বাংলাদেশে নৃবিজ্ঞান অধ্যয়নের ভবিষ্যৎ
Advertisements

নৃবিজ্ঞান মানুষের জীবন, সংস্কৃতি, সমাজ, ভাষা, জৈবিক বৈশিষ্ট্য, বিবর্তন ও ইতিহাসের সামগ্রিক এবং বৈজ্ঞানিক অধ্যয়ন। বাংলাদেশে প্রায় পাঁচ দশক ধরে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নৃবিজ্ঞানের চর্চা চলছে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর গুরুত্বও বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশের দ্রুত সামাজিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এই শাস্ত্রের প্রাসঙ্গিকতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশে নৃবিজ্ঞান শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা হয় ১৯৮৬ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। এরপর ১৯৯২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১৯৯৫ সালে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে এই বিভাগ চালু হয়। পরবর্তীকালে দেশের আরও পাঁচটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং তিনটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফলে ধীরে ধীরে দেশে নৃবিজ্ঞানের একাডেমিক পরিসর বিস্তৃত হয়েছে এবং নতুন প্রজন্মের গবেষক ও শিক্ষার্থীরা এই বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।

বাংলাদেশ বর্তমানে দ্রুত পরিবর্তনশীল একটি সমাজ। নগরায়ণ, শিল্পায়ন, অভিবাসন, প্রযুক্তির বিস্তার, জলবায়ু পরিবর্তন এবং সামাজিক বৈষম্যের মতো নানা উপাদান দেশের সামাজিক বাস্তবতাকে প্রতিনিয়ত নতুনভাবে রূপ দিচ্ছে। এই পরিবর্তনগুলো শুধু অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক বিষয় নয়; এগুলো মানুষের জীবনযাপন, সংস্কৃতি, পরিচয়, সামাজিক সম্পর্ক এবং মূল্যবোধের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এই জটিল বাস্তবতাকে বোঝার জন্য প্রয়োজন এমন একটি শাস্ত্র, যা মানুষের জীবন ও সমাজকে সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষণ করতে পারে। সেই জায়গায় নৃবিজ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

নৃবিজ্ঞান মূলত মানুষের আচরণ, বিশ্বাস, সংস্কৃতি, জীবনব্যবস্থা এবং পারস্পরিক সম্পর্ককে তুলনামূলক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করে। বাংলাদেশ যেমন জাতিগত, ভাষাগত, ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ, তেমনি এই বৈচিত্র্য নৃবিজ্ঞানের জন্য একটি বিস্তৃত গবেষণাক্ষেত্র তৈরি করেছে। গ্রামীণ সমাজের জীবনধারা, নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতি ও সংস্কৃতি, শ্রমজীবী মানুষের বাস্তবতা, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, নগর দরিদ্রতা, অভিবাসী শ্রমিকদের জীবনসংগ্রাম, নারী ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা—এসব বিষয় নৃবৈজ্ঞানিক গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশে দ্রুত নগরায়ণের ফলে গ্রামীণ সমাজেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটছে। নতুন নগর সংস্কৃতি গড়ে উঠছে, পরিবার কাঠামো পরিবর্তিত হচ্ছে এবং যৌথ পরিবার ধীরে ধীরে একক পরিবারে রূপ নিচ্ছে। একই সঙ্গে নারীর শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং তরুণ প্রজন্মের জীবনধারা ও মূল্যবোধেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এই পরিবর্তনগুলো কেবল পরিসংখ্যানের মাধ্যমে পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়; এগুলো অনুধাবনের জন্য প্রয়োজন গভীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিশ্লেষণ, যা নৃবিজ্ঞানের অন্যতম শক্তি। পাশাপাশি সামাজিক বৈষম্য, শ্রেণিভিত্তিক বিভাজন, লিঙ্গ বৈষম্য এবং ক্ষমতার সম্পর্ক বিশ্লেষণেও নৃবিজ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।

বাংলাদেশে নৃবিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করছে প্রয়োগমূলক নৃবিজ্ঞানের বিকাশের ওপর। উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রায়ই দেখা যায় যে স্থানীয় সংস্কৃতি, সামাজিক সম্পর্ক এবং মানুষের বাস্তব চাহিদা যথাযথভাবে বিবেচনায় না নেওয়ার কারণে অনেক উদ্যোগ কাঙ্ক্ষিত ফল দেয় না। নৃবিজ্ঞানীরা মাঠভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমে এই বাস্তবতাকে গভীরভাবে বোঝার সুযোগ পান এবং উন্নয়ন পরিকল্পনায় সেই জ্ঞানকে কাজে লাগাতে পারেন। দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, নারী উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষা সংস্কারের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে নৃবিজ্ঞানীদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এনজিও, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানে নৃবিজ্ঞানীদের কাজের ক্ষেত্রও ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে।

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। নদীভাঙন, লবণাক্ততা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় এবং খরা মানুষের জীবন ও জীবিকাকে প্রতিনিয়ত প্রভাবিত করছে। এই সমস্যাগুলো কেবল প্রযুক্তিগত বা প্রকৌশলগত নয়; এগুলোর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিকও রয়েছে। তাই পরিবেশ নৃবিজ্ঞান ও জলবায়ু নৃবিজ্ঞান ভবিষ্যতে বাংলাদেশের নৃবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ শাখা হিসেবে বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। জলবায়ুজনিত অভিবাসন, উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর অভিযোজন কৌশল এবং পরিবেশগত ন্যায়বিচারের মতো বিষয়গুলো নৃবিজ্ঞানীদের গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

স্বাস্থ্য ক্ষেত্রেও নৃবিজ্ঞানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্য কেবল চিকিৎসা বা ওষুধের বিষয় নয়; এটি মানুষের বিশ্বাস, সংস্কৃতি, আচরণ এবং সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচি, মাতৃস্বাস্থ্য, মানসিক স্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাধা রয়েছে। স্বাস্থ্য নৃবিজ্ঞান এসব বাধা চিহ্নিত করতে এবং কার্যকর নীতি প্রণয়নে সহায়তা করতে পারে। ফলে জনস্বাস্থ্য গবেষণা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নে নৃবিজ্ঞানীদের ভূমিকা ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশের আদিবাসী ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীগুলো দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের প্রান্তিকতার শিকার। ভূমি অধিকার, ভাষা সংরক্ষণ, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে তারা এখনও বিভিন্ন বৈষম্যের মুখোমুখি। নৃবিজ্ঞান এই জনগোষ্ঠীগুলোর জীবন, সংস্কৃতি এবং সমস্যাকে গবেষণার মাধ্যমে তুলে ধরতে পারে এবং নীতিনির্ধারণ ও মানবাধিকার আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারও বাংলাদেশের সমাজকে নতুনভাবে রূপান্তরিত করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন সংস্কৃতি, ডিজিটাল শ্রম এবং ভার্চুয়াল পরিচয় নতুন সামাজিক বাস্তবতা তৈরি করছে, যা নৃবিজ্ঞানের নতুন গবেষণাক্ষেত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। একই সঙ্গে নগর নৃবিজ্ঞানও গুরুত্ব পাচ্ছে, যেখানে বস্তিবাসী জীবন, নগর দরিদ্রতা, পরিবহন সংস্কৃতি, নিরাপত্তা এবং নগর সহিংসতার মতো বিষয়গুলো বিশ্লেষণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতা যত জটিল হবে, নৃবিজ্ঞানের প্রয়োজনও তত বাড়বে। এই শাস্ত্রের ভবিষ্যৎ আরও শক্তিশালী করতে নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় নৃবিজ্ঞানীদের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি, প্রয়োগমূলক ও জনসম্পৃক্ত গবেষণার প্রসার, আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা প্রকাশনা বৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থীদের বাস্তবমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি।

মানুষ ও সমাজকে গভীরভাবে বোঝার মাধ্যমে নৃবিজ্ঞান যদি বাস্তব জীবনের সমস্যার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে, তবে এটি শুধু একটি একাডেমিক শাস্ত্র হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বাংলাদেশের সামাজিক পরিবর্তন ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানভিত্তিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে।

লেখক: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক

Advertisements