কদর এর রাত কি
Advertisements

রামাদানের শেষ দশক মর্যাদাশীল “লাইলাতুল ক্বদর” এর কারণে। তাই, আমাদের সবারই উচিত এই সময়ে “সূরা ক্বদর”-কে বুঝে বুঝে পড়া। “সূরা ক্বদর” বুঝলে কদর এর রাতের গুরুত্ব অনুধাবন করা সম্ভব হবে। নিচে সহজ ভাষায় “সূরা ক্বদর” নিয়ে আলোচনা করা হলো।

ইন্না- আনযালনাহু ফি লাইলাতিল ক্বদর (অর্থ: নিশ্চয়ই আমরা একে (অর্থাৎ, কুরআনকে) কদর এর রাতে অবতীর্ণ করেছি।)

লক্ষ্য করুন, আল্লাহ্‌ ﷻ এই বাক্যে “কুরআন” শব্দটিকে উহ্য রেখেছেন। কিন্তু কেন? কারণ এর মাধ্যমে আল্লাহ ﷻ যেন মানুষকে বলতে চাইছেন, কদর এর রাত “বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ রাত” টাইটেল পাওয়ার জন্য আল্লাহ্‌ ﷻ তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থকে (কুরআন) এ রাতে অবতীর্ণ করবেন, এটা খুব অবভিয়াস একটা ব্যাপার। পাঠকের তো এটা এমনিতেই বুঝা উচিত, এটা আবার বলার কি আছে? এভাবে, কুরআন শব্দটি উহ্য রেখে আল্লাহ্‌ ﷻ আমাদেরকে কুরআনের মর্যাদা বুঝিয়ে দিয়েছেন।

ওয়ামা- আদ্‌রোকামা লাইলাতুল ক্বদর (অর্থ: কিভাবেই বা তুমি বুঝবে কদর এর রাত কি?)

আল্লাহ্‌ ﷻ আমাদের প্রশ্নের আড়ালে বুঝিয়ে দিচ্ছেন যে, “লাইলাতুল ক্বদর” এর মর্যাদা এতই বেশী যে এটা ঠিকমতো অনুধাবন করার মত পূর্ণ সামর্থ্য পর্যন্ত আমাদের নাই। আরবীতে – “লাইলা” শব্দের অর্থ রাত। আর, “ক্বদর” শব্দটির অনেকগুলো অর্থ আছে, এমনকি এই অর্থগুলোর ব্যবহার বাংলা ভাষাতেও দেখা যায়। যেমন –

১.কদর অর্থ ভাগ্য। আমরা অনেক সময় বলে থাকি: “আরে ভাই ঐটা আমার তকদীর এ নাই।” এই বাক্যের তকদীর শব্দটি এসেছে কদর থেকে।

২.কদর অর্থ শক্তি। যেমন – বাংলায় একটা প্রচলিত ধাঁধা আছে: “আল্লাহর কি কুদরত, লাঠির ভিতর শরবত”, এখানে কুদরত শব্দটি কদর থেকে এসেছে।

৩.কদর অর্থ মর্যাদা। যেমন আমরা বলে থাকি – “যে দেশে গুণের কদর নাই সে দেশে গুণী জন্মায় না”।

৪.কদর অর্থ চাপাচাপি করে থাকা। কারণ, এই রাতে আসমানের সব ফেরেশতা দলে দলে পৃথিবী চলে আসে; এত বেশী ফেরেশতা আসে যে তাদের মধ্যে ধাক্কা-ধাক্কি শুরু হয়ে যায়। এই ফেরেশতারা নিয়ে আসে শান্তি, আর তাদের চেতনায় থাকে রাজ্যের বিস্ময়। এই ফেরেশতারা বিস্মিত হয়ে মানুষ দেখে, বিমুগ্ধ ভাবে চেয়ে দেখে কিভাবে কিছু মানুষ না ঘুমিয়ে, না জিরিয়ে, প্রবৃত্তির কু-তাড়নার বিরুদ্ধে লড়াই করে শুধু আল্লাহর ﷻ সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ইবাদতে মগ্ন হয়ে আছে।

লাইলাতুল কদরী খইরুম মিন আলফি শাহর (অর্থ: কদর এর রাত তো হাজার মাস থেকেও উত্তম)

আগের আয়াতে আল্লাহ্‌ ﷻ বলেছিলেন যে, আমাদের পক্ষে লাইলাতুল কদর কি তা ঠিক মতো বুঝা সম্ভব না, কারণ এ রাতের মহত্ব অনুধাবন করা মানুষের মস্তিষ্কের ক্ষমতার বাইরে। কিন্তু ভেবে দেখুন, দৈনন্দিন জীবনে কেউ যখন কিছু না বুঝে তখন আমরা তাকে এমন কিছু উদাহরণ দিয়ে বুঝাতে চেষ্টা করি যাতে সে কিছুটা হলেও তা অনুধাবন করতে পারে। আল্লাহও ﷻ তাই করলেন এখানে। আমরা যদিও কদর এর রাতের মর্যাদা ঠিকমতো বুঝবো না – তবু আল্লাহ ﷻ উদাহরণ দিয়ে আমাদের সাহায্য করলেন: এই রাতের ইবাদত হাজার মাস তথা ৮৩ বছর ৪ মাস ইবাদত করার চেয়েও উত্তম। অর্থাৎ, এই রাতে আপনি ১ টাকা দান করা মানে আপনি কমপক্ষে ৮৩ বছর ধরে প্রতি রাতে ১ টাকা দান করেছেন, এই রাতে ২ রাকআত নফল নামাজ পড়া মানে আপনি কমপক্ষে ৮৩ বছর ধরে প্রতি রাতে ২ রাকআত নফল নামাজ পড়লেন, এই রাতে কুরআনের ১ আয়াত মুখস্থ করলে আপনি যেন কমপক্ষে ৮৩ বছর প্রতিরাতে কুরআনের ১টি আয়াত মুখস্থ করলেন।

তানাযযালুল মালা-ঈকাতু ওয়ার রুহু ফিহা বি ইযনি রব্বিহিম মিন কুল্লি আমর (অর্থ: এই রাতে প্রত্যেক কাজে দলে দলে ফেরেশতারা নেমে আসে, আর আসে রুহ (জিব্রিল), কারণ তাদের প্রতিপালক অনুমতি দেয়)

এই রাত মর্যাদাবান হওয়ার অন্যতম কারণ হলো আসমানের বিলিয়ন ট্রিলিয়ন ফেরেশতা সব সেদিন পৃথিবীতে চলে আসে, এমনকি যে জিব্রিল(আ) শুধুই নবী-রাসূলদের কাছে আসতেন তিনিও চলে আসেন এই ধরায়। কেন? তারা আসেন সেলিব্রিটি ইবাদতকারীদের দেখতে! বিশ্বকাপ ক্রিকেট বা ফুটবল শুরুর আগে আমরা যেমন উত্তেজনায় ভুগি, বার-বার ক্যালেন্ডার চেক করি কবে আমার ফেভারিট প্লেয়ারকে দেখব, তার চেয়েও বহুগুন অধীর আগ্রহ আর উত্তেজনা নিয়ে ফেরেশতারা অপেক্ষা করে লাইলাতুল কদর এর জন্য। কারণ, এই এক রাতের জন্য আল্লাহ্‌ ﷻ ফেরেশতাদের অনুমতি দেন তাঁর প্রিয় বান্দাদের ইবাদতরত অবস্থায় দেখে আসার জন্য, তাদেরকে সালাম দেয়ার জন্য। ভেবে দেখুন – ফেরেশতাদের মধ্যে সে কি উত্তেজনা বিরাজ করে এই রাতের জন্য! কোনও ফেরেশতা হয়তো দেখতে আসবে – সেই ব্যক্তিকে যে সবচেয়ে বেশী খুশু’ এর সাথে নামাজ পড়েছে, কেউ হয়তো দেখতে আসবে সেই ব্যক্তিকে যে ভালো ব্যবহারের মাধ্যমে আল্লাহর ﷻ সন্তুষ্টি অর্জন করেছে, আবার অন্য ফেরেশতা দেখবে আসে তাকে যে বিপদে পড়া মানুষকে নিজের সামর্থ্যমতো সাহায্য করেছে, ধাক্কাধাক্কি লেগে যাবে সেই বান্দাকে দেখতে যে শুধু আল্লাহর ﷻ শাস্তির ভয়ে নিজের পাপের কথা চিন্তা করে একাকী চোখের পানি ফেলেছে। একটি অস্তিত্ব সম্পূর্ন নিজের ইচ্ছায় মহান আল্লাহর ﷻ ইবাদত করছে – এটা যেন ফেরেশতাদের কাছে আসমান-জমিনের সবচাইতে সুন্দর দৃশ্য!

কে জানে – আমি, আপনি হয়তো আজ এই কদর এর রাতকে ঘুমিয়েই কাটিয়ে দিব, কিন্তু আমাদের বাসার দারোয়ান চাচা, বা পাশের বস্তির রিকশাওয়ালা আজ সারারাত জেগে ইবাদত করবে। ফেরেশতাদের সালাম, ফেরেশতাদের দু’আ আমি-আপনি হয়তো মিস করব, কিন্তু আমাদের বাসার দারোয়ানকে হয়তো তারা ঠিকই সালাম দিয়ে যাবে। আমি-আপনি আজ রাতে নিজের অজান্তেই হয়তো হয়তো দরিদ্র হয়ে গেছি, হেরে গেছি, আল্লাহর ﷻ হিসাবে আজ হয়তো জিতে গেছে পাশের বস্তির রিকশাওয়ালা।

সালামুন হিয়া হাত্তা মাত লাঈল ফাজর (অর্থ: শান্তি, এ রাতের ফজর পর্যন্ত)

শেষে এসে আল্লাহ্‌ ﷻ মনে করিয়ে দিচ্ছেন – জলদি ইবাদতের দিকে আসো, জলদি! এই রাত তো অতি সংক্ষিপ্ত, মাত্র কয়েক ঘন্টা, মাত্র চার-পাঁচশ’ মিনিট। ফজরের আজান হয়ে গেলেই সব শেষ! অল্প এই সময়টুকু কোনও মতেই হাত ছাড়া হতে দিও না হে বোকা মানুষ! আজ রাতে বেশী বেশী করে দু’আ করে নাও, আজ রাতেই নির্ধারিত হয়ে যাবে আগামী এক বছর তুমি মরবে না বাঁচবে, তুমি নামাজী হবে না বেনামাজী হবে, তোমার সন্তান হবে কি হবে না, আজ নির্ধারিত হবে তুমি কবে কি খাবে, কবে কোথায় যাবে, চাকুরী হারাবে না ব্যবসায় লাভ করবে, তোমার কোন্‌ আত্মীয় অসুস্থ হবে, কে মারা যাবে – সব কিছু নির্ধারণ হয়ে যাচ্ছে এই রাতে। আজ রাতের মতো আর সুযোগ পাবে না শান্তি কিনে নেয়ার। বিরাট সেইল, বিরাট সুযোগ – কিনে নাও এই রাতে শান্তি, দুনিয়ার ও আখেরাতের শান্তি।

শেষ করব ইন্টারেস্টিং দুইটা তথ্য দিয়ে

এক: সূরা কদর হলো মাক্কী সূরা। মাক্কী সূরাগুলোর অডিয়েন্স ছিল মূলত মক্কার মুশরিকরা। প্রশ্ন দাঁড়ায় – মুশরিকরা যেখানে কুরআনেই বিশ্বাস করে না সেখানে তাদেরকে লাইলাতুল কদর এর মহত্ব সম্পর্কে বলে লাভ কি? লাভ হলো – আল্লাহ্‌ ﷻ মুশরিকদের বুঝিয়ে দিলেন, তোমরা তোমাদের সম্পদ, ক্ষমতা, টাকা-পয়সা নিজে যতই বড়াই করো না কেন, বিলাল(রা) আর আম্মার বিন ইয়াসির(রা) এর মতো দাসদের একটি মাত্র রাতের মর্যাদা তোমাদের ৭০-৮০ বছরের জীবনের চাইতে বেশী। জমিনের বাসিন্দাদের হাতে মুসলিমরা হয়তো নির্যাতিত, কিন্তু আসমানের বাসিন্দাদের কাছে তারা ঠিকই সম্মানিত।

দুই: লাইলাতুল কদর এর রাত রমজানের শেষ দশকের যে কোন রাতেই হতে পারে, বেজোড় রাতে হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশী। তাই শেষ ১০ রাতের প্রত্যেই রাতেই নিয়মিতভাবে কিছু ভালো কাজ করুন, আর বেজোড় রাতগুলিতে আরো বেশী এফোর্ট দিয়ে পুরো রাত জেগে ইবাদত করার চেষ্টা করুন। আচ্ছা – আল্লাহ্‌ ﷻ এই রাতকে নির্দিষ্ট না করে দিয়ে এরকম ভ্যারিয়েবল করলেন কেন? এর একটা কারণ আমাদের সবার জানা। সেটা হলো – মানুষ যাতে অলস হয়ে শুধু এক রাতের পেছনে পড়ে না থাকে, বরং বিভিন্ন রাতে চেষ্টার মাধ্যমে তার নিজের মর্যাদার উন্নয়ন করতে পারে। কিন্তু আলেমরা এর আরেকটা গূঢ় কারণও বের করেছেন। তারা বলেন – বান্দাকে লজ্জার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য আল্লাহ্‌ ﷻ ইচ্ছা করে একে লুকিয়ে রেখেছেন। সেটা কিভাবে? ভেবে দেখুন, এই রাত যদি নির্দিষ্ট করা হয়ে যেতো আর কোনো বান্দা যদি তারপরেও এই রাত জেগে ইবাদত না করে ঘুমিয়ে থাকত, তারপর ফেরেশতারা যদি এসে দেখত লোকটা ইবাদত না করে ঘুমিয়ে আছে, তাহলে ফেরেশতাদের দৃষ্টিতে সেই মানুষটা কি পরিমাণ ছোট হয়ে যেত! বান্দাহকে এই লজ্জা থেকে রক্ষা করার জন্য মহান আল্লাহ্‌ ﷻ এই রাতকে লুকিয়ে রেখেছেন, সুবহানআল্লাহ্‌।

মহান আল্লাহ্‌ ﷻ আমাদেরকে লজ্জার হাত থেকে যতটা বাঁচাতে চান, আমরা নিজেরাও কি নিজেকে ততটা বাঁচাতে চাই?

Advertisements