নিউ মার্কেট এলাকায় চাঁদাবাজি ও দোকান দখলের মাধ্যমে হাজারো ব্যবসায়ীকে জিম্মি করে রেখেছেন এক রাজনৈতিক দম্পতি—আওয়ামী লীগ নেত্রী জান্নাত জাহান চামেলি ওরফে লুনা হোসেন এবং তার স্বামী নিউ মার্কেট থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি মকবুল হোসেন। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীদের মারধর, জাল দলিল তৈরি করে দোকান দখল এবং চাঁদা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।
২০১৪ সাল থেকে আওয়ামী লীগের শাসনামলে লুনা নিউ মার্কেট এবং আশপাশের এলাকায় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ব্যাপক চাঁদাবাজি চালিয়েছেন। লুনা ঢাকা দক্ষিণ সিটির সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস এবং দলীয় নেতা আমির হোসেন আমুর ঘনিষ্ঠ পরিচয়ে নিজেকে পরিচয় দিয়ে অন্তত ৯টি দোকান দখলে রেখেছেন বলে অভিযোগ। তিনি ২০১৪ সালে জাল চুক্তিনামার মাধ্যমে ২৬১ ও ২৬২ নম্বর দোকান দখল করে নেন, যদিও সেসব দোকান ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য আদালত ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে নির্দেশনা ছিল। তার কথায় অমান্য করলেই ব্যবসায়ীদের ওপর চালানো হতো মারধর।
বিপ্লব কুমার দাস নামে এক ব্যবসায়ী জানান, ২০১৪ সালে লুনা তার দোকান দখল করে নেন এবং তাকে মারধর করেন। সিআইডির তদন্তেও তার অভিযোগের সত্যতা মেলে। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেও দোকান ফিরিয়ে দিতে চিঠি দেওয়া হয়, কিন্তু বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর একই ধারা বজায় রেখে চাঁদাবাজির দায়িত্ব নেন লুনার স্বামী বিএনপি নেতা মকবুল হোসেন। অভিযোগ রয়েছে, মকবুল বর্তমানে শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের নাম ব্যবহার করে ভয় দেখিয়ে চাঁদা আদায় করছেন। যদিও ইমন এ বিষয়ে নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছেন এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
ডলফিন বুক হাউসের মালিক রাফি জানান, আওয়ামী লীগ নেতা বিপ্লব সরকার তার কাছ থেকে ঋণ নিয়ে ফেরত দেননি। এখন টাকা চাইলে মকবুল হুমকি দিয়ে বলেন, “৫০ হাজার নাও, না নিলে যাও।” ব্যবসায়ীরা সেনাবাহিনী ও পুলিশের কাছে অভিযোগ দিলেও কোনো ফল আসেনি।
নিউ মার্কেটের ফুটপাত ও মূল দোকান মিলিয়ে প্রতিদিন অন্তত ৬০ লাখ টাকা চাঁদা তোলা হচ্ছে। ফুটপাতে ৫০০ দোকান থেকে বিদ্যুৎ বিলের নামে প্রতি দোকান থেকে আদায় করা হয় মাসে ২,৫০০ টাকা। এছাড়া পার্কিং ফি, দোকান ভাড়া ও অগ্রিম বাবদ কয়েক কোটি টাকা আদায়ের অভিযোগ আছে। অথচ এসব টাকা সিটি করপোরেশনের হিসাবে জমা হচ্ছে না।
মকবুলের চাঁদাবাজি বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে আছেন: জাহাঙ্গীর মিঠু, আলমগীর, জসিম, মাসুদ, মন্টি রহমান, ইউসুফ বাবুর্চি, সিটন, রাজু, সোহাগ, স্বপন, চায়না সুমন, এনাম খান, কালে খাঁ, পিন্টু, কেএম চঞ্চল, সুজন, সোহেল রানা, সুনিয়াদ আহমেদ সুমন প্রমুখ।
নিউ মার্কেট দোকান মালিক সমিতির সভাপতি লিপিকা দাসগুপ্তা ২৩ এপ্রিল বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও সিটি করপোরেশন বরাবর চিঠি দিয়ে মকবুলের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান। এছাড়াও সিটি করপোরেশনকে জানানো হয় যে, মকবুল ২৬২ ও ২৬৩ নম্বর দোকান দখল করে নিয়েছেন। কিন্তু এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
মকবুল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমি এসব জানি না। কেউ চাঁদাবাজি করলে ব্যবস্থা নিন।” বিএনপি নেতা হলেও আওয়ামী লীগ নেতাদের পুনর্বাসনের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে বলেন, “আমি সবাইকে নিয়ে চলি।”
সানজিদুল ইসলাম ইমন বলেন, “মকবুল আমার নামে চাঁদা তুলছে, কিন্তু আমি জড়িত নই। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী যেন তাকে আইনের আওতায় আনে।”
নিউ মার্কেট এলাকার ব্যবসায়ীরা রাজনৈতিক দম্পতির দখল ও চাঁদাবাজিতে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন। একের পর এক অভিযোগ করেও মিলছে না প্রতিকার। প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলগুলোর হস্তক্ষেপ না হলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
সূত্রঃ আমার দেশ





































