওয়ার কথা।
সুতরাং, যদি মিডিয়াকে সত্যিকার অর্থে দেশের পক্ষে আনতে চাই, তবে আমাদের প্রথম কাজ হবে এই করাপ্ট, মাফিয়ানির্ভর স্টাবলিশমেন্টকে প্রতিহত করা। গড়ে তুলতে হবে নতুন চিন্তা, নতুন সংস্কৃতি—একটি কাউন্টার স্টাবলিশমেন্ট। মিডিয়াকেও বদলাতে হবে তার নিজস্ব মানসিক কাঠামো, তার ভেতরের চিন্তা ও চর্চা। শুধু মালিকানা বদল নয়, বদলাতে হবে মিডিয়ার আত্মা।
এই পরিবর্তনের সুবর্ণ সুযোগ ছিল সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদলের পর। কিন্তু যারা ভাবছেন—ক্ষমতায় থাকা দল পরিবর্তিত হলে মিডিয়া নিজে থেকেই জনগণের পক্ষে কাজ করবে—তারা আসলে বোকার রাজ্যে বাস করছেন। মিডিয়া যদি আদর্শগতভাবে পরিবর্তন না হয়, তবে যেই আসুক, মিডিয়া আবার ঘুরে গিয়ে সেই পুরনো প্রভুর গল্পই আওড়াবে।
আর তখন তারা আবারও ভুয়া তথ্য বানিয়ে, মিথ্যা প্রচার চালিয়ে, প্রকৃত দেশপ্রেমিকদের চরিত্র হননের খেলায় মেতে উঠবে। তারা হিরোকে বানাবে ভিলেন, আর ভিলেনকে উপস্থাপন করবে ত্রাতা হিসেবে।
তাই এখন সময়—মিডিয়া কী প্রচার করছে, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো—মিডিয়া নিজে কী বিশ্বাস করে, কী চর্চা করে। এই আত্মসংস্কার ছাড়া নতুন বাংলাদেশ গড়া যাবে না। এগিয়ে আসতে হবে চিন্তাশীল, সৎ ও সাহসী মানুষদের—যারা মিডিয়াকে সত্য, ন্যায় ও মানুষের পক্ষে দাঁড় করাতে পারবেন।





































