বিএসএফের সার্চলাইটে
Advertisements

বাংলাদেশ–ভারত সীমান্তের কুড়িগ্রাম অংশে রাতে আর অন্ধকার নামে না। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) স্থাপন করা উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সার্চলাইটের তীব্র আলো সীমান্ত পেরিয়ে কয়েকশ মিটার পর্যন্ত বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকে পড়ছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি, গাছপালা, মানুষের স্বাভাবিক ঘুম—সামগ্রিকভাবে ব্যাহত হচ্ছে সীমান্তবর্তী মানুষের জীবনযাপন।

কুড়িগ্রামের রাজিবপুর, রৌমারী, উলিপুর, নাগেশ্বরী, ভুরুঙ্গামারী ও ফুলবাড়ী উপজেলার প্রায় ২৭৮ কিলোমিটার সীমান্ত জুড়ে বসবাসরত প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ মূলত কৃষির ওপর নির্ভরশীল। তবে বিএসএফের সার্চলাইটকে তারা এখন নতুন সংকট হিসেবে দেখছেন।

২০০১ সালের বড়াইবাড়ী ঘটনার পর সীমান্তজুড়ে প্রায় ২০০ মিটার অন্তর সার্চলাইট বসায় বিএসএফ। সন্ধ্যার পর সেগুলো জ্বালানো হয়, বন্ধ হয় সকালে। স্থানীয়দের দাবি, আলো সীমান্ত পেরিয়ে প্রায় ৪০০ মিটার বাংলাদেশের ভেতর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছে। আলো এতটাই তীব্র যে অনেক জায়গায় রাতও দিনের মতো উজ্জ্বল দেখায়।

চাষিদের অভিযোগ, এই আলো ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত করছে। ধান গাছের পাতা হলুদ হয়ে যাওয়া, শীষ ছোট হওয়া, পাটগাছ কম লম্বা হওয়া, ভুট্টার মোচা ছোট হওয়া, সবজি গাছ ঝিমিয়ে পড়া—এমন নানা ক্ষতির কথা জানিয়েছেন তারা। আলো আকৃষ্ট হয়ে বিভিন্ন পোকামাকড় দল বেঁধে ফসলে আক্রমণ করছে। ফলে কীটনাশক ও সারের ব্যবহার দ্বিগুণেরও বেশি করে ফেলতে হচ্ছে কৃষকদের।

ফুলবাড়ীর নাওডাঙার কৃষক আব্দুস সালাম বলেন, “লাইটের কারণে ধানের শীষ ছোট হয়, পাতা হলুদ হয়ে যায়। ভুট্টার মোচা ঠিক মতো হয় না। সবজিও ঠিকমতো বড় হয় না।” তার ভাই আবুল কালাম বলেন, “বাতির বাইরে ধান বিঘায় ১৫–১৬ মণ হয়, কিন্তু বাতির নিচে আট মণও হয় না। ওই ধান তেতো লাগে, খড়ও গরু খায় না।”

রৌমারীর চাষি সফিকুল ইসলাম জানান, পোকামাকড়ের আক্রমণ এত বেড়েছে যে সাধারণত যেখানে দুইবার কীটনাশক দিলেই হয়, সেখানে এখন দিতে হয় চার–পাঁচবার। স্থানীয় ওষুধ বিক্রেতারাও স্বীকার করেছেন, সীমান্ত এলাকার ওষুধ ও সার বিক্রি অন্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি।

সীমান্তবর্তী আম, লিচু, সুপারি, নারিকেল ও কলার বাগানেও তীব্র আলোর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। ফুল কম ধরছে, অনেক ফুল ঝরে যাচ্ছে এবং ফলন কমে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন চাষিরা।

তীব্র আলো সীমান্ত এলাকার বহু কাঁচা ঘরের ওপর সরাসরি পড়ে রাতে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। শিশুদের ঘুম ভেঙে যায়, বয়স্কদের চোখ জ্বলে, মাথাব্যথা হয়। মানসিক চাপও বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে। এমনকি রাতে টহলে থাকা বিজিবি সদস্যরাও চোখের সমস্যায় ভুগছেন বলে জানিয়েছেন কয়েকজন।

কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ ও উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান মির্জা মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, “উদ্ভিদ দিনে সালোকসংশ্লেষণ করে, রাতে শ্বসন করে। রাতে গাছের ওপর কৃত্রিম আলো পড়লে এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। এতে ফসলের বৃদ্ধি কমে, ফলন কমে এবং পোকামাকড় বাড়ে।”

স্থানীয়রা বলেন, চোরাচালান ও নিরাপত্তার অজুহাতে সার্চলাইট বসানো হলেও মূলত তীব্র আলো বাংলাদেশের কৃষিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তাদের মতে, চাইলে বিএসএফ আলো নিচের দিকে দিতে পারে বা শক্তি কমাতে পারে—কিন্তু তা করা হয় না।

Advertisements