শয়তান-যেভাবে-আমাদেরকে-কুমন্ত্রণা-দেয়
Advertisements

শয়তানের সাথে মানবজাতি প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে যাচ্ছে। যে-কোনো যুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে শত্রু পক্ষ সম্পর্কে ভালো করে জানা। শত্রুর দুর্বলতা কোথায়, তার শক্তি কোথায়, সে কীভাবে কাজ করে, কীভাবে তাকে পরাজিত করা যায় —তা নিয়ে গবেষণা করা। তাহলেই শত্রুর সাথে যুদ্ধে জেতা সম্ভব। এ কারণে আমাদের ভালো করে জানা দরকার শয়তান কীভাবে কাজ করে।

শয়তান আসলে কী?

ইবলিস এবং তার শয়তান বাহিনী আসলে কী ধরণের সত্তা — আল্লাহ تعالى তাদেরকে কতখানি ক্ষমতা দিয়েছেন এবং কী ধরণের খারাপ কাজ শয়তান আমাদেরকে দিয়ে করায়, আর কী ধরণের খারাপ কাজ আমরা নিজেদের প্রবৃত্তির কারণে করি — আমাদেরকে সেটা সবার আগে ভালো করে বুঝতে হবে।

প্রথমে শয়তানের সংজ্ঞা কী তা ভালোভাবে জানা দরকার—

শয়তান: মানুষ বা জ্বিন, যারা ইবলিস এবং তার উদ্দেশ্যকে বাস্তবায়ন করতে সাহায্য করে।

শয়তান কখনও আমাদের কাছে এসে বলবে না, “আমি শয়তান, আমি তোমাকে জাহান্নামে পোড়াতে চাই। এসো, আমরা ‘ইয়ে’ করি।” ইবলিস এবং জ্বিন শয়তানরা মানুষের কাছে অদৃশ্য প্রাণী। তারা সাইন্স ফিকশনের ভাষায় কোনো এক ‘প্যারালাল ইউনিভার্সে’ বা ‘অন্য ডাইমেনশনে’ থাকে, যেখান থেকে তারা ঠিকই আমাদেরকে দেখতে পায়, কিন্তু আমরা তাদেরকে দেখতে পাই না বা কোনো বৈজ্ঞানিক যন্ত্র দিয়ে সনাক্ত করতে পারি না—

إِنَّهُ يَرَاكُمْ هُوَ وَقَبِيلُهُ مِنْ حَيْثُ لَا تَرَوْنَهُمْ

সে এবং তার অনুসারিরা তোমাদেরকে তাদের জায়গা থেকে দেখতে পায়, কিন্তু তোমরা তাদেরকে দেখতে পাও না। [আ’রাফ ৭:২৭]

শয়তান এমন কৌশলে আমাদের মনে কু-চিন্তা ও অসুস্থ কামনা ঢুকিয়ে দেয় যে, আমরা মনে করবো সেগুলো আসলে আমাদের নিজেরই চিন্তা-ভাবনা, নিজের আবেগ এবং অনুভুতি। যেহেতু আমরা সবসময় শয়তানের ব্যাপারে সাবধান থাকি না, তাই কখন যে শয়তান আমাদের মধ্যে তার কুমন্ত্রণা ঢুকিয়ে দিয়ে আমাদেরকে দিয়ে তার কাজ করানো শুরু করে দেয়, তা আমরা ভুলে যাই। একারণেই আল্লাহ تعالى আমাদেরকে সাবধান করেছেন—

إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

যারা আল্লাহর প্রতি সচেতন থাকে, যখনি তাদের মনে শয়তান কোনো কু-চিন্তা দেয়, তারা সাথে সাথে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তখনি তারা পরিস্কার দেখতে পায় আসলে কী ঘটছে। [আ’রাফ ৭:২০১]

শয়তানকে প্রতিহত করার একটা চমৎকার ফর্মুলা আল্লাহ تعالى আমাদেরকে শিখিয়ে দিয়েছেন। যখনি আমরা অনুভব করা শুরু করবো যে, আমরা এখন যেই কাজটা করছি, তা করা ঠিক হচ্ছে না, সাথে সাথে আল্লাহর تعالى কথা মনে করবো এবং বলবো, “আউ’যু বিল্লাহি মিনাশ শাইত্বনির রজীম” – “আমি আল্লাহর কাছে সাহায্য চাই বিতাড়িত শয়তানের কাছ থেকে”। দ্রুত কোনো কু’রআনের আয়াত মনে করার চেষ্টা করবো, যেটা পরিস্থিতির সাথে মিলে যায়। যেমন, আমরা হয়ত কারও প্রতি দুর্বলতা অনুভব করছি, এমন দিকে তাকাচ্ছি, যেদিকে আমাদের তাকানোর কথা না, সাথে সাথে নিজেকে মনে করিয়ে দেই—

قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ۚ ذَٰلِكَ أَزْكَىٰ لَهُمْ ۗ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ

وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ

বিশ্বাসী পুরুষদেরকে বলো, যেন তারা তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের গোপন অঙ্গকে সাবধানে রক্ষা করে, এটা তাদের জন্যই বেশি কল্যাণকর। আল্লাহ খুব ভালো করে জানেন তোমরা কী করো। বিশ্বাসী নারীদেরকে বলো, যেন তারা তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের গোপন অঙ্গকে সাবধানে রক্ষা করে … [নুর ২৪:৩০]

তবে দরকারের সময় জরুরি কোনো আয়াত মনে করাটা খুব কঠিন, যদি না আমরা নিয়মিত কিছু জরুরি আয়াত ঝালিয়ে না নিই।

আমরা যেন আল্লাহর تعالى উপদেশ মনে রাখতে না পারি, সে জন্য শয়তান যথাসাধ্য চেষ্টা করবে। কারণ তার প্রথম সাফল্যের ঘটনা ছিল আদমকে عليه السلام ভুলিয়ে দেওয়া: আল্লাহ تعالى তাকে কী করতে মানা করেছিলেন। শয়তানের মানুষকে দিয়ে খারাপ কাজ করানোর একটি মোক্ষম উপায় হল—

শয়তান আমাদেরকে ভুলিয়ে দিবে আমাদের কী করা উচিত না

ইনসান শব্দটির একটি অর্থ হলো – যে ভুলে যায়। মানুষ ভুলে যায়। এটা তার একটা বিরাট দুর্বলতা। মানুষ যদি সবসময় সবকিছু মনে রাখতে পারতো, তাহলে সে আল্লাহর বাণী জানার পরেও খারাপ কাজ কমই করতো। আর এটা শয়তানের একটা বিরাট সুযোগ। শয়তান যতভাবে পারে চেষ্টা করে আমাদেরকে আল্লাহর تعالى নিষেধ মনে রাখতে না দেওয়ার। রাজনীতি, মারামারি, ধর্ষণ, মন্ত্রীদের কোটি টাকা আত্মসাৎ, গত দশটি সিরিজের কোন খেলোয়াড়ের স্কোর কত, কোন তারকা কোন ধরণের সালওয়ার-কামিজ পছন্দ করে ইত্যাদি হাজারো ধরণের আবর্জনা তথ্য আমাদের মাথায় দিয়ে সে আমাদের মস্তিস্ক ভরিয়ে ফেলে, যাতে করে আল্লাহ تعالىআমাদেরকে কী করতে বলেছেন এবং কী করতে মানা করেছেন সেটা আমরা আর মনে রাখতে না পারি।

শয়তান আমাদেরকে প্রতিদিন সকালে খবরের কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বলে – ‘যাও, মাথা ভর্তি ফালতু সব জিনিসপত্র ঢুকাও যেগুলো তোমার কোনো কাজে আসবে না।’ আমরা হয়তো বছরে একটা ভালো আর্টিকেল বা বই পড়লাম, কিন্তু তারপর শয়তান আমাদেরকে দশটা মুভি দেখিয়ে আমাদের ব্রেইনের কোটি কোটি নিউরন আবর্জনা দিয়ে ভরে ফেললো এবং যা কিছু ভালো শিখেছিলাম তার কিছুই যেন মস্তিষ্কে অবশিষ্ট না থাকে তার জন্য আরও বিশটা হিন্দি, বাংলা বা ইংরেজি সিরিয়াল ঢুকিয়ে দিলো। এরপর আমরা যখনি একা বসে থাকি বা রাতে বিছানায় শুতে যাই, তখন আর আল্লাহর কথা মনে পড়ে না বা কু’রআনের কোনো বাণী কানে বাজে না। বরং আমাদের কানে বাজে মুভির ডায়ালগ, চোখ বন্ধ করলে নাচ-গান বা মারামারির দৃশ্য ভেসে উঠে এবং আমরা মুখে কোনো গানের সুর গুনগুন করতে থাকি —এগুলো পরিষ্কার লক্ষণ যে, আমরা নিজেরাই শয়তানকে আমাদের মাথা দখল করে ফেলতে দিয়েছি।

আমাদের সবসময় চেষ্টা করতে হবে যেন শয়তান আমাদেরকে ভালো কথা, ভালো উপদেশ, কু’রআনের বাণী ভুলিয়ে দিতে না পারে। একারণেই আল্লাহ تعالىআমাদেরকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ বুঝেশুনে, গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়তে বলেছেন, যাতে করে আমরা ভালো জিনিসগুলো ভুলে না যাই। কিন্তু আমরা সেটা করতে পারি না, কারণ —

শয়তান আমাদেরকে বিনোদনে ডুবিয়ে রাখে

আজকের প্রজন্মে এক ভয়াবহ সমস্যা দেখা দিয়েছে, যেটা আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন এতটা খারাপ অবস্থা ছিল না। আজকালকার কিশোর, তরুণরা বাসায় এসে ঘন্টাখানেক কম্পিউটারে গেম খেলে। তারপর ঘন্টাখানেক টিভি। তারপর ঘন্টাখানেক ফেইসবুক, ইউটিউব। তারপর ঘন্টাখানেক মোবাইলে বন্ধুবান্ধবের সাথে বেহুদা আড্ডা মারে। এতসব ব্যস্ততা শেষ হলে ঘুম। পরের দিন স্কুল/কলেজ/চাকরি। তারপর বাসায় এসে আবারো সেই মোবাইল ফোন, ভিডিও গেম, টিভি, কম্পিউটার, ফোন। এত কিছু করার পরে তাদের আর ভালো কিছু করার সময় থাকবে কোথায়? আগের প্রজন্মের যেমন মাদকাসক্তি ছিল, সেরকম আজকের প্রজন্মের ‘বিনোদনাসক্তি’ মহামারির পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। একদিন টিভি না দেখে এরা থাকতে পারে না। সকালে, বিকালে, রাতে কখন ফেইসবুকে যাবে, তার জন্য জান আকুপাকু করতে থাকে। মোবাইল ফোন নষ্ট হয়ে গেলে এরা ডিপ্রেশনে চলে যায়।

আজকাল আর শয়তানদেরকে বেশি কষ্ট করতে হয় না। মানুষ নিজেই নিজেকে ধ্বংস করার জন্য এত ব্যবস্থা করে ফেলেছে যে, শয়তানরা আরামে বসে দেখতে থাকে: যখন বাবা-মা তার সন্তানদেরকে মোবাইল ফোন কিনে দিয়ে শয়তানের কাজ করে দেয়। যখন বাবা-মারা সন্তানদেরকে খুনাখুনির ভিডিও গেম, নিজের ঘরে বসে যা খুশি করার জন্য ব্যক্তিগত কম্পিউটার এবং অবাধ ইন্টারনেটের সংযোগ এনে দিয়ে সন্তানদেরকে মানুষ থেকে শয়তান বানিয়ে দেয়। মানবজাতিকে নৈতিকভাবে ধ্বংস করে মানুষরূপী শয়তান দিয়ে পৃথিবী ভরিয়ে ফেলার যে মহাপরিকল্পনা শয়তানের রয়েছে, তা বাস্তবায়নে অধিকাংশ মানুষ আজকাল নিয়মিত নিষ্ঠার সাথে বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করে যাচ্ছে।

আজকাল টিভি, কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, ভিডিও গেম ছাড়া মানুষ নিজেদেরকে ছোট মনে করে। মাত্র ৩০ বছর আগেও মানুষের এগুলো কিছুই ছিল না। এর কারণ হল শয়তানের আরেকটি অন্যতম কৌশল—

শয়তান আল্লাহর تعالى প্রতি কৃতজ্ঞ হতে দেয় না

আল্লাহ تعالى যখন ইবলিসকে তাঁর সান্নিধ্য থেকে বের করে দিচ্ছিলেন তখন ইবলিস একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ শপথ করেছিল, যা থেকে তার মানুষকে ধ্বংস করার অন্যতম একটি প্রধান কৌশল সম্পর্কে জানা যায়—

ثُمَّ لَآتِيَنَّهُم مِّن بَيْنِ أَيْدِيهِمْ وَمِنْ خَلْفِهِمْ وَعَنْ أَيْمَانِهِمْ وَعَن شَمَائِلِهِمْ ۖ وَلَا تَجِدُ أَكْثَرَهُمْ شَاكِرِينَ

(ইবলিস বলল) “আমি মানুষের কাছে আসবো ওদের সামনে থেকে, ওদের পেছন থেকে, ওদের ডান দিক থেকে এবং ওদের বাম দিক থেকে। আপনি দেখবেন ওরা বেশিরভাগই কৃতজ্ঞ না। [আ’রাফ ৭:১৭]

কু’রআনে আল্লাহ تعالى প্রায় ৬০টি আয়াতে কৃতজ্ঞতার গুরুত্ব সম্পর্কে বলেছেন। এর মধ্যে একটি বিখ্যাত আয়াত হলো—

وَإِذْ تَأَذَّنَ رَبُّكُمْ لَئِن شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ ۖ وَلَئِن كَفَرْتُمْ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٌ

মনে পড়ে তোমাদের প্রভু কথা দিয়েছিলেন, “যদি তোমরা কৃতজ্ঞ হও, তাহলে আমি তোমাদেরকে আরও দিতেই থাকবো। কিন্তু তোমরা যদি অকৃতজ্ঞ হও, তাহলে আমার শাস্তি কঠিন। [ইব্রাহিম ১৪:৭]

এখানে আল্লাহ تعالى আমাদেরকে কথা দিয়েছেন যে, যদি আমরা কৃতজ্ঞ হই তাহলে তিনি تعالى আমাদেরকে দিতেই থাকবেন। নিশ্চয়ই শয়তান চাইবে না আমরা জীবনে আরও বেশি পাই, আরও ভালো থাকি। একারণে শয়তানের সবসময় চেষ্টা থাকে কীভাবে আমাদেরকে অসুস্থ বিনোদনে বুঁদ করে রাখা যায়, যেই বিনোদন আমাদেরকে কখনই পরিতৃপ্তি দেয় না। কীভাবে আমাদেরকে ভুলিয়ে দেওয়া যায় যে, আল্লাহর تعالى অনুগ্রহে আমরা জীবনে কত কিছুই না পেয়েছি।

আল্লাহ تعالى আমাদের প্রত্যেককে অসংখ্য নিয়ামত দিয়েছেন, কিন্তু তারপরেও আমরা তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হই না। বরং সবসময় দুশ্চিন্তায় থাকি কখন সেগুলো হারিয়ে ফেলব। কারণ —

শয়তান আমাদেরকে সবসময় সম্মান ও সম্পত্তি হারানোর ভয়ে রাখে

মানুষকে অভাবের ভয় দেখানোর পদ্ধতিটি শয়তান হাজার হাজার বছর থেকে সফল ভাবে প্রয়োগ করে আসছে। আজো কোটি কোটি মানুষ কাজ করতে করতে তাদের জীবন শেষ করে ফেলে: যতটা পারা যায় সম্পত্তি জমানোর জন্য। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কবরে যায় নগ্ন হয়ে একটা সাদা চাদর জড়িয়ে; সমস্ত সম্পত্তি, উপাধি, ক্ষমতা পিছনে ফেলে। যাদের ঈমান দুর্বল, শয়তান তাদেরকে সবসময় এসব কিছু হারানোর ভয়ে রাখে, যাতে করে তারা আল্লাহর تعالى উপর ভরসা হারিয়ে ফেলে। যার ফলে মানুষ হয় কিপটা হয়ে জীবন পার করে, না হয় সম্পত্তি ধরে রাখার জন্য এমন কোনো খারাপ কাজ নেই যেটা করে না। শয়তানের এই পদ্ধতিকে আল্লাহ تعالىকু’রআনে বলেছেন—

الشَّيْطَانُ يَعِدُكُمُ الْفَقْرَ وَيَأْمُرُكُم بِالْفَحْشَاءِ ۖ وَاللَّهُ يَعِدُكُم مَّغْفِرَةً مِّنْهُ وَفَضْلًا ۗ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ

শয়তান তোমাদেরকে অভাবের ভয় দেখায়, আর তোমাদেরকে অশ্লীল কাজ করতে তাগাদা দেয়। কিন্তু আল্লাহ তোমাদেরকে তাঁর পক্ষ থেকে ক্ষমা এবং প্রাচুর্যের নিশ্চয়তা দেন। আল্লাহ তো সবকিছু ঘিরে আছেন, তিনি সব জানেন। [আল-বাক্বারাহ ২৬৮]

আমাদের মনে রাখতে হবে যে, শয়তান আমাদেরকে সবসময় আরও চাওয়ার, আরও পাওয়ার জন্য খোঁচা দিতে থাকবে। আমাদের জীবনে যতই থাকুক, আমরা শান্তি পাবো না। আমরা আরও চাইতেই থাকবো। কারণ, যখন আমরা জীবনে যা পেয়েছি তা নিয়ে সন্তুষ্ট হয়ে যাবো, তখন আমরা ধিরস্থির হয়ে যাবো এবং আল্লাহর تعالى প্রতি কৃতজ্ঞ হবো। যার ফলে আমাদের ভেতরে প্রশান্তি আসবে এবং তা আমাদের পরিবারের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে। আমাদের ছেলেমেয়েগুলো সুস্থ পরিবারে বড় হয়ে আদর্শ মানুষ হবে। তখন তারা সমাজের মধ্যে সুখ ও শান্তি ছড়িয়ে দিবে। শয়তান কোনোভাবেই চায় না এর কোনোটাই হোক। তাই যেভাবেই হোক শয়তান কখনও আপনাকে জীবনে ধিরস্থির হয়ে, নিজেকে নিয়ে ভাবার, আল্লাহকে تعالى নিয়ে ভাবার, পরিবারকে নিয়ে ভাবার সুযোগ হতে দিবে না। এর সবচেয়ে মোক্ষম উপায় হল, আমাদের একটা নতুন মডেলের গাড়ি কেনার জন্য পাগল করে দেওয়া। একটা নতুন মডেলের ল্যাপটপ কিনে লোকজনকে দেখানোর জন্য অস্থির করে দেওয়া। ২০ ইঞ্চি টিভিটা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফেলে দিয়ে একটা ৪০ ইঞ্চি টিভি কেনার জন্য তাগাদা দেওয়া, যেন আমরা প্রতিবেশী ও বন্ধুবান্ধবের সামনে মুখ দেখাতে পারি। কারণ —

শয়তানের আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর تعالى কথা ভুলিয়ে দেওয়া

মানুষের স্বভাব হচ্ছে শয়তানের ফাঁদে পা দিয়ে এমন সব ব্যাপার নিয়ে দিনরাত চিন্তা করা, যুক্তিতর্ক করা, বই লেখা, লেখকের সমালোচনা করা, দিনরাত ইন্টারনেট ব্রাউজ করা—যা তাকে নিজেকে সংশোধন করা থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। তাকে এমন সব কাজ করা থেকে ভুলিয়ে রাখে, যেগুলো আল্লাহ تعالى আমাদেরকে পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তা মানুষকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচিয়ে একদিন জান্নাতের বাগানে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু না। মানুষ যত সব অপ্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে দিনরাত তর্ক করে। অন্যের কাছে নিজের জ্ঞান জাহির করার চেষ্টা করে। অন্যের ভুল ধরে অসুস্থ আনন্দ পাবার চেষ্টা করে। যাবতীয় অপ্রয়োজনীয় ব্যাপারে কৌতূহলী হয়ে, তার পেছনে সময় নষ্ট করে, শয়তানের ফাঁদে পা দিয়ে নিজের এবং অন্যের সর্বনাশ ডেকে আনে।

কিছু মানুষ আছে যাদের উপর শয়তান পুরোপুরি দখল করে নিয়েছে। এধরনের মানুষের চিন্তা-ভাবনা, কাজকর্ম, অনুভুতি, আবেগ —সবকিছুই শয়তানের দখলে চলে গেছে। এরা কথা বললে খারাপ কথা বলে যা শুনলে মানুষ কষ্ট পায়, বিভ্রান্ত হয়ে যায়, মানুষে-মানুষে সমস্যা তৈরি হয়। এদের কাজগুলো বেশিরভাগই হারাম কাজ। যেমন, টিভি দেখলে এরা দেখে তারকাদের সাক্ষাতকার, মিউজিক শো, ড্যান্স কম্পিটিশন, নানা ধরণের অসুস্থ সিরিয়াল। মুভি দেখলে দেখে সব মারামারি, খুনাখুনি, হরোর মুভি, না হয় হারাম প্রেম-ভালবাসা, পরকীয়ার মুভি। খবরের কাগজে এরা সব আজেবাজে খবর পড়ে— নেতাদের কাঁদা ছোড়াছুড়ির ঘটনা, ধর্ষণের রগরগে বর্ণনা, তারকাদের গোপন কেলেঙ্কারির ঘটনা। কম্পিউটারে টরেন্ট দিয়ে দিন-রাত মানুষের পরিশ্রম করে বানানো সফটওয়ার, ভিডিও, অডিও বিনামূল্যে অন্য চোরদের কাছ থেকে চুরি করে। ইন্টারনেটে গেলে এরা বেশিরভাগ সময় পর্ণ, সিনেমা, সিরিয়াল; না হয় ফেইসবুকে পরকীয়া, অবৈধ মেলামেশা, ডেটিং সাইটে মিথ্যা যোগ্যতা দিয়ে অন্যদেরকে পটানোর চেষ্টা করে। মোবাইল ফোনে বন্ধুবান্ধবের সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গীবত। এর নামে ওকে লাগানো, ওর গোপন খবর ফাঁস করে দেওয়া। এভাবে এরা প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠার পর থেকে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত যত ধরণের শয়তানী কাজ করা যায়, তার সবই করে। এরা তাদের মস্তিস্কের নিয়ন্ত্রণ শয়তানের হাতে দিয়ে দিয়েছে। তাদের চালকের আসনে আর তার বিবেক বসে নেই, বসে আছে শয়তান।

اسْتَحْوَذَ عَلَيْهِمُ الشَّيْطَانُ فَأَنسَاهُمْ ذِكْرَ اللَّهِ ۚ أُولَٰئِكَ حِزْبُ الشَّيْطَانِ ۚ أَلَا إِنَّ حِزْبَ الشَّيْطَانِ هُمُ
الْخَاسِرُونَ

শয়তান এদের উপরে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে এবং তাদেরকে আল্লাহর কথা ভুলিয়ে দিয়েছে। এরা শয়তানের দল। সাবধান! এই শয়তানের দল একদিন ধ্বংস হয়ে যাবেই। [মুজাদিলা ৫৮:১৯]

এই ধরণের মানুষদের সম্পর্কে সাবধান থাকতে হবে। আল্লাহ تعالى এদেরকে শয়তানের দল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এরা আর সাধারণ মানুষ নেই। আল্লাহর দৃষ্টিতে এরা মানুষরূপী শয়তান। এরা আমাদের বাবা-মা, ভাইবোন, ছেলে-মেয়ে যেই হোক না কেন, সাবধানে থাকতে হবে, যেন তাদেরকে সন্তুষ্ট করতে গিয়ে বা তাদের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে আমরা আল্লাহকে تعالى সন্তুষ্ট রাখার কথা ভুলে না যাই, আল্লাহর تعالى বিরুদ্ধে কাজ করা শুরু না করি। আমাদেরকে সবসময় মনে রাখতে হবে যে, আমরা পৃথিবীতে এসেছি আল্লাহকে تعالى খুশি রেখে নিজে ভালো থাকার জন্য। আল্লাহর تعالى বিনিময়ে অন্যদেরকে খুশি রাখার জন্য নয়। তাই কখনও নষ্ট হয়ে যাওয়া স্বামী বা স্ত্রীর জন্য নিজের জীবন শেষ করবো না। কখনও বাবা-মার অন্যায়ের সমর্থনে নিজেকে এবং নিজের পরিবারকে শেষ করবো না। মানুষরূপী শয়তান বসের হয়ে জঘন্য কাজ করে নিজের উপরে আল্লাহর تعالى আক্রমণ ডেকে আনবো না। এদের কাছ থেকে আমরা সসন্মানে সরে আসবো, কারণ আল্লাহ تعالىআমাদেরকে সাবধান করেছেন—

لَّا تَجِدُ قَوْمًا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ يُوَادُّونَ مَنْ حَادَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَوْ كَانُوا آبَاءَهُمْ أَوْ أَبْنَاءَهُمْ أَوْ إِخْوَانَهُمْ أَوْ عَشِيرَتَهُمْ

তুমি এমন কাউকে পাবে না যারা সত্যিই আল্লাহ এবং শেষ বিচার দিনে বিশ্বাস করে, কিন্তু একই সাথে তাদেরকেও ভালবাসে যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধে যায়, যদিও কিনা তারা তাদেরই বাবা, ছেলে, ভাই বা নিজেদের কোনো দল বা জাতির হয়। [মুজাদিলা ৫৮:২২]

লেখকঃ ওমর আল জাবির

Advertisements