গাজীপুরে হারুন-জাহাঙ্গীর-মোজাম্মেলের ‘দুঃশাসন’
Advertisements

আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে শিল্পাঞ্চল গাজীপুরে তৎকালীন পুলিশ সুপার (এসপি) হারুন অর রশিদ, সাবেক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক এবং সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে গুম-খুন, চাঁদাবাজি, হয়রানি ও হাজার হাজার কোটি টাকার আর্থিক কেলেঙ্কারির চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে।

এসপি হারুনের বিরুদ্ধে ‘টাকার খনি’ বানানোর অভিযোগ

তৎকালীন এসপি হারুন অর রশিদের বিরুদ্ধে গাজীপুরকে ‘টাকার খনি’ হিসেবে ব্যবহার করে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়,

অর্থনৈতিক দুঃশাসন: শিল্পপতি, ব্যবসায়ী ও বিত্তশালীদের মাদকসহ বিভিন্ন মামলায় ফাঁসানো এবং জুয়ার আসর, আবাসিক হোটেলে যৌনবৃত্তির কমিশন ও মাদক কারবার থেকে নিয়মিত বখরা আদায় করে তিনি চাঁদাবাজির এক রাজত্ব কায়েম করেছিলেন।

রাজনৈতিক হয়রানি ও মুক্তিপণ: বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের ধরে নিয়ে ‘জঙ্গি নাটক’ সাজিয়ে এবং ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করতেন। শ্রীপুর পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বিল্লাল বেপারীর দাবি, এসপি হারুন তার কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকা আদায় করেন এবং বহু নেতাকর্মী জমি বিক্রি করে তার চাহিদা পূরণ করতে বাধ্য হন।

অপরাধ নেটওয়ার্ক: এই অপকর্ম বাস্তবায়নে ডিবি পুলিশের ১৫টি টিম এবং সন্ত্রাসী মুচি জসিমকে ব্যবহার করতেন। হারুন বদলি হওয়ার পর চাঁদাবাজির সহযোগী মুচি জসিম পুলিশের ক্রসফায়ারে নিহত হন।

প্রেসিডেন্টের নাম ব্যবহার: হারুন অর রশিদ তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার দাবি করতেন এবং আদায় করা টাকার একটি বড় অংশ রাষ্ট্রপতি হামিদকেও দিতে হতো বলে মন্তব্য করতেন।

জঙ্গি নাটক ও হত্যাকাণ্ড: নগরীর হাড়িনাল লেবুবাগান এলাকায় ডুয়েটে ভর্তিচ্ছুক সাত শিক্ষার্থীকে গুলি করে হত্যা করে তাদের ‘জঙ্গি’ আখ্যা দেওয়া হয়। এই ঘটনার বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলছে।

মন্ত্রী মোজাম্মেল হকের ক্ষমতার অপব্যবহার

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা আ ক ম মোজাম্মেল হকের বিরুদ্ধেও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, তিনি ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৮৮ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে তৎকালীন বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের মাধ্যমে রায় করিয়ে চাকরি থেকে অন্যায়ভাবে বরখাস্ত করান। এছাড়া মোজাম্মেলসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা শিল্পাঞ্চলের ঝুট ব্যবসা পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করতেন।

মেয়র জাহাঙ্গীরের সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচার এবং ভুয়া ব্যাংক হিসাব খুলে ২ কোটি ৬০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মামলা করেছে।

ভুয়া বিল উত্তোলন: প্রাথমিক তদন্তে ২৩টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার ভুয়া কাজ দেখিয়ে বিল উত্তোলনের প্রমাণ মিলেছে।

রাজনৈতিক সন্ত্রাস: অভিযোগ রয়েছে, গত বছরের ২৮ অক্টোবর ঢাকায় বিএনপির মহাসমাবেশ পণ্ড করতে ডিবিপ্রধান হারুনের সঙ্গে জাহাঙ্গীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং তার বাহিনী ট্রাকযোগে রঙিন লাঠি নিয়ে হামলা চালায়। তার দুর্নীতিকে সমর্থন না করায় সিটি করপোরেশনের প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেনকে হত্যার পেছনে তার মূল ভূমিকা আছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

জনভোগান্তি ও বিআরটি প্রকল্প: জাহাঙ্গীর আলমের আমলে ক্ষতিপূরণ না দিয়ে জনগণের শত শত বাড়িঘর ভেঙে রাস্তা তৈরি করার অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, দুর্নীতি ও ভুল নকশার কারণে এয়ারপোর্ট থেকে গাজীপুর পর্যন্ত বিআরটি প্রকল্পটি বিগত ১২ বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি, যা জনগণের ভোগান্তির কারণ হয়েছে।

বিরোধী দল দমনে ‘গায়েবি মামলা’ ও সহিংসতা

আওয়ামী লীগ শাসনামলে গাজীপুরে বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীদের দমনে ‘গায়েবি মামলা’ দায়েরের হিড়িক পড়েছিল। জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট সিদ্দিকুর রহমানের তথ্যমতে, এই সময়ে অন্তত এক হাজারের বেশি মামলা দায়ের হয় এবং গ্রেপ্তারের সংখ্যা ছিল প্রায় পাঁচ হাজার। এছাড়া, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে গাজীপুরে ১৮ আন্দোলনকারী শহীদ হয়েছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সোহেল হাসান জানিয়েছেন, সিটি করপোরেশন দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিতে অটল এবং অতীতের যেকোনো অনিয়মের বিষয়ে রাষ্ট্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলোর আইনি প্রক্রিয়াকে তারা স্বাগত জানায়।

Advertisements