সোমবার ‘রাষ্ট্র মেরামতের’ রূপরেখা ঘোষণা করবে বিএনপি
Advertisements

সংবিধানসংশ্লিষ্ট যেকোনো সংস্কার আগামী সংসদে অনুমোদনের পর তা গণভোটে দেয়ার পক্ষে মত দিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটির মতে, গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়গুলোতে জনগণের সরাসরি মতামত নেয়াই সবচেয়ে গণতান্ত্রিক ও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি। পাশাপাশি, প্রয়োজনে বিচার বিভাগের মতামতও নেয়া যেতে পারে বলে বিএনপি তাদের অবস্থান জানিয়েছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনকে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরামে আলোচনা করেই এ অবস্থান চূড়ান্ত করা হয়েছে। দলটি স্পষ্ট করেছে, সংবিধানসংশ্লিষ্ট নয়—এমন সংস্কারগুলো অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশের মাধ্যমে যেকোনো সময় কার্যকর করা যেতে পারে। এসব বিষয়ে তাদের কোনো আপত্তি নেই। বিএনপির এ অবস্থানকে ১২ দলীয় জোট, ১১ দল, এনডিএম, এলডিপি ও লেবার পার্টিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক জোট সমর্থন জানিয়েছে বলে জানা গেছে।

জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে চলমান রাজনৈতিক বিতর্কের প্রেক্ষাপটে বিএনপি জানিয়েছে, তাদের মূল উদ্বেগ হলো—সংবিধান সংশোধনের এমন কোনো নজির তৈরি না করা, যেটা ভবিষ্যতে অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করবে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “আমরা এমন কোনো নজির রাখতে চাই না, যেটা ভবিষ্যতে কেউ সহজেই সংবিধান সংশোধনের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।”

দলটির দায়িত্বশীল নেতারা জানিয়েছেন, সংবিধান সংস্কারের যেসব বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য রয়েছে, সেগুলো সংসদে সংশোধনের মাধ্যমে পাস করা হবে। তবে এর আগে যদি কেউ বৈধ ও সাংবিধানিক কোনো বিকল্প পথ দেখাতে পারেন, বিএনপি সেই পদ্ধতির পক্ষে থাকবে—শুধু শর্ত একটাই, সেটি যেন জাতীয় স্বার্থ ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করে।

সালাহউদ্দিন আহমদের মতে, সংবিধান সংস্কার বিষয়ে বিচার বিভাগের পরামর্শ নেয়া যেতে পারে, তবে সেটি গ্রহণের আগে রাজনৈতিকভাবে সবাইকে একমত হতে হবে। তিনি বলেন, “যদি আমরা একমত হই, তাহলে বিচার বিভাগের মতামত মানার একটা নৈতিক বাধ্যবাধকতা তৈরি হবে। প্রয়োজন হলে পর্দার আড়ালেও আলোচনা হবে, কিন্তু জাতির স্বার্থে একটি পথ বের করতেই হবে।”

বিএনপি মনে করে, জুলাই সনদ একটি রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল। তাই এ নিয়ে বিচার বিভাগের বাধ্যতামূলক ভূমিকা না থাকলেও পরামর্শমূলক ভূমিকা থাকতে পারে।

বিএনপি জানিয়েছে, তারা জুলাই সনদে স্বাক্ষর করতে প্রস্তুত। তবে যদি বারবার নতুন করে প্রস্তাব বা শর্ত যুক্ত হয়, তাহলে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া জটিল হয়ে পড়বে। দলের মতে, সাংবিধানিক বিষয়গুলো বাদে অন্য যেসব সংস্কারে সবাই একমত, সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
বিএনপি চায়, এই সনদে সবাই এমনভাবে অঙ্গীকার করুক—যেখান থেকে কেউ ভবিষ্যতে সরে যেতে না পারে। তাদের প্রস্তাব, জুলাই সনদকে জাতীয় প্রতিশ্রুতি হিসেবে গ্রহণ করা উচিত, যাতে এর বাইরে গিয়ে কোনো দল রাজনীতি করতে না পারে।

জানা গেছে, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি ও অন্যান্য দলকে সন্তুষ্ট রেখে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় ঐকমত্য কমিশন দুটি বিকল্প পথ নিয়ে আলোচনা করছে। বিশেষজ্ঞ প্যানেল তাদের পরামর্শ দিয়েছে সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুসারে সুপ্রিম কোর্টের অভিমত গ্রহণের ব্যবস্থা রাখতে।

প্রথম প্রস্তাব অনুযায়ী—একটি সংবিধান আদেশ জারি করে সেখানে গণভোটের বিধান রাখা হবে। আদেশ জারির পর রাষ্ট্রপতি ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আপিল বিভাগের অভিমত নেবেন।

দ্বিতীয় প্রস্তাব অনুযায়ী—আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গেই একটি গণপরিষদ বা সংবিধান সংস্কার সভা গঠন করা হবে। নির্বাচনের পর সংখ্যাগরিষ্ঠ দল সরকার গঠন করবে, অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নেবে, এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জুলাই সনদ গৃহীত হলে ওই গণপরিষদ পাঁচ বছর মেয়াদি সংসদে রূপান্তরিত হবে।

রাজনৈতিক অঙ্গনে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে এখনো মতবিরোধ থাকলেও বিএনপি ও সমমনা দলগুলো সংবিধান সংস্কারের ক্ষেত্রে গণভোট ও বিচার বিভাগের পরামর্শের পথকে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য সমাধান হিসেবে দেখছে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের পরবর্তী বৈঠকেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত রূপরেখা নির্ধারিত হতে পারে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা।

Advertisements