ভারতকে আমেরিকান ছেঁকা
Advertisements

কেবল আমেরিকার আফগানিস্তান দখলের ক্ষেত্রেই নয় “ঘটনার ২০ বছর” কথাটা ভারত-আমেরিকার “বিশেষ সম্পর্কের” ক্ষেত্রেও প্রয়োগ হচ্ছে। সেও বিশেষ সম্পর্কের একটা বড় অংশ জুড়ে দাড়িয়েছিল কোয়াড [QUAD]; যা আমেরিকা, অষ্ট্রেলিয়া, জাপান ও ভারত এই চার দেশীয় এক জোট। আমেরিকা-ভারতের গত ২০ বছরের সেই “বিশেষ সম্পর্ক” এবার হেলে পড়েছে মনে হচ্ছে। তাই আপাতত আমেরিকার উপরে ভারতের ক্ষোভ, অভিযোগ আর অভিমানের প্রকাশ দিয়ে বুঝাচ্ছে। বিশেষ করে গত ২৪ সেপ্টেম্বরের পরের ঘটনাবলীতে। কেন?

আসলে ভারতের খুবই গর্বের ‘কোয়াড’ নিয়ে কথা বলছি। এত দিন কোয়াড এর উদ্দেশ্য নিয়ে কথা বললে মানে হত যেন আপনি দুনিয়ার কথিত ‘বেস্ট ডেমোক্র্যাটিক” রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে কথা বলছেন। আর তাতে আমরা ভাবতাম তারা তারা মিলেই বেষ্ট হয়ে থাকুক আমাদের অসুবিধা নাই। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে আমেরিকা ভারতের মানবাধিকার লঙ্ঘণ নিয়ে প্রশ্ন জানিয়েছে সেটা আমরা অনেকেই জানি। আর নতুন ঘটনা হল, ভারতের এক প্রাক্তন পররাষ্ট্র সচিব উলটা আমেরিকার দিকে আঙুল তুলে বলছে, আমেরিকার গণতন্ত্র নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে […there are serious questions about the strength and performance of democracy in the US, highlighted by what happened in January 2021]

তবে খুব সাবধান! কারণ এটা এতদিনে কেন? কারণ, আমেরিকা কোয়াডকে কেন্দ্র করে বুঝিয়ে দিয়েছে যে ভারত আমেরিকার কাছে (মানে খোদ কোয়াড-ই) এত গুরুত্বের কিছু না। তাই সে ভারতকে ছেড়ে অষ্ট্রেলিয়াকে কাছে টেনে কোয়াডের বদলে নতুন এবং সামরিক এক জোট খুলেছে। আমেরিকার এই “অবজ্ঞা” ও “তুচ্ছজ্ঞান” ভারতের ভিতরে মূল আলোচ্য বিষয়। ভারতের ভিতরের যারা এতদিন আমেরিকান পয়সায় থিঙ্কট্যাংক খুলে আঁতলামি করত আর গল্পে রাজা-উজির মারত তারা এখন ভারতেই কোনঠাসা আর নাইলে উলটা গান ধরেছে। এককথায় এটাকেই বলে প্রেমে ছেঁকা খাওয়া – ভারতকে দেয়া “আমেরিকান ডিচ” (ditch)। তাতেও শেষ না। ওদিকে, এখন খোদ লন্ডন ইকোনমিস্ট ম্যাগাজিনে তার আর্টিকেলের শিরোনাম “কোয়াডের কাজটা কী” [What is the point of the Quad]?

গত ২৪ সেপ্টেম্বর ছিল হোয়াইট হাউজে কোয়াডের চার নেতার এই প্রথম মুখোমুখি কোন মিটিং করতে বসার দিন। আগের লেখায় বলেছিলাম, এটাই প্রথম মুখোমুখি মিটিং; তবে এটাই শেষ মিটিংও হতে পারে। আর এখন ওই মিটিং শেষে যত দিন যাচ্ছে তাতে আমেরিকার উপর ভারতের গোসসা আর চেপে রাখা থাকছে না; বরং নানান ক্ষোভ ও অভিমান ততই সামনে আসছে। তবে সম্পর্কটা আপাতত কেউই ভেঙে দিচ্ছে না। যদিও অকার্যকর ফেলে রাখার ঝোঁকটাই বেশি। কেন?

ছোট্ট জবাব হল, স্বামী সতীন নিয়ে এলে যা হয়! মানে হল, আমেরিকা চীনের বিরুদ্ধে অস্ট্রেলিয়াকে পরমাণু চালিত সাবমেরিনে সজ্জিত করতে ইংল্যান্ডকে সাথে নিয়ে “অকাস” (AUKUS) [ভিন্ন উচ্চারণে অনেকে “আউকাস” বলছে] নামে এক ত্রিদেশীয় নয়া জোট ঘোষণা করেছে; অর্থাৎ মোট চার সদস্যের কোয়াড অথচ এর দুই সদস্য মিলে আবার বাড়তি যুক্তরাজ্যকে সাথে নিয়ে নতুন আরেক জোট গড়ার ঘোষণা করেছে। আর এবার আগেভাগেই ঘোষণা করে দিয়েছে এটা ‘সামরিক জোট’। এতে যেন আমেরিকার এক প্রকাশ্য ইঙ্গিত যে, আমরা সামরিক সম্পর্কে আসতে ভারতের জন্য অনেক অপেক্ষা করেছি, আর না। অথবা এটা যেন বাইডেন বলছেন, “এখন তোমরা ভেবে দেখো, এই সামরিক জোটে যুক্ত হবে কি না, না হলে রাস্তা মাপো! আর এ নিয়ে কার্ড শো করো, তোমাদের মনে কী আছে ঝেড়ে কাশো। সেটি দেখতেই তো ২৪ তারিখে মিটিং ডেকেছি- এখানে মুখোমুখি হও!”

এখানে এই ভাষ্যটা নিঃসন্দেহে অনুমান-কল্পনা করে লেখা। কিন্তু বাস্তবে ঘটনাটা প্রায় এমনই ঘটেছে। নরেন্দ্র মোদীর হোয়াইট হাউজ রওনা হওয়ার দুই দিন আগে ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রীংলা যে প্রেস ব্রিফিং করেন, সেখানেই সুনির্দিষ্ট করে তিনি বলেছিলেন, কোয়াড অথবা মোদির কোয়াড মিটিংয়ে যোগ দিতে হোয়াইট হাউজে যাওয়ার সাথে ত্রিদেশীয় নয়া জোট অকাসের কোনো সম্পর্ক নেই; [No link between AUKUS and Quad, says India]। এটা ছিল ‘দ্য হিন্দু’ এর এনিয়ে ২১ সেপ্টেম্বরে বিস্তারিত এক রিপোর্টের শিরোনাম। লিখেছে, ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বলেছেন, ‘আমরা এই নয়া জোটের কেউ নই। আমাদের চোখে কোয়াডের সাথে এই নয়া জোটের কোনো প্রাসঙ্গিকতা নেই। অথবা কোয়াডের তৎপরতার উপর এর কোনো প্রভাব বা সম্পর্ক নাই।’

“We are not party to this alliance. From our perspective, this is neither relevant to the Quad, nor will it have any impact on its functioning,” – Mr. Shringla told journalists at a briefing on the Prime Minister’s visit.

কিন্তু শ্রীংলার এসব কথাতে মিডিয়ার কৌতুহল মিটেনি। তাই তারা আরো প্রশ্ন করেন তাহলে মোদীর এই হোয়াইট হাউজ সফর কি নয়া জোটের প্রভাবের নিচে গুরুত্ব হারিয়ে চাপা পড়ে যাবে? অন্য এক সাংবাদিক জিজ্ঞাসা করেন, কোয়াড কি এখন থেকে তা হলে ‘নরম-সরম’ ধরনের ইস্যুতে নিজেকে নামিয়ে নেবে? শ্রীংলাকে তাই আবার এ নিয়ে মুখ খুলতেই হয় যদিও তাতে বিপদ আরো বেড়ে যায়, কমেনি।

if the Mr Modi’s meetings and the Quad summit would be impacted or overshadowed by the big U.S.-Australian defence partnership, Mr. Shringla said the two events were not linked and also denied that the new partnership would mean that the Quad would only deal with “softer issues”

তিনি বলেন, “নয়াজোট একটি সামরিক জোট। আর কোয়াড আলাদা লক্ষ্য নিয়ে আলাদা কিছু দেশের গ্রুপ। তবে কোয়াডের চার সদস্য দেশ আবার মালাবার এক্সারসাইজ নামে আরেক সমমনাদের কাজের জোট, যারা প্রায়ই মূলত একসাথে যৌথ নৌমহড়ার আয়োজন করে থাকে। কিন্তু ‘মালাবার নৌমহড়া গ্রুপের’ সাথে কোয়াডের কোনো সম্পর্ক নেই”- শ্রীংলা বলেন।

And in the same sentiment Malabar exercises (maritime exercises involving Australia, India, Japan, U.S.) are those that are done between different nations but has nothing to do with Quad,” Mr. Shringla said.

কিন্তু আমাদের কাছে এটি কৌতুকের যে, এখন ভারত কোনো সামরিক তৎপরতা বা সামরিক জোটের সাথে নেই বলে এখন হাত ধুয়ে ফেলতে চাচ্ছে; অথচ যতবারই ওসব নৌমহড়া হয়েছে মিডিয়া রিপোর্টে সবসময় তা কোয়াডের নামে হচ্ছে বলেই রিপোর্টেড হয়েছে। কিন্তু ভারতসহ কেউ এর বিরুদ্ধে কোনো সংশোধনী বা আপত্তি করেনি। তাই আগের লেখায় বলেছিলাম এটাই ভারতের “মাংস না খাওয়া নিরামিশাসী থাকতেই চান কিন্তু মাংসের ঝোল খাবার লোভ-শখ ষোল আনা!”। আর তাই যেন এবার বাইডেন এবার কোয়াডের মিটিং দিয়েছেন একেবারে হোয়াইট হাউজে যেন ভারত প্রত্যক্ষভাবে আমেরিকার সাথে সামরিক জোট করতে রাজি কিনা তা এবারই খোলাখুলি জানাতে বাধ্য হয়। যেটা এবার ভারত জানাতে বাধ্য হয়েছে যে সে নাই। অর্থাৎ আর আমেরিকার সাথে খাতিরের ভাব, ভান ও ভনিতার দিন নাই, শেষ। তাই, হোয়াইট হাউস এই কোয়াড সভা উপলক্ষ্যে এক ফ্যাক্টশীট প্রকাশ করেছে [Fact Sheet: Quad Leaders’ Summit] স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে, যা তাদের থিঙ্কট্যাংক ব্যক্তিত্বরাই সমালোচনা করে বলছেন, এতে এক কোভিডের টিকা প্রোগ্রাম নিয়েই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কথা বলা হয়েছে। যা আসলে ইতোমধ্যেই ব্যর্থ হয়েছে। ভারত জাপানের বিনিয়োগ নিয়ে অন্যকে টিকা সরবরাই করবে কী যেখানে ভারতের নিজ জনগোষ্ঠির জন্য প্রয়োজনীয় যা টিকা তা উতপাদনের ক্যাপাসিটিই নাই। আর নাই বলেই শেষে বাস্তবত ভারতকে বিদেশে থেক্লে টিকা আমদানি করে পরিস্থিতি সামলাতে হয়েছে। তার মানে নতুন করে কোয়াড বেচে আছে দেখাতে চেয়েই কোয়াডের কেবল কোভিড প্রোগ্রামের কথা বলা হয়েছে পুরা সাত পৃষ্ঠা ধরে। যা ইতোমধ্যেই কোয়াডের ব্যর্থ এরিয়া।

অর্থাৎ কোয়াড যে নাই হয়ে গেছে গত ২৪ সেপ্টেম্বরে এটাই চারদেশ মিলে পরোক্ষে স্বীকার করে নিয়েছে। আর ঠিক একথাটাই নিউইয়র্ক সিটি কলেজের এক প্রফেসর আমেরিকারই “ফরেন পলিসি’ পত্রিকায় গত জুন মাসে আর্টিকেল লিখে বলেছিলেন। লেখার শিরোনাম ছিল কোয়াড এক মিথ্যা-মায়ার নাম’ [The Quad Is a Delusion]। বলেছিলেন এই জোট “আমেরিকাকে চীনের বিপরীতে কোন বাড়তি সুবিধা এনে দিবে না”।

ভারতের রাজনীতিকেরা কী জানতেন না, কোয়াড বা আমেরিকা তাদেরকে রক্ষা করবে নাঃ

অভ্যন্তরীণভাবে ভারতের শাসক-নেতাদের মনে এটা পরিষ্কার না থাকার কারণ নেই যে, কোনো যুদ্ধে জড়ানোর মূল বিপদ হল যে, এটা যুদ্ধের খরচের বোঝা চাপিয়ে নিজ খারাপ অর্থনৈতিক অবস্থাকে আরো খারাপ করে ফেলা। ফলে পাকিস্তানের ইস্যু ছাড়া কোনো যুদ্ধে না জড়ানোই অন্য সব দেশের মতো ভারতীয় মনের সাধারণ অবস্থান। কিন্তু এ দেশের নাম ভারত যার আরেক নাম হওয়া উচিত ‘ভান ও ভণিতা’র দেশ। ভান-ভনিতা করে চলে এদের জনগোষ্ঠিগত বৈশিষ্ঠের আকার ধারণ করে বসে গেছে। এরা জীবিনের কঠিন বাস্তবতাগুলোকে কখনো প্রকাশ পেতে দেবে না; বরং যা সে নয় তাই সে ‘শো’ করবে, যেটাকে আমরা শো-আপ করা বলি।

ভারত শো-আপ করা ছাড়া কিছুই করতে পারে না, চলতে পারে না। এটা নেহরু কংগ্রেসের ভারতের প্রথম প্রায় পাঁচ দশক ধরে চলা তথাকথিত কমিউনিস্ট অর্থনীতির (বিদেশের বিনিয়োগ নেয়া যাবে না) পরিণতি; এমন এক কালচারাল বৈশিষ্ঠ হয়ে গেছে। গ্রামের মানুষ উন্মুখ হয়ে কাজের খোঁজে শহরে-রাজধানীতে এসে থাকে এটা দুনিয়াতে খুবই কমন ফেনোমেনা। কিন্তু নেহরুর ভারতের ক্ষেত্রে কাজে নয়া পেশা, কাজের আশায় শহরে ভীড় করেছিল এমন চার প্রজন্ম পার হয়ে গেলেও নেহেরুর কমিউনিস্ট অর্থনীতি তাদের বস্তিবাস অথবা জীবনমানের নিম্ন ও স্থবির দশায় কোনো পরিবর্তন আনতে পারে নাই। খারাপ অর্থনীতিতে কাজের অভাবে পড়ে চরম দুঃখ-দুর্দশাগুলোর প্রকাশ মাপক অনেক ধরনের হয়ে থাকে। এর একটি হলো মধ্যবিত্তের উত্থান-পরিবর্তনগুলোকে স্টাডি করে সেটা বোঝার চেষ্টা অনেক পুরনো হলেও ভারতের এই মাপকে ভারতের চার প্রজন্মের খবর এখানে খুবই করুণ। বাংলাদেশের সাথে যদি তুলনা করা হয়, আমাদের বেলায় আমাদেরকে শুরুই করতে হয়েছিল অনেক দেরিতে অন্যদের (দেশভাগের আগের ভারত আর পরের পশ্চিম পাকিস্তান) পেট ভরার পরে, স্থায়ী সম্পদগুলো সবই তাদের পকেতে থেকে গেছিল, আমাদের শুরু একাত্তরের পরে। তবু এখানে দেখব আমাদের মধ্যবিত্তের ফর্মেশন সবার চেয়ে আলাদা। ভারেতের চেয়ে তো বটেই, একেবারেই আলাদা। আমাদের বেলায়, কোনো প্রথম প্রজন্ম যদি ঢাকায় এসে বাসের হেলপার হয়, তবে পরের প্রজন্মের কর্তা বাস ড্রাইভার হয়ে হাজির হতে দেখা যেতে পারে। আর এখানে সবচেয়ে চোখে পড়ার মত ও তাতপর্যপুর্ণ ঘটনা হল, একালে বাস ড্রাইভারের মেয়ে কলেজে পড়ে! আমাদের এখানে কোন মানুষ বা তার পরিবার যারা গ্রাম থেকে শহরে ধাবমান এরা চার প্রজন্ম ধরে একই স্তরের জীবনমানে আছে দেখা যাবে না – ট্রেন্ড টা এরকম।

এখন ভারতের বেলায় যেটা ঘটে আসছে তা হল এক লম্বা সময় ধরে একই নিম্নআয়ের জীবনমান ধরে ওর মধ্যেই আটকে থাকতে বাধ্য হলে তখন একটা সময়ে এর কালচারাল প্রভাব হয় মারাত্মক। যেমন – স্বল্প আয়ের পরিবার বলে, এক নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার রান্নার তেল কিনে একেকবার আধাছটাক করে। তবে তা নিয়ে কথা বলার কিছু নেই। কিন্তু সে সেটা কী করতে কিনে এটা গুরুত্বপুর্ণ। সে কিনবে পকেটে করে শিশি নিয়ে গিয়ে। কেন? কেউ যখন তা কিনে বাসায় ফিরবে, তা যেন পড়শি পরিবারের কেউ দেখে না ফেলে যে এত অল্প করে তেল কিনে। যার মানে তার অর্থনৈতিক অবস্থার আসল লেভেল কোনটা। কেন এমন হয়?

কিন্তু তাঁর পড়শিও কি তার মত একই লেবেলের অর্থনৈতিক জীবনমানের মানুষ নয়? অবশ্যই। আসলে তারা নানা সামাজিক আসরে ওসব পড়শিরা পরস্পর পরস্পরের কাছে ভান-ভণিতায় শো করে গেছে ও যায়। তারা সবাই ভনিতা করে দেখাতে চায় যে তাদের জীবনমান অনেক ভালো বা উঁচু। আর এমন করে দেখানোতে সবচেয়ে বিপজ্জনক ‘শো-আপ’ হল যখন তারা পরস্পরকে শো-আপ করে এই বলে যে, তাদের জীবন নিয়ে তারা খুবই খুশি, খুব ভালো, সুখে আছে তারা। সে কারণে এই মিথ্যা শো-আপটার সাথে আধাছটাক তেল কিনে আনাটা যায় না, মিলে না বলেই সে পকেটে শিশি ঢুকায়! সব ঢেকেঢুকে ভণিতা করতে চায়। অথচ যেটা সবাই জানে আর যেটা পড়শি সবারই কমন অবস্থা সে্টা নিয়ে আবার একে অপরের কাছ থেকে লুকানোর চেষ্টার কী আছে? কিন্তু এথেকে সম্ভবত গভীর ক্ষতের দিকটা হল, এখন এই যে শো-আপ এটি সম্ভবত মধ্যবিত্তের একটি ‘জাতীয় কালচারে’ পরিণত হয়ে গেছে। ফরমাল স্টাডি করলে আর এরকম অনেক লক্ষণও নিশ্চিয় পাওয়া যাবে! তাই, যেন এই হল ভান-ভনিতার ভারত! এটাই সম্ভবত ভারতেরই আরেকটা দিক-বৈশিষ্ঠ; – নেহেরু-ইয়ান ভারতের কমিউনিস্ট ইকোনমির স্থায়ী ছাপ বৈশিষ্ঠ।

এর কী কোনই পরিবর্তন নাই?

অবশ্যই হয়েছে খানিক আর্ধেক, তবে যা একবার কালচারে ঢুকে যায় তা সহসা বের হয় না। ভারতের ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর গান্ধী পরিবারের বাইরে নরসীমা রাও প্রথম ও নতুন প্রধানমন্ত্রী হন। আর তারই অর্থমন্ত্রী হন মনমোহন সিং। কিন্তু ততদিনে আগের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী (শ্রীলংকার এলটিটি ইস্যুতে তাদের হাতে খুন হয়েছিলেন তিনি) মৃত্যুর অনেক আগে তিনি জেনে গিয়েছিলেন, দাদামশাই নেহরু গ্রেটেস্ট কমিউনিস্ট আকামটা কী করেছিলেন; কারণ এর আগেই মনমোহন অনেক দিন সেন্ট্রাল ব্যাংকের গভর্নরসহ ভারত সরকারের নানা অর্থনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ সব পজিশনের দায়িত্বে তিনি ছিলেন এবং প্রধানমন্ত্রী রাজীবকে সমস্যার গোড়া বুঝানোর সুযোগ নিয়েছিলেন। যাতে, নেহরুর কথিত কমিউনিস্ট অর্থনীতির কাঠামোটা ফেলে এর সংস্কারই একমাত্র সমাধান এতে তিনি রাজি হন। এরই মধ্যে ১৯৯০ সালে ভারত “ব্যালেন্স অব পেমেন্টের ঘাটতির মুখে পড়ে যায়। ফলে আইএমএফ লোনের দ্বারস্থ হয়ে মুক্তেতি খুজতে নামতেই হয়। কমিউনিস্ট অর্থনীতির বেকুবিপনা আর অচলতা উদোম হয়ে যায়। এ কারণে পরের বছর নতুন সরকারে ড. মনমোহন সিং অর্থমন্ত্রী হয়ে সংস্কার শুরু করেছিলেন সহজেই, প্রায় বিনা বিতর্কে।

এদিকে পরবর্তীতে নতুন শতকে, তত দিনে চীনেরও অর্থনীতি ভালভাবেই ডাবল ডিজিট গ্রোথে প্রবেশ করেছে। ফলে “ডেভেলপড” অর্থনীতির উন্নত পশ্চিমা দেশগুলোর বাইরে “রাইজিং ইকোনমির’ দেশ বলে নয়া টার্ম চালু হয়। দুনিয়ার বড় জনসংখ্যার দেশ হিসেবে চীন (১৩৯ কোটি) সবার উপরে আর তার পেছনে ভারত (১৩৫ কোটি)। এমন জনসংখ্যা বেশির দেশে অর্থনীতি খারাপ থাকলে ওদেশের লোক কম ভোগ করলেও অর্থনীতিটা সাইজে বড় গ্রুপে গিয়ে পড়ে। চীনের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটাও তাই-ই। তবে ততদিনে চীন শুধু জনসংখ্যাতেই বড় নয়; আবার অর্থনৈতিক সামর্থ্য অর্থে বড় উদ্বৃত্ত সঞ্চয়ের দেশ হয়ে দাঁড়িয়ে গেছিল [যেটা চীনের বিনিয়োগ সক্ষমতার উৎস]। চীনের সাথে ভারতের কেবল ফারাকটা ছিল যে, জনসংখ্যাতেও ভারত বড় অবশ্যই তবে চীনের মতো অর্থনৈতিক সামর্থ্য অর্থে বড় উদ্বৃত্ত সঞ্চয়ের দেশ ভারত তখনো নয়। তখনো নয়। এটাই আবার বিশাল ফারাক টেনে দিয়েছে কারণ চীনের বিনিয়োগ সক্ষমতা আছে বলে সেই-ই গ্লোবাল নেতা হতে পারবে। ভারত নয়। সুতরাং বড় জনসংখ্যাই সবকিছু না। কিন্তু পটেনশিয়াল দেশ মাত্র। কিন্তু ওদেশের সরকারের কোনো লোভী বা ওভার-এস্টিমেটেড সিদ্ধান্ত দেশের সব সম্ভাবনা শেষ করে দিতে পারে। তবে সে যাই হোক ঐ সময়ই এই “রাইজিং ইকোনমি” টার্মটা চালু হলে ব্যাপারটা আমেরিকার নজরে আসে।

এমনিতেই নাইন-ইলেভেনের হামলার পাল্টা, আফগানিস্তানে আমেরিকার হামলার পক্ষে বিভিন্ন দেশের সমর্থন নিতে গিয়ে ২০০২ সালের মধ্যে কথিত “সন্ত্রাসবাদ ইস্যুতে” ভারত ও আমেরিকা, তাদের মধ্যে আঁতাত হয়ে যায়। ইসলামবিদ্বেষীভাবে কাদের ও কিভাবে সন্ত্রাসী বলবে, তা ঠিক হয়। আর সাথে “রাইজিং ইকোনমি” বিষয়ে ভারতের সাথে কাজ করার গ্রাউন্ড তৈরি করাও শুরু হয়েছিল। এখান থেকেই এশিয়ার দুই রাইজিং অর্থনীতির দু’টা দেশ চীন ও ভারতকে একসাথে মোকাবেলা করতে না গিয়ে, বরং একটাকে আরেকটার বিরুদ্ধে খাড়া করতে ভারতকে প্রলোভন ও প্রশ্রয়ের পিঠে হাত রাখার পরিকল্পনা করেছিল আমেরিকা। এখান থেকেই ভারতের পিঠে হাত রেখে ‘চীন ঠেকানোর’ পরিকল্পনা ও তৎপরতার শুরু। আর তাতেই তারা লোভী করে তুলেছিল ভারতকে, য়ার এতে ভারতের মাথা ঘুরিয়ে দিতে সক্ষম হয়ে যায়।

সাধারণভাবে বললে, একাজটাকে বলে ভারতের ইন্টেলেজেনশিয়ার (একাদেমিক প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশুনা, চিন্তাচর্চায় জড়িত যে জনসংখ্যার অংশ) উপরে চিন্তায় প্রভাব-দখল নেয়া। একাজটা আমেরিকা করেছিল কিছু আমেরিকান থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে, কিন্তু কয়েকভাবে। ভারতে আমেরিকান ওসব থিংকট্যাংকের এক্সটেন্ডেড শাখা খুলে অথবা প্রতিষ্ঠান বা এনজিও খুলতে ফান্ড দিয়ে এবং এক চীনবিরোধী ক্যাম্পেইন দিয়ে একাদেমিক পেশায় জড়িত এমন এবং এছাড়াও হায়ার স্টাডিতে আগ্রহীদের তাদের প্রলুব্ধ করে। আর দ্বিতীয়টি হল, স্কলারশিপ বিতরণ। হায়ার স্টাডিজে আকাঙ্খীদের (মাস্টার্স বা পিএইচডি) স্টুডেন্টদের স্কলারশিপ দিয়ে আমেরিকার চীনবিরোধী বয়ানের অংশ করে নেয়াটা এর লক্ষ্য; যাতে তারা বিশ্বাস করতে ও প্রচারণা করতে উৎসাহী হয়ে ওঠে। ( এবারের হোয়াইট হাউজ কোয়াড মিটিংয়ে বাইডেন আবার এমন এক স্কলারশিপ চালুর ঘোষণা দিয়েছেন।) এ বিষয়ে প্রথম কথাবার্তা শুরু হয়েছিল ২০০৪ সাল থেকেই, মনমোহন সিং প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হলে। আর পরে চুক্তি হয়েছিল ২০০৬ সালে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশের ভারত সফরকালে। ভারতে সেই প্রথম থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠান দেখতে পাওয়া শুরু হয়েছিল। তবে করুণ ব্যাপারটা হল, সে সময় ভারতের নীতি নির্ধারকেরা ব্যাপারটাকে দেখেছিল এভাবে যে নিজেকে আর থিংকট্যাংক খুলতে পয়সা খরচ করতে হলো না, এমনই সঙ্কীর্ণ দৃষ্টিকোণ থেকে। এছাড়া আরও দিকটা হল, আমেরিকার কাছে গুরুত্ব পাওয়ায় নিজে বিরাট কিছু দামি হয়ে গেছে বলে ওভার-এস্টিমেশন; অর্থাৎ ফিরে সম্ভবত সেই ভান-ভনিতার দিন এতে আরো জেঁকে বসেছিল মনে করা যেতে পারে।

আসলে সেকালের ভারতে থিংকট্যাংক বলতে সামরিক বাহিনীই নিজ বাজেট থেকে অর্থ নিয়ে আর সেনা এক্সটেনডেড প্রতিষ্ঠান হিসেবে সীমিতভাবে চালানো কিছু স্টাফ দিয়ে কিছু প্রতিষ্ঠান খাড়া করে রেখেছিল। বাজেট স্বল্পতা থাকলে একটা প্রতিষ্ঠান যেমন হয় তাই। আমেরিকান বয়ান ভারতে প্রবেশ করেছিল এভাবেই এর সুযোগ নিয়ে। আর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হল, একটা বয়ানে এসবের সমন্বয়ের নিয়ম স্ট্রাকচার তারা চালু করেছিল তখন থেকে। সেটা সম্ভব হয়েছিল যেসব কারণে যেমন, এরপর থেকে ভারতে থিংকট্যাংক জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সবাই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে সম্পর্কযুক্ত হয় কারণ সেটাই ছিল নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান; কারণ থিংকট্যাংকগুলোর প্রতিটি প্রোগ্রাম এই মন্ত্রণালয়েরই অনুমোদন ও পূর্বানুমতিপ্রাপ্ত। ফলে সমন্বিত। আর থিংকট্যাংক জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বলতে তখন দেখা যেওত যেমন সরাসরি সরকারি, অথবা একমাত্র (ব্যবসায়ীদের দেয়া দাতব্য অনুদানে চলা) ওআরএফ [ORF] আর এবার এসবের সাথে আমেরিকান থিংকট্যাংকের ভারতীয় শাখা বা ফান্ডে চলে এরা এবং ভারতীয় ব্যক্তিত্ব যারা আমেরিকান থিংকট্যাংকের ফেলো [fellow] হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত এমন যারা আমেরিকায় বা ভারতেই থাকেন। এতে ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রণালয় ও আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্ট (আমেরিকান থিংকট্যাংকসহ) যেটা সমন্বিত অবস্থান একেক সময়ে নেয়, সেটাই সংশ্লিষ্ট সবার উপর কার্যকর হয়, তাই সবার কমন অবস্থানের গাইড লাইন হয়। তবে ট্রাম্প আমলে এসে তার “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতিতে এসব স্কলারশিপ এবং এনজিও ফান্ড সব বন্ধ বা খুবই সীমিত হয়ে যায়। তবুও আমেরিকা্নর নিজের থিংকট্যাংকঅগুলোর তৎপরতা খুবই সক্রিয় থেকেই গেছিল মূলত মন্ত্রী জয়শঙ্করের কারণে, যাকে আড়ালে ভারতের সবচেয়ে বড় আমেরিকান থিংকট্যাংকের এজেন্ট বলেন অনেকে। ওদিকে আমেরিকান স্বার্থে স্কলারশিপের ভারতে বসে মূল অনুমোদনদাতা ভারতীয় যে মূলত আমেরিকানদের প্রধান লোক সে তখন থেকে ভারত ছেড়ে সিঙ্গাপুরে গিয়ে চাকরি নিয়ে আছেন। তখন থেকে ভারতে আমেরিকান থিংকট্যাংক তৎপরতা কিছুটা ঝিমিয়ে ছিল। বাইডেন সম্ভবত চাচ্ছেন সেটিকে সবার আগে আবার চালু রাখতে। এই ব্যাপারটা এমন বিস্তৃত বলার পিছনের কারণ এটাই। কোয়াড নাই ঠিক তা হবে না সম্ভবত তবে, গুটিয়ে যাচ্ছে এর সব লক্ষণ এভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কিন্তু বাইডেনের এখনও দরকার ভারতের চিন্তাশীল কর্তাদের চিন্তার উপর প্রভাব। তাদেরকে প্রভাবিত করতে পারার সক্ষমতা যাতে আমেরিকার চীনবিরোধী বয়ানের নিচে তারা চাপা থাকে।

এই অংশটা এত বিস্তারিত বললাম আর এক এজন্য যে, এবারের মোদীর হোয়াইট হাউজ সফর শেষে অথবা বলা যায় – এবার কোয়াড-এরই এক সতীন প্রতিষ্ঠান অকাস [AUKUS] খাড়া হওয়াতে, উপেক্ষিত বোধ করা ভারতের ক্ষোভ-অভিমান যা ক্রমেই বের হয়েই চলেছে তাতে মনে হচ্ছে, এবারই প্রথম আমেরিকান বয়ান ভারতের আবার নীরবে খেতে, মেনে চলতে ভারত কেউ কেউ আপত্তি তুলবে; যেটা আবার হয়ত আর্থিক সুযোগ সুবিধা পেলে চুপ করে যাবে। অর্থাৎ সেটা যেভাবেই নতুন রূপ নেক না কেন – এটাই হবে আফগানিস্তানে তালেবানে উত্থানের বাইরে আরেক প্রায় ২০ বছরের ঘটনার পরিসমাপ্তি। এর পুরনো ‘সেটিংসের’ এবার ভেঙে পড়ার ঘটনা হবে এটা। এককথায় এটাই ভারত-আমেরিকার এত দিনের থিংকট্যাংক সম্পর্কে বদল। তা একেবারে ভেঙ্গে যদি নাও পড়ে এতে মোচড় আসার মত তা বদলে যেতে বাধ্য।

এমন কোথায় কোথায় এখন ভারতের আঘাত লাগবে এর একটি তালিকা (না আমার করা নয়) পাওয়া যায় – হর্ষ ভি পন্থ [Harsh V. Pant] -এর লেখা থেকে। পন্থ মূলত লন্ডন কিংস কলেজের অধ্যাপক। কিন্তু ভারতে সক্রিয় সবচেয়ে বড় থিংকট্যাংক ওআরএফ [ORF] বা অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের তিনি ডিরেক্টরও। আর তিনি এবার তাঁর লেখাটা ছাপতে দিয়েছেন আমেরিকান ম্যাগাজিন ‘ফরেন পলিসি’-তে।

ফরেন পলিসি (আমেরিকান এলিটদের পত্রিকা ফরেন অ্যাফেয়ার্স নয়। দু’টিই কাছাকাছি নামের বলে ভুল বোঝা থেকে সতর্ক করতে একথা বলছি। এই পত্রিকার পজিশন আগে যাই থাক না কেন, বাইডেন ক্ষমতায় আসার পরে এই পত্রিকাটা এখন বিশেষভাবে বাইডেন-অ্যাসাইন্ড এক পত্রিকা। সাধারণভাবে পত্রিকাটা বাইডেনের অঘোষিত এক পাবলিক মুখপাত্রের মত তার সব পলিসির পক্ষে প্রচার করতে তো দেখাই যায়, এটাই এর অবস্থান। এছাড়াও বিশেষত আরেকটা দিক হল, আমেরিকান প্রফেসর কুগেলম্যান [Michael Kugelman]; তিনি আসলে Deputy Director of the Asia Program at the Wilson Center] এটা একটা প্রভাবশালী আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক। তাঁকে এখানে হায়ার বা নিয়োগ করা হয়েছে। আর তাঁকে কেন্দ্র করে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বাইডেনের নীতি-পলিসির পরিপ্রেক্ষিতে প্রতি সপ্তাহে [ এশিয়ার দেশগুলোতে বাইডেনের স্বার্ত্থ সংশ্লিষ্ট] চার-পাঁচটি দেশে কী ঘটছে বা বাইডেন কী ঘটাতে যাচ্ছেন তা নিয়ে সরাসরি কুগেলম্যানের (চার-পাঁচ পাতা, ২০০০ অক্ষরের) মন্তব্য এ পত্রিকায় ছাপা হচ্ছে। যার শিরোনাম weekly South Asia Brief। উল্টো করে বললে এতে – কুগেলম্যানের মন্তব্য থেকে বাইডেনের মনোভাবের কিছু হদিস মিলা সম্ভব।

এই ফরেন পলিসি পত্রিকাতেই হর্ষ পন্থের ভারতের ক্ষোভের তালিকাসমৃদ্ধ লেখাটার [শিরোনামঃ- The U.S.-India Relationship Is the Quad’s Litmus Test ] ছাপা হয়েছে। এই আক্রমণাত্মক শিরোনামের ভাবানুবাদ টা হবে এমন – “ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের টিকে যাওয়া এই কোয়াড টিকে কি না তার ভাগ্য পরীক্ষা”। এছাড়া এলেখায় তিনি এশিয়ায় আমেরিকা তার বিদেশনীতি বদলে ফেলেছে বলে আমেরিকাকে অভিযুক্ত করেছেন [……as the United States makes a foreign-policy shift in Asia. ]। এমনকি খুবই কড়াভাবে ভারত-আমেরিকা বিরোধের কথা উল্লেখ করে আবার- এটিকে ‘কনফ্লিক্টিং অব প্রায়োরিটি’ ক্যাটাগরিতে ফেলেছেন। ব্যাপারটা অনেকটা একবার ছেড়ে দিয়েছেন বলে হুমকি ও ভাব করে আবার ধরে রাখছেন – এমন।

India has a vital role to play in each area, but it also has many unresolved differences with the United States, such as their vaccine supply chain issues, approaches to climate policy, and conflicting priorities regarding Taiwan and Pakistan.

অর্থাৎ নাম ধরেই বলেছেন, “ভারতের প্রায়োরিটি পাকিস্তান”। প্রথমত তিনি স্বীকার করছেন ভারত আমেরিকা বিরোধের পর্যায়ে চলে গেছে। কিন্তু আবার তিনি বিরোধ বলেও এবার তা লঘু করে দেখাতে বলছেন এটা নাকি “conflicting priorities” – কে কোনটা আগে চায় এনিয়ে বিরোধ-বিভক্তি আছে। কিন্তু এটা তো কোনটা আগে চায় এর বিরোধ নয় বরং কে কোনটা চায় তার বিরোধ – যেখানে আগে পড়ে বলে কিছু নাই। মানে বলতে চাইছেন, বাইডেন ভারতের ইচ্ছা-আকাঙ্খার পক্ষে, ( প্রধানত তালেবান ইস্যুতে) পাকিস্তানের বিরুদ্ধে চাপ দিচ্ছে না। ভারতের দাবি অনুসারে কাজ করছেই না। আর বিপরীতে “আমেরিকান প্রায়োরিটি নাকি তাইওয়ান” – মানে ভারত তাইওয়ানের পক্ষে সামরিকভাবে নামতে আমেরিকার নয়া সামরিক জোটে যাচ্ছে না।

হর্ষ পন্থ স্বীকার করছেন, কোয়াডে ভারত আমেরিকা বিরোধের পর্যায়ে চলে গেছে। কিন্তু আবার তিনি বিরোধ বলেও এবার তা লঘু করে দেখাতে বলছেন এটা নাকি “conflicting priorities” – কে কোনটা আগে চায় এনিয়ে বিরোধ-বিভক্তি আছে। কিন্তু এটা তো কোনটা আগে চায় এর বিরোধ নয় বরং কে কোনটা চায় তার বিরোধ – আগে পড়ে বলে কিছু নাই। মানে বলতে চাইছেন, বাইডেন ভারতের ইচ্ছা-আকাঙ্খার পক্ষে, ( প্রধানত তালেবান ইস্যুতে) পাকিস্তানের বিরুদ্ধে চাপ দিচ্ছে না। ভারতের দাবি অনুসারে কাজ করছেই না। আর বিপরীতে “আমেরিকান প্রায়োরিটি নাকি তাইওয়ান” – মানে ভারত তাইওয়ানের পক্ষে সামরিকভাবে নামতে আমেরিকার নয়া সামরিক জোটে যাচ্ছে না।

পন্থের কথাটি জমেনি বা অর্থ হয়নি। অনেকটা জোর করে মিলিয়ে বলা। আগে-পড়ে বলে কিছু না থাকলেও সেটা দাবি করা। পন্থ কামনা করছেন, আসলে পাকিস্তানের কথা, ঠিক যেভাবে গত প্রায় বিশ বছর ধরে সন্ত্রাসবাদের অসৎ বয়ান ঠিক রাখার স্বার্থে ভারতকে তোষামোদ আর পাকিস্তানকে চাপের মধ্যে রেখে গেছে – সেটাই, সেই সুখের দিন ভারত ফেরত চাইতেছে। কিন্তু বাস্তবতা হল তালেবান ইস্যু কি কেবল ভারত-পাকিস্তান ইস্যু? তা তো কখনো নয়, কারণ এতে খোদ বাইডেনের আমেরিকার স্বার্থই (এবং সক্ষমতাও) তো সবার চেয়ে বড়। আর বাইডেনকে অন্তত সেনা ফিরিয়ে নিয়ে আমেরিকার প্রতিদিনের ৩০০ মিলিয়ন ডলার বাঁচাতেই হত। সেটা পরোয়া না করে বাইডেন কেবল ভারতের ইচ্ছার পক্ষে কাজ করবে এটা আশা করাটাই যে করে তারই সমস্যা! এটা না বুঝার তো কিছু নেই। কিন্তু পন্কেথ বা ভারত এভাবে ভাবে কেন? কেন এমন করছে? এটাই, এই যে সবসময় এই ওভার-এস্টিমেশন, বড় মনে করে — মুই কী হনু রে — যে আমি অনেক দামী এই ফুটা দেমাগ ইত্যাদি – এটাকেই তো ভান-ভনিতার ভারত বলেছি! অতএব, ভারত এখন যত দাম মানে অহেতুক যতই দাম দেখাবে ততই এই দুরত্ব বাড়তে থাকবে যা শেষ পর্যন্ত খুবই খারাপ জায়গায় – উইঘুরের মত, এই আমেরিকাই ঘুরে গিয়ে ভারতের কাশ্মীর ইস্যুতে আচরণ, মানবাধিকার নিয়ে ভীষণ চাপে ফেলতে পারে! এসব দিক নিয়ে ভারতের ভিতরেই বুদ্ধিমানেরা ইনার আলোচনা শুরু করেছে!

ক্ষুব্ধ ভারতের চেয়েও বাইডেনের এখনকার বড় মাথাব্যথা হল চীনের সাথে আপোষে বসাঃ
এদিকে আমেরিকার চিন্তার জন্য কেবল ভারতের ক্ষোভই ‘একমাত্র’ নয়। এর থেকেও নিঃসন্দেহে এখনকার বড় বাইডেনের মাথাব্যথা হল চীন। না নতুন করে আমেরিকা-চীনের কোন বিরোধ এটা নয়; বরং তা থেকে ছুটবার আলো এটা। আসলে এটা চীনের সাথে আমেরিকার ‘বাণিজ্য যুদ্ধ’ যেটা ট্রাম্প শুরু করে দিয়ে গিয়েছিলেন এবং তা থেকে সব ধরনের যুদ্ধ লেগে যাওয়ার উপক্রম বা সম্ভাবনা। আর ক্ষমতা ত্যাগের আগে ট্রাম্প বড়াই করে বলে গিয়েছিলেন যে, তার দেখানো পথই বাইডেনকে অনুসরণ করে যেতে হবে। কারণ এমন ‘শক্ত বাঁধন’ তিনি দিয়ে যাচ্ছেন।

আমরা (অন্তত আমি নিজে) অবাক বিস্ময়ে দেখলাম, বাইডেনের শপথের পরে বোকা হয়ে এই ইস্যুতে ট্রাম্পকেই অনুসরণের নীতি অনুসরণ করতে গেলেন। আর তাতে চীনের সাথে আলোচনার ‘আলাস্কা বৈঠকে’ই সব শেষে, এমনকি মারামারি লাগার অবস্থা। সেই থেকে বাণিজ্য যুদ্ধ বা আলোচনা একেবারেই বন্ধ হয়েছিল। কিন্তু বন্ধ থাকলে যা হয়, চীন-আমেরিকা যত ধরনের শত্রুতা সম্ভব তা ক্রমশ ডালপালা মেলতে শুরু করেছিল।

গত মাস থেকেই পরিস্কার বাইডেনের অর্থনীতি মুদ্রাস্ফীতির চাপের মুখে। এনিয়ে আমার আগের লেখা দেখতে পারেন এখানে। আর তিন ডজন ব্যবসায়ী ফেডারেশন কর্তৃক বাইডেনকে লিখিত অনুরোধ যে, চীনের সাথে বাণিজ্য আলাপে চীনা পণ্যের ওপর বাড়তি শুল্ক সরাতে যেন দ্রুত চীনের সাথে আলোচনা শুরু করা হয়।এছাড়াও, মিডটার্ম নির্বাচনে নিজ ডেমোক্র্যাট দল হারবে এই পূর্বাভাস দেখে [এই সব প্রসঙ্গ আমার আগের লেখার বিস্তারিত আছে] বাইডেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে ফোনে কথা বলেন। অনেকে বলছেন এতে শি জিনপিং শর্ত দিয়েছেন; অনেকে বলছেন, তিনি আবার বাণিজ্য আলোচনা করতেই চাননি।

আর বাস্তবে আমরা দেখছি আলোচনা ফের শুরু করার পরিবেশ সৃষ্টির নামে বাইডেন চীনের বিরুদ্ধে- উইঘুরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বয়ান ঘুরে যাওয়ার ইঙ্গিত, হংকং বা তাইওয়ান ইস্যুতে চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকার মানবাধিকার লঙ্ঘণের অভিযোগ ঢিলা করা, হুয়াওয়ে ফোনের সিএফওকে ‘মেঙ’ -কে তিন বছর ধরে কানাডায় আটকে রাখার পরে বন্দিবিনিময়ে তাকে ছেড়ে দেয়াসহ আপোষনামার বা পরিবেশ সৃষ্টির তালিকাটা অনেক লম্বা মনে হচ্ছে। সব কিছু শুরু হয়েছে। তা হলে হুয়াওয়ের ফাইভ-জি টেকনোলজিতে অবরোধও কি তুলে নেয়া হবে; চীনে পশ্চিমা মাইক্রোচিপস বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞাও কি? এটা শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামবে? মনে হচ্ছে ন্যাংটা করে ফেলবে বাইডেনকে। কারণ, তার বিপদটা ঘরেই। বাইডেন খারাপ অবস্থা হল মিডটার্ম নির্বাচনে ও অর্থনীতিতে!

মূল্কথাটা হল, প্রেসিডেন্ট শি, আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টির জন্য আমেরিকার দিক থেকে যা কমানো সম্ভব এমন বাহ্যিক টেনশনগুলো কমানোর মত পদক্ষেপগুলো নিতে বলেছে। বাইডেনও এই সারকথাটাই মিডিয়ায় জানিয়েছে। তাই বলে এর লিস্ট কত বড় বা তাতে কী থাকবে তাকিছু বাইডেন বলেন নাই।

তবে বাইডেন-শি এর আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টির নামে এখনই এসব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের লিস্ট যত লম্বা হবে ততই আমেরিকার উপর ভারতের ক্ষোভ আরো বাড়বে বলেই অনুমান! কারণ বাইডেন ক্ষমতার শপথ নেয়ার পর থেকেই ভীত মোদীর কামনা ছিল চীন-আমেরিকা সম্পর্ক যত তিতা হবে, তা মোদীর জন্য ভালো। কারণ যাতে সেই তিতা সম্পর্কের আড়ালে কমলা হ্যারিসের মুখ দিয়ে তোলা বাইডেনের ভারতের বিরুদ্ধেও মানবাধিকারের খারাপ রেকর্ডটা (কাশ্মিরের স্ট্যাটাস, ভারতজুড়ে মুসলমান নিপীড়ন ও মুসলমানবিদ্বেষ প্রভৃতি) চাপা পড়ে যায়।

দুনিয়া আসলেই আর আগের মতো সব সম্পর্কে থাকছে না।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

Advertisements