মূত্রনালীর সংক্রমণ
Advertisements

মূত্রনালীর সংক্রমণ (UTI) বিশ্বব্যাপী নারীদের জন্য একটি সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা। গবেষণা অনুযায়ী, মহিলাদের প্রায় ৬০ শতাংশ জীবনে অন্তত একবার উপসর্গযুক্ত UTI-তে আক্রান্ত হন। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর প্রায় ১০ শতাংশ মহিলার এ ধরনের সংক্রমণ হয়।

বিশেষ করে ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী যৌনভাবে সক্রিয় তরুণী মহিলাদের মধ্যে UTI সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ২৫ শতাংশের ক্ষেত্রে কোনো চিকিৎসা ছাড়াই উপসর্গ চলে যায়, তবে সমান সংখ্যক রোগীর ক্ষেত্রে সংক্রমণ সক্রিয় অবস্থায় থেকে যায়।

অন্যদিকে, পুরুষদের তুলনায় নারীদের মধ্যে এ সংক্রমণ অনেক বেশি দেখা গেলেও, পুরুষদের মধ্যে সাধারণত UTI ঘটে মূত্রনালীর গঠনগত সমস্যা বা বয়সজনিত কারণে। বিশেষ করে প্রবীণ পুরুষরা এ ঝুঁকিতে বেশি থাকেন।

ইউরিনারি ট্র্যাক্ট মানে হলো যে রাস্তা দিয়ে প্রস্রাব বের হচ্ছে। আমরা জানি, কিডনি প্রস্রাব তৈরি করে। তার পর কিডনি থেকে ইউরেটার নল দিয়ে ইউরিনারি ব্লাডারে প্রস্রাব আসে। এর পর প্রস্রাব ইউরিথ্রা দিয়ে বের হচ্ছে। এই পুরো জায়গাটাকে, অর্থাৎ ইউরেটার থেকে শুরু করে ইউরিথ্রা পর্যন্ত, ইউরিনারি ট্র্যাক্ট বলা হয়। এই জায়গার কোনো অংশে যদি সংক্রমণ হয়, তাকে ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (UTI) বলা হয়।

ইউরিনারি ট্র্যাক্টে দুই ধরনের সংক্রমণ দেখা যায়। Lower UTI (Cystitis) মানে হলো ব্লাডারের সংক্রমণ। সহজভাবে বললে, এটি ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশনের (UTI) নিম্ন অংশের প্রধান ধরন, যা মূলত মূত্রাশয় (bladder) কে প্রভাবিত করে। E. coli ব্যাকটেরিয়া, যা অন্ত্রে থাকে, periurethral এলাকায় সংক্রমণ সৃষ্টি করে। সাধারণত সংক্রমণ ব্লাডারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে এবং গুরুতর হয় না। এ সংক্রমণের লক্ষণগুলো হলো:

প্রস্রাব করার সময় জ্বালা বা পেশীতে ব্যথা

ঘন ঘন প্রস্রাবের প্রবণতা

প্রস্রাবের রঙ পরিবর্তন বা দুর্গন্ধ

কখনও কখনও লঘু জ্বর

Upper UTI (Pyelonephritis) হলো ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশনের (UTI) গুরুতর রূপ, যেখানে সংক্রমণ শুধু ব্লাডার (মূত্রথলী) বা ইউরেথ্রায় (মূত্রনালী) সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং কিডনিতে ছড়িয়ে যায়। অর্থাৎ ব্যাকটেরিয়া সাধারণত ইউরেথ্রা → ব্লাডার → ইউরেটার → কিডনি পথে উঠে যায়।

অনেক সময় ক্যাথেটার, কিডনি/ব্লাডার স্টোন বা প্রস্রাবের বাধা (obstruction) থাকলে সংক্রমণ সহজেই কিডনিতে পৌঁছে যায়। আবার রক্তের মাধ্যমে (hematogenous spread) Staphylococcus aureus কিডনিতে সংক্রমণ ঘটাতে পারে।

এর লক্ষণগুলো হলো:

কোমর বা পিঠে তীব্র ব্যথা

জ্বর ও শীত শীত ভাব

প্রস্রাবের সময় জ্বালা বা ব্যথা

প্রস্রাবে দুর্গন্ধ বা রঙ পরিবর্তন

বমি বমি ভাব বা বমি

প্রচণ্ড ক্লান্তি

মূত্রনালী সংক্রমণে প্রধান জীবাণুঃ

চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, মূত্রনালীর সংক্রমণ বা UTI সাধারণত গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়া দ্বারা হয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে গ্রাম-পজিটিভ ব্যাকটেরিয়াও দায়ী হতে পারে।

গবেষণায় দেখা গেছে, আনকমপ্লিকেটেড UTI (সাধারণ সংক্রমণ)-এর প্রায় ৯৫% ক্ষেত্রে একক ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের কারণ হয়।

সবচেয়ে সাধারণ জীবাণু:

ইশেরিশিয়া কোলি (E. coli) – প্রায় ৭৫%–৯৫% সংক্রমণ দায়ী

ক্লেবসিয়েলা নিউমোনিয়া (Klebsiella pneumoniae)

স্ট্যাফাইলোককাস স্যাপ্রোফাইটিকাস (Staphylococcus saprophyticus)

এন্টেরোকককাস ফেসালিস (Enterococcus faecalis)

গ্রুপ বি স্ট্রেপ্টোকক্কি (Group B streptococci)

প্রোটিয়াস মিরাবিলিস (Proteus mirabilis)

বিশেষজ্ঞদের মতে, সংক্রমণের ধরন রোগীর বয়স, লিঙ্গ এবং সংক্রমণের ধরন অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে।

মূত্রনালীর সংক্রমণ প্রতিরোধ ও চিকিৎসা

মূত্রনালীর সংক্রমণ প্রতিরোধে কিছু বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি। চিকিৎসকরা সতর্ক করেছেন, সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য সচেতনতা ও দৈনন্দিন অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রতিরোধমূলক কার্যকর পদক্ষেপগুলো হলো:

পর্যাপ্ত পানি পান করুন: দিনে কমপক্ষে ৮–১০ গ্লাস পানি পান করলে জীবাণু প্রস্রাবের মাধ্যমে বের হয়ে যায়।

পর্যাপ্ত মূত্রত্যাগ করুন: প্রস্রাব চেপে রাখা থেকে বিরত থাকুন।

সঠিক হাইজিন বজায় রাখুন: প্রস্রাবের পর সামনের দিকে (মলদ্বারের দিকে নয়) পরিষ্কার করা।

অন্তর্বাস নিয়মিত পরিবর্তন করুন।

যৌনমিলনের পর প্রস্রাব করুন: এতে ইউরিনারি ট্র্যাক্টে ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি কমে।

হালকা, শ্বাসপ্রশ্বাসযোগ্য পোশাক পরুন: ঘাম জমে ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধি রোধ করে।

ক্যাথেটার ব্যবহারে সতর্কতা: দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।

প্রয়োজনমতো প্রাকৃতিক সাপ্লিমেন্ট: যেমন ক্র্যানবেরি জুস বা D-ম্যানোজ, যা ইউরিনারি ট্র্যাক্টে ব্যাকটেরিয়ার সংযোগ কমাতে সাহায্য করে।

চিকিৎসা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

মূত্রনালীর সংক্রমণ বা UTI বিশ্বের সর্বাধিক সাধারণ ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ। চিকিৎসকরা সতর্ক করেছেন, সংক্রমণ সঠিকভাবে শনাক্ত না করলে এবং অ্যান্টিবায়োটিক ভুলভাবে ব্যবহার করলে ড্রাগ-প্রতিরোধী জীবাণুর ঝুঁকি বাড়তে পারে।

UTI চিকিৎসা শুরুতে সংক্রমণের ধরন নির্ধারণ করা হয়। ধরনগুলো হলো:

সাধারণ সিস্টাইটিস (acute uncomplicated cystitis)

কিডনির সংক্রমণ (pyelonephritis)

জটিল cystitis ও pyelonephritis

ক্যাথেটার-সম্পর্কিত সংক্রমণ (CA-UTI)

উপসর্গবিহীন জীবাণু উপস্থিতি (asymptomatic bacteriuria)

পুরুষদের প্রোস্টেট সংক্রমণ (prostatitis)

Infectious Diseases Society of America (IDSA)–এর সুপারিশ অনুযায়ী, আনকমপ্লিকেটেড UTI-এর জন্য অ্যান্টিবায়োটিক নির্বাচন স্থানীয় জীবাণু সংবেদনশীলতার উপর নির্ভর করে, বিশেষ করে E. coli সংক্রমণের ক্ষেত্রে।

যেখানে স্থানীয় প্রতিরোধের হার ২০%-এর কম, সেখানে Trimethoprim/Sulfamethoxazole(ট্রাই-মেথো-প্রিম / সলফা-মেথ-অক্সাজল) ব্যবহার করা যেতে পারে।

প্রতিরোধের হার ১০%-এর কম হলে Fluoroquinolones (ফ্লুরোকুইনোলোনস) বিবেচনা করা হয়।

জটিল সংক্রমণে থেরাপি শুরুতে স্থানীয় সংবেদনশীলতার উপর ভিত্তি করে প্রাথমিক অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়, এবং পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে চূড়ান্ত থেরাপি নির্ধারণ করা উচিত।

ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনো অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করা উচিত নয়। ভুল ওষুধ খেলে উপকারের পরিবর্তে ক্ষতির আশঙ্কাই বেশি থাকে। তাই ইউটিআই-এর লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

Advertisements