শাহবাগ নয়
Advertisements

এক.
এখানে গত ১৫ বছর ধরে তারেক রহমানের চরিত্রহননের জন্য একটি বয়ান তৈরি করা হয়েছে। প্রথম আলো, ডেইলি স্টারসহ আরও কিছু গণমাধ্যম এই কাজ করেছে। কেউ যেন তার সমালোচনা না করে, চোখে চোখ রেখে কথা না বলে—এমন কথা আমরা বলছি না। অবশ্যই সমালোচনা হতে পারে। আমরা কোনো নেতা-ভক্তি বা পূজা সংস্কৃতির পক্ষে না। কিন্তু তাই বলে পরিকল্পিত চরিত্রহনন মেনে নেওয়া যায় না।

আপনারা রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার নামে বিদেশি প্রপাগান্ডার ভাষা ধার করে তাকে গালি দিয়েছেন, বিকৃত ও বিভৎস ঘটনার মিথ্যা বয়ান তৈরি করে তাকে আক্রমণ করেছেন। এই অন্যায় ভাষার প্রতিবাদ করায় আমাদেরও অনলাইনে চরিত্রহননের শিকার হতে হয়েছে। গালাগালি করা হয়েছে।

দুই.
আপনারা ‘শাহবাগ’ আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলাদেশে আওয়ামী ‘জাহেলিয়াত’কে শক্তিশালী হতে দেখেছেন। ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের জনযুদ্ধকে কেবল “চেতনার যুদ্ধ” বানিয়ে দেশকে বিভক্ত করেছেন। ‘জুডিশিয়াল কিলিং’-এর মাধ্যমে সম্মানিত আলেম ও দেশপ্রেমিক নেতাদের হত্যা করেছেন শেখ হাসিনা।

বেগম খালেদা জিয়া ‘শাহবাগ’কে স্পষ্টভাবে ধর্মবিরোধী বলেছিলেন। বলেছিলেন—এটা বন্ধ না হলে সারা দেশে পাল্টা জনতার মঞ্চ গড়ে তোলা হবে। কথাটি বাস্তবে পরিণত হয়েছিল। হেফাজতের আলেমদের প্রতি বিএনপির তখন সম্পূর্ণ সমর্থন ছিল। শাপলা চত্বরে সেই জন-প্রতিরোধ ছিল বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক উপনিবেশ হবার রাস্তায় এক মোক্ষম বাধা। (পরে যদিও ‘কওমী জননী’ বলা হয়েছে, সেটা আলাদা প্রসঙ্গ।)

‘শাহবাগ’ ছিল ইসলাম-বিদ্বেষী এক কৃত্রিম জন-জাগরণ। এটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের আঁতুড়ঘর। রাজনৈতিক চরিত্র যাচাইয়ের এক কষ্টিপাথর—শাহবাগ।

তাহলে আজ জামায়াতকে দুর্বল করার জন্য আবার কেন সেই শাহবাগীয় বয়ান ধার করা হচ্ছে? রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ৫ জুলাইয়ের পরে কেন প্রতিহিংসায় পরিণত হলো? ভিন্নতার মধ্যে ঐক্য ছাড়া গণতন্ত্র চলবে কীভাবে?

আপনারা শহীদ জিয়ার কথা বলেন, কিন্তু তাঁর নীতির অনুসরণ করেন না। আপনাদের নিজস্ব কোনো ন্যারেটিভ নেই, তাই কি লীগীয় (আওয়ামী) বয়ানে আপনাদের রাজনীতি করতে হয়?

তিন.
বাংলাদেশে সব ধরনের ন্যারেটিভ পলিটিক্স ব্যর্থ হয়েছে। আমরা এখন ‘পোস্ট-ন্যারেটিভ’ যুগে আছি। বিএনপি কোনো কৃত্রিম গল্প বা প্রোপাগান্ডা বানিয়ে রাজনীতি করে না। বিএনপি কোনো ঘটনা নিয়ে ক্রেডিট-বাজি করে না—না ৭১, না ২৪। বিএনপি মূল্যবোধের রাজনীতি করে। রাষ্ট্রবাদী রাজনীতি করে।

দল আলাদা, কিন্তু রাষ্ট্র সবার। বিএনপি সকল নাগরিকের অধিকার দেখভাল করবে—এটাই জনগণের প্রত্যাশা।

তাই বিএনপিকে ফ্যাসিস্টদের মতো ‘ন্যারেটিভ’ তৈরি করতে হয় না। সততা, নীতি—এগুলোই দলের শক্তি। রাষ্ট্র হবে মূল্যবোধ-ভিত্তিক। সমাজে মতাদর্শ থাকবে, রাষ্ট্র চলবে মূল্যবোধসম্পন্ন ব্যক্তিদের দিয়ে। ন্যারেশন-বাজি বিএনপির প্রয়োজন নেই।

কিন্তু এখন কিছু ধান্দাবাজ, কবি-সাহিত্যিক, যারা আসলে শাহবাগঘরানার লোক, তারা বিএনপিকে বিভ্রান্ত করছে। তারা ‘ন্যারেশন’ দেখিয়ে বিএনপিকে জনবিচ্ছিন্ন করে তুলছে। অথচ আমাদের জাতীয় বয়ান (বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ)—যেটাকে শহীদ জিয়া সার্বিক জাতীয়তাবাদ বলেছেন—এই বয়ানেই রয়েছে আমাদের সভ্যতা, পরিচয়, সব কমিউনিটির জন্য জায়গা।

বিএনপির এই সার্বজনীন বয়ানের বাইরে আলাদা কোনো ‘ন্যারেটিভ পার্টি’ তৈরি করার দরকার নেই। বাটপার, চোর-গুন্ডারাই এখন দলের আসল শত্রু। বিএনপি টিকে আছে মানুষের জন্য, নেতা-কর্মীদের আত্মত্যাগের কারণে।

চার.
আপনারা সবাই পরাজিতদের রাজনীতি করছেন। শত্রুদের লাইনে গিয়ে তাঁদেরই শক্তিশালী করছেন। এটাই সবচেয়ে দুঃখজনক। ৫ তারিখের পর কেউ আর রাজনীতিতে ফিরছেন না। একটা রক্তাক্ত গণ-অভ্যুত্থান হয়ে গেছে। তাতে আমাদের তরুণেরা জীবন দিয়েছে। অথচ আপনারা কে কত বড় স্টুপিড হতে পারেন, কে কতটা শত্রুর কাজ সামনে এগিয়ে দিতে পারেন—সে প্রতিযোগিতা শুরু করে দিয়েছেন!

আমাদের রক্ত, শ্রম, কষ্ট আপনারা বোঝেন না। সামনে নতুন অভ্যুত্থান ছাড়া আর কোনো পথ আমাদের সামনে খোলা রাখছেন না আপনারা। যদি আপনারা বাংলাদেশের স্বার্থকে বড় করে না দেখেন—আমরা আপনাদের ক্ষমা করব না। শহীদরা যদি প্রতিশোধ নেয়, আপনারা ধ্বংস হয়ে যাবেন।

পাঁচ.
প্রতিটি দল নিজ নিজ শক্তি দেখাচ্ছেন, কিন্তু কাকে দেখাচ্ছেন? চিন্তা করে দেখুন—সবাই যদি একসাথে খুন, জননিরাপত্তা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য রাজপথে নামতেন, তাহলে দেশ কি এতদিন এমন অবস্থায় থাকতো?

আপনারা সম্মিলিতভাবে একটি গণ-অভ্যুত্থান করলেন না। সবাই আলাদা আলাদা অনুষ্ঠানে ব্যস্ত। একটা ‘জাতীয়’ অনুষ্ঠান পর্যন্ত হলো না। সবাই মিলে একটি কর্মসূচি দেওয়া কি যেত না?

আমরা তো বারবার বলেছি, অনুরোধ করেছি—কিন্তু আপনারা শোনেননি। এখনো সময় আছে—জাতীয়ভাবে চিন্তা করুন। একসাথে অ্যাকশনে নামুন।

প্রথম দিন থেকে বলেছি—আওয়ামী লীগ একটা ‘নফসানিয়াত’। এ থেকে আমাদের সবাইকে, সব দলকে মুক্ত হতে হবে। এরপরেই রাজনীতির বিকাশ শুরু হবে।কিন্তু আপনারা নিজেরাও এখন লীগ হয়ে উঠেছেন, প্রবল প্রতাপে।

Advertisements