
বাংলাদেশের মূল সমস্যা রাজনৈতিক নয়, বরং নৈতিক। কিন্তু সমস্যা হলো—চরম টাউট লোকেরাই নৈতিকতার এজেন্সি খুলে বসেছে। তারা একটি ফ্যানাটিক জোয়ার তৈরি করে সাধারণ জনগণকে আরও বেশি বিশৃঙ্খল করে তোলে। মধ্যপন্থার নাগরিক ভিত্তিক স্বচ্ছ রাজনৈতিক অবস্থান বাদ দিয়ে, তারা সম্ভাবনাময় শক্তিকে গুপ্ত/ডিপ-স্টেট ভিত্তিক রাজনীতির দিকে ঠেলে দেয়। এই চক্র সবসময় বিপ্লবী ভঙ্গিতে থাকে, কিন্তু সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে না যে তারা মূলত দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানেরই অংশ। তাদের কারণেই বাংলাদেশে প্রকৃত রাজনীতি ও চিন্তাশীলতার বিকাশ সম্ভব হয়নি।
এই গোষ্ঠী নিজেদের কিছু অশিক্ষিত মুরিদ তৈরি করা ছাড়া আর কিছু করতে পারেনি। জাতীয় জীবনে তাদের কোনো অবদান নেই। তারা নিজেরা কখনো কোনো ঝুঁকি নেয়নি, বরং অন্যদের উসকে দিয়েছে। পরবর্তীতে যখন ঘটনা ঘটেছে, তখন তার সমস্ত কৃতিত্ব দাবি করেছে। তারা মূলত ব্যক্তিগত স্বার্থ ও অহংবোধকে জনগণের নামে, চিন্তার নামে, বিপ্লবের নামে প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
যে কোনো সম্ভাবনাময় রাজনৈতিক শক্তিকে শুরুতেই দিকভ্রান্ত করার জন্য তারা কয়েক স্তরে নিজেদের লোক বসিয়ে রাখে। তারা মূলত পাওয়ার ব্রোকার হিসেবে কাজ করে এবং বহুদিন ধরেই এই ভূমিকা পালন করছে।
এই চক্রটি নতুন রাজনৈতিক দলের একাংশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। আমি অনেক আগেই বলেছি, তারা রাজনীতির জন্য কুফা, এক ধরনের ফেরাউন। এই ডুগডুগি বাজানো গোষ্ঠী যার দিকেই ঝুঁকেছে, তারই দুর্ভাগ্য ডেকে এনেছে।
এনসিপির অনেক ভুল থাকলেও, অভ্যুত্থানের লড়াকু শক্তি হিসেবে জনগণের কাছে তাদের একটা আলাদা সম্মান ও মর্যাদা থাকবে। তবে এই মর্যাদা ধরে রাখতে হলে স্বচ্ছ অবস্থান ও নৈতিক উচ্চতা বজায় রাখতে হবে। কিন্তু এই চক্র যখনই দলে প্রবেশ করবে, তখনই তারা ভারতবিরোধী ভারতীয় রাজনীতি এবং আওয়ামীবিরোধী আওয়ামী রাজনীতি করিয়ে নেবে।
যদি নতুন দল এই চক্রকে চিহ্নিত করে তাদের দলীয় কার্যক্রম থেকে সম্পূর্ণভাবে দূরে সরাতে না পারে, তাহলে তারাও তিন কদম এগিয়ে পাঁচ কদম পিছিয়ে যাবে।
এই গোষ্ঠী বুদ্ধিজীবিতার ও এক্টিভিজমের আড়ালে এক ধরনের ফ্যানাটিসিজম বা হুজুগেপনা তৈরি করছে, যা জাতি গঠন ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক উত্তরণের জন্য বড় সমস্যা। ইতোমধ্যে তাদের একাধিক অবস্থান পরাজিত হয়েছে ও ভুল প্রমাণিত হয়েছে, তারপরও কেন নতুন দল তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে পারছে না, সেটাই রহস্য।
মনে রাখতে হবে, রাজনীতি একটি নৈতিক পছন্দ। যত স্বচ্ছ অবস্থান নেওয়া যাবে, সত্যকে যত বেশি আকড়ে ধরা হবে, ততই শক্তিশালী হওয়া সম্ভব। কিন্তু যত বেশি চতুরতা ও গোপন পথ খোঁজা হবে, তত দ্রুত রাজনীতি থেকে হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।
রাজনীতির বিকাশের এই সময়ে নিজেদের ধ্বংস কোরো না—এইসব টাউটদের খপ্পরে পড়ে। এখনও সময় আছে, সতর্ক হও। তাদের বাকোয়াজিতে না মজে সরলভাবে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাও। মানুষই তোমাকে আগলে রাখবে।
মনে রাখো—
“অধিকাংশ বুদ্ধিজীবী মেরুদণ্ডহীন, স্বার্থপর এবং দুর্নীতিগ্রস্ত। তারা হয়তো কারো পুতুল, প্রচারক বা অন্ধ অনুগামী।”—Nassim Nicholas Taleb
সাধারণ মানুষ জীবনকে সরলভাবে দেখে। সরলতা যে কোনো সত্য ও সৌন্দর্যের মূল নির্যাস। যাদের মধ্যে এই সরলতা নেই, তাদের দ্বারা কোনো মহৎ কাজ সম্ভব নয়। আগে এই সরলতা রক্ষার সংগ্রামে সফল হতে হবে, তাহলেই মহৎ কিছু করা সহজ হবে। এখানেই আমরা বেশিরভাগ মানুষ হেরে যাই। তখন, মহত্ত্বের নকল চরিত্রে অভিনয় করি। জীবনটা হয়ে যায় একটা মিমিক্রি।