গত ২৪ ঘণ্টায় ১০৫ ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে
Advertisements

ডেঙ্গুর নতুন ধরন দেখা দিয়েছে। শুরুতে সাধারণ জ্বর হয়, ওষুধ খেলেই ভালো হয়ে যায়। কিন্তু কিছুদিন পর আবার জ্বর ফিরে আসে— আর তখনই দেখা দেয় মারাত্মক জটিলতা। কয়েক দিনের মধ্যেই অনেক রোগী মৃত্যুবরণ করছেন। সম্প্রতি রাজধানীতে এমন একাধিক ঘটনার খবর পাওয়া গেছে।

রাজধানীর মিরপুরের গৃহবধূ সালমা বেগম (৩৫) প্রথমে হালকা জ্বরে আক্রান্ত হন। চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ খেয়ে কিছুটা সুস্থও হয়ে ওঠেন। কিন্তু এক সপ্তাহ না যেতেই আবার জ্বর আসে। হঠাৎ রক্তচাপ কমে যায়, প্লাটিলেট নেমে যায় বিপজ্জনক পর্যায়ে। দ্রুত জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হলেও তিনদিন আইসিইউতে চিকিৎসার পর গত ৮ অক্টোবর মারা যান তিনি।

একই ধরনের উপসর্গে প্রাণ হারিয়েছেন ডেমরার তরুণ হাফেজ সাইফুর রহমান ত্বকী (২৫)। বিদেশে পড়াশোনার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার পর স্থানীয় ফার্মেসি থেকে ওষুধ খেয়ে কিছুটা উন্নতি হলেও কয়েকদিন পর ফের জ্বর আসে। পরে নারায়ণগঞ্জের একটি বেসরকারি হাসপাতাল হয়ে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাঁকে। কিন্তু অবস্থার অবনতি হওয়ায় আইসিইউতেই মৃত্যুবরণ করেন ত্বকী।

চিকিৎসকদের মতে, এবারের ডেঙ্গুর ধরন আগের চেয়ে অনেক বেশি আক্রমণাত্মক। ভাইরাসের ভ্যারিয়েন্ট পরিবর্তনের কারণে রোগীরা দ্রুত শক সিনড্রোমে চলে যাচ্ছেন এবং সামান্য ফ্লুইড ব্যবস্থাপনায় ভুলও মারাত্মক হয়ে উঠছে। মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. ইমরান হোসেন মালিথা বলেন, “এবারের ডেঙ্গুর ধরন একেবারে আলাদা। তরুণরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে এবং অনেকেই প্রথম দফায় জ্বর সেরে যাওয়ার পর অসচেতন থাকছেন। কিন্তু শরীরের ভেতরে প্লাটিলেট ও অক্সিজেন স্যাচুরেশনের দ্রুত অবনতি ঘটে অজান্তেই। দ্বিতীয় দফায় জ্বর ফিরে এলে অবস্থা এতটাই খারাপ হয়ে যায় যে, রোগীকে ফেরানো কঠিন হয়ে পড়ে।”

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুসারে, চলতি বছর এখন পর্যন্ত ৭০ হাজার ৫১৩ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৬৫১ জন আক্রান্ত হয়েছেন এবং তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৭৮ জনে। আক্রান্তদের মধ্যে ৬২ শতাংশ এবং মৃতদের ৫৩ শতাংশই পুরুষ।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি বছর ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া রোগীদের ৬৮ শতাংশই ভর্তি হওয়ার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে, আর ৪৬ শতাংশের মৃত্যু হয়েছে প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই। চিকিৎসকদের মতে, দেরিতে হাসপাতালে আসা এবং শরীরে দ্রুত শক সিনড্রোম তৈরি হওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।

রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এখন পর্যন্ত দুই হাজার ৬৯৮ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন, মারা গেছেন ৩৯ জন। বর্তমানে ১৭৬ জন চিকিৎসাধীন। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, অধিকাংশ রোগী রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, মান্ডা, বাসাবো ও খিলগাঁও এলাকার বাসিন্দা।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, “এখন অধিকাংশ রোগী এক্সপ্যান্ডেড ডেঙ্গু সিনড্রোমে ভুগছেন, যা একসঙ্গে লিভার, কিডনি ও হৃদযন্ত্রকে আঘাত করছে। ফলে হাসপাতালে নেওয়ার পর খুব দ্রুত অবস্থার অবনতি হচ্ছে। অনেক সময় চিকিৎসকরা কিছু করার সুযোগই পাচ্ছেন না। জ্বর দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষা, পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ এবং সঠিক ফ্লুইড ব্যবস্থাপনাই এখন সবচেয়ে জরুরি।”

অন্যদিকে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রতিদিন হাসপাতালে ভর্তি রোগীর তথ্য প্রকাশ করলেও দেশে মোট কতজন ডেঙ্গু পরীক্ষা করছেন বা শনাক্ত হচ্ছেন— তার কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। গত বছর ডেঙ্গুর প্রকৃত চিত্র জানার জন্য একটি সফটওয়্যার তৈরি হলেও তা এখনও চালু হয়নি। অধিদপ্তরের এমআইএস বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, অপারেশন প্ল্যান বন্ধ থাকায় নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ আটকে গেছে, ফলে সফটওয়্যারটি চালু করা সম্ভব হয়নি।

জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, ডেঙ্গু এখন শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। তাই প্রত্যন্ত এলাকায়ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে ডেঙ্গু পরীক্ষার ব্যবস্থা করা জরুরি। আইইডিসিআর-এর উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, “ডেঙ্গুর বর্তমান আচরণে অনেক সময় বোঝাই যায় না রোগী আক্রান্ত কিনা। তাই গ্রামীণ মানুষ যেন নিজ এলাকায় পরীক্ষা করতে পারে— সেই ব্যবস্থা করতে হবে। এতে দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে এবং মৃত্যুঝুঁকিও অনেকটা কমে যাবে।”

Advertisements