চাল আমদানি বন্ধ হচ্ছে—এমন গুজব ছড়িয়ে আবারও বাজার অস্থির করার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মাঠপর্যায়ের ব্যবসায়ীদের দাবি, করপোরেট কোম্পানিগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে এই গুজব ছড়িয়ে দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা করছে। সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য জানানো হয়েছে, চাল আমদানি স্বাভাবিকভাবে চলছে এবং তা বন্ধের কোনো সিদ্ধান্ত নেই।
চালের পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ব্যাপক আমদানির কারণে বাজারে সরবরাহ বেড়েছে। এতে দাম কমতে শুরু করেছে এবং বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরছে। কিন্তু করপোরেট হাউসগুলোর স্বার্থের পরিপন্থী হওয়ায় তারা নানা কৌশলে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে।
রাজধানীর চাঁদপুর রাইস এজেন্সির ব্যবসায়ী বাচ্চু মিয়া বলেন, করপোরেট কোম্পানিগুলোর সদিচ্ছা থাকলে মিনিকেটসহ অন্যান্য চালের দাম আরও কমতে পারত। কিন্তু তারা গুজব ছড়িয়ে বস্তাপ্রতি ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।
খাদ্য অধিদপ্তরের সংগ্রহ বিভাগের পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, চাল আমদানি বন্ধের কোনো পরিকল্পনা বা আলোচনা হয়নি। বরং উচ্চপর্যায়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে, প্রয়োজন অনুযায়ী আমদানি অব্যাহত থাকবে। সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ফলে বাজারে সরকারি মজুতের চাল আসছে, এতে সিন্ডিকেটের প্রভাব অনেকটাই কমে গেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত বেসরকারি পর্যায়ে ৩ লাখ ৮৪ হাজার টন এবং সরকারি পর্যায়ে ৫০ হাজার ৪৩০ টন চাল আমদানি হয়েছে। এ বছর মোট ৯ লাখ টন চাল আমদানির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ১১ লাখ টন গমও আমদানি করেছে সরকার।
সম্প্রতি মিয়ানমার ও দুবাই থেকে আরও এক লাখ টন চাল আমদানির অনুমোদন দিয়েছে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটি। এর মধ্যে মিয়ানমার থেকে ৫০ হাজার টন আতপ চাল এবং দুবাই থেকে ৫০ হাজার টন নন-বাসমতি সিদ্ধ চাল আমদানি হবে। আন্তর্জাতিক দরপত্র ও জিটুজি ভিত্তিতে এ চাল আমদানিতে ব্যয় হবে ৪৪৬ কোটি ২৩ লাখ টাকা।
বাবুবাজার, নয়াবাজার ও কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বাজারে সরবরাহ বেড়েছে এবং দাম কমছে। ইরি ও স্বর্ণা জাতের মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৫২ টাকায়, যা এক সপ্তাহ আগেও ছিল ৫৫ থেকে ৬০ টাকা। আটাশ ও পাইজাম জাতের মাঝারি চাল বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৬৫ টাকায়, আগে ছিল ৭০ থেকে ৭৫ টাকা। সরু নাজিরশাইল জাতের চালের দামও কমেছে সাত টাকা পর্যন্ত।
কারওয়ান বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী হাজী আবু ওসমান বলেন, কয়েক মাস পর চালের দাম কমতে শুরু করেছে। সপ্তাহখানেক ধরে পাঁচ থেকে ছয় টাকা পর্যন্ত দাম কমেছে। মিল মালিকদের সিন্ডিকেট করার সুযোগ এখন অনেকটাই কমে গেছে।
চলতি বোরো মৌসুমে সরকার কৃষকদের কাছ থেকে ৩৬ টাকা কেজি দরে তিন লাখ ৭৬ হাজার টন ধান কিনেছে। এছাড়া সিদ্ধ চাল ৪৯ টাকা কেজি দরে ১৪ হাজার টন এবং আতপ চাল ৪৮ টাকা কেজি দরে ৫১ হাজার টন সংগ্রহ করা হয়েছে। বর্তমানে সরকারি গুদামে চালের মজুত ১৪ লাখ এক হাজার ৪৪৬ টন এবং ধান রয়েছে দুই হাজার ৫৬৬ টন।
সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) তথ্য বলছে, চালের দাম কমায় খাদ্য মূল্যস্ফীতিতেও কিছুটা স্বস্তি এসেছে। আগস্টে যেখানে মূল্যস্ফীতিতে চালের অবদান ছিল ৪৮ দশমিক ৩৭ শতাংশ, সেপ্টেম্বরে তা নেমে এসেছে ৪৫ শতাংশে। সেপ্টেম্বরে গড়ে চালের দাম কমেছে প্রায় এক শতাংশ।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম কমছে, সরকারও নিয়মিত আমদানি করছে। ঠিক এই সময় করপোরেট হাউসগুলো গুজব ছড়িয়ে ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে। এসব সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, অভ্যন্তরীণ চাল ক্রয়ের জন্য ১১ হাজার ২০০ কোটি টাকা এবং আমদানির জন্য ৭ হাজার ৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী এ বরাদ্দ বাড়ানো বা কমানো হতে পারে।
সরকার ও বাজারসংশ্লিষ্টদের অভিন্ন মত, চাল আমদানির ধারা অব্যাহত থাকলে বাজারে সরবরাহ আরও বাড়বে এবং দাম স্থিতিশীল থাকবে। গুজবের মাধ্যমে বাজার অস্থিতিশীল করার যে প্রচেষ্টা চলছে, তা টেকসই হবে না বলেও মনে করছেন তারা।





































