সাকরাইন

পুরান ঢাকার একটি জনপ্রিয় উৎসব হল সাকরাইন। পৌষ মাসের শেষ দিনে বা মাঘের প্রথম দিনে পুরান ঢাকার তরুণ প্রজন্ম ছাদের মধ্যে বিশেষ পাওয়ারি সার্চ লাইট লাগিয়ে, হিন্দি গান বাজিয়ে, ডিজে পার্টির আয়োজন করে, ফানুস উড়িয়ে, আতশবাজি ফুটিয়ে, ঘুড়ি উড়িয়ে আকাশ জমিন ভারি করে তোলে। এই দিনে বুড়িগঙ্গা তীরবর্তী আকাশ ছেয়ে যায় আতশবাজি আর ফানুসের বর্ণিল রঙ্গে।

পৌষ সংক্রান্তি বা মকর সংক্রান্তি বলে যেই হিন্দুয়ানি উৎসব দক্ষিণ এশিয়ায় পালিত হয় সেটারই ঢাকাইয়া নাম সাকরাইন। ঐতিহাসিকভাবে হিন্দু ধর্মের সাথেই এই উৎসবের সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পাওয়া যায়। প্রাচীন মহাভারতেও এই দিনকে তাৎপর্যপূর্ণভাবে দেখানো হয়েছে। এই দিনকে ঘিরে হিন্দু ধর্মে নানা ধরণের বিশ্বাস প্রচলিত আছে বলে জানা যায়। হিন্দুদের ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী এই দিন তাদের দেবতাদের ঘুম ভাঙ্গে। ফলে এই দিনকে তারা শুভ মনে করে এবং নানা আয়োজনের সাথে দিনটিকে উৎযাপন করে থাকে। তবে ঘুড়ি উড়ানোর প্রচলন এই উৎসবের মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বলা হয়, হিন্দুরা ঘুড়ি উড়িয়ে সূর্য দেবতা কিংবা পছন্দের দেবতাদের কাছে নিজেদের আশা-আখাংকার বার্তা পৌঁছিয়ে থাকে। ফলে এই দিনে ঘুড়ি উড়ানো এক প্রকার পূজার অংশ বলেই বিবেচিত হয়।

যারা সূর্যের পূজা করে তারাও এই দিনটিকে উৎযাপন করে থাকে। তাদের মতে, এই দিনে মকর নামক এক রাশিতে সূর্য প্রবেশ করে। এছাড়াও এই দিনকে ঘিরে মুশরিকদের ভিতর হরেক রকম বিশ্বাস প্রচলিত আছে। মোটকথা এই উৎসবটির ঐতিহাসিক সম্পর্ক প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী শিরকি সব বিশ্বাসের সাথেই সংশ্লিষ্ট বলে জানা যায়।

উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে পুরান ঢাকার হিন্দু অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে বেশ জমজমাটভাবে উদযাপিত হয় পৌষসংক্রান্তি তথা সাকরাইন। তাঁতীবাজার, লক্ষ্মীবাজার, সূত্রাপুর, গেণ্ডারিয়া, লালবাগ ও এর আশেপাশের এলাকাগুলোতে বিপুল উৎসাহ ও উদ্দীপনার সাথে ছোট বড় সকলেই এই উৎসবে মেতে উঠে। বিশেষভাবে উল্লেখিত এলাকাগুলোতেই এই উৎসব পালন হওয়ার একটি তাৎপর্য আছে।

এই অঞ্চলগুলোতে প্রাচীনকাল থেকেই নানা নিচুজাতের হিন্দুদের বসবাস। এজন্য এই এলাকাগুলোর নামই হয়ে গেছে হিন্দু সেই জাতেসমূহের নামে। আদিকাল থেকে পুরান ঢাকাতে সম্ভ্রান্ত মুসলিমরা বসবাস করে আসছে। তাদের মধ্যে কখনোই এই উৎসবের প্রচলন ছিল না। কিন্তু বংগদেশে ধারাবাহিকভাবে হিন্দু সংস্কৃতির প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ার সূত্র ধরে এই উৎসব পুরান ঢাকার মুসলিম-হিন্দু নির্বিশেষে সার্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়। অথচ ঐতিহাসিকভাবে এটা কখনোই পুরান ঢাকার সম্ভ্রান্ত মুসলিমদের কালচার ছিল না।

ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণকে একপাশে রেখেও যদি এই উৎসবকে দেখা হয়, তথাপি এই আয়োজন দ্বীনি ও সুস্থ সংস্কৃতি বিরোধী আয়োজনে ভরপুর থাকে। নাচগান, মদ্যপান, পরিবেশ দূষণ, মানুষকে কষ্টপ্রদান, ফ্রি মিক্সিং, এমনকি যিনার মত মারাত্মক গোনাহের কাজকর্মে তরুণ সমাজ মেতে উঠে এই উৎসব। কেবল এই দৃষ্টিকোণ থেকেই এই উৎসব নিকৃষ্ট হারাম ও জঘন্য পাপে পরিণত হত।

মুসলমানদের জন্য বিধর্মীয় উৎসবের কোনকিছুতে সাদৃশ্য গ্রহণ করা জায়েয নয়। না, তাদের খাদ্যদ্রব্যের ক্ষেত্রে, না পোশাকে, না গোসলে, না অগ্নি প্রজ্বলনে, না প্রাত্যহিক কাজকর্ম বা ইবাদত থেকে অবকাশ নেয়ার ক্ষেত্রে, কোন ক্ষেত্রেই নয়। তেমনি ভোজ-অনুষ্ঠান করা, উপহার বিনিময় করা, তাদের উৎসবের সৌজন্যে বেচাবিক্রি করা, শিশুদেরকে তাদের উৎসবের খেলায় যেতে দেওয়া, সাজ-সজ্জা প্রকাশ করা ইত্যাদি কোনটি জায়েয নয়। মোদ্দাকথা, অর্থাৎ তাদের উৎসবের দিনকে কোন প্রকারে বিশেষত্ব দেয়া মুসলমানদের জন্য জায়েয নয়। বরং মুসলমানদের নিকট সে দিনটিও অন্য দিনগুলোর ন্যায়। মুসলমানগণ তাদের উৎসবের কোন বৈশিষ্ট্য ধারণ করবে না। (মাজমুউল ফাতাওয়া – ২৫/৩২৯)

সবশেষে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভয়াবহ বাণী স্মরণ করছি। যে ব্যক্তি কোন সম্প্রাদায়ের সাথে সাদৃশ্য রাখে সে তাদেরই দলভুক্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।