দুর্বল প্রশাসনের সুযোগ নিয়ে গোপালগঞ্জে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা সশস্ত্র হামলা চালিয়ে এনসিপির (জাতীয় নাগরিক পার্টি) শান্তিপূর্ণ পদযাত্রা কর্মসূচি ভণ্ডুল করে দেয়। গত বুধবারের ঘটনায় চারজন নিহত, বহু আহত, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর ওপর আক্রমণ এবং ব্যাপক ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেনাবাহিনী গুলি ছোড়ে এবং রাত ৮টা থেকে টানা ২৫ ঘণ্টার কারফিউ জারি করা হয়।
নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও তাদের সহযোগী সংগঠনের সন্ত্রাসী ক্যাডারদের এক সপ্তাহ আগে থেকেই গোপালগঞ্জে জড়ো করা হয়। এনসিপির জুলাইযোদ্ধাদের পদযাত্রা উপলক্ষে গোপালগঞ্জে ক্যাডার ও অস্ত্রের দুর্গ তৈরি করে ফেলে তারা। ‘শেখ মুজিবের কবর ভাঙা হবে’ মর্মে গুজব ছড়িয়ে জনমনে উত্তেজনা তৈরি করে। জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের চোখের সামনে এসব প্রস্তুতি চললেও তারা কার্যত নিশ্চুপ ছিল।
বুধবার সকালে এনসিপির নেতা-কর্মীরা গোপালগঞ্জে প্রবেশের পরপরই ছাত্রলীগের ক্যাডাররা তাদের মঞ্চে হামলা করে ভাঙচুর চালায়। ঢাকা, বরিশাল, বাগেরহাট, মাদারীপুর থেকে আগত আওয়ামী ক্যাডাররা শহরের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান নেয় এবং এনসিপির রুট অবরুদ্ধ করে রাখে।
নাহিদ ইসলাম, সারজিস আলম ও হাসনাত আবদুল্লাহর নেতৃত্বে পদযাত্রা শুরুর আগেই হামলা শুরু হয়। ককটেল, পেট্রল বোমা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তারা এনসিপির গাড়িবহরে হামলা চালায়। পুলিশ সুপারের কার্যালয়েও হামলা হয়, একটি পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়।
আইএসপিআরের তথ্যমতে, সেনাবাহিনী বারবার মাইকিং করে হামলাকারীদের থামাতে চেষ্টা করে। কিন্তু উত্তেজিত ক্যাডাররা সেনাবাহিনীর ওপর ইট-পাটকেল ও ককটেল নিক্ষেপ করে। একপর্যায়ে সেনাবাহিনী আত্মরক্ষার্থে গুলি চালাতে বাধ্য হয়। এতে চারজন নিহত হন, অন্তত ২৩ জন গুলিবিদ্ধ হন। এরপর রাত ৮টা থেকে কারফিউ জারি হয়। শুক্রবার জুমার নামাজের সময় বিবেচনায় ১১টা থেকে ২টা পর্যন্ত কারফিউ শিথিল রাখা হয়।
পুলিশ সদর দপ্তরের পর্যালোচনা বৈঠকে বলা হয়, জেলা পুলিশ ও প্রশাসন গোপালগঞ্জের পরিস্থিতি অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছে। পর্যাপ্ত ফোর্স মোতায়েন না করা, গোয়েন্দা তথ্য উপেক্ষা, এবং স্থানীয় আওয়ামীপন্থী নেতাদের সঙ্গে প্রশাসনের গোপন যোগাযোগও ব্যর্থতার কারণ। বরিশাল থেকে আগত এনসিপির গাড়িবহরে হামলার সময় মাত্র ৫ জন পুলিশ সদস্য পাঠানো হয়, যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় সম্পূর্ণ অপ্রতুল ছিল। ফলে হামলাকারীরা উৎসাহিত হয়ে আরো বড় হামলা চালাতে সক্ষম হয়।
নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, তারা প্রশাসনের ‘সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স’ নিয়েই গোপালগঞ্জে গিয়েছিলেন। প্রশাসনের নির্দেশ অনুযায়ী সমাবেশ পরিচালনা ও শহর ত্যাগ করেন। তিনি বলেন, “প্রশাসন যদি সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করত, তাহলে এ ধরনের হামলা হতো না। দায়ভার সরকার ও প্রশাসনের।”
উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক সারজিস আলম আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে বলেন, “আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হামলার পর কঠোর ভূমিকা নিলেও, হামলার সময় তারা একেবারে নিষ্ক্রিয় ছিল।”
বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, সিপিবি, গণসংহতি আন্দোলনসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল গোপালগঞ্জের ঘটনাকে গণতন্ত্রের ওপর আঘাত বলে আখ্যা দিয়েছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটি বলেছে, “ফ্যাসিবাদী শক্তি গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তির সময় সশস্ত্র তাণ্ডব চালিয়ে দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে চরম হুমকির মুখে ফেলেছে।”
চরমোনাই পীর বলেছেন, “এটি স্পষ্ট প্রশাসনের চরম ব্যর্থতা। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত হওয়া উচিত।”
২০২৩ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর গোপালগঞ্জে বিক্ষোভে সেনাবাহিনীর ওপর হামলা, অস্ত্র লুট, গাড়ি পোড়ানোসহ একাধিক সহিংসতা ঘটে। ১৩ সেপ্টেম্বর স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা শওকত দিদারকে হত্যা করা হয়। ২৬ মার্চ গ্রেপ্তারকৃত আওয়ামী লীগ নেতাকে ছিনিয়ে নিতে পুলিশ ওপর হামলার ঘটনাও ঘটে।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেন. (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, “যারা অন্যায় করেছে, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।” প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানিয়েছেন, ঘটনার তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়েছে। কেউ দোষী হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গোপালগঞ্জে এনসিপির ওপর হামলা, প্রশাসনের ব্যর্থতা এবং সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ—সব মিলে এটি হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন না হলে, পরিস্থিতি আরো অশান্তির দিকে যেতে পারে বলে বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন।





































