ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরাসরি ছত্রচ্ছায়ায় পুলিশের এক কর্মকর্তা হারুন-অর-রশীদ পরিণত হয়েছিলেন দানবে। চেইন অব কমান্ড না মেনে নিজেকে “চেইন অব কমান্ড” ঘোষণা করে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে গড়ে তুলেছিলেন একক কর্তৃত্ব।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বিরোধী রাজনৈতিক দল দমন, সভা-সমাবেশ পণ্ড এবং নির্যাতনমূলক কর্মকাণ্ডে সরাসরি শেখ হাসিনার নির্দেশে অভিযান চালাতেন হারুন। ফোনালাপ তো বটেই, প্রয়োজনে সরাসরি গণভবনে গিয়েও নির্দেশনা নিতেন। শুধু প্রধানমন্ত্রীর নয়, রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও পলাতক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সঙ্গেও ছিল তার গভীর যোগাযোগ।
বিএনপির ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবরের সমাবেশ বানচাল করতে প্রধান বিচারপতির বাসায় হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নও ছিল হারুনের নেতৃত্বে। পুলিশের একাধিক সূত্র বলছে, তিনি নিজেই এসব পরিকল্পনার নেতৃত্ব দেন এবং বিএনপির ওপর দায় চাপিয়ে দেন।
আন্দোলনে সরকার পতনের পর সেনা হেফাজতে আশ্রয় নেন হারুন। ৮ আগস্ট সেনা ক্যান্টনমেন্ট থেকে গাড়িতে করে আখাউড়া সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের ত্রিপুরা হয়ে নেপালে যান। পরে ক্যারিবীয় দ্বীপ সেন্ট লুসিয়া হয়ে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় অবস্থান করছেন। তার স্ত্রী ও সন্তানরা আগেই সেখানে চলে গিয়েছিলেন।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বলছে, গাজীপুর ও ঢাকা—বিশেষ করে উত্তরায় তার নামে ও বেনামে রয়েছে অন্তত ২০টির বেশি ফ্ল্যাট, বাড়ি, বাণিজ্যিক ভবন ও জমি।
উত্তরার ৩, ৫, ১০, ১১ ও ১৫ নম্বর সেক্টরে ১০ কাঠার প্লট, ছয়তলা বাড়ি, ১৪ তলা বাণিজ্যিক ভবনসহ রয়েছে বিপুল সম্পদ।
গাজীপুরে ‘সবুজপাতা রিসোর্ট’, আশুলিয়ায় ‘নন্দন পার্কে’ শেয়ার, কিশোরগঞ্জে ‘প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট’সহ রাজধানীর খিলক্ষেত, বনানী, টঙ্গী ও সাভারে রয়েছে বিলাসবহুল সম্পত্তি।
দুদক সূত্র বলছে, এসব সম্পদের অনেকগুলো তার স্ত্রী, আত্মীয় বা বিশ্বস্তদের নামে।
ডিবি অফিসে ‘ভাতের হোটেল’ নামে একটি কক্ষ তৈরি করে সেখানে আওয়ামী লীগ নেতা, শিল্পপতি, সেলিব্রেটি, এমনকি বিরোধী নেতাদেরও বসিয়ে খাওয়াতেন হারুন। এসব দৃশ্য ভিডিও করে ছড়িয়ে দিতেন সোশ্যাল মিডিয়ায়।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ও তার ফাঁদে পড়েছিলেন। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় বিরোধী দলের নেতাদের ধরে এনে ডিবি অফিসে ‘বিবৃতি আদায়ের’ অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ডিবিতে একটি চক্র গড়ে তোলেন হারুন। এদের ‘পঞ্চপাণ্ডব’ বলা হতো।এর মধ্যে অন্যতম ছিলেন ডিবির এডিসি রফিকুল ইসলাম, সাইবার ইউনিটের নাজমুল আলম, এডিসি আসমা আরা জাহান, এসআই শাহেন শাহ ও এডিসি মনিরুল ইসলাম।
এই চক্রটি রাজনৈতিক নেতাকর্মী, ব্যবসায়ী ও ইউটিউবারদের টার্গেট করে ব্ল্যাকমেইল, নির্যাতন, চাঁদাবাজি, জমি দখল ও অর্থ পাচারে যুক্ত ছিল। ডিবির অভ্যন্তরে কেউ হারুনের বিরুদ্ধে কথা বললে তাকে ‘বিএনপি-জামায়াত ঘরানার অফিসার’ বলে বদলি করা হতো।
৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের পর দ্রুত গা ঢাকা দেন হারুন। পুলিশ সদর দপ্তরের একটি হেলিকপ্টারে করে অজ্ঞাত স্থানে যাওয়া, সেনা হেফাজতে থাকার তথ্য মিলেছে বিভিন্ন সূত্রে। পরে অর্থের বিনিময়ে দেশ ত্যাগ করেন তিনি।বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় অবস্থান করলেও হারুনের বিরুদ্ধে দুদকের তদন্ত ও একাধিক মামলা চলমান রয়েছে।





































