জুলাই গণহত্যা
Advertisements

বাংলাদেশে এখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কার ও মানবাধিকার নিশ্চিতের দাবি জোরালো হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ঢাকা সফরে এসেছেন জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী বিশেষ দূত ড. অ্যালিস জিল এডওয়ার্ডস। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পুলিশি নির্যাতন বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংস্কার এবং দীর্ঘদিনের বিচারহীনতা দূর করার উপায় নিয়ে তিনি কথা বলেছেন।

অস্ট্রেলীয় মানবাধিকার আইনজীবী ড. এডওয়ার্ডস বর্তমানে জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী সপ্তম স্পেশাল র‍্যাপোর্টার এবং এই পদে প্রথম নারী। প্রায় ২৫ বছরের অভিজ্ঞতায় তিনি পুলিশ, বিচারব্যবস্থা ও কারাগার সংস্কার নিয়ে কাজ করেছেন। যৌন সহিংসতাকে নির্যাতনের একটি রূপ হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা রয়েছে।

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, দেশটি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আছে। মানুষের প্রত্যাশা যেমন বেশি, তেমনি চ্যালেঞ্জও বড়। তার মতে, সহিংসতার সমস্যা নতুন নয়—এটি দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতার ফল। তাই সমাধানও হতে হবে গভীর ও স্থায়ী।

মানবাধিকার নিয়ে রাজনীতি না করে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। সংসদীয় মানবাধিকার কমিশন গঠনের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, সব দলের অংশগ্রহণ থাকলে এ ধরনের উদ্যোগ আরও কার্যকর হবে।

পুলিশ সংস্কার নিয়ে তিনি সবচেয়ে জোরালো কথা বলেন। তার মতে, জিজ্ঞাসাবাদের সময় নির্যাতন করলে সত্য বের হয় না, বরং ভুল তথ্য পাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। ভয়ের কারণে মানুষ অনেক সময় এমন স্বীকারোক্তি দেয়, যা সত্য নয়। তাই তিনি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে জিজ্ঞাসাবাদ করার পরামর্শ দেন। জিজ্ঞাসাবাদ অডিও বা ভিডিওতে রেকর্ড করা, জোর করে স্বীকারোক্তি নেওয়া বন্ধ করা এবং প্রমাণভিত্তিক তদন্তে ফিরে যাওয়ার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন। তার ভাষায়, পুলিশকে জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করতে হবে, ভয় দেখানোর বাহিনী হিসেবে নয়।

র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) নিয়ে তিনি বলেন, শুধু নাম পরিবর্তন করে কোনো লাভ নেই। এই বাহিনীর কাজের ধরন, কাঠামো এবং ব্যবহৃত পদ্ধতিতে বাস্তব পরিবর্তন আনতে হবে। বাহিনীগুলোকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা জনগণের অংশ হিসেবে কাজ করে।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সহিংসতার বিচার প্রসঙ্গে তিনি সরাসরি মন্তব্য না করলেও একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার ওপর জোর দেন। তার মতে, ভুক্তভোগীদের নিরাপদে অভিযোগ জানানোর সুযোগ থাকতে হবে। পাশাপাশি সত্য প্রকাশ এবং সমাজে পুনর্মিলনের একটি প্রক্রিয়া থাকা জরুরি।

নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ নিয়েও তিনি কথা বলেন। জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী সনদের আলোকে তিনি বলেন, সরকারকে এমন একটি ব্যবস্থা করতে হবে যাতে ভুক্তভোগীরা সহজে অভিযোগ জানাতে পারেন এবং ক্ষতিপূরণ পান। শুধু সাম্প্রতিক ঘটনা নয়, গত অনেক বছরের নির্যাতনের শিকারদেরও এর আওতায় আনা উচিত।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে তিনি বলেন, মানবাধিকার রক্ষা মূলত প্রতিটি দেশের নিজের দায়িত্ব। কার্যকর বিচারব্যবস্থা ছাড়া জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। শেষ পর্যন্ত তিনি বলেন, মানবাধিকার কোনো অতিরিক্ত বিষয় নয়—এটাই একটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও মানুষের আস্থার ভিত্তি।

Advertisements