৪৩ কিমি চার লেন করতে পরামর্শককে ১১০ কোটি টাকা
Advertisements

সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) প্রকৌশলী থাকার পরও ৪২.৯৮ কিলোমিটার মহাসড়ক চারলেনে উন্নীত করার জন্য পরামর্শক খাতে ব্যয় ১০৯ কোটি ৯৩ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। প্রতি কিলোমিটার সড়ক উন্নয়নে পরামর্শক ব্যয় হবে দুই কোটি ৫৬ লাখ টাকা। সিলেট-চারখাই-শেওলা মহাসড়ক চারলেনে উন্নয়ন প্রকল্পে বিভিন্ন ধরনের ১১টি যানবাহন কেনার পরও রাজস্ব খাত থেকে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা খরচ করে গাড়িভাড়া করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বৈশি^ক মন্দা পরিস্থিতির পরও দুই কোটি ৫৬ লাখ টাকা খরচ করে কর্মকর্তারা বিদেশে প্রশিক্ষণ নিতে যাবেন। এই খরচের ব্যাপারে আপত্তি জানিয়েছে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগ।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের দেয়া প্রকল্প প্রস্তাবনা থেকে জানা গেছে, সিলেট-চারখাই-শেওলা মহাসড়কটি বিসিআইএস করিডোর এবং সাসেক রোড করিডোর-৫ এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চীনের ইউনান প্রদেশ, বাংলাদেশ, মিয়ানমার এবং ভারতের উত্তর-পূর্ব দিকের সেভেন সিস্টারের মধ্যে এই বিসিআইএম করিডোর সংযোগ স্থাপন করবে। সাসেক রোড করিডোর-৫ এর মধ্য ও উত্তর-পূর্ব বাংলাদেশকে ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোর সাথে সংযুক্ত করবে। এই জন্যই উন্নয়ন প্রকল্পটি হাতে নেয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের ফলে মহাসড়ক প্রকল্পটি আঞ্চলিক সংযোগ করিডোর বিবিআইএন কার্গো রুটের অন্তর্ভুক্ত একটি উপপ্রকল্প। প্রস্তাবিত ৪২.৯৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই মহাসড়কটি সিলেট শহরের কীন ব্রিজের দক্ষিণ প্রান্ত থেকে এক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কদমতলী থেকে শুরু হয়ে ভারতের সীমান্ত সংলগ্ন শেওলা স্থলবন্দরে শেষ হয়েছে। চারলেনে উন্নীতকরণের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে তিন হাজার ৮৭২ কোটি ৩২ লাখ ৩৮ হাজার টাকা, যার মধ্যে বিশ^ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে দুই হাজার ৬০৪ কোটি ছয় লাখ ৪৬ হাজার টাকা। এই প্রকল্পটির মেয়াদ ধরা হয়েছে পাঁচ বছর, যা অনুমোদন পেলে আগামী ২০২৭ সালের জুনে শেষ হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পাচ্ছে সওজ।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) বলছে, এই প্রকল্পে অর্থায়নের ব্যাপারে গত ২০২২ সালের ২৯ মে বিশ^ব্যাংকের সাথে সমঝোতা হয়। প্রকল্পে ৭৫ কোটি ৩০ লাখ ডলার প্রদানের আশ^াস দিয়েছে বিশ^ব্যাংক। তবে প্রকল্পটি অনুমোদনের পর তারা ঋণচুক্তি চূড়ান্ত করবে।

পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রায় ৪২ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়নের জন্য ১০৯ কোটি ৯৩ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে শুধু পরামর্শক খাতে। এ ছাড়া সুপারভিশন খাতে আরো প্রায় এক শ’ কোটি টাকা। পরামর্শক খাতে খরচে বিশ^ব্যাংকের ঋণ থেকে যাবে ৭৭ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। আর বাকি ৩২ কোটি টাকা যাবে সরকারি অর্থায়ন থেকে। এই খরচ নিয়ে ভৌত অবকাঠামো বিভাগের আপত্তি আছে। মাত্র ৪৩ কিলোমিটার রাস্তার জন্য এই বিরাট অর্থের পরামর্শক কেন?

প্রকল্পের জন্য ১৯৪.১৩ একর জমি অধিগ্রহণ করতে হবে, যাতে খরচ হবে ৪৯৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা। প্রতি একরের দাম ২ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। আর পুনর্বাসন খাতে খরচ ২৫ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। সাড়ে ৪৪ লাখ ঘনমিটার মাটির কাজের প্রস্তাব করা হলেও সড়ক বাঁধের উচ্চতা কত হবে তা উল্লেখ করা হয়নি। আউট সোর্সিং খাতে জনবল সংস্থান প্রস্তাবের পক্ষে অর্থ বিভাগের জনবল কমিটির সভার কোনো সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

প্রকল্পের আওতায় ছয়টি জিপ কিনতে খরচ ছয় কোটি ৩০ লাখ টাকা। চারটি পিকআপ কিনতে দুই কোটি ৩২ লাখ টাকা। ৪৫ লাখ টাকায় একটি মাইক্রোবাস। ১২ লাখ টাকায় ৬টি মোটরসাইকেল কেনা হবে। ভৌত অবকাঠামো বিভাগ বলছে জনবল কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ড্রাইভারের সংখ্যা অনুযায়ী যানবাহনের সংখ্যা ও ব্যয় নির্ধারণ করতে হবে। প্রকল্পে বৈদেশিক প্রশিক্ষণের জন্য জিওবি খাতে দুই কোটি ৫৬ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশিক্ষণ খাতে ৩০ লাখ টাকা। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই খাতে ব্যয় কমানোর জন্য বলা হয়েছে।

প্রকল্পে জেনারেল সাইট ফ্যাসিলিটিজের আওতায় কনস্ট্রাকশন সাইট ম্যানেজমেন্ট সুপারভিশন ও কন্ট্রোল খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। এ ছাড়া সিডস অ্যান্ড প্লান্টস ইনক্লুডিং প্লান্টেশন খাতের জন্য দেড় কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। এসব খরচ যৌক্তিক পর্যায়ে কমিয়ে আনতে হবে।

সওজ বলছে, বিশ^ব্যাংকের সেফগার্ড পলিসি অনুযায়ী পরামর্শক কর্তৃক মৌজার লেনদেনকৃত বাজার দর, রেকর্ডকৃত রেট, বর্তমান বাজার দর, প্রত্যাশিত বাজার দর সংগ্রহ করে প্রকারভেদে বিভিন্ন ধরনের ভূমির গড় রেটের ভিত্তিতে এনজিও কর্তৃক ভূমির ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক থেকে প্রাক্কলন সংগ্রহ করা হয়নি। প্রকল্পের আওতায় সম্পূর্ণ সড়কটি সার্ভিস লেনসহ ছয়লেনে উন্নীত করা না হলেও ভবিষ্যতের কথা বিবেচনায় বর্তমানে ৬ লেন হিসেবে ভূমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব করা হয়েছে। সড়ক বাঁধের ব্যাপারে বলা হয়, বিগত ৫০ বছরে পানির উচ্চতা বিবেচনায় নিয়ে এই উচ্চতা পাঁচ ফুট ধরে ডিজাইন করা হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগ বলছে, প্রকল্পের বিভিন্ন খাতে ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে কমিয়ে আনার জন্য পিইসি সভা থেকে সুপারিশ করা হয়েছে। কিছু অবজারভেশন দিয়ে ডিপিপিকে পুনর্গঠন করতে বলা হয়েছে। গাড়ি কেনার পরও চার কোটি ৮১ লাখ টাকা খরচ করে রাজস্ব খাতে গাড়ি ভাড়ার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয় এ কথাও বলা হয়েছে।

Advertisements