শিক্ষক রাজনীতি
Advertisements

দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক প্রকাশ্যে রাজনীতি ও দলীয় কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন। আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনি প্রচারণাতেও অংশ নিচ্ছেন তাঁরা। সরকারি চাকরিজীবীদের রাজনৈতিক কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও অনেক শিক্ষক এই বিধি উপেক্ষা করছেন।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ কার্যত কঠিন হয়ে পড়েছে। কুড়িগ্রাম, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর ও রাজবাড়ীসহ বিভিন্ন জেলার তথ্য বিশ্লেষণে প্রকাশিত হয়েছে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক রাজনীতি ও নির্বাচনি কর্মকাণ্ডে সক্রিয়।

কুড়িগ্রামের রাজারহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মনিবুল হক বসুনিয়াকে নিয়মিত রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেখা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বিষয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) রাজারহাট উপজেলা প্রতিনিধি কমিটিতে ১ নম্বর সদস্য হিসেবে তার নাম রয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, “এনসিপিতে পদ থাকলেও গত চার মাস আমি সক্রিয় নই। বর্তমানে সাসপেন্ড অবস্থায় আছি।”

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ছাটকালুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল গফুরও নির্বাচনি প্রচারে অংশ নিয়ে ভোট চাইতে দেখা গেছে। একই জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার শিক্ষক হাফিজুর রহমান জুয়েল এনসিপির উপজেলা আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কুড়িগ্রামের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, “শুধু আমাদের জেলাতেই ডজনখানেক শিক্ষক নিয়মিত রাজনীতিতে জড়িত। ব্যবস্থা নিতে গেলে উল্টো আমাদেরই জবাবদিহি করতে হয়।”

গোপালগঞ্জ ও ফরিদপুরের সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তারা জানান, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত অনেক শিক্ষক পাঠদান বাদ দিয়ে সভা-সমাবেশে ব্যস্ত থাকেন। স্থানীয় প্রভাবশালী শিক্ষক, রাজনৈতিক নেতা ও শিক্ষক সংগঠনগুলোর চাপের কারণে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ভীত থাকেন।

শিক্ষক সংগঠনগুলোর দাবিতে কর্মবিরতি, পরীক্ষা বর্জন এবং বিদ্যালয়ে তালা দেওয়ার ঘটনা প্রাথমিক শিক্ষা খাতকে ব্যাহত করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকার ও প্রশাসনবিরোধী কটূক্তিমূলক মন্তব্যও শৃঙ্খলা লঙ্ঘনের প্রমাণ হিসেবে ধরা হচ্ছে।

রাজনীতি ছাড়াও দুর্নীতি ও অপকর্মের ঘটনায় শিক্ষকরা জড়িত হচ্ছেন। চলতি বছরের ৮ জানুয়ারি ঘুষ লেনদেনের অভিযোগে যশোরের প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আশরাফুল আলম আটক হওয়ার ঘটনায় শিক্ষকরা দুদক কার্যালয় ঘেরাও করে বিক্ষোভ দেখান। রাজবাড়ীর অলংকারপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল হালিমের বিরুদ্ধে ছাত্রীদের যৌন হয়রানি ও গুরুতর অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।

অভিভাবকরা শিক্ষকদের এমন আচরণে গভীর হতাশা প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, যারা নিজেরাই দায়িত্ব ও নৈতিকতা মানছেন না, তারা শিক্ষার্থীদের কী শেখাবেন। বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদানের অভাবে অনেক শিক্ষার্থী কোচিংয়ে নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মোহাম্মদ শামসুজ্জামান জানান, পরীক্ষার সময় আন্দোলনের নামে অসহযোগিতা করা ৪৩ জন শিক্ষকের বিভিন্ন স্থানে বদলি করা হয়েছে এবং শতাধিক শিক্ষককে শোকজ করা হয়েছে। “শোকজের পর ব্যক্তিগত শুনানি শেষে অপরাধ অনুযায়ী শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোনো দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ নেই। যেখানে খবর পাচ্ছি, সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিচ্ছি। ফেসবুক মনিটরিং আরও সক্রিয় করা হবে।”

Advertisements