রেমিট্যান্স কমল ২০ শতাংশ

করোনা মহামারীর মধ্যে বড় রেকর্ড হয়েছিল প্রবাসী আয়ে। অর্থনীতির প্রতিটি সূচক বিধ্বস্ত হলেও চাঙ্গা ছিল রেমিট্যান্স প্রবাহ। ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রবাসীরা রেকর্ড ২ হাজার ৪৭৭ কোটি ডলার রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছিলেন। এক্ষেত্রে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৩৬ শতাংশেরও বেশি। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের শুরু থেকেই রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধির রথ থেমে গেছে। উল্টো অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) রেমিট্যান্স কমেছে প্রায় ২০ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, অক্টোবরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ১৬৪ কোটি ৬৮ লাখ ডলার। যদিও আগের বছরের একই মাসে ২১০ কোটি ২১ লাখ ডলার রেমিট্যান্স দেশে এসেছিল। এ হিসাবে সর্বশেষ মাসেও প্রবাসী আয় কমেছে ২১ দশমিক ৬৮ শতাংশ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত বছরের শুরুতে বিশ্বব্যাপী নভেল করোনাভাইরাসের বিস্তৃতি প্রবাসী বাংলাদেশীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছিল। ব্যবসা-বাণিজ্যের স্থবিরতাসহ কর্মহীনতা ও চাকরিচ্যুতির শিকার হয়ে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশী দেশে ফিরেছেন। ফেরার আগে অনেকেই নিজেদের সব সঞ্চয় দেশে পাঠিয়েছেন। আবার অনেকে দেশে থাকা স্বজনদের জন্য বাড়তি অর্থ পাঠিয়েছেন। যাতায়াত ব্যবস্থায় স্থবিরতার কারণে হুন্ডিসহ অবৈধ পথে অর্থ লেনদেনের পথগুলোও সংকুচিত ছিল। এসব কারণে ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে এসেছে। কিন্তু করোনা পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে আসায় রেমিট্যান্স প্রবাহের চিত্র পুরোপুরি পাল্টে গেছে।

রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধির ওপর ভর করে গত অর্থবছরে তরতর করে বেড়েছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। চলতি বছরের আগস্টে রিজার্ভের পরিমাণ ৪৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু আমদানি ব্যয়ে অস্বাভাবিক উল্লম্ফনের পাশাপাশি রেমিট্যান্স আয় কমে যাওয়ায় রিজার্ভের অর্থে টান পড়তে শুরু করেছে। অক্টোবরে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নেমে এসেছে ৪৬ বিলিয়ন ডলারে।

যদিও চলতি অর্থবছরের জন্য ঘোষিত মুদ্রানীতিতে রেমিট্যান্সে ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা করেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মুদ্রানীতিতে বলা হয়েছিল, চলতি ২০২১-২২ অর্থবছর শেষে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৫২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে। কিন্তু অর্থবছরের প্রথম চার মাসেই উল্টো ১৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ প্রবাসী আয় কমেছে।

অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে রেমিট্যান্স কমেছিল ২৭ দশমিক ৯৭ শতাংশ। এরপর আগস্টে ৭ দশমিক ৮৩ ও সেপ্টেম্বরে ১৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ কমেছে রেমিট্যান্স প্রবাহ। সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৭০৫ কোটি ৫১ লাখ ডলার। ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে ৮৮১ কোটি ৫৩ লাখ ডলার রেমিট্যান্স দেশে এসেছিল।

কয়েক মাস ধরেই জ্বালানি তেলসহ বিশ্ববাজারে ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ছে অস্বাভাবিক হারে। জ্বালানি তেল, ভোজ্যতেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নতুন নতুন রেকর্ড ভাঙছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ও অস্বাভাবিক মাত্রায় বাড়ছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্টেই আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৪৬ শতাংশ। আমদানি ব্যয়ের তুলনায় রেমিট্যান্স ও রফতানি আয়ে প্রবৃদ্ধি না হওয়ায় দেশের বাজারে ডলারের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। আন্তঃব্যাংকে প্রতি ডলার ৮৫ টাকা ৬৫ পয়সায় লেনদেন হলেও খুচরা বাজারে তা ৯০ টাকা ছুঁয়েছে। একইভাবে বাড়ছে পাউন্ড, ইউরোসহ অন্য সব প্রধান বিদেশী মুদ্রার মান। ডলারের মান সহনীয় রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে বাজারে প্রায় ১৫০ কোটি ডলার বিক্রি করেছে। যদিও বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে ২০২০-২১ অর্থবছরে বাজার থেকে রেকর্ড ৭৭০ কোটি ডলার কিনে নিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক।

Advertisements