জমিদারি-হিন্দুত্ব জাগিয়ে বলা ওআইসি ‘সাম্প্রদায়িক’
Advertisements

ইংরেজি কমিউনাইজ [communize] শব্দটি খুবই ইতিবাচক এক শব্দ। যার রুট শব্দ কমিউন [commune]। ল্যাটিন অরিজিন কমিউনিস [communis] সেখান থেকে ইংরাজিতে যার অর্থ কমন [common] বা সাধারণ। সেখান থেকে সম্ভবত ফ্রেঞ্চ comuner (মানে ভাগাভাগি শেয়ার করা), হয়েও অরিজিনাল কমিউনাল [communal] (জোর করে দেয়া হিন্দু-ভারতীয় নেতি অর্থটা না) খুবই ইতিবাচক শব্দ যার অর্থ যে কমিউনিটিতে স্বেচ্ছাশ্রম দেয়, কমিউনিটির জন্য কাজ করে, আর কমিউনিটির কষ্ট-আরামসহ সবই যে শেয়ার করে; এবং এক সম্প্রদায় হিসেবে মিলেমিশে থাকে। এছাড়া, অনেক সময় প্রকৃতির সাথে স্পিরিচুয়ালি সম্পর্কিত করে দেখা অর্থে ‘কমিউনাইজ’ শব্দটা ব্যবহার করা হয়। দেখা যাচ্ছে রুট কমিউন এর যতগুলা অর্থ হয় সবই ইতিবাচক। কোন নিচা মানে যেটাকে ইংরাজিতে নেতিবাচক বা derogatory অর্থে ব্যবহার হয় এমন কোন ডেরিভেটিভ শব্দ বা অর্থই নাই।

অথচ বৃটিশ-ইন্ডিয়ান সমাজের জমিদার-হিন্দুরা রাজনৈতিক, সামাজিক বা কালচারাল আধিপত্য খাটাতে গিয়ে সেই দরকারে অরিজিনাল কমিউনাল শব্দের অর্থ-বিকৃতি ঘটিয়েছিল। তাই ডিকসনারিতে না থাকলেও হিন্দুত্ববাদী ধারণা ও ঘৃণায় হিন্দুত্ব-জাতির জোশে তারা সব ঢেকে ফেলতে চেয়েছিল। আর তাতে সবচেয়ে ইতিবাচক কমিউন শব্দটাকেও জবরদস্তিতে নেতিবাচক অর্থ দিয়ে ছেড়েছে। কিন্তু শব্দটা ইংরাজি, ফলে ইংলিস ডিকসনারি তাদের এই নেতি অর্থ গ্রহণ করে নাই। একারণে বলা যায় জমিদার-হিন্দুরা কমিউন শব্দের বাংলা – ‘সম্প্রদায়’ শব্দটাকে করেছে ‘সাম্প্রদায়িক’ যা খুবই নেতিবাচক অর্থ। তাই ভারতে ছেপে নেওয়া ছাড়া অন্য কো্ন ইংরেজি ডিকশনারিতে নেতি ‘কমিউনাল’ শব্দটাই পাওয়া যাবে না। কমিউন বা কমিউনিটি অথবা ইতিবাচক-কমিউনাল শব্দ পাওয়া যাবে। যার সবগুলোও অবশ্যই ইতিবাচক শব্দ।

এখন জমিদার-হিন্দুর দেয়া এই কমিউনাল শব্দের অর্থ কী? তারা কী বোঝাতে চান?
প্রথমত তারা বলতে চান, অবিভক্ত বাংলায় মুসলমানেরা বাঙালি না। জমিদার হিন্দুর রাজনৈতিক সামাজিক কালচারাল আধিপত্য সবাইকেই মানতেই হবে। আর সেই জবরদস্তি ক্ষমতার জমিদার-হিন্দুর দাবি বাঙালি মানেই কেবল হিন্দু; মুসলমানেরা এথনিক পরিচয়ে বাঙালিই নয়। যেন কারও এথনিক-সাংস্কৃতিক পরিচয় অন্য কারও রাজনৈতিক ক্ষমতা দিয়ে নির্ধারণ করে দেয়া যায়।

সারা মোগল আমলের নিয়ম খাজনা দেয়া সাপেক্ষে জমিতে যেই চাষাবাদ করে জমি ভোগ-দখলের অধিকার তাঁর। বৃটিশ কলোনি-দখলদারেরা প্রথম এই জমি মালিকানা ভিত্তি ভেঙ্গে দেন। তারা জোর করে নেয়া জমির আগেরটাইটেল এবার অর্থের বিনিময়ে ‘জমিদার নামে নয়া গোষ্ঠির কাছে সেই জমির টাইটেল হস্তান্তর বা লিখে দিয়েছিল। অথচ তখনও জমি ভোগ-দখলের অধিকার পুরানা জমির চাষাবাদকারির হলেও।

এখন নতুন এই জমিদার-হিন্দু শ্রেণী নিজ ক্ষমতা আধিপত্য দেখাতে মুসলমানদের এথনিক-সাংস্কৃতিক পরিচয় নিজ রাজনৈতিক ক্ষমতা দিয়ে নির্ধারণ চালু করেন। দাবি করেন মুসলমানেরা বাঙালি না। এরই বিপরীতে দুবার জবাব দিয়েছে বাঙালি মুসলমানেরা। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান কায়েমের প্রধান সংখ্যা-শক্তি হয়ে দেখিয়েছে তারা অবশ্যই মুসলমান। আর পরে ১৯৭১ সালে রক্ত দিয়ে সশস্ত্রযুদ্ধ করে দেখিয়েছে – তারা বাঙালিও। জমিদার কলকাতা তাদের বাঙালিত্ব কেড়ে নিতে পারে নাই, পারবে না। ব্রাহ্মণ্য বর্ণপ্রথায় নিষ্পেসিত অন্তজ কিন্তু লড়াকু বাঙালির যে অংশটা ভালভাবে বাঁচতে ও লড়াবার সুবিধার জন্য ইসলাম গ্রহণ করেছিল এরা বাঙালি মুসলমান অবশ্যই। কিন্তু একারণে তার এথনিক-জাতি পরিচয়, যে ভাষায় সে মায়ের সাথে কথা বলে সম্পর্ক করে তা বদলে যাবে কেন? মুসলমানদের বাঙালি পরিচয় কোন জমিদার-হিন্দু মাতবর কেড়ে নিতে পারে না। মুসলমানদের বাঙালি পরিচয় কেড়ে নিবার ক্ষমতা জমিদার-হিন্দুর নাই, জমির মালিকানা টাইটেলের মত এই বাঙালি পরিচয় কেড়ে নেয়া যায় না সম্ভব নয়। মানুষের এথনিক পরিচয় প্রায় অর্গানিক; ফলে তা কেড়ে নিতে পারবে না। আমরা যে ঘরে জন্ম নেই সে ভিত্তিতে এই পরিচয় সেখানেই নির্ধারিত হয়ে যায়। এজন্য এথনিক-সাংস্কৃতিক অর্থে জাতি বা জাতিবোধ কথাটা আগে বুঝতে হবে। এটা জবরদস্তির বিষয় না। মুসলমান বাঙালি তাই বাংলা ভাষা ছাড়ে নাই ছাড়তে পারে না, বাঙালি খাদ্যাভাস ইত্যাদিও ছাড়বে না আর সর্বোপরি মুসলমানিত্বও ছাড়ে নাই। তাতে শরতচন্দ্র হয়ে যতই আপনি “বাঙালি বনাম মুসলমানের খেলা” দেখানোর উপন্যাস লেখেন না কেন!

কিন্তু বৃটিশ-ভারতের কলকাতার জমিদার হিন্দু সেই জবরদস্তিটাই করেছিল। অ-হিন্দুরা বিশেষত মুসলমানেরা তাদের মানতে না চাইলে অথবা পাল্টা তাদেরকে ভিন্ন কোন নিজ ধর্মীয় সামাজিক চিহ্ন দেখানোর চেষ্টা করলে তাদেরকে “সাম্প্রদায়িক ডাকা হবে” – এটা ছিল জমিদারশ-হিন্দুর সিদ্ধান্ত। তাদের আধিপত্যের সমাজে থাকতে গেলে তাদের সংজ্ঞায়িত করা ধারণা মানতে বাধ্য করার কায়দা হল এটা। মুসলমানদের উপর চাপিয়ে দেয়া তাদের কথিত সব শিষ্টাচার ও কোড ফলো করলেই কেবল তারা স্কুল-কলেজ বা চাকরিতে তাদের সমাজে প্রবেশাধিকার দেবে, পাশে বসতেও দিতে পারে। আর যে তাদের কোড মানে না, ডমিনেন্স মানে না তাকে জমিদারেরা ‘সাম্প্রদায়িক’ বলত। একারণেই আজও সাম্প্রদায়িক শব্দটাই জমিদার-হিন্দুর সেই অত্যাচারেরই স্মারক চিহ্ন। কাজেই এই সাম্প্রদায়িক শব্দটা ব্যবহারে আমাদের সতর্কতা প্রয়োজন!
মনে রাখতে হবে মুসলমানের বিরুদ্ধে জমিদার-হিন্দুর বুকভরা বিদ্বেষ আর ঘৃণার ঝড় তোলা শব্দটাই হল ‘সাম্প্রদায়িক’।

ভারতের বিদেশ বিভাগ বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বর্তমান মুখপাত্র অরিন্দম বাগচি একজন বাঙালি হিন্দু; উনার ‘বাগচি’ টাইটেল তাই নির্দেশ করে। হিজাব ইস্যুতে স্বভাবতই ওআইসি বা ইসলামি ঐক্য সংস্থা [Organisation of Islamic Cooperation (OIC)] ভারতের মুসলমান বিদ্বেষ-ঘৃণা ছড়ানোর নীতির নিন্দা করে অন্যান্যদের মতই বিবৃতি দিয়েছে। এটা সহ্য হয় নাই ভারতের বিদেশ বিভাগের। ব্যাপারটাকে তারা দেখেছে যেন পুরানা জমিদার হিন্দুর চোখে, তাদের আধিপত্য অস্বীকারের চেষ্টার আলোকে। তাই পুরা জমিদার-হিন্দুর ঘৃণার হুঙ্কার দিয়েছেন অরিন্দম বাগচি। বলেছেন এটা নাকি ওআইসির সাম্প্রদায়িক মাইন্ডসেট। এছাড়া অরিন্দম দাবি করছেন ভারতে নাকি একটা “কনষ্টিটিউশনাল ফ্রেমওয়ার্ক ও মেকানিজম” কার্যকর আছে আর ওর সাথে নাকি আছে – “ডেমোক্রাটিক ইথোস (মুল্যবোধ) ও (পলিটি)” ।

constitutional framework and mechanisms, as well as democratic ethos and polity. The communal mindset of the OIC Secretariat does not allow for a proper appreciation of these realities

কিন্তু সরি, অরিন্দম! ভারতে এগুলোর কোনটাই নাই, ভারতের জন্ম থেকেই নাই। আছে কেবল দগদগে ঘা, এক হিন্দুত্ব। পলিটি, ইথোস কিছুই থাকতে দেয়া হয় নাই। এমনকি কান পেতে শুনেন আরএসএস প্রধানের ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র ঘোষণা দিবার পরিকল্পনা শুনতে পাবেন। আর চলতি নির্বাচন উপলক্ষ্যে সব হারিয়ে মোদির ভোট যোগাড়ের এতে একমাত্র উপায় মুসলমান গণহত্যার হুমকি, মুসলমান বিদ্বেষ-ঘৃণা ছড়ানো আর বিজেপি প্রার্থী না জিতলে মুসলমান মারবেন, বুলডোজার চালাবেন এই হুমকি দিচ্ছে। এগুলো কী কনষ্টিটিউশনাল আচরণ ?? ভারতে কী সুপ্রীম কোর্ট অথবা কোন নির্বাচন কমিশন বলে কিছু আর আদৌ আছে??? যাদের প্রত্যক্ষ কনষ্টিটিউশনাল দায়িত্ব ছিল মুসলমান ভোটারদের উপর এত চরম হুমকির বিরুদ্ধে তাতক্ষণিক সকল ব্যবস্থা নেয়া। অথচ এমন কোন কিছুই করা হয় নাই। মানে ভারতের দুর্বল যে কনষ্টিটিউশন যে কনষ্টিটিউশনালিজম তাই তো নিস্ক্রিয় ও অকেজো হয়ে গেছে। এবং এটা প্রমাণিত। সেকারণের ওআইসি তো কোন ইসলামি আলেম ডেকে আনার কথা বলে নাই, পরামর্শ দিতে যায় নাই। বরং আহবান রেখেছে [……OIC called upon the U.N. and the Human Rights Council to take “necessary measures”] জাতিসংঘ ও এর হিউম্যান রাইট কাউন্সিলের কাছে তাদেরকে “প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা” নিতে বলেছে। অথচ দেখা যাচ্ছে এটাও মুখপাত্র অরিন্দমের সহ্য হয় নাই। তাহলে?

ভারতে আছে কেবল দগদগে ঘা – যার নাম হিন্দুত্ব। যেখানে পলিটি, ইথোস কিছুই থাকতে দেয়া হয় নাই, পারে না

অর্থাৎ মুখপাত্র অরিন্দম এখনও জানেনই নাই যে ও আইসি-কে সাম্প্রদায়িক বলা – এটা একটা এথনিক ঘৃণা ছড়ানোর কাজ। কারণ এই “সাম্প্রদায়িক” শব্দ ও ধারণাটাই জমিদার-হিন্দুর মুসলমান-বিদ্বেষী ধারণা ও সেকালে তাদের হাতেই যার আবির্ভাব ঘটানো হয়েছিল। অন্যের এথনিক পরিচয় অরিন্দম আপনি পছন্দ না করতে পারেন। কিন্তু আপনি অন্য এক জনগোষ্ঠিকে তার এথনিক পরিচয় ও ইতিহাস তুলে কথা বলতে পারেন না; জমিদার-হিন্দুর মুসলমান-বিদ্বেষের ইতিহাসের পক্ষে সাফাই দিতে পারেন না। বিশেষ করে আপনি যখন একটা দেশের বিদেশবিভাগের মুখপাত্র!! খেয়াল করেন, হিজাব নিয়ে বিবৃতি, আপত্তি তো আমেরিকাও তুলেছে। ওখানে অরিন্দম বাগচির মুরোদ হয় নাই “সাম্প্রদায়িক মাইন্ডসেট” শব্দ ব্যবহার করে আমেরিকার বিরুদ্ধে কথা বলার!

এদিকে বর্তমান চালু নির্বাচনে মরিয়া মোদিকে জিতাতে, খুঁচিয়ে ঘা করা এক পদক্ষেপ হল ভারতের স্কুল-কলেজে হিজাব ইস্যু খাড়া করা। এতে চরম এক মুসলমানবিদ্বেষ-ঘৃণায় বৈষম্যমূলক আচরণে সমাজ তোলপাড় করা ফেলা, এটাই চলছে এখন। এতে আমেরিকা, ইউরোপ আর এদিকে পাকিস্তান বা ওআইসির নিন্দা করে বিবৃতি দিয়েছে; আর আসলে এতে ভারত কূটনৈতিক সঙ্কটে পড়ে যায়। কূটনৈতিক রেওয়াজের বিষয়টা হল, আপনি আপনার দেশের সব চিহ্ন-পরিচয় নির্বিশেষে আপনার নাগরিকের প্রতি অ-বৈষম্যমূলক রাজনৈতিক সাম্যের চোখে দেখতে বাধ্য থাকবেন ও দেখবেন – এটাই “আন্তর্জাতিক পলিটিক্যাল অর্ডার” আশা করে। এই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই এবার ভারতের নিন্দা করা হয়েছে। আর তাতেই কূটনৈতিক ভাষা ও ভাষ্য হারিয়ে বেহাল দেউলিয়া অবস্থায় পড়ে যায় ভারত। এমন বে-দিশায় পড়ে, ওআইসি-কেই ঐ পুরানা জমিদার-হিন্দুর বয়ানের সাহায্যে “সাম্প্রদায়িক” বলে গালি দিয়েছে। আর এতে যেন সারা দুনিয়াটা জমিদার-হিন্দুর রাজত্ব – এটাই ধরে নেয়া হয়ে গেছে! আবার তাদের হিসাব টনটনে, একইভাবে তারা আমেরিকাকে তাদের নিন্দার জবাব দিতে যায় নাই! অর্থাৎ দুনিয়ার মুসলমান মাত্রই তারা যেনবা জমিদার-হিন্দুর প্রজা!

তাই, এরপরে আমাদের আশা থাকবে যে “সাম্প্রদায়িক” শব্দটার অর্থ-ইতিহাস-তাতপর্য বুঝে এটাকে কিভাবে আমল ও সুলুক করতে হবে তা আমরা নিজেরাই বুঝে নিতে পারব। কারণ জমিদার-হিন্দুর এমন মুসলমান-বিদ্বেষে ভরপুর শব্দের ইতিহাসের পক্ষে আমরা দাড়াতে বা প্রমোট করতে পারি না।

মুসলমান কোপাতে হবে ও ইসলামবিদ্বেষ একমাত্র ভরসা মোদিরঃ
প্রায় তিন সপ্তাহ আগের এক লেখায় পরিষ্কার করে লিখেছিলাম যে, একালের ভারতে বিজেপি-আরএসএস বা মোদি একেবারে চ্যালেঞ্জ হয়ে যাওয়া বা হিন্দুত্ববাদ প্রথমবারের মতো উৎখাত হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থায় পড়েছিল গত ২০২১ সালে। সেবারের মধ্য মার্চে ভারতে নেমে এসেছিল করোনাভাইরাস আক্রমণের সেকেন্ড ওয়েভ বা দ্বিতীয় আক্রমণের ঝড়! সারা ভারত তাতে তছনছ হয়ে গিয়েছিল। অক্সিজেন, বেড আর সৎকার, এসব পাওয়ার পুরোপুরি অনিশ্চয়তা – এটাই হয়ে উঠেছিল ভারতের মুখ্য পরিচয় আর মোদি যার প্রতীকী এবং এক অসহায় প্রধানমন্ত্রীর রূপ। সৌদি আরব অক্সিজেন ভরা ট্যাংকার পাঠিয়েছে কার্গো প্লেনে করে কিন্তু তা তিনি দেশে না দেখিয়েও পারছেন না আবার দেখালে মোদির ইজ্জত যায় অবস্থা! যেন মুসলমান সৌদি আরব তো ‘নিচা’; তার সাহায্য মোদি নিয়েছে এটা কেমন দেখায়? তাই তিনি ঐ ট্যাংকারের উপর রঙ লাগিয়ে সৌদি সব চিহ্ন ঢেকে ঐ অক্সিজেনই ব্যবহার করেছেন, ক্রেডিট নিয়েছেন! আর তা দেখেই দ্যা-হিন্দু দৈনিকের কূটনীতিক এডিটর সুহাসিনী হায়দার প্রথম নিশ্চিত হয়েছিলেন যে, তাদের ভারত আসলে, মোদি তাকে যা বুঝায়ছিলেন, এমন কোনো পরাশক্তি নয়! যা নিয়ে মৌদির বয়ানে এতদিন তিনি বিশ্বাস করেছিলেন। কেবল তখন সেটা তাস্র কাছে পরিস্কার হয়েছে যে ভারত কোন পরাশক্তি নয়। বলেছেন, ভারত নইলে সৌদি সাহায্য নিবে কেন? এ’এক অদ্ভুত ভারতের মিথ্যাবলা প্রধানমন্ত্রী মোদি আর তার সাংবাদিক যার নিজস্ব বুঝাবুঝির মেকানিজমই বিকশিত হয় নাই!

সেখানে আরো বলেছিলাম, চলতি এই নির্বাচনে “মুসলমান কোপাতে হবে, ইসলামবিদ্বেষ – এটাই হবে মোদির একমাত্র ভরসা। হিন্দুত্ববাদের দিকে ভোটার ফেরানোর একমাত্র উপায়। আর তাই ঘটছে। এ’কারণেই ব্যাপারটা এখন দাঁড়িয়েছে এমন যে, বাইডেন যতই মোদিকে মানবাধিকার লঙ্ঘনে অবরোধের ভয় দেখান না কেন, মোদিকে আরো বেশি করে এখন মুসলমান কোপাতেই হবে – তা কাশ্মিরে বা সারা ভারতে। এটাই মোদির রাজনৈতিক আয়ু লুপ্ত হওয়া ঠেকানোর একমাত্র উপায় ঠাউরানো যার সোজা মানে, আগামী ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাইডেনের সাথে মোদি ভারতের সম্পর্ক আর ভালো হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই, বরং আরো সঙ্ঘাতেরই সম্পর্ক হবে। অন্তত ২০২৪ সালের মে পর্যন্ত!”

নির্বাচন শুরু হয়েছে, খবর ভালো নাঃ
শিডিউল মোতাবেক গত ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে ভারতের কিছু রাজ্য বা বিধানসভা নির্বাচন শুরু হয়েছে। আর এর সাথে মোদির পক্ষে পরিকল্পিতভাবে দুটো চরম ঘৃণা ছড়ানোর পরিস্থিতি তৈরি করে নেয়া হয়েছে। প্রথমটি ঘটানো হয়েছে, গত ২০২১ সালের ডিসেম্বরের ১৭-১৯ লাগাতার এই তিন দিন। দুই কথিত ‘সাধু’ নরসিংহআনন্দ ও প্রবোধানন্দ গিরি, তারা এর আয়োজক ও বক্তা। এরা আবার বিজেপি-আরএসএসের বিভিন্ন নামের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের প্রধান নেতা। তারা শেখানে বলেছেন, “প্রত্যেক হিন্দুকে ‘সাফাই অভিযান’ পরিচালনার জন্য হাতে অস্ত্র তুলে নিতে হবে। এ ছাড়া আর কোনো সমাধান নেই”। [every Hindu must pick up weapons and we will have to conduct this cleanliness drive (safai abhiyan). There is no solution apart from this.”] আর প্রথমজন বলেছেন, ‘সারা দুনিয়ায় যদি মানুষকে টিকে থাকতে হয় তবে আমাদেরকে জিহাদিদের উপর সাফাই অভিযান চালাতে হবে” [“In the entire world, if we want humanity to last, we will need to clean it of jihadis. ]। এর পরও কারো বুঝতে অস্পষ্টতা যাতে না থাকে তাই বলে দেই, এখানে এই সাফাই অভিযান মানে হল জাতিগতভাবে (মুসলমানদের) সবাইকে নির্মূল করা বোঝাতে ইংরেজিতে ‘এথনিক ক্লিনজিং’ বলে বোঝায়। দুনিয়াতে প্রথম হিটলার ও তার সহযোগীদের এই এথনিক ক্লিনজিং’ এর অভিযোগে বিচার হয়েছিল। সেই থেকে আন্তর্জাতিক আদালতের চোখে এটা সবচেয়ে ঘৃণিত অপরাধ। যার বেলায় শাস্তি হল সর্বোচ্চ দন্ড। সেই থেকে ‘এথনিক ক্লিনজিং’ – এটাই একাডেমিক বইপত্রে ও আইন-আদালতের ভাষাও সবচেয়ে বড় গোত্রের এক অপরাধ মানা হয় বটে। এটাই এখন মোদি ও তাঁর গোষ্ঠির প্রধান রাজনৈতিক পরিচয়। অথচ মোদি সরকারের বিদেশ বিভাগের মুখপাত্র সমালোচকদেরই উলটা “সাম্প্রদায়িক” বলছেন!

গত ডিসেম্বরে কথিত সাধুদের ঘৃণা-সভার পরে প্রায় এক মাস ধরে চলে এদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা না দেয়ার-নেয়ার পুলিশি প্রচেষ্টা; এছাড়া কোনো বাদি-অভিযোগকারী পাওয়া যাচ্ছে না, এ অজুহাতও খাড়া করা হয়েছিল। এরপরে ১৫ জানুয়ারি কেবল নরসিংহ-আনন্দকে গ্রেফতার করা হয়। তবুও এমন সব আইনে গ্রেফতার দেখানো যাতেসে সহজেই জামিন পেতে পারে। অথচ ‘জনশৃঙ্খলা ভঙ্গ’ বা ‘জনজীবনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি’ – শুধু এ’অভিযোগে কাশ্মির বা নর্থ-ইস্টে অনবরত এমন আইন প্রয়োগ ও গ্রেফতার করে কয়েক বছরের জন্য ফেলে রাখা হচ্ছে; এমন অন্তত চারটি আইন আছে। এসব আইন প্রয়োগ করে তারা, জঙ্গি বা সশস্ত্র সন্ত্রাসী বলে থাকে। অথচ নরসিংহআনন্দের উপর একটা পুরা কমিউনিটিরর উপর এথনিক ক্লিনজিং, গণহত্যা বা হত্যার হুমকি এসবের কোনটাই অভিযোগ আনা হয় নাই। কেবল ৫০৯ দারার একটা অভিযোগ দেয়া হয়েছিল যে নারী ও সাংবাদিকদের উপর আপত্তির ভাষা প্রয়োগ করা হয়েছে [under section 509 of the Indian Penal Code (IPC) for making objectionable remarks against women and abusing a journalist.]। ফলে স্বভাবতই ইতোমধ্যে তাঁর জামিনে মুক্তিও হয়ে গেছে।

এখন এমন গণহত্যার হুমকির ঘটনার পর এক মাস কেন বিভিন্ন অজুহাতে কোনো গ্রেফতার বা মামলা না করে অপেক্ষা করা হল? মূল কারণ এবছরের পাঁচ রাজ্য নির্বাচন শুরু হয়েছে ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে প্রায় এক মাস ধরে কয়েক পর্বে। তাই ১৭-১৯ ডিসেম্বর ২০২১ সালে ঐ এথনিক ক্লিনজিং আর চরম মুসলমানবিদ্বেষ ও ঘৃণা ছড়ানোর বক্তব্য দেয়ার পরও কোনো পুলিশ অ্যাকশন না ঘটানোতে – হিন্দু ভোটারদের মনে উসকানির ঝড় তুলে মানসিকভাবে তাদের প্রভাবিত করার সুযোগ নেয়া হয়। এভাবে এক মাস কাটিয়ে দেয়ার পরে নরসিংহআনন্দ এরপরে গ্রেফতার হয়েছে কি না বা জামিন হয়েছে কি না তা এসব আমজনতা হয়ত ব্যাপারটা আর খেয়াল রাখবে না; বেশির ভাগই মনে রাখবে না – এই ভরসায়। কিন্তু এদিকে হিন্দু ভোটারদের উসকানি দিয়ে এর নগদ ফলাফলে মোদির ভোটের বাক্স পর্যন্ত আনার লক্ষ্যে তাদের মনের ওপর ছাপ ফেলার ঘটনাটা ঘটিয়ে দেয়া তো হয়েই গেছে। এই ছিল পরিকল্পনাটা।

এবার দ্বিতীয় ঘটনা – স্কুল-কলেজে হিজাবঃ
নির্বাচন শুরু হয়ে গেলে সেসব রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বিষয়টা নির্বাচন কমিশনের অধীনে চলে যায়। কমিশনের যেকোনো নির্দেশনা মান্য করা সব-বাহিনীর জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে যায়। সে কারণে হিজাবের ইস্যুটা উঠানো হয়েছে এমন এক বিজেপিশাসিত রাজ্যে যেখানে এবছর নির্বাচন নাই। ফলে নির্বাচন কমিশনেরও কিছু বলার নাই। কিন্তু আবার ইস্যুটা হাজির করা হয়েছে এমনভাবে যার এফেক্ট ভারতব্যাপী বিস্তৃত হয়। স্কুল-কলেজে হিজাব নিষিদ্ধকরণ ইস্যু যে কারণে এটা কেবল কর্নাটক রাজ্যের ঘটনা। এর ওপর আবার এটা এক-দু’টা স্কুল-কলেজের স্থানীয় পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্ত। সারা রাজ্যে বা কর্নাটক শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকেও নয়। একটা জেলার দু-একটা স্কুল-কলেজে। কিন্তু পাশের আরো দুটো জেলায় জবরদস্তিতে হিজাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের প্রচেষ্টাই শুরু করে দেয়া, আন্দোলন, এসব শুরু হয়েছে মোদির ছাত্র সংগঠনকে দিয়ে; অথচ সংশ্লিষ্ট স্কুল-কলেজ পরিচালনা কমিটি নিশ্চুপ।

এতে কার্যত হিজাদ নিষিদ্ধ ইস্যুটা সারা কর্নাটক তো বটেই, সারা ভারতের সব রাজ্য ছাপিয়ে ভারতের বাইরে আমেরিকার নিন্দা প্রস্তাব, ওআইসি নিন্দা প্রস্তাব ঘটিয়ে এটা এখন ভারতের জন্য এক গ্লোবাল কূটনীতিক ইস্যু হয়ে গেছে। এতে বলাবাহুল্য এর এফেক্ট নির্বাচন চলছে এমন পাঁচ রাজ্যের উপরই পরিপূর্ণভাবে কার্যকর প্রভাব ফেলেছে। আর এবার তা সেখানকার প্রতিটি ব্যালট বাক্সে গিয়ে আছড়ে পড়বে, বিজেপির ভোটের বাক্সগুলো এখন নিশ্চয় উপচে পড়বে আর মোদি-বিজেপি এরই অপেক্ষায়! এ হল পরিকল্পনা!

কথিত নিরপেক্ষ হিন্দুত্বের আদালতঃ
এছাড়া এবার ঘটনাকে আরো পোক্ত করতে কোনো উপায়ই ছাড়া হয়নি; তাই আদালতও। এদিকে আদালত মানেই ভীষণ বিজ্ঞ, জ্ঞানী মানুষে তা ভরপুর থাকে। তাদের সামাজিক সম্মানও অনেক উঁচুতে। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট থেকেও এ’ইস্যুতে বলা হল, তারা এখন হস্তক্ষেপ করবে না; কখন করবে তা তারাই ঠিক করবে বলে রায় দেয়া হয়েছে। আর এ সুযোগে স্থানীয় রাজ্য হাইকোর্ট বিরাট নিরপেক্ষতার ভান নিয়ে হাজির। তারা এক সাময়িক রায় দিয়ে দিয়েছে। সেটা হল, “স্টাটাস কো”; যার আইনি মানে হল বিবদমান পক্ষগুলো বিবাদ শুরুর আগে যে যেখানে ছিল, সেখানে ফিরে গিয়ে স্থিতাবস্থায় থাকবে, যত দিন আদালত ইস্যুটা নিয়ে বিচার বিবেচনা করে কোনো ফাইনাল রায় না দেয়। এটাই ইউজুয়াল প্র্যাকটিস হয়ে থাকে।

কিন্তু এখানে বাড়তি একটি টুইস্ট দেয়া হয়েছে। বলছে ‘স্ট্যাটাস কো’; কিন্তু সাথে ব্যাখ্যাও দিচ্ছে যে, এর মানে হল, এই অন্তর্বর্তী বা সাময়িক সময়ে কেউ কোনো ধর্মীয় পোশাকে স্কুল-কলেজে যেতে পারবে না। অথচ এ বলাটাই বেআইনি। এটা নিজেই এক বিরাট বৈষম্য – একেবারে এক সূক্ষ্ম কারচুপি করা যাকে বলে।

কারণ হিজাব ইস্যু হওয়ার আগে যে যেমন খুশি হিজাব, পাগড়ি, ঘোমটা প্রভৃতি পরে স্কুল-কলেজে যেতে পারত ও আসতও। কাজেই ‘পূর্বাবস্থা’ বলতে এটাকেই বুঝায়। কিন্তু ব্যাখ্যায় তা না বলে উল্টো ধর্মীয় পোশাক পড়া যাবে না [we restrain all the students regardless of their religion or faith from wearing] এ কথা বলে আসলে কথিত এই সাময়িক সময়ের রায়ের কথা বলে যারা হিজাববিরোধী মোদি-বিজেপির লোক এদের দাবিকেই মেনে নেয়া ও এদের পক্ষেই রায় দিয়ে দেয়া হয়ে গেছে। অর্থাৎ দুপক্ষের কথা শুনে বিচার বিবেচনা করে ফাইনালি রায় হবার আগেই we restrain বলে হিজাবকেই বাদ দেওয়ার কর্তৃত্ব কোন বিচারকেরই নাই। কিসের ভিত্তিতে আপনারা we restrain বললেন??? কারণ, এই সাময়িক রায়টাও তো কোন শুনানির শেষে দেয়া নয়, করা হয়নি। অথচ, আদালত যেন খুবই একটি নিরপেক্ষ সাময়িক সিদ্ধান্ত দিয়েছে এই ভাব করে তাদের হিন্দুত্বের খেয়াল এটাই চাপিয়ে দিয়েছে।

“Pending consideration of all these petitions, we restrain all the students regardless of their religion or faith from wearing saffron shawls (Bhagwa), scarfs, hijab, religious flags or the like within the classroom, until further orders.”

এখন পরে কী ফাইনাল রায় হবে তা আগেই বলে দেয়া যায়। এ’বছরের নির্বাচন কেবল এই পাঁচ রাজ্যে আর তা কেবল ১০ মার্চ পর্যন্ত। এর মানে হল ১০ মার্চের পরে আদালত ফাইনাল রায় দিলে আর সেখানে আবার হিজাব পরে স্কুল-কলেজে আসার পক্ষেও যদি আদালত রায় দেয় তো বিজেপির আপত্তি হবে না; কারণ পরের বছরের আগে আর নির্বাচন নাই। অর্থাৎ এখনকার এই সাময়িক নিষেধাজ্ঞাটা যেঁ বিজেপির পক্ষে কাজ করে দিয়ে আদালত বিজেপির হিন্দুত্ব ও ভোট জোগাড়কে সাহায্য করল। আবার ফাইনাল রায় হিজাব পড়ার পক্ষে দিবার পথ খুলে রেখে বিচারক বিরাট উদার সাজবার পথ পরিষ্কার রেখে দিলেন, এবং তেমন রায়ও দিতে পারবেন।

ভারতের উচ্চ আদালতগুলোর ভেঙে পড়ার ইতিহাসঃ
এমনিতে ভারতের উচ্চ আদালতগুলোকে নিয়ে বাংলাদেশের চোখে আমাদের দেশের অনেকে ভূয়সী প্রশংসা করতে দেখা যায়। কিন্তু বটম অব দ্য ফ্যাক্টস হল, ভারতের আদালতগুলো রাজনীতি বা সরকারের কাছে স্বেচ্ছায় নিজেদের সব ক্ষমতা সমর্পণ করার পেশাগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ১৯৭৫ সালে। কেন ও কখন? প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে নির্বাচনী কারচুপির জাজমেন্টে তাকে দোষীকরে রায় দেয়া হয়ে যায়। এরপর বাকি ছিল তিনি কিভাবে শাস্তি হিসাবে জেলে যাবেন তার ব্যবহারিক সিদ্ধান্ত নেয়া কেননা তিনি সিটিং প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। আর এরপর ইন্দিরার উপর প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ত্যাগ করে নিয়ে এরপর শাস্তিভোগের জন্য তৈরি হয়ে আসতে আদালতের সিদ্ধান্ত-রায় দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ইন্দিরা আদালতের সেই নির্দেশ পালন না করে, রায় উপেক্ষা করে – ক্ষমতায় থেকেই উল্টো দেশে জরুরি অবস্থা জারি করে বসেন। এভাবে তিনি এই শাস্তি গ্রহণ জীবনেও আর করেন নাই।

আর সেই থেকে আইন পেশার সব লোক, রাজনীতিবিদ মিলে মূল্যায়নে গিয়েছিলেন যে, জাজদের অমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার সাথে সংঘাতে যাওয়াতে তাতে কোন লাভই হয়নাই উলটা ভারত-রাষ্ট্রই নাকি দুর্বল হয়ে গেছে। তাই তাদের আপস করা উচিত ছিল।’ এমন সঙ্ঘাতের এই নাকি মহিমা। অর্থাৎ আদর করে যেন বলা যে “রাজনীতিবিদেরা খুব দুষ্ট”। অতএব মন্দের ভাল হিসেবে ক্ষমতার সাথে আপস করাই নাকি ভাল – এই ছিল তাদের সিদ্ধান্ত। কেন?

কারণ না হলে জরুরি অবস্থা দিলে তো তা রাষ্ট্রই না থাকার সমান, এই ক্ষতি হয়। ফলাফলে জরুরি অবস্থা পাওয়ার চেয়ে তাই নির্বাহী ক্ষমতার সাথে আপস করা অথবা এড়িয়ে চলা হলো -এটাই সর্বোত্তম পন্থা। এটাই নাকি আদালতের পথ। যদিও এর কোনো লিখিত প্রস্তাব পাওয়া যাবে না, তবে এটাই সেই থেকে তাদের অলিখিত চর্চা ও বুদ্ধিজীবিতা! আর এ সুযোগে দেখা যাচ্ছে এখন যেটা হয়েছে, একদল বিচারক হয়েছেন যারা এ সুযোগে প্রধান নির্বাহীর কাছ থেকে নানা পার্সোনাল সুবিধা আদায় করে নেয়ার সূক্ষ্ম তৎপরতা চালিয়ে, কে কত বুদ্ধিমানের মত মোদির সাথে সঙ্ঘাত এড়িয়েছেন সেই ক্রেডিটের গর্ব ও এর প্রতিযোগিতা শুরু করে দিয়েছেন। তাতে ভারতের পরপর গত দুই প্রধান বিচারপতি যে এই দোষ দুষ্ট আছে তা আমাদের দেখার সুযোগ হয়েছে। একজন বিশেষ মটর সাইকেল চড়ার খায়েস মিটালেন। অপরজন আসাম জাতিবাদের পক্ষে জাতির-সৈনিক হয়ে গেলেন!

এতে প্রায়ই ভারত-রাষ্ট্রের বড় বড় দুর্বলতা বা ‘ফুটাফাটা’ এসবের কারণে, এটি ভেঙে পড়ার দিকে এগোচ্ছে বলা হয় – সে পথের সবচেয়ে বড় এক গর্ত হল, এই নির্বাহী ক্ষমতার সাথে আপস, এড়িয়ে যাওয়া তথা হবু জরুরি অবস্থা এড়ানোর বিরাট বুদ্ধি প্রয়োগ-কথা!

মুসলমান কোপানো, ঘৃণা ছড়ানোর সাথে ভোটের সম্পর্কঃ

অনেকের মনে হতে পারে মোদির মুসলমান কোপানো, ঘৃণা ছড়ানোর নীতি-পদক্ষেপের সাথে ভোটের সম্পর্ক কী? আমরা বোধহয় বাড়িয়ে দেখছি ব্যাপারটাকে। তা অবশ্যই না। ভারতে এখন রাজ্য নির্বাচন চলছে পাঁচ রাজ্যে যেখানে সবচেয়ে বড় উত্তরপ্রদেশ রাজ্যও আছে। কত বড়? ভারতে কেন্দ্র সরকার গড়তে মোট ন্যূনতম ২৭২ আসনে জিততে হয়। এই ২৭২টার ৮০ আসন সংগ্রহ করা সম্ভব একা এই উত্তরপ্রদেশ থেকেই, যার মানে ২৭২ এর প্রায় তিনের এক ভাগ আসন পেয়ে যাওয়া। একারণে বলা হয়, কেউ কেন্দ্রে সরকার গড়তে চাইলে উত্তরপ্রদেশে জেতা গুরুত্বপূর্ণ’ যদিও এখন যা চলছে তা কেন্দ্রের নির্বাচন না; রাজ্য নির্বাচন। কিন্তু এখন উত্তরপ্রদেশ রাজ্য নির্বাচনে জিতলে তবেই না ২০২৪ সালে কেন্দ্র নির্বাচনেও উত্জেতরপ্তারদেশের আশি আসনের বেশির ভাগ পাওয়া সম্ভব! একারণে এবারের উত্তরপ্রদেশ রাজ্যে মোদি মুসলমান কোপায়ে যেকোনোভাবে জিততে মরিয়া!

ঘটনার কেন্দ্র কৃষি আইনবিরোধী আন্দোলনঃ
এই প্রথম এটা রেকর্ড যে, একটা কৃষক আন্দোলন ১৫ মাস ধরে লাগাতার ভারতের হাইওয়ে রাস্তায় বসে থেকে প্রতিবাদ করে শেষে জয়ী হয়েছে। দিল্লি-উত্তরপ্রদেশের সংযোগ হাইওয়ে সড়কের মুখ্য শহর গাজিপুর। এটাই ছিল সেই আন্দোলনের কেন্দ্রভূমি। হিন্দু জাতিবাদী আনন্দবাজার পত্রিকাও একে ‘ধাত্রীভূমি’ [ইতিহাসের ধাত্রীভূমিতে কি ক্ষতির আশঙ্কায় বিজেপি? ] বলে উচ্ছ্বাস দেখিয়েছে। এঅঞ্চলটাকে ‘পশ্চিম উত্তরপ্রদেশও’ বলা হয়। এটাই মোদির জন্য কাঁটা বিছানো ভূমি। এখানে মোদি হাঁটলে পায়ে কাঁটা বিঁধবে খালি। অথচ বিরোধী অন্যদের বেলায় হবে উল্টোটা। দিল্লিসহ এ অঞ্চলের আবহাওয়া হল – গ্রীষ্মে যত তপ্ত গরম, শীতকালে ততই শীত। অথচ এখানেই ১৫ মাস ধরে অনেকেই বউ-সংসার সাথে নিয়ে রাস্তায় বসে-শুয়ে কষ্ট করে গেছেন। শেষে মোদি তাদের সবার কাছে হার স্বীকার করে মাফ চেয়েছেন, চালু করা তার তিন কৃষি আইন প্রত্যাহার বা বাতিল করেছেন। কেন?

এ অঞ্চলটা আশপাশের হরিয়ানা, পাঞ্জাব বা উত্তরপ্রদেশের বাকি যারা বাণিজিক কৃষিকাজ করে থাকেন, তাদের সবার চেয়েও সমৃদ্ধ এবং আসলে অগ্রগামী স্বার্থের বড় কৃষক লোকেদের বসবাসের স্থল। এদের জাট বা জাঠ, ইংরেজিতে জাঠল্যান্ডার বলা হয়; এমন এদের বৈশিষ্ট্য হল – মিনিমাম পাঁচ একর বা বেশি ও উর্বর জমিকে ঘিরে এদের কারবার এবং পাইকারি কৃষিপণ্যের বাজারের (মান্ডির) বড় সাপ্লায়ার এমন কৃষক এরা। পাকিস্তানের করাচিতে বা কাশ্মিরেও এমন ‘জাঠদের’ দেখা মিলবে। আর তত্ত্বটা হল, যত আরবাইনাইজেশন বা শহুরেকরণ ঘটবে, ততই জাঠ কালচার বড় হবে, তাদের প্রভাব বাড়বে। এরাই ছিল ঐ কৃষক আন্দোলনের মূল আপসহীন অংশ। কিন্তু এমন জাঠ অঞ্চলে হিন্দু-মুসলমান জাঠের টেনশন প্রায়ই ঘটে থাকে, হয়েছেও স্থানীয় ভাষায় এটাকে তারা আবার জাঠ ও মুসলমান দ্বন্দ্ব বলে বুঝে।

মোদির ২০১৪ সালের প্রথম কেন্দ্রে সরকার গঠনে নির্বাচনের আগের প্রায় এক বছর অমিত শাহ, ‘দা মাস্টারমাইন্ড অব দাঙ্গা’ – তিনি এসে এই উত্তরপ্রদেশে কাটিয়েছেন। তারই পদক্ষেপে মুজাফফরনগরে তিনি পরিকল্পিত দাঙ্গা ঘটিয়েছিলেন, যার নগদ পরিণতি হল জাঠ-মুসলমান শত্রুতাকে চরমে তোলা, ভোট ভাগ হয়ে যাওয়া। আর সেটারই ব্যালট ফলাফল ছিলল, ২০১৪ নির্বাচনে উত্তরপ্রদেশের মোট কেন্দ্রিয় ৮০ আসনের ৭২ আসন মোদির ব্যাগে। এমনকি অমিত শাহের এই ‘শত্রুতা’ বিক্রি করেই বিজেপি পরে ২০১৭ সালে উত্তরপ্রদেশ বা ইউপি রাজ্য নির্বাচনে বিজয় লাভ করেছিলেন। এবং পরে ২০১৯ সালে মোদির দ্বিতীয়বার সরকারের আসার জয়ও সম্পন্ন করেছিলেন, একই জাঠ-মুসলমান বিভক্তির কাধে চড়ে। কিন্তু এবার আর নয়। কেন?

এরই মধ্যে এবার এই জাঠ ও মুসলমান একযোগে মোদির বিরুদ্ধে রাস্তায় কৃষি আন্দোলন করে ফেলেছেন এবং জয়ী হয়েছেন। আর এতেই মোদি মাফ চেয়েও যে এই বিরোধী ঐক্যের পাথর সরাতে পারবেন না, তা জেনেও যতটা যা করা যায় মনে করে লজ্জ্বার মাথা খেয়ে মাফ চেয়েছেন। আর তার একমাত্র করণীয় করেছেন যে মুসলমান কোপানো আর বিদ্বেষ-ঘৃণা ছড়ানো তুঙ্গে তোলা প্রবলতরভাবে তা সম্পন্ন করতে গেছেন, আর এখান থেকেই বাড়তি হিজাব বিতর্ক। স্কুলের ছোট বা টিন-এজ মেয়েগুলোকে মানুষের মর্যাদা হারিয়ে অপমানের অভিজ্ঞতায় অবলীলায় ডুবিয়ে দেয়ার এই নিষ্ঠুরতা।

ইউপি নির্বাচনের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের ৫৮ ও ৫৫ আসনের এলাকায় নির্বাচন সম্পন্ন হয়ে গেছে ইতোমধ্যে; বিশেষ করে প্রথম ৫৮ আসন – এই-ই সেই জাঠ অঞ্চলের। মোদির ভাগ্য এখানেই নির্ধারিত হবে। তবে এর ফলাফল পেতে অপেক্ষা করতে হবে আগামী ১০ মার্চ। যদিও এরই মধ্যে আগাম মিডিয়া পূর্বাভাস মোদির বিরুদ্ধেই!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

Advertisements