গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ১৩ বছর বয়সী এক মাদরাসাছাত্রীকে ফুসলিয়ে ধর্ষণের অভিযোগে তিন যুবকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তবে পুলিশ, স্থানীয় সূত্র ও পরিবারের বর্ণনায় ঘটনার ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। কেউ বলছেন এটি প্রেমের সম্পর্কের পরিণতি, কেউ বলছেন শিশু নির্যাতনের নিদারুণ উদাহরণ।
মৌচাক এলাকার এক মাদরাসাছাত্রী গত ২০ আগস্ট নিখোঁজ হয়। তিন দিন পর অসুস্থ অবস্থায় বাড়ি ফিরে আসে সে। এরপর পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়, স্থানীয় হিন্দু যুবক জয় কুমার দাস মেয়েটিকে প্ররোচনায় বাড়ি থেকে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করেছে। একই মামলায় জয় কুমারের ভাই লোকনাথ দাস ও সহযোগী সঞ্জিত বর্মণকে আসামি করা হয়।
ভিকটিমের মা জানান, ঘটনার পর তাঁকে ভয়ভীতি দেখানো হয়। “ওরা বলেছিল, বাড়াবাড়ি করলে মেয়ের মতো আমারও অবস্থা করবে,”— এমন অভিযোগ করে তিনি বলেন, “মেয়েকে কুড়িগ্রামে পাঠিয়ে দিই, ওর মানসিক অবস্থা ভয়ানক হয়ে গিয়েছিল।”
পুলিশের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, মেয়েটির সঙ্গে জয় কুমারের প্রেমের সম্পর্ক ছিল এবং এর আগেও দু’বার পালিয়ে গিয়েছিল। এ কারণে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে ঘটনাটিকে “সম্পর্কভিত্তিক প্ররোচনা” হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে ভিকটিমের বয়স ১৩ বছর হওয়ায় আইন অনুযায়ী কোনো সম্মতিপূর্ণ সম্পর্কের প্রশ্নই ওঠে না— এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ধর্ষণ হিসেবে গণ্য হয় (নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০-এর ৯(১) ধারা অনুযায়ী)।
জয় কুমার দাসকে গ্রেপ্তারের পর পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে সে দাবি করে, মেয়েটি স্বেচ্ছায় তার সঙ্গে গিয়েছিল। ভিডিওতে জয় কুমারকে বলতে শোনা যায়, “ও আমায় ভালোবাসতো। আমি ওকে বলছিলাম বাড়ি যা, কিন্তু ও থাকতে চাচ্ছিল।” তবে তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, “এমন দাবি সম্পর্কের প্রকৃত চিত্র বদলায় না। বয়স কম হলে সম্মতি গ্রহণযোগ্য নয়।”
ঘটনার দেড় মাস পর বিষয়টি আলোচনায় আসে, যখন ভিকটিমের মা অভিযুক্ত লোকনাথের দোকানে গিয়ে ঘটনার ব্যাখ্যা চান। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, দোকানের সামনে তাকে একাধিক ব্যক্তি ঘিরে ফেলে ও টেনে নিয়ে যায়। এতে হামলাকারীদের একজন সঞ্জিত বর্মণ বলে শনাক্ত হয়। এই ঘটনার পরপরই নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করা হয়।
স্থানীয় এক শিক্ষক বলেন, “ঘটনাটা সোজাসাপটা নয়। মেয়েটির ওপর সামাজিক ও পারিবারিক চাপ ছিল, আর ছেলেটি বিষয়টাকে প্রেম হিসেবে প্রকাশ করেছিল। এর ফলে দুই পরিবারেরই মান-সম্মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।”
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, “মেয়েটির বয়স মাত্র ১৩ বছর। তাই এখানে প্রেম বা সম্পর্কের প্রশ্নই আসে না— আইন অনুযায়ী এটি স্পষ্টভাবে শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণ।”
ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে ঘটনাটি দ্রুত সামাজিক মাধ্যমে উত্তেজনা ছড়ায়। একাধিক ফেসবুক পোস্টে জয় কুমারকে “হিন্দুত্ববাদী অপরাধী” আখ্যা দিয়ে ভিকটিমের ছবি প্রকাশ করা হয়, যা আইন অনুযায়ী অপরাধ (শিশু আইন ২০১৩-এর ২৯ ধারা)। পরে কালিয়াকৈর থানা প্রশাসন সতর্কতা জারি করে এ ধরনের পোস্ট না ছড়ানোর আহ্বান জানায়।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ঘটনাটি ধর্মীয় নয়, বরং সামাজিক ও পারিবারিক সমস্যা থেকে উদ্ভূত। একজন ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বলেন, “মেয়েটির পরিবার দরিদ্র, সারাদিন মা কাজে থাকেন। মেয়েটি মানসিকভাবে দুর্বল ছিল, আর সেই সুযোগটাই নিয়েছে ছেলেটা।”
মামলায় তিনজনকে আসামি করা হয়েছে— জয় কুমার দাস, লোকনাথ দাস ও সঞ্জিত বর্মণ। প্রথম দুইজন কারাগারে এবং তৃতীয়জন পলাতক। শহীদ তাজউদ্দীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ ডা. মাযহারুল হক জানান, “মেয়েটির শারীরিক পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে, রিপোর্ট তদন্ত কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হবে।”
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মামলা শুধু ধর্ষণ নয়, বরং সমাজে কিশোর-কিশোরীদের মানসিক নিরাপত্তা ও পারিবারিক তত্ত্বাবধানের প্রশ্নও তুলেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. রোকেয়া পারভীন বলেন, “এখনকার সমাজে শিশুরা খুব সহজে মোবাইল ও সামাজিক যোগাযোগে প্রভাবিত হচ্ছে। পরিবার ও সমাজ— দুপক্ষের দায়িত্বহীনতা মিলে এই ধরনের বিপর্যয় ঘটছে।”
মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’-এর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ধর্মীয় পরিচয় টেনে এনে এমন মামলাকে রাজনৈতিক রঙ দেওয়ার প্রবণতা বিচার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। সংগঠনের মুখপাত্র আরিফুজ্জামান বলেন, “এই মামলা রাষ্ট্রের কাছে পরীক্ষা— আইন ধর্মনিরপেক্ষভাবে প্রয়োগ হয় কি না।”
বর্তমানে মামলাটি কালিয়াকৈর থানায় তদন্তাধীন। পুলিশ জানিয়েছে, “প্রত্যেক অভিযুক্তের ভূমিকা ও মেয়েটির বক্তব্য মিলিয়ে যাচাই করা হচ্ছে। সত্য উদঘাটনে আমরা নিরপেক্ষভাবে কাজ করছি।”
এ ঘটনার পর স্থানীয় এলাকায় উত্তেজনা প্রশমনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ভিকটিমের পরিবার বর্তমানে আত্মীয়ের বাড়িতে অবস্থান করছে।
কালিয়াকৈরের এই ঘটনা দেখিয়েছে, কিশোরীদের মানসিক দুর্বলতা, পারিবারিক অবহেলা, সামাজিক চাপ ও ধর্মীয় বিভাজন— সবকিছু মিলেই কীভাবে একটি ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভয়াবহ অপরাধে পরিণত হতে পারে। আর সেই ফাঁকে হারিয়ে যায় মূল বিষয়টি— শিশুর নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার।





































