দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর কোনো গণমাধ্যমে মুখোমুখি সাক্ষাৎকার দিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। একইসঙ্গে তিনি বলেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ জুলুমকারীদের বিচার হবে দেশের আইন অনুযায়ী।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের এই সাক্ষাৎকারটি নেন বিবিসি বাংলার সম্পাদক মীর সাব্বির ও সিনিয়র সাংবাদিক কাদির কল্লোল। ৪৪ মিনিট ৩৪ সেকেন্ডের এই সাক্ষাৎকারের প্রথম পর্বটি রবিবার প্রকাশিত হয়।
দেশে ফেরা ও প্রধানমন্ত্রী পদে আগ্রহ
দেশে ফেরার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তারেক রহমান জানান যে কিছু ‘সংগত কারণে’ এতদিন ফেরা হয়ে না উঠলেও, “সময় তো চলে এসেছে মনে হয়। ইনশাআল্লাহ দ্রুতই ফিরে আসবো।”
তিনি নিশ্চিত করেন, তিনি আসন্ন নির্বাচনে অংশ নেবেন। প্রধানমন্ত্রী পদের প্রত্যাশী কিনা—জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্ত তার নয়, বরং বাংলাদেশের জনগণ এটি নির্ধারণ করবে। তবে দল এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।
দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নির্বাচন বা রাজনীতিতে ভূমিকা প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, “উনার শারীরিক সক্ষমতা যদি অ্যালাও করে উনাকে, নিশ্চয়ই উনি কিছু না কিছু ভূমিকা রাখবেন।”
জুলাই গণঅভ্যুত্থান: মাস্টারমাইন্ড কোনো ব্যক্তি নয়
গত বছরের ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তার ভূমিকা প্রসঙ্গে তারেক রহমান নিজেকে ‘একমাত্র মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে আখ্যা দিতে সরাসরি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন,
“এই আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড কোনো দল কোনো ব্যক্তি নয়, এই আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী জনগণ।”
তিনি বলেন, এই আন্দোলন শুধু বিএনপির আন্দোলন ছিল না, বরং এতে কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, গৃহিণী থেকে শুরু করে সামরিক বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ সমাজের সকল স্তরের মানুষের অবদান ছিল। এ সময় তিনি জুলাই আন্দোলনে শিশুসহ শহীদ হওয়া প্রায় ২০০০ মানুষের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করেন।
আওয়ামী লীগের বিচার: ‘এটি প্রতিশোধের বিষয় নয়, ন্যায়ের কথা’
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের রাজনীতি প্রসঙ্গে তিনি কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেন। বিগত ১৭ বছরে গুম, খুন, লুটপাট ও নির্যাতনের জন্য যারা দায়ী, তাদের প্রত্যেকের বিচার হতে হবে বলে তিনি জানান।
“এ সকল অন্যায়, এ সকল হত্যা, এ সকল নির্যাতনের জন্য যারা দায়ী, যারা এসবের হুকুম দিয়েছে, তাদের প্রত্যেকের বিচার হতে হবে। এটি প্রতিশোধের কোনো বিষয় নয়। এটি ন্যায়ের কথা। এটি আইনের কথা।”
তিনি বলেন, দল হিসেবে আওয়ামী লীগ যদি অন্যায় করে থাকে, তবে দেশের আইন অনুযায়ী তার বিচার হবে। তিনি আরও দৃঢ় বিশ্বাস ব্যক্ত করেন যে, “যে দলের ব্যক্তিরা বা যে দল মানুষ হত্যা করে, মানুষ গুম করে, মানুষ খুন করে… জনগণ তাদেরকে সমর্থন করতে পারে বলে আমি মনে করি না।”
নির্বাচনী কৌশল ও জামায়াতের সম্ভাব্য জোট
জোটবদ্ধ নির্বাচন: আগামী নির্বাচনে বিএনপি জোটবদ্ধভাবে অংশ নেবে বলে ইঙ্গিত দিয়ে তারেক রহমান বলেন, আন্দোলনে থাকা সকল দলকে নিয়েই তিনি রাষ্ট্র পুনর্গঠন করতে চান।
জামায়াতের বিষয়ে অবস্থান: জামায়াতে ইসলামী যদি আলাদা জোট করে, তাতে বিএনপির কোনো উদ্বেগ নেই বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বীকৃত আইন-কানুনের ভেতরে থেকে যারা রাজনীতি করবে, তারা তা করতেই পারে।
মনোনয়ন ও দুর্নীতি: মনোনয়নের ক্ষেত্রে পেশি শক্তি বা টাকার প্রভাব নয়, বরং জনসমর্থন এবং এলাকার মানুষের সঙ্গে যার সম্পৃক্ততা আছে, এমন ব্যক্তিকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি সামাজিক ব্যাধি, যা কাজ দিয়ে প্রমাণ করতে হবে।
চাঁদাবাজি-দখলদারিত্বের অভিযোগ ও সরকারের ব্যর্থতা
৫ই আগস্টের পর বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও দখলের অভিযোগ প্রসঙ্গে তারেক রহমান স্বীকার করেন যে কিছু ঘটনা ঘটেছে, এবং দল প্রায় ৭০০০ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছে। তবে তিনি পাল্টা প্রশ্ন তোলেন:
“পুলিশিং করা তো আমাদের কাজ না… আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে, যাদের কাজ পুলিশিং করা তারা কেন তাদের কাজটি করছে না। তারা কেন তাদের কাজে ব্যর্থ?”
তিনি নিশ্চিত করেন, বিএনপি সরকার গঠন করলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের কাজ করবে এবং দলের কোনো নেতাকর্মী অনৈতিক কাজে সম্পৃক্ত হলে দল তার পক্ষে থাকবে না।





































