চীনবিরোধী প্রচারণা
Advertisements

বাংলাদেশে চীনবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনায় ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর (RAW) একটি সংগঠিত নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে বলে পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানা গেছে। এতে বলা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চসহ আওয়ামী ঘরানার কয়েকটি সংগঠনের কিছু নেতা ও ব্যক্তি এ নেটওয়ার্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন।

এসবি’র তদন্তে দেখা যায়, ২০১৮ সালের অক্টোবরের পর থেকে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ উইঘুর মুসলমানদের সহানুভূতির নামে চীনের বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু করে। এ কার্যক্রমের মূল অর্থায়ন ও নির্দেশনা আসে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর পক্ষ থেকে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর এই কার্যক্রম আরও সক্রিয় হয় এবং বর্তমানে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সংশ্লিষ্টদের ওপর কড়া নজর রাখছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ নেটওয়ার্কের সঙ্গে সরাসরি জড়িত চারজন—ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল, আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক উপকমিটির সদস্য মুফতি মাসুম বিল্লাহ নাফিয়ী, সম্মিলিত ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মাওলানা আবু জাফর কাসেমী এবং মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মামুন। তাদের মধ্যে তিনজন আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত এবং তাদের রাজনৈতিক পরামর্শদাতা হিসেবে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও সাবেক এমপি শামীম ওসমানের নাম উঠে এসেছে।

২০১৮ সালে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আ ক ম জামাল উদ্দিন ও সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খানের ছেলে আসিবুর রহমান খান ‘মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ’ গঠন করেন। তখন ছাত্রলীগ নেতা আমিনুল ইসলাম বুলবুলকে সভাপতি এবং আল মামুনকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। শুরুতে তারা মুক্তিযোদ্ধা কোটা রক্ষার আন্দোলনে সক্রিয় থাকলেও পরে ভারতীয় মদতে উইঘুর মুসলমানদের সমর্থনের নামে চীনের বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু করে।

২০২০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় চীনের বিরুদ্ধে সমাবেশ ও মানববন্ধনের আয়োজন করে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ, আওয়ামী ওলামা লীগ এবং সম্মিলিত ইসলামী ঐক্যজোট। এসব কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা খুবই সীমিত হলেও ভারতীয় গণমাধ্যমে তা বড় আকারে প্রচার করা হয়। চীনা দূতাবাস এ সময় উদ্বেগ জানিয়ে সরকারের মন্ত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে ২০২৩ সালের মে মাসে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে বহিষ্কার করা হয়। তবে ওই বছরই চীনবিরোধী প্রচারণা সবচেয়ে তীব্র আকার ধারণ করে।

এরপর আওয়ামী ওলামা লীগ, সম্মিলিত ইসলামী ঐক্যজোট এবং বাংলাদেশ সোশ্যাল অ্যাকটিভিস্ট ফোরাম (বিএসএএফ) এই কার্যক্রমের নেতৃত্ব নেয়। ঢাকাসহ চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, যশোর ও পঞ্চগড়ে ছোট পরিসরে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীদের অনেকে অর্থের বিনিময়ে উপস্থিত থাকত।

প্রতিবেদন বলছে, বিএসএএফের কয়েকজন নেতা ২০২৩ সালে ভারত সফর করে বিজেপি নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন, যা ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয়। মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের সাবেক সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলের সঙ্গে ঢাকাস্থ ভারতীয় দূতাবাসের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। তিনি বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন এবং সেখান থেকে আওয়ামী লীগের পক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালাচ্ছেন।

সম্মিলিত ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান আবু জাফর কাসেমী ভারতের দেওবন্দ মাদরাসার সাবেক শিক্ষার্থী এবং দীর্ঘদিন ভারতে অবস্থান করেছেন। অন্যদিকে, মুফতি মাসুম বিল্লাহ নাফিয়ী আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক উপকমিটির সদস্য এবং বিএসএএফের সভাপতি। তিনি ধর্মীয় ও সামাজিক ইস্যুকে সামনে রেখে চীনবিরোধী কর্মসূচির আয়োজন করতেন এবং বিজেপি নেতাদের সঙ্গে একাধিকবার সাক্ষাৎ করেছেন।

এসবি প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় এ নেটওয়ার্ক তিন ধাপে কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। প্রথম ধাপে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের নেতৃত্বে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ, দ্বিতীয় ধাপে সম্মিলিত ইসলামী ঐক্যজোট ও ওলামা লীগের সম্পৃক্ততা এবং তৃতীয় ধাপে বিএসএএফের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও ভারত সফর। এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ব্যবহার করে চীনবিরোধী প্রচারণা চালানো হয়েছে।

এ বিষয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষক এয়ার কমডোর (অব.) ইশফাক ইলাহী চৌধুরী বলেন, এক দেশের নাগরিক হয়ে অন্য দেশের স্বার্থে কাজ করা রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল। এতে দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক ও আস্থার সংকট তৈরি হয়।

প্রতিবেদনে অভিযুক্ত চারজনের মধ্যে আবদুল্লাহ আল মামুন বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। আমিনুল ইসলাম বুলবুলের মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। মাওলানা আবু জাফর কাসেমী বলেন, তিনি কোনো চীনবিরোধী প্রচারণায় জড়িত নন, শুধু উইঘুর মুসলমানদের নির্যাতনের প্রতিবাদ করেছেন। মুফতি মাসুম বিল্লাহ নাফিয়ীও অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, তিনি কোনো বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত নন।

এসবি’র বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ থেকে শুরু করে ধর্মীয় সংগঠন ও সামাজিক ফোরামের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে চীনবিরোধী প্রচারণা চালানো হয়েছে। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার নির্দেশনা ও অর্থায়নে পরিচালিত এই নেটওয়ার্ক এখনো সক্রিয় এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর কঠোর নজরদারির মধ্যে রয়েছে।

সূত্রঃ আমার দেশ

Advertisements