কৈশোরে মেয়েদের মাসিক
Advertisements

কৈশোরে প্রবেশের সঙ্গে মেয়েদের শরীরে বড় পরিবর্তন আসে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মাসিক চক্র। সাধারণত ১১ থেকে ১৪ বছর বয়সে মেয়েদের প্রথম মাসিক বা মেনার্কি শুরু হয়। কারও ক্ষেত্রে এটি একটু আগে বা পরে হতে পারে, যা সবসময় চিন্তার কারণ নয়।

চিকিৎসকদের মতে, কৈশোর শুরু হয় মস্তিষ্কের হরমোন পরিবর্তনের মাধ্যমে। হাইপোথ্যালামাস নামের অংশ থেকে গোনাডোট্রপিন-রিলিজিং হরমোন (GnRH) নিঃসৃত হয়। এটি পিটুইটারি গ্রন্থিকে উদ্দীপিত করে দুইটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন — লুটিনাইজিং হরমোন (LH) ও ফলিকল-স্টিমুলেটিং হরমোন (FSH) — উৎপন্ন করতে। এই হরমোনগুলো ডিম্বাশয়ের কাজ নিয়ন্ত্রণ করে এবং ইস্ট্রোজেন, প্রোজেস্টেরনসহ অন্যান্য যৌন হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখে। ফলে স্তন বিকাশ, কোমরের গঠন পরিবর্তনসহ মেয়েদের দেহে কৈশোরের চিহ্ন দেখা দেয়।

স্তনের বৃদ্ধি বা থিলার্ক সাধারণত ১১ বছর বয়সে শুরু হয়। এরপর দুই বছরের মধ্যে বেশিরভাগ মেয়ের মাসিক শুরু হয়। শুরুতে অনেকের চক্র অনিয়মিত থাকে এবং ডিম্বস্ফোটন (ovulation) হয় না, যাকে অনভুলেটরি চক্র বলা হয়। এটি স্বাভাবিক এবং সময়ের সঙ্গে ঠিক হয়ে যায়।

তবে অনেকের ক্ষেত্রে মাসিক শুরু হতে দেরি হয়। কেউ ১৪ বছরেও মাসিক না পেলে সেটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। চিকিৎসকেরা বলেন, এর প্রধান তিনটি কারণ থাকতে পারে।

প্রথমত, শরীরের স্বাভাবিক হরমোন কার্যক্রমে বিলম্ব। এ সময় LH ও FSH হরমোনের মাত্রা কম থাকে, কিন্তু সময়ের সঙ্গে স্বাভাবিক হয়ে আসে। খারাপ পুষ্টি, অতিরিক্ত ব্যায়াম বা দীর্ঘস্থায়ী অসুখ এর কারণ হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, হরমোন ঘাটতির সমস্যা। জন্মগত বা জেনেটিক কারণে LH ও FSH সঠিকভাবে তৈরি না হলে কৈশোর বিলম্বিত হয়। যেমন কালম্যান সিন্ড্রোম বা পিটুইটারি গ্রন্থির সমস্যা।

তৃতীয়ত, ডিম্বাশয়ের ত্রুটি। অনেক সময় LH ও FSH হরমোন ঠিক থাকলেও ডিম্বাশয় কাজ করে না। টার্নার সিন্ড্রোম, প্রিম্যাচিউর ওভারিয়ান ইনসাফিসিয়েন্সি, কেমোথেরাপি বা রেডিয়েশনের প্রভাবে এমন হতে পারে।

মাসিক না হওয়ার পেছনে হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, পিসিওএস বা ডিম্বাশয়ের সমস্যা থাকতে পারে। এসব ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ খাওয়া বিপজ্জনক। দেখা যায়, অনেকেই ফার্মেসি থেকে নিজে নিজে ওষুধ কিনে খেয়ে ফেলেন। এতে হরমোনের আরও গোলমাল হয়, ভবিষ্যতে বন্ধ্যাত্ব, লিভার বা থাইরয়েডের জটিলতা দেখা দিতে পারে।

চিকিৎসকেরা বলেন, নিয়মিত মাসিক হওয়া মানে নারীর শরীর ও হরমোন ঠিকভাবে কাজ করছে। মাসিক বন্ধ থাকা বা অনিয়মিত হওয়া মানে শরীরে কোনো সমস্যা আছে। কৈশোরে সঠিকভাবে চিকিৎসা নিলে ভবিষ্যতে সন্তান ধারণে সমস্যা হয় না।

অনেকে মাসিক বন্ধ রাখার বা নিয়মিত করার জন্য নিজের ইচ্ছায় হরমোনাল ওষুধ খেয়ে থাকেন। দুটোই নারীর প্রজনন স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। প্রত্যেকটি ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে, তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কিছুই খাওয়া উচিত নয়।

কৈশোর এমন একটি সময়, যখন শরীরের পরিবর্তনকে ভয় না পেয়ে বুঝে নেওয়া প্রয়োজন। মাসিক অনিয়মিত হলে বা বন্ধ থাকলে লজ্জা না পেয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সঠিক পদক্ষেপ।

ডা. রুহী জাকারিয়া
সহকারী অধ্যাপক, স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগ
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল

Advertisements