আগস্ট, আওয়ামী শোকের মাস—এই আবেগঘন সময়কে ঘিরে দেশজুড়ে অস্থিরতা তৈরির ভয়াবহ ষড়যন্ত্র করছে ফ্যাসিবাদী চক্র। অন্তর্বর্তী সরকারকে হটাতে এবং চলমান রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ব্যাহত করতে তৈরি হচ্ছে সুনির্দিষ্ট নাশকতামূলক ছক। সম্প্রতি একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার গোপন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনের তথ্য মতে, ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় চার শতাধিক আওয়ামী ক্যাডারকে কর্মশালার নামে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। নাশকতা-প্রবণ এলাকায় যেমন গোপালগঞ্জে তৈরি করা হয়েছে প্রশিক্ষণ ঘাঁটি। এর পাশাপাশি ভারতেও চলছে ক্যাডারদের প্রস্তুতি। ভারতের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোয় জড়ো হচ্ছেন পলাতক আওয়ামী নেতাকর্মীরা। আয়ত্ত করছেন ‘হিট অ্যান্ড রান’ কৌশলসহ নানা ধরনের আধুনিক নাশকতার পদ্ধতি।
গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, পুরো পরিকল্পনার মূল কেন্দ্র ভারত। সেখানেই অবস্থান করছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় একাধিক সাবেক সামরিক কর্মকর্তা, পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং দলীয় নেতারা সমন্বয় করছেন এই অস্থিরতা তৈরির প্রচেষ্টা। দিল্লিতে অবস্থানরত লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মুজিবুর রহমান ও অতিরিক্ত আইজিপি মনিরুল ইসলাম পুরো প্রক্রিয়ার কারিগরি ও কৌশলগত তত্ত্বাবধানে রয়েছেন।
মনিরুল ইসলাম ‘এসবি’র সাবেক প্রধান হিসেবে পরিচিত, বর্তমানে তিনি দিল্লিতে একটি কার্যালয় থেকে সরাসরি কাজ করছেন। তিনি ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর সঙ্গে যোগাযোগ করে কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সক্রিয়। এসব অপারেশনে অর্থায়ন চলছে হুন্ডির মাধ্যমে। সুইজারল্যান্ডে অবস্থানরত সামিট গ্রুপের মালিক আজিজ খানকে বিদেশে ফান্ড ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
আগামী ৫ আগস্ট ‘গণঅভ্যুত্থান’-এর এক বছর পূর্তি। এই তারিখকে ঘিরেই নাশকতার প্রধান পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে বলে জানিয়েছে গোয়েন্দা সূত্র। শেখ হাসিনা এ লক্ষ্যে দেশজুড়ে দলে দলে প্রশিক্ষিত, পরীক্ষিত এবং দলভক্ত কর্মীদের চিহ্নিত করেছেন—যারা প্রয়োজনে জীবন দিতেও প্রস্তুত।
ঢাকাসহ প্রতিটি জেলা ও সিটি করপোরেশনের জন্য একজন করে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা নির্ধারণ করা হয়েছে। রাজধানীতে নাশকতার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে, যিনি বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। জানা গেছে, তিনিও ইতোমধ্যে একটি বাহিনী গঠন করে তাদের দেশে ও বিদেশে প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেছেন।
পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আওয়ামী লীগ এমন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চায়, যাতে মনে হবে বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে এসব সংঘর্ষ সংগঠিত হবে নিজেদের মধ্যে, যাতে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে ও পুলিশ বাহিনীর মনোবল ভেঙে পড়ে। সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের এক ফাঁস হওয়া অডিওবার্তায় এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, যেখানে তিনি বলেছেন, আওয়ামী লীগ গত ১৬ বছরে নিজেদের অনুগত পুলিশ কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছে—যারা সময়মতো তাদের হয়ে বন্দুকের নল ঘুরিয়ে দেবে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুসারে, নিরাপত্তা বাহিনীর নজর এড়াতে ক্যাডারদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে প্রচলিত মোবাইল বা সোশ্যাল মিডিয়ার বদলে নির্দিষ্ট বিকল্প অ্যাপ ব্যবহার করতে। পাশাপাশি গুজব ছড়ানো এবং জনমত প্রভাবিত করার জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ডিজিটাল দল কাজ করছে।
সম্প্রতি রাজধানীর মাইলস্টোন স্কুলের ট্র্যাজেডি ও সচিবালয়ে হামলা—দুটিকেই এই বৃহৎ নাশকতার ছক হিসেবে বিবেচনা করছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। শাহবাগ দখলের পরিকল্পনার তথ্যও উঠে এসেছে গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে। গোপালগঞ্জ ছাত্রলীগের সংগঠক খোরশেদ আলম ও শাকিলসহ যাঁরা এই হামলায় যুক্ত ছিলেন, তাঁরা সবাই আওয়ামী পরিবারের সদস্য।
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার সাইফুল ইসলাম শানতু বলেন, “দেশবিরোধী যেকোনো ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রস্তুত। তাদের অপতৎপরতা কঠোরভাবে দমন করা হবে।”
ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক জানান, “গোপালগঞ্জসহ দেশের যেকোনো জায়গায় অপরাধীরা থাকলে, আইন অনুযায়ী তাদের গ্রেপ্তার করা হবে।”
ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার শেখ সাজ্জাত আলী বলেন, “সচিবালয় হামলা ও দিয়াবাড়ী বিক্ষোভের পেছনে যারা মদদ দিয়েছে, তারা কেউই রেহাই পাবে না।”




































