সাগর-রুনি হত্যা মামলা
Advertisements

সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরোয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডের তেরো বছর পেরিয়ে গেলেও প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে ব্যর্থ হয়েছে সব তদন্তকারী সংস্থা। ডিবি ও র‌্যাবের পর এবার পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) নেতৃত্বাধীন টাস্কফোর্সও চূড়ান্ত কূলকিনারা করতে না পারায় দেশের ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত এই মামলাটি ‘অমীমাংসিত’ হিসেবেই নথিভুক্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ এই সময়ে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আদালত থেকে ১২১ বার সময় নেওয়া হয়েছে, যা এই মামলার তদন্তের স্থবিরতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের নিজেদের ফ্ল্যাটে নৃশংসভাবে খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের তৎকালীন বার্তা সম্পাদক সাগর সরোয়ার এবং এটিএন বাংলার সিনিয়র রিপোর্টার মেহেরুন রুনি। এই হত্যাকাণ্ডের পর তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের গ্রেপ্তারের আশ্বাস দিলেও তা ফাঁকা বুলি হিসেবেই প্রমাণিত হয়েছে। মামলার তদন্ত প্রথমে থানা পুলিশ, পরে ডিবি এবং পরবর্তীতে র‌্যাবের হাতে যায়। কিন্তু কোনো সংস্থাই খুনিদের শনাক্ত করতে বা হত্যার মোটিভ জানতে পারেনি। সর্বশেষ, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আদালতের নির্দেশে গঠিত পিবিআই-এর নেতৃত্বাধীন উচ্চ পর্যায়ের টাস্কফোর্সও এখন কার্যত হাল ছেড়ে দেওয়ার পথে।

তদন্তকারী সংস্থাগুলো নিশ্চিত হয়েছে যে, এই হত্যাকাণ্ড দুজন খুনি ঘটিয়েছে, যারা রান্নাঘরের গ্রিল কেটে ফ্ল্যাটে প্রবেশ করেছিল। ঘটনাস্থল থেকে সাগর, রুনিসহ মোট চারজনের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই-এর সহযোগিতায় সেখানকার ল্যাবে পরীক্ষা করে দুজনের ডিএনএ সাগর-রুনির বলে শনাক্ত হলেও বাকি দুই অজ্ঞাত পুরুষের পরিচয় মেলেনি। ডিএনএ থেকে ছবি তৈরির চেষ্টাও ব্যর্থ হয় ‘অধিক মিশ্রণজনিত কারণে’। হত্যাকাণ্ডের পর হারিয়ে যাওয়া দম্পতির ল্যাপটপ ও দুটি মোবাইল ফোনও এখন পর্যন্ত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি, যা এই মামলার রহস্যের জট খুলতে পারতো বলে ধারণা করা হয়।

তদন্তের দীর্ঘ পরিক্রমায় দুটি তত্ত্ব সামনে এলেও কোনোটিই প্রমাণিত হয়নি। একটি তত্ত্বে বলা হয়, কোনো ক্ষমতাবান চক্র ভাড়াটে খুনি দিয়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে এবং পরে খুনিদের সরিয়ে দিয়েছে। অন্যটি ছিল, চুরির উদ্দেশ্যে বাসায় ঢুকে খুনের ঘটনা। তবে এই সন্দেহে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ১৪৫ জন পেশাদার চোর-ডাকাতকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করেও কোনো সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি।

এই মামলায় র‌্যাবের তৎকালীন কর্মকর্তা এম সুহায়েল, বরখাস্তকৃত মেজর জিয়াউল আহসান, ডিবির মনিরুল ইসলামসহ বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পিবিআই। জিজ্ঞাসাবাদের মুখে র‌্যাবের কমান্ডার সুহায়েল স্বীকার করেন যে, তদন্তে অগ্রগতির কথা তিনি সাংবাদিক সমাজকে বিভ্রান্ত করার জন্যই বলেছিলেন। অন্যদিকে, শুরু থেকেই ঘটনাটিকে ‘চুরির ঘটনা’ বলে চালানোর চেষ্টার অভিযোগ রয়েছে ডিবির তৎকালীন কর্মকর্তা মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে।

হতাশা প্রকাশ করে রুনির ভাই ও মামলার বাদী নওশের আলম রোমান বলেন, “আমরা আশা ছেড়ে দিয়েছি। আমরা মনে করি, এই ঘটনায় তৎকালীন সরকার এবং প্রশিক্ষিত কোনো বাহিনী জড়িত ছিল।” হত্যাকাণ্ডের সময় সাড়ে পাঁচ বছরের শিশু হিসেবে বেঁচে যাওয়া সাগর-রুনির একমাত্র সন্তান মাহির সরওয়ার মেঘ এখন যুবক। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তদন্তের গতি নিয়ে আশাবাদী হলেও এখন সে হতাশ। মেঘের একটাই আর্তি, তার দাদি যেন এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার দেখে যেতে পারেন।

তদন্তকারী সংস্থাগুলো যখন চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিতে চেয়েছে, তখন রহস্যজনকভাবে তা প্রকাশ করতে দেওয়া হয়নি। র‌্যাবের একটি সূত্র জানায়, তারা ফাইনাল রিপোর্ট দিতে চাইলেও তৎকালীন স্বরাষ্ট্র ও আইনমন্ত্রীর আপত্তিতে তা সম্ভব হয়নি। তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছিলেন, “পৃথিবীতে অনেক মামলার নজির আছে, যা রুজুর পর এখনো Undispossal (অমীমাংসিত) অবস্থায় আছে, এটিও থাক।”

বর্তমানে পিবিআই তাদের তদন্ত প্রায় শেষ করে আনলেও প্রতিবেদন প্রকাশে সাহস পাচ্ছে না, কারণ তা গ্রহণযোগ্য হবে কি না, তা নিয়ে তারা সন্দিহান। সব মিলিয়ে, সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড এখন এমন এক রহস্যের দেয়ালে আটকে গেছে, যা সম্ভবত আর কোনোদিনই ভাঙা সম্ভব হবে না এবং খুনিরা রয়ে যাবে চিরকাল অধরা।

Advertisements