ইসলামের উপর পৌত্তলিকতা
Advertisements

ইকবাল মনে করেন ইসলাম আর খ্রিস্টধর্ম তাদের শুরুর দিকে একই প্রতিকূলতা—পৌত্তলিকতার—মোকাবেলা করেছে। কিন্তু মোকাবেলার ধরণে পার্থক্য হল খ্রিষ্টবাদ পৌত্তলিকতার সাথে সমঝোতা করেছে, পৌত্তলিকতার অনেক কিছু গ্রহণ করেছে, যেখানে ইসলাম পৌত্তলকতাকে ধ্বংস করে দিয়েছে।

ইকবালের এই পর্যবেক্ষণের সত্যতা আমরা বুঝতে পারি যখন দেখি যে খ্রিষ্টীয় ধর্ম-উপাদানে রোমান পৌত্তলিকতার একটা ছাপ বুঝা যায়, এমন কি খ্রিষ্টীয় ধর্মানুষ্ঠান থেকে রোমান পৌত্তলিকতার একটা স্কেচও আঁকা যায়। একইভাবে ইসলাম ধর্মের ধর্ম-উপাদান আর ধর্মানুষ্ঠান থেকে আরবীয় পৌত্তলিকতার রূপ পাওয়া বুঝা সম্ভব না। এরপরও প্রমাণভিত্তিক আলোচনা যা আমাদের এই ব্যাপারে আরো বেশি স্পষ্ট একটা অবস্থানে যেতে সাহায্য করতে পারে এই স্বল্প পরিসরে সেই আলাপ করা সম্ভব না। অন্তর্দৃষ্টির সংক্ষিপ্ত পথে আমরা একটা বুঝে আসতে পারি। পৌত্তলিকতার খুব প্রাথমিক ভিত্তিগত নীতি হল ঐশ্বরিকতাকে একটি অবিভাজ্য, অদ্বিতীয় ও একক কেন্দ্রে কেন্দ্রীভূত করতে না পারা। সেমেটিক বা আব্রাহামিক ধর্মগুলোর অবস্থান ঠিক এর বিপরীতে এবং খুবই শক্ত ও কঠোর অবস্থান। ইহুদি ধর্ম ও ইসলাম ধর্ম এই নীতিতে একই জায়গায় দাড়ালেও খ্রিষ্ট ধর্ম নিয়ে আমরা একই কথা সমান জোর দিয়ে বলতে পারি না। এবং মূলত এই ভিত্তিগত নীতিই ধর্মের অন্যান্য দিকগুলোর জন্য নির্ধারক ভূমিকা নিয়ে থাকে।
সব ধর্মই সময়ের আবর্তে বিভিন্ন ধরণের বাস্তবিক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয় এবং বিভিন্ন অভিজ্ঞতায় তার ধর্মাচার ও ধর্মানুষ্ঠানে পরিবর্তন-পরিবর্ধন নিয়ে আসে। এই পরিবর্তন-পরিবর্ধনের সবই একচেটিয়া ভাল বা মন্দ নয়। আর আমাদের আলোচনার এখানের প্রাসঙ্গিকতায় মূল বিবেচ্য বিষয় হল, এই পরিবর্তন-পরিবর্ধনের অংশটুকু সময়ের ছাকনি বেয়ে ধর্মের মূল নির্ধারক নীতিতে উপনীত হয় কি না। যে পৌত্তলিকতা ইসলাম মোকাবেলা করেছে এটা স্বতঃই স্পষ্ট যে ইসলাম সেই পৌত্তলিকতাকে নূণ্যতমও বহন করে না, পৌত্তলিকিতার চেতনা নির্ধারক ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া তো বহুদূর।

তবে ইসলাম ইহুদি ও খ্রিষ্টধর্মের মূল প্রত্যাদেশকে ইসলামের স্রষ্টা আল্লাহর কাছ থেকেই আগত বলে মনে করে এবং ইসলাম নিজেকে ইহুদি ও খ্রিষ্ট ধর্মের সত্যায়নকারী বলে ঘোষণা দিয়েছে। শেষের দিকের প্রত্যেক সেমেটিক ধর্মই তার পূর্বের ধর্মের ব্যাপারে এই একই অবস্থান নিয়েছে। তাই সেমেটিক ধর্মের সর্বশেষ সংস্করণ ইসলাম তার পূর্বের সংস্করণের অনেক কিছুই যেমন বাদ দিয়েছে তেমনি অনেক কিছু আবার গ্রহনও করেছে। এটাই মূলত সত্যায়ন প্রক্রিয়া। এই গ্রহণ প্রক্রিয়াটা নৈব্যক্তিক আকারে দেখলে ইসলামের উপর ইহুদি ও খ্রীষ্টবাদের প্রভাব হিসেবে দেখা যায়। আবার ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে এই গ্রহণ যতটা না আকারগতভাবে তার চেয়ে বেশি নীতিগতভাবে। এইটা দিকটা বুঝা যাবে যদি আমরা ভারতীয় ধর্মগুলোর সাথে তুলনামূলকভাবে বিচার করি। সনাতন ধর্মের পর আগত ধর্মগুলো যে আগ্রহের সাথে সনাতন ধর্ম আত্তীকরণ করেছে একই ভাবে ইহুদি ও খ্রিষ্ট ধর্ম ইসলামকে আত্তীকরণ করে নি।
ইসলামের নামাজ, রোজা, হজ্জ, যাকাত এই সমস্ত ধর্মানুষ্ঠান থেকে শুরু করে আইন-কানুনের অনেক কিছুই ইহুদি ও খ্রিষ্ট ধর্ম থেকে আগত। কোরানের সাক্ষ্যেই এর বহু প্রমাণ আছে। এমনকি অনেক কিছুই ইসলামে আছে যা ইহুদি, খ্রিষ্ট ও অন্যান্য আব্রাহামিক নবীদের সময়ে ছিল কোরান বলছে কিন্তু ইতিহাস থেকে পুরোপুরি আবিষ্কার করা সম্ভব না। অর্থ্যাৎ ইতিহাস বা আমাদের ইতিহাসের পাঠ যেখানে বলে ইসলাম ইহুদি বা খ্রিষ্ট ধর্ম দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত সেখানে কোরান নিজেই এক ধাপ এগিয়ে বলে ইসলাম মূলত ইহুদি ও খ্রিষ্ট ধর্মের নতুন সংশোধিত সংস্করণ।

ইসলামের এই প্রভাবিত হওয়ার বিষয়টি বুঝার জন্য ইসলামের নিজস্ব অবস্থানটি খুবই গুরুত্বপুর্ণ। সাধারণত প্রভাবিত হওয়া বলতে আমরা একধরণের নিষ্ক্রিয় বা কর্মবাচ্যমূলক অবস্থান থেকে অন্যকে বা অন্যের কোন কিছু গ্রহণ করাকে বুঝাই। ইসলাম এই জায়গায় খুবই ভিন্ন আচরণ করে থাকে। ইসলাম খুবই সক্রিয়তার সাথে অন্যকে বিচার করে বা এক ধরণের নিজস্ব নিরীক্ষামূলক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিয়ে এসে আত্তীকরণ করে গ্রহণ করে। ইসলামের এই সক্রিয় অবস্থান তাকে স্বতন্ত্র করে তুলেছে।

তবে এই সক্রিয়তার ভিন্ন কিছু ইতিহাস, নিষ্ক্রিয়ভাবে প্রভাবিত হয়ে কর্মবাচ্যমূলক অবস্থান থেকে কিছু বিষয় গ্রহণের ইতিহাস কিছুটা পাওয়া যাবে যদি মুহাম্মদ পরবর্তী সময়ের সংগৃহীত ও প্রয়োগকৃত ধর্মীয় নিয়ম-কানুন ও ভাবনার দিকে আমরা তাকাই। কেননা আরবের ইহুদি, খ্রিষ্টানদের যারা ইসলাম গ্রহণ করছিল তারা তাদের পূর্বের বিশ্বাস, ধ্যান ধারণা কিছুটা নিজেদের অজান্তে কিছুটা উদ্দেশ্যমূলকভাবে ইসলামে প্রবিষ্ট করেছেন এবং এই কাজে তৎকালীন প্রভাব-প্রতিপত্তিশীল মানুষ বিশেষ করে বিভিন্ন জায়াগার খলিফাদের বিশেষ পৃষ্ঠপোষকতা ছিল। তবে একই কথা আরবের পৌত্তলিকতার ব্যাপারে বলা যাবে না এবং এই পরবর্তী ইহুদি-খ্রিষ্টীয় প্রভাবের নীতি, নিয়ম-কানুন দ্বিতীয় স্তরের ধর্মীয় উৎস হিসেবে জায়গা করে আছে, মৌল ভিত্তি হিসেবে নয়। আবার একই ভাবে এটাও সত্য যে যদিও বিষয় গুলো নীতিগতভাবে দ্বিতীয় শ্রেণীর এবং মৌলিক নয়, চর্চায় এগুলোই এগিয়ে। সুতরাং আমরা বলতে পারি ইসলামের মৌল ভিত্তিগত নীতিমালাগুলো যার উপর ইসলামের প্রতিষ্ঠা তা নিজস্ব সক্রিয়তায় অনন্য, কিন্তু ইসলামের পৃথিবীব্যাপী অধিকাংশ অনুসারীরাই নিষ্ক্রিয়ভাবে মৌল ইসলামের বহির্ভূত চিন্তা, ভাব ও শক্তি দ্বারা প্রভাবিত।

Advertisements