মধু আমাদের চিরকালীন খাদ্যতালিকায় একটি পুষ্টিকর ও ওষুধিগুণসম্পন্ন প্রাকৃতিক উপাদান হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে যে, মধুর প্রকৃত পুষ্টিগুণ মানবদেহে কীভাবে কার্যকরভাবে শোষিত হয়, তার পেছনে মৌমাছির শরীরের জৈবপ্রক্রিয়া এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
হার্ভেস্ট ইনফার্টিলিটি কেয়ারের বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসক ও গবেষক ডা. মোশতাক আহমেদ এবং ডা. ফারহানা আনামের গবেষণায় দেখা গেছে, মৌমাছি যখন ফুল থেকে পরাগরেণু সংগ্রহ করে, তখন সেটি সরাসরি মানবদেহে হজমযোগ্য নয়। কারণ প্রাকৃতিক পরাগরেণুর বাইরের স্তর স্পোরোপোলেনিন এবং ভেতরের স্তর সেলুলোজ দিয়ে গঠিত, যা এতটাই শক্তিশালী যে মানুষের হজমতন্ত্র তা ভাঙতে পারে না। মানবদেহে এই জাতীয় শক্ত বন্ধনের বিপরীতে প্রয়োজনীয় হজম এনজাইম নেই বলেই প্রায় ৭০ শতাংশ পরাগরেণু হজম না হয়ে মল দ্বারা বেরিয়ে যায়।
অথচ এই পরাগরেণুর ভেতরে রয়েছে অত্যাবশ্যকীয় অ্যামিনো অ্যাসিড, প্রোটিন, লিপিড, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান, যা শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা, হরমোন নিয়ন্ত্রণ এবং যৌন স্বাস্থ্য উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
গবেষণায় দেখা গেছে, মৌমাছির পেটের সামনের অংশে থাকা পরাগ সংরক্ষণকারী বিশেষ কুঠুরিতে কিছু উপকারী ব্যাকটেরিয়া থাকে—যেমন Bifidobacterium asteroides এবং Coryneform জাতীয় ব্যাকটেরিয়া—যারা সেলুলোজ ভাঙতে সক্ষম। এই ব্যাকটেরিয়াগুলো সেলুলেজ নামক হজমকারক এনজাইম নিঃসরণ করে, যা পরাগরেণুর শক্ত স্তরকে আংশিকভাবে ভেঙে দেয়। এই ভাঙা পরাগরেণু পরে মৌমাছির মুখ দিয়ে মধুর সঙ্গে মিশে যায় এবং তখনই এটি মানবদেহের জন্য সহজপাচ্য হয়ে ওঠে। অর্থাৎ মৌমাছি পরাগরেণুর ভেতরের মূল্যবান পুষ্টিগুণ মানবদেহে পৌঁছানোর উপযোগী করে তোলে—এ এক আশ্চর্য প্রাকৃতিক রূপান্তর।
গবেষণাটি এই বিষয়টিও তুলে ধরে যে, সাধারণভাবে নেওয়া পরাগরেণুকে নানা কৌশলে ভাঙার চেষ্টা করা হলেও (যেমন স্টিম এক্সপ্লোশন, অ্যাসিড ব্যবহার, অতিস্বনক তরঙ্গ, এনজাইমিক প্রক্রিয়া বা উচ্চচাপ বিশ্লেষণ) মৌমাছির নিজস্ব প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া সবচেয়ে কার্যকর ও সহজলভ্য।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, একটি গড়ে নেওয়া পরাগরেণুতে প্রায় ২২.৭ শতাংশ প্রোটিন, ১০.৪ শতাংশ অত্যাবশ্যকীয় অ্যামিনো অ্যাসিড এবং ৫ শতাংশেরও বেশি লিপিড থাকে, যার মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্যকর ফ্যাটি অ্যাসিড, ফসফোলিপিড ও ফাইটোস্টেরল।
এতে রয়েছে A, D, E, B1, B2, B6 ও C ভিটামিন এবং প্যান্টোথেনিক, নিকোটিনিক ও ফলিক অ্যাসিড। এ ছাড়া এতে ১ শতাংশের বেশি ফেনলিক যৌগ যেমন ক্যাম্পফেরল, কুয়েরসেটিন ও আইসোর্হ্যামনেটিন পাওয়া যায়, যা ক্যান্সার, প্রদাহ, বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসা এবং রোগপ্রতিরোধে সহায়ক হিসেবে কাজ করে। মধুর এই উপাদানগুলো শরীরের কোষীয় এনজাইমতন্ত্র, রোগপ্রতিরোধ এবং যৌন স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী।
এ বিষয়ে কোরআনে বলা হয়েছে, “তাদের (মৌমাছির) পেট থেকে বের হয় বিভিন্ন রঙের পানীয়, যাতে মানুষের জন্য রয়েছে আরোগ্য।” (সূরা নাহল, আয়াত ৬৯)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) মধুকে আরোগ্যের উৎস হিসেবে ঘোষণা করেছেন এবং বলেছেন, “আরোগ্য তিনটি জিনিসে: শিঙ্গা লাগানোতে, মধু পান করাতে এবং আগুন দিয়ে দাগানোতে; তবে আমি আমার উম্মতকে দাগানো থেকে নিষেধ করেছি।” এ বক্তব্যগুলো শুধু ধর্মীয় বিশ্বাস নয়, বরং বিজ্ঞানও আজ তা প্রমাণ করছে।
এই গবেষণা আমাদের সামনে তুলে ধরে, আল্লাহর সৃষ্টি কতটাই নিখুঁত ও পরিপূর্ণ। মৌমাছির ক্ষুদ্র দেহে থাকা ব্যাকটেরিয়া ও এনজাইম কীভাবে পরাগরেণুর অবিশ্বাস্য শক্ত দেয়াল ভেঙে দিয়ে তাকে মানুষের জন্য উপযোগী করে তোলে, তা এক বিস্ময়কর জীবনচক্র। এই প্রক্রিয়া শুধু পুষ্টির উৎস নয়, বরং সৃষ্টিকর্তার নিপুণতা ও হিকমতেরও এক জীবন্ত নিদর্শন।





































