পোশাক রপ্তানিতে
Advertisements

আসন্ন ঈদে পোশাক ও বস্ত্র শিল্পকে আর্থিক সংকট মোকাবিলায় সহায়তা করতে ও শ্রমিকদের বেতন-ভাতা ও বোনাস পরিশোধে সহজ শর্তে ঋণ চেয়েছেন বস্ত্র ও পোশাক খাতের শিল্পমালিকরা।

গতকাল রবিবার (২৫ এপ্রিল) পোশাক ও বস্ত্র শিল্প মালিকদের তিন সংগঠন বিজিএমইএ, বিটিএমএ ও বিকেএমইএ এই প্রণোদনা চেয়ে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের কাছে একটি চিঠি দিয়েছে। বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি ফারুক হাসান, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন ও বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি একেএম সেলিম ওসমান এমপির স্বাক্ষরে এ চিঠি দেয়া হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিজিএমইএর সভাপতি ফারুক হাসান সংবাদমাধ্যমকে বলেন, সরকারের সহায়তা চেয়ে অর্থমন্ত্রীর কাছে একটি চিঠি আজ (গতকাল) পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে নভেল করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউয়ে পোশাক খাতের অনেক ক্রয়াদেশ স্থগিত হয়েছে। অনেক ক্রয়াদেশের সময়সীমায় পরিবর্তন এসেছে। এরই মধ্যে যেসব পণ্য রফতানি করা হয়েছে, ক্রেতারা সে অর্থও পরিশোধ করতে পারছেন না। সব মিলিয়ে বর্তমানে এ খাতের সংকট এখনো চলমান। আবার সামনে আসছে ঈদ। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারের কাছে প্রণোদনা চাওয়া হয়েছে।

তিন সংগঠনের পক্ষ থেকে অর্থমন্ত্রীকে লেখা চিঠিতে বলা হয়, করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের কারণে গত বছর সচল রফতানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য আর্থিক প্রণোদনা হিসেবে সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা দেয়া হয়েছিল। শ্রমিক-কর্মচারীদের গত বছরের এপ্রিল-জুলাইয়ের বেতন-ভাতা পরিশোধের জন্য সহজ শর্তে ঋণ হিসেবে বিশেষ প্রণোদনা প্রদানের ফলে এ শিল্পের অস্তিত্ব টিকে রয়েছে এবং সংকটপূর্ণ পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে সক্ষমতা অর্জন করতে পেরেছে।

এ সংগঠনগুলো বলছে, বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসজনিত উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে বর্তমানে পোশাক শিল্পে চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে এবং এর প্রভাবে অনেক পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। আন্তর্জাতিক স্বনামধন্য অনেক ক্রেতা নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করার ফলে তাদের কাছ থেকে রফতানীকৃত পণ্যের বিপরীতে পেমেন্ট পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ক্রেতা কর্তৃক ক্রয়াদেশ বাতিল বা স্থগিত ও নির্দিষ্ট সময়ে পেমেন্ট না পাওয়ার ফলে পোশাক খাত খুব আর্থিক সংকটের মধ্যে রয়েছে।

সংগঠনগুলোর দাবি, বিশ্ববাজারে রফতানি সক্ষমতা বজায় রাখার জন্য বাংলাদেশের পোশাক শিল্প অন্যান্য দেশের তুলনায় কম মূল্যে পোশাক রফতানি করে। এতে করে মুনাফা খুবই কম হয়। টিকে থাকার জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে লস দিয়েও ক্রয়াদেশ নিতে বাধ্য হয় পোশাক কারখানার মালিকরা। ক্রেতাদের কাছ থেকে পাওয়া পেমেন্ট এবং রফতানির বিপরীতে পাওয়া নগদ সহায়তার অর্থ দিয়ে শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ব্যয় পরিশোধ করা হয়। কিন্তু রফতানিমূল্য না পাওয়ার কারণে পোশাক মালিকরা নগদ সহায়তার আবেদন করতে পারছেন না। আবার অনেক ক্রেতা ডিসকাউন্ট হারে মূল্য পরিশোধ করছেন। যার কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো তারল্য সংকট নিরসন করতে পারছে না।

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ধীরে ধীরে কমবে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসবে এটাই সবার কাম্য ছিল। কিন্তু বিশ্বব্যাপী পুনরায় শুরু হয়েছে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ। বিশ্বের অনেক দেশেই আগের মতো লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। যার ফলে যেসব ক্রেতা পেমেন্ট দেয়ার প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছিল, তারাও পেমেন্ট দিতে অপারগতা প্রকাশ করছে। এ অবস্থায় আসন্ন ঈদে সচল কারখানাগুলোর শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও বোনাস প্রদানের জন্য রফতানিকারকদের ওপর প্রচণ্ড চাপ রয়েছে। উদ্যোক্তাদের আর্থিক সংকটের কারণে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা ও বোনাস পরিশোধের জন্য অর্থের জোগান দেয়া কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে রফতানিমুখী পোশাক শিল্পকে সহায়তা করার জন্য শ্রমিক-কর্মচারীদের চলতি বছরের এপ্রিল, মে ও জুনের বেতন-ভাতা ও বোনাস প্রদানের জন্য আগের মতো সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করা একান্ত আবশ্যক।

অর্থমন্ত্রীর কাছে পাঠানো চিঠিতে আরো উল্লেখ করা হয়, করোনাভাইরাস সমগ্র বিশ্বে অতিমারী রূপ ধারণ করেছে। এ ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট সংকট মোকাবেলা করে শিল্প-বাণিজ্যকে টিকিয়ে রাখতে এরই মধ্যে বিশ্বের উন্নত-অনুন্নত সব দেশ আর্থিক সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে একাধিকবার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে বাস্তবায়ন করেছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি পোশাক ও বস্ত্র খাতের রফতানি বাণিজ্যের সক্ষমতা টিকিয়ে রাখা এবং আসন্ন ঈদে শ্রম-অসন্তোষ রোধে এবং আর্থিক সংকট মোকাবেলায় সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে শ্রমিক-কর্মচারীদের চলতি বছরের এপ্রিল, মে ও জুনের বেতন-ভাতা ও বোনাস প্রদানের জন্য আগের মতো একই শর্তে ঋণ হিসেবে অর্থের জোগান দেয়ার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য বস্ত্র খাতের তিনটি সংগঠনের পক্ষ থেকে আপনাকে বিনীতভাবে অনুরোধ করা হচ্ছে।

জানতে চাইলে বিকেএমইএ প্রথম সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম সংবাদমাধ্যমকে বলেন, কভিডের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ক্রেতাদের দেয়া বর্তমান ক্রয়াদেশ পরিস্থিতি যেমন ভালো না আবার ভবিষ্যতের ক্রয়াদেশের পূর্বাভাসগুলোও অনিশ্চিত। এদিকে সামনে আছে ঈদ। সব দিক বিবেচনায় আগের মতো সহজ শর্তে ঋণ চাওয়া হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, রফতানিমুখী শিল্পে করোনার নেতিবাচক প্রভাব কাটাতে সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় সহজ শর্তে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা বাবদ সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়েছে। শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধে কয়েক দফায় এ ঋণ দেয়া হয়। করোনার সংক্রমণ রোধে গত বছরের ২৬ মার্চ থেকে দেশব্যাপী সাধারণ ছুটি শুরু হয়। এর আগের দিন ২৫ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রফতানি খাতের শিল্প-কারখানার শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধে ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেন। তবে এপ্রিল ও মে মাসের বেতন-ভাতা দিতেই ৫ হাজার কোটি টাকা থেকে ৪ হাজার ৯৩৫ কোটি ১৯ লাখ টাকা শেষ হয়ে যায়। সরকারের কোষাগার থেকে জোগান দেয়া এ অর্থের জন্য ২ শতাংশ সার্ভিস চার্জ আরোপ করা হয়।

পরে ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে জুনের বেতন-ভাতার জন্য ব্যাংক খাত থেকে আরো আড়াই হাজার কোটি টাকার ঋণ দেয়া হয়। আড়াই হাজার কোটি টাকা ঋণের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো ৯ শতাংশ হারে সুদ পাবে। তবে এর মধ্যে গ্রাহক সুদ হিসেবে পরিশোধ করবে মাত্র ২ শতাংশ। বাকি ৭ শতাংশ সুদ ভর্তুকি হিসেবে দেবে সরকার। এরপর জুলাইয়ের বেতন পরিশোধের জন্য রফতানিমুখী খাতকে সরকার ঘোষিত ৩০ হাজার কোটি টাকার আরেকটি প্যাকেজ থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ সুবিধা দেয়া হয়। এ ঋণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সুদহার ৯ শতাংশ, যার মধ্যে গ্রাহক দেবে সাড়ে ৪ শতাংশ, বাকি সাড়ে ৪ শতাংশ ভর্তুকি হিসেবে দেবে সরকার।

Advertisements