কয়েকদিন ধরে চলমান রাজনৈতিক জটিলতার কালো মেঘ কাটতে শুরু করেছে। গণভোট, সংসদের উচ্চকক্ষে প্রপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন (পিআর) পদ্ধতি এবং প্রতীক ‘শাপলা কলি’ নিয়ে দীর্ঘদিনের মতপার্থক্য নিরসনের পথে এগোচ্ছে সরকার। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে একাধিক দফায় বৈঠক শেষে সমঝোতার একটি সম্ভাব্য রূপরেখা তৈরি হয়েছে। আজ সোমবার উপদেষ্টা পরিষদের বিশেষ বৈঠকে সেই রূপরেখা চূড়ান্ত হতে পারে।
সরকার ও রাজনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে আজ সকালে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে উপদেষ্টা পরিষদের বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বৈঠকে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, আসন্ন গণভোট ও উচ্চকক্ষের পিআর কাঠামো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। বৈঠক শেষে দুপুর ১২টায় সংবাদ সম্মেলনে এর ফলাফল জানানো হবে বলে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর সূত্রে জানা গেছে।
এর আগে রোববার রাতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতার দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের সঙ্গে যমুনায় অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করেন প্রধান উপদেষ্টা। বৈঠকে আজকের আলোচ্যসূচি ও সংবাদ সম্মেলনের বিষয় চূড়ান্ত করা হয়।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের সাম্প্রতিক বক্তব্যে রাজনৈতিক সমঝোতার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেই গণভোট আয়োজনের বিষয়ে দলীয় অনাপত্তির কথা জানান। এছাড়া এনসিপি ইতোমধ্যে ‘শাপলা কলি’ প্রতীকটিকে তাদের পছন্দের তালিকায় রেখে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়েছে।
এদিকে সরকারের পক্ষ থেকেও নির্বাচনের প্রস্তুতি ত্বরান্বিত করা হয়েছে। রোববার প্রধান উপদেষ্টার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা হয় ৪৮ সেকেন্ডের একটি ভিডিও টিজার, যা দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা। ওই টিজারে ক্যাপ্টেন (অব.) ড. খান সুবায়েল বিন রফিককে দেখা যায় জনগণকে ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানাতে।
নির্বাচন কমিশন ও সরকারের ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধেই অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে সংবিধান সংস্কার প্রস্তাবের ওপর গণভোটও। এতে পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ (সিনেট) গঠিত হবে প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে পিআর পদ্ধতিতে। এছাড়া জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ২৭০ দিনের বাধ্যতামূলক সময়সীমা বাতিল এবং অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতা প্রশ্নেও ভোট হবে বলে সূত্র জানিয়েছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এখনো কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য রয়ে গেছে। বিএনপি উচ্চকক্ষ গঠনে পিআর পদ্ধতির বিরোধিতা করছে, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর দাবি— গণভোট সংসদ নির্বাচনের আগে, অর্থাৎ নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হোক। এনসিপি শুরুতে একই দাবি তুললেও এখন কিছুটা নমনীয় অবস্থান নিয়েছে।
গতকাল নাহিদ ইসলাম বলেন, “একই দিনে দুই নির্বাচন নিয়ে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। তবে যারা সংস্কারের বিপক্ষে, তাদের সঙ্গে এনসিপি থাকবে না।”
অন্যদিকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শনিবার বলেন, “আমরা ১৭ সনদে স্বাক্ষর করেছি, সেটুকু বাস্তবায়ন করব, কিন্তু জুলাই আদেশে যা করা হয়েছে, তার দায় বিএনপির নয়।” তিনি অভিযোগ করেন, ঐকমত্য কমিশন জুলাই সনদ পরিবর্তন করে ‘জুলাই আদেশ’ জারি করে জাতির সঙ্গে প্রতারণা করেছে।
সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবারের উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সেখানেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের আপত্তির বিষয় উঠে আসে। পরে প্রধান উপদেষ্টা আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের নেতৃত্বে চারজন উপদেষ্টাকে সমাধান খোঁজার দায়িত্ব দেন। এ দলটি এরপর বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির সঙ্গে একাধিক দফা আলোচনা করে।
সরকারি পর্যায়ের আলোচনায় দুটি প্রস্তাব গুরুত্ব পেয়েছে— বিএনপিকে পিআর পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ গঠনে রাজি করানো এবং জামায়াতকে একই দিনে নির্বাচন ও গণভোটে সম্মতি দিতে রাজি করানো। যদিও এখনো দুই দলই তাদের অবস্থানে অনড়।
সরকার বিকল্প সমাধানও বিবেচনা করছে। এর মধ্যে রয়েছে— জুলাই সনদের ২৭০ দিনের সময়সীমা বাতিল করে সংবিধান সংস্কার পরিষদের হাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা তুলে দেওয়া, এবং জুলাই সনদে প্রধান উপদেষ্টার পরিবর্তে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর সংযোজনের প্রস্তাব। আইনি জটিলতা বিবেচনায় এসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
ঐকমত্য কমিশনের একাধিক সদস্য জানিয়েছেন, তারা সব দলের মধ্যেই ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাচ্ছেন, কিন্তু কিছু দল এখনো রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে আসতে রাজি নয়। কমিশনের একজন সদস্য বলেন, “সব তথ্য আমাদের কাছে আছে, চাইলে প্রমাণ করা যায়। তবে এখন সংঘাত নয়, সমঝোতাই আমাদের লক্ষ্য।”
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “সরকার যেহেতু ঐকমত্য কমিশনেরও প্রধান, তাই সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ তাদেরই নিতে হবে। আমরা সহযোগিতার জন্য প্রস্তুত আছি।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান মনে করেন, “রাজনৈতিক দলগুলো এখনো নিজ নিজ অবস্থান ধরে রাখলেও এটি বড় কোনো সংকট নয়। সরকার যদি উদ্যোগ নেয়, দ্রুত সমাধান আসবে।”
তার মতে, একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের বিকল্প নেই। তিনি বলেন, “সরকারের সামনে সময় ও নিরাপত্তা— দুটোই চ্যালেঞ্জ। আলাদা দিনে ভোট দিলে ঝুঁকি বাড়বে। কাজেই ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে একই দিনে ভোট আয়োজনই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত।”
সব মিলিয়ে আজকের উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠককে রাজনৈতিক সংকট নিরসনের জন্য ‘সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপ’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বৈঠকে চূড়ান্ত রূপরেখা অনুমোদিত হলে চলমান অচলাবস্থা কাটিয়ে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।





































