মোদি মুসলমান ‘নির্মূলের’ উস্কানি তুলছেন

প্রশাসনিকভাবে ‘হরিদ্বার’ যদিও একটি জেলা শহর মাত্র, কিন্তু এটা ভারতে হিন্দুদের এক গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান [pilgrimage]। বয়স্ক হিন্দু নারী-পুরুষের কাছে সাধারণত এক আগ্রহ ও আকাঙ্খার নাম হরিদ্বার যে, যদি তিনি একবার তীর্থের উদ্দেশ্যে হরিদ্বার ঘুরে আসতে পারতেন! তীর্থ মানে হল পূণ্যসঞ্চয়ের উদ্দেশ্যে কোন “পবিত্র স্থান” ভ্রমণ। পবিত্র স্থান মানে সেসব জায়গাকে হিন্দু ধর্মীয় মিথিক্যাল ধারণায় গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান মানা হয়েছে। সাধারণত দেখা যায় বেশিরভাগ এমন তীর্থস্থানগুলো ভারতের উত্তরপ্রদেশেরও সর্ব-উত্তরে (ভারতের দিক থেকে উত্তর-পুর্ব কোণে) প্রায় নেপাল সীমান্তের কাছে।

গত ২০০০ সালের আগে এই হরিদ্বার ছিল ভারতের সবচেয়ে বড় রাজ্য উত্তরপ্রদেশের অংশ। কিন্তু গত নভেম্বর ২০০০ সালে উত্তরপ্রদেশের সর্ব-উত্তর অংশকে প্রশাসনিকভাবে উত্তরাখন্ড [Uttarakhand] নামে আলাদা আরেক রাজ্য বলে এর জন্মের ঘোষণা দেয় কেন্দ্রীয় সরকার। তাই হরিদ্বার এখন নবগঠিত উত্তরাখন্ড রাজ্যের ১৩ জেলার একটা। তবুও উত্তরাখন্ড ভারতের ছোট ছোট রাজ্যের কাতারেই রয়ে যায়। কারণ একটা তুলনা করলে, পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার (রাজ্য সরকার যে নির্বাচিত সংসদের হাতে গঠিত ও জবাবদিহিতা করে থেকে) ২৯৪ আসনের চেয়ে উত্তরাখন্ডে বিধানসভা মাত্র ৭০ আসনের , আবার কেন্দ্রীয় সংসদের আসন নিয়ে যদি তুলনা করি তবে পশ্চিমবঙ্গের ৪২ আসনের তুলনায় উত্তরাখন্ডের আসন মাত্র পাঁচটা। তবে এটা একটা জনসংখ্যাগত ধারণা পাওয়ার জন্য তুলনা মাত্র।

ওদিকে উত্তরপ্রদেশ মানে কুখ্যাত যোগী আদিত্যনাথ যার (বিজেপি) মুখ্যমন্ত্রী; যিনি জনপ্রতিনিধির পরিচয়ের চেয়ে কট্টর ধর্মীয় জবরদস্তির এক শাসক হিসেবে বেশি নাম কামিয়েছেন। পুরানা সেই উত্তরপ্রদেশের এক জেলা হরিদ্বার তীর্থক্ষেত্র হিসেবে নামডাকের আরেক কারণ, এটা হিমালয় পর্বতমালার পাদদেশে অবস্থিত। ফলে দু’টি নদী যমুনা ও গঙ্গা নদীর প্রবাহের শুরু, হিমালয়ের গা-চুইয়ে আসা বরফগলা পানির উৎস, এখান থেকেই। এই নদীর পানিতে স্নান, এর স্বর্গীয় প্রভাব ফেলার ক্ষমতা আছে – এই মিথ [Myth, মুখে মুখে প্রচলিত বহুপুরানো কোন ধারণা] সেখানে প্রচলিত। এ’কারণে এখানে গঙ্গাকে শুধু গঙ্গা না বলে আগে পবিত্র শব্দ বসিয়ে মানে ‘পবিত্র গঙ্গা’ লেখা বা উচ্চারণ এর রেওয়াজ। যদিও বর্তমানে সারা হরিদ্বারের মানুষের বসবাসের প্রধান সঙ্কটের নাম পানি। খাবার পানি বা চাষাবাদের পানি দু’টিরই সঙ্কট এখানে। নদী দূষিত আর পানি প্রাপ্যতা কমে গিয়ে শহর এলাকাগুলোয় হাহাকার উঠেছে।

উত্তরাখন্ডের ভেতরেই হরিদ্বার আর এই হরিদ্বার থেকে মাত্র কুড়ি কিমির বাস-দূরত্বের মধ্যেই আবার আরেক তীর্থের শহর ঋষিকেশ। ঋষিকেশ যোগ [Yoga] (পপুলারলি যা এটা ‘যোগব্যায়াম’ বলে পরিচিত) ও ধ্যান বা মেডিটেশন – একে বুঝবার জানবার শহর। এ’ছাড়া আরেক মিথিক্যাল গঙ্গাস্নানের ভুমিঘাট হল “কুম্ভমেলা” সেটাও এখানেই এই হরিদ্বারে। যা ১২ বছর পরপর আয়োজন করা রীতি আর এসময়ে গঙ্গাস্নানে খাস পুণ্য মিলবে- এ্মন বিশ্বাসে বা লোভে এবার (২০২১) সেখানকার মুখ্যমন্ত্রীর নিজের উদ্যোগে করোনার প্রকোপের মধ্যেও এ’মেলার আয়োজন চালু রেখেছিলেন। আর তাতে করোনাভাইরাসের সেকেন্ড ওয়েভে ভারতের প্রশাসন ও অর্থনীতি ভেঙে পড়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করা হয়। না ভাইরাসে আক্রান্তদের ভাগ্যে হাসপাতালের বেড অথবা শ্বাস সহজের অক্সিজেন মিলেছে কিংবা মারা যাবার পর সৎকার – কোনোটাই ঠিকমত কপালে জুটেনি কুম্ভমেলায় অংশগ্রহণকারীদের-সহ উত্তরপ্রদেশ ও ভারতের প্রায় সব শহরের বাসিন্দাদের। মোদি সরকারের সেকেন্ডম্যান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ পর্যন্ত দল বেঁধে গায়ে গা লাগিয়ে কথিত পুণ্যস্নানের লোভ সামলাতে পারেননি। এমন পুণ্যস্নানের পরে সৎকারবিহীন মৃত্যু যাদের হয়েছে তা নিয়ে খুব কিছু বলাও আসলে অস্বস্তিকর!

অর্থাৎ সাধারণভাবে মূলত ধর্মীয় ভিজিটর বা ট্যুরিস্টের শহর হরিদ্বার আর এটাই এর অর্থনৈতিক ভিত্তি। আর কমবেশি সারা উত্তরাখন্ডই এমন। যার পিছনের অর্থ হল – বড়লোক ট্যুরিস্ট নয়, পুণ্য আদায়ের লোভে বা বলা যায় স্পিরিচুয়াল চাহিদা মিটাতে নিম্ন আয়ের যারা এরাই এই শহরের প্রধান ভিজিটর। আর এ’ফ্যাক্টরের কারণে উত্তরপ্রদেশের যেকোনো নতুন স্থাপনা বা অবকাঠামো বা কারখানা উতপাদন তা আর এই ঘিঞ্জি তীর্থস্থানগুলোতে নির্মাণ করা নয়; বরং এদেরকে পাশ কাটিয়ে অন্য শহরে স্থাপিত হতে শুরু করেছিল। আর ততই এসব তীর্থস্থানের শহুরগুলো পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের নাম নিয়েছে। আর একপর্যায়ে নবগঠিত উত্তরাখন্ড হল আসলে তেমনই ওসব পিছিয়ে পড়া অঞ্চলগুলোর সমাহার। মানে পিছিয়ে পড়া শহরহুলোকে নিয়ে গঠিত নতুন রাজ্য। এবার কড়া সত্যটা বলি, এরই পরিণতি হল, উত্তরাখন্ড তাই সাধু-সাধ্বীদের [সাধু শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ সাধ্বী] দ্বারা নিয়ন্ত্রিত শহর। স্বভাবতই তাই বিজেপি-আরএসএসের বহু নামি-বেনামি অঙ্গসংগঠনের সক্রিয় তৎপরতার প্রধান শহর এটা। আর এসব ধর্মীয় নেতার প্রধান কাজ রাজনীতিবিদ ও রাজনীতিকে চ্যালেঞ্জ করে প্রকাশ্যে দায়-দায়িত্বহীন উস্কানি ও হুঙ্কার তুলে কথা বলা। আমাদের আজকের প্রসঙ্গ এটাই!

দুই মাস আগে আমার এক লেখায় ত্রিপুরার মুসলমানদের উপর নিপীড়নে করুণ মার্জিনাল অবস্থা লক্ষ্য করে বলেছিলাম, মোদি এখন সব হারানো মুসাফির, পাবলিক রেটিং যার তলানিতে। তাই সে এসব অপরাধমূলক নিপীড়নের রাস্তা ধরেছে। আর এসব কিছু নিয়ে আমাদের জল্পনা-কল্পনাতেও খুব দূরে যাওয়া জরুরি নয়। কারণ যেসব রাজ্যে মোদির ভরাডুবির সম্ভাবনা বলে বিজেপি নিজেই মনে করে তা বুঝার সবচেয়ে সহজ ফর্মুলা হল যে, যেসব রাজ্যে মুসলমান কোপানোর বিজেপি ততপরতা ও হুমকি যত বেশি বুঝতে হবে, বিজেপি মনে করে তাদের অবস্থা বা পাবলিক রেটিং ওখানে খুবই খারাপ। মোদির কাছে তাই, সমাজে মুসলমান হত্যার উন্মাদনা তোলাটাই ওসব কনষ্টিটুয়েন্সিতে হিন্দু-ভোটারদেরকে দলবেধে বিজেপি বাক্সে নিয়ে আসার শেষ ভরসা বা অবলম্বন। তাতে সরাসরি মুসলমান হত্যার উন্মাদনা আওড়ানো তা যতই মারাত্মকভাবে কনস্টিটিউশন বা নির্বাচন কমিশনের আইন লঙ্ঘন হোক না কেন, মোদি-অমিত তাতে পিছপা নন! বরং বেপরোয়া, দায়িত্বজ্ঞানহীন!

এসব বিচারে হরিদ্বার – এ তীর্থের শহর মানে পুণ্যলোভীদের খেদমত ও বিশ্বাস আরো শক্ত করা ও আশ্বাস দেয়ার উসিলায় সর্বজ্ঞানী, ধর্মজ্ঞানী ভাবধরে মিথিক্যাল গল্প ছড়িয়ে যারা পেটের ভাত জোগাড় করে এমন ‘পাণ্ডাদের’ শহর এটা। অরিজিনাল ‘পান্ডা’ শব্দের অর্থ, ধর্মীয় টুরিস্টদের ধর্মীয় ক্রিয়া-কর্মাদি পালন ও সম্পন্ন করার কাজে যারা ভিজিটরদের থেকে নেয়া ফি-এর বিনিময়ে সহায়তা দেয়। এই বিশেষ মানসিক স্থিতি ও পরিবেশটা কেমন তা বুঝানোর জন্য এই লেখার শুরু থেকেই প্রায় ৩০০ অক্ষর ব্যয় করলাম। এ’ছাড়া নতুন বছর, এই ২০২২ সালে মোদির জন্য নির্ধারক উত্তরপ্রদেশ ও উত্তরাখন্ড রাজের নির্বাচন, তা অনুষ্ঠিত হবে এই ফেব্রুয়ারি-মার্চে।

অতএব বলাবাহুল্য মোদির বিজেপির কাছে তাই হরিদ্বারের কথিত সাধু-সাধ্বীর কদর এখন তুঙ্গে। এদের ভাড়া করে নিয়ে হুঙ্কারের বক্তৃতা দেয়ানোর স্টাইলটা হল, তারা সরাসরি মুসলমানদেরকে তুচ্ছ জ্ঞান করে অপমান করে তাদের – মেরে ফেলবে, কেটে ফেলবে, পিষে ফেলবে – এথনিক ক্লিনজিং করে মুসলমান মুছে দেবে- এসব কথা বলবে তারা দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে। আর এদের দিয়ে বলানোতে মোদি আশা করেন, বিরোধীরা যেন আপত্তি না তুলে এই ভেবে যে, ওরা ‘ধর্মীয় লোক’ কত কিছুই না বলে। অথবা এরা, আধুনিক রাষ্ট্র কনস্টিটিউশন না বুঝে বলেছে এই ভেবে বিরোধীরা এটা উপেক্ষা করুক। আবার বিরোধীরা এ নিয়ে আপত্তি তুললে সেটা থেকে পরে পাওয়া সামাজিক হৈচৈ বিজেপির নির্বাচনী ইচ্ছা- হিন্দুভোটের পোলারাইজেশন সেটা করে দিক, এটাই মোদি-বিজেপির প্রধান খায়েস। আর সর্বোপরি পুলিশ যেন কোনো অভিযোগ না নেয় বা মামলাকে নিরুৎসাহিত করে এটাই অমিত শাহের এবারের ‘পবিত্র’ নির্বাচনী দায়িত্ব। এরই মধ্যে এক পুলিশ অফিসার সেসব জ্ঞান পাবলিককে বিতরণ করে দিয়েছে মিডিয়ায়। অথচ কাহিনী হল, এবার ক্রিকেটে পাকিস্তানকে সমর্থন-উচ্ছ্বাস দেখানোতে এক ভারতীয় কাশ্মিরি তরুণের বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসদমন আইনে চার্জ এনেছে পুলিশ।

হরিদ্বারে ‘ধর্মসংসদ’ এর আয়োজনঃ
এবারের ঘটনার শুরু যেভাবে, গত ১৭ থেকে ১৯ ডিসেম্বর হরিদ্বারে “ধর্মসংসদ” নামে সংগঠন এক আয়োজন করেছিল যার মূল আয়োজক ছিলেন এক বিতর্কিত কথিত ধর্মগুরু যতি নরসিংহানন্দ সরস্বতী। এদের নাম এমন বাহারিই হয়ে থাকে। “সমাবেশে আরো উপস্থিত ছিলেন হিন্দু রক্ষা সেনার প্রবোধানন্দ গিরি, বিজেপির মহিলা মোর্চার নেত্রী উদিতা ত্যাগী এবং বিজেপি নেতা অশ্বিনী উপাধ্যায়। ভাইরাল একটি ক্লিপে দেখা যায়, প্রবোধানন্দ গিরি বলছেন, ‘মিয়ানমারের মতো আমাদের পুলিশ, সেনা, রাজনীতিবিদ এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের সব মানুষকে হাতে অস্ত্র তুলে নিতে হবে। এবার ‘সাফাই [ক্লিনজিং] অভিযান’ চালাতে হবে।” এই ভাষ্যটা আনন্দবাজারের। এখানে সাফাই মানে ‘ক্লিনজিং বা ‘নির্মূল’ করা বুঝতে হবে। ভারতের দেয়া বাংলাভাষী বয়ান থেকে সরাসরি তা বুঝবার জন্য আনন্দবাজারের ভাষ্যটা এখানে এনেছি।

তবে আম-পাঠকদের জন্য একটা সাবধান-বার্তা জানিয়ে রাখি। হরিদ্বারের ওসব ধর্মীয় নেতার সরাসরি সেসব বক্তৃতা ইউটিউবে পাওয়া যাচ্ছে। বলাহুল্য, তা লোমহর্ষক, একটা মানুষ কী করে গোষ্ঠী-ধরে অপর মানুষদের খুন করার আহ্বান জানাতে পারে? কিন্তু তবু সাবধান আমরাও ওই ভিডিওর ব্যাপক প্রচার করে হিন্দুদের ‘অপর’ বলে তাদেরকেও খুন হতে খুনাখুনির উসকানি দিতে পারি না। সেটা আইনি চোখেও পালটা আমাদের ‘অপরাধ’ হবে। তাদের মতোই দায়দায়িত্বহীন কাজ হবে। এমন প্রত্যেক ইউটিউব ভিডিওর শুরুতে সেকথা স্পষ্ট বলা আছে; পাবেন। পড়ে নিতে পারেন। তারা অপরাধী মানুষ ও দায়দায়িত্বহীন হলে আমরা যারা ধর্ম-নির্বিশেষে এমন মুসলমান হত্যার ঘৃণা ছড়ানোর বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে চাই, তারাও তাদের মতোই অপরাধী ও দায়দায়িত্বহীন হয়ে যেতে পারি না।

এই অপরাধের শাস্তি কী?
গত ১৯৪৫ সালের আগের আর পরের দুনিয়ার এক মৌলিক ফারাক এখানেই। দুনিয়াতে কোনো দু’টা জনগোষ্ঠী স্বার্থ-সঙ্ঘাতে জড়িয়ে পড়লে অন্যকে ‘অপরজ্ঞান’ করে তাদের ‘গুষ্ঠি-সহ নির্মূলের’ কথা, উগ্র ঘৃণা ছড়ানোর কথা আমরা শুনে থাকি। অপরকে কোনো একটা শব্দ দিয়ে ব্যঙ্গ বা তুচ্ছ করে কথা বলা যেমন, পাকিস্তানিদের”পাকি” বলা বা হিন্দুদের ‘মালাউন’ বলা ইত্যাদি; ভদ্র বা আইনি ভাষায় এটাকে বলে ‘এথনিক ক্লিনজিং’-এর শুরুর প্রথমদিকের উস্কানি তুলে কথা বলা। যেটা এরপর গণহত্যার পথে যাবার আগাম-ধ্বনি!

এটাই ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলার গংয়ের প্রধান অপরাধ যিনি ঠিক এই কথিত সাধু-সাধ্বীদের মতই ‘এথনিক ক্লিনজিং’-এর উসকানি, কিল দেম [kill them]– এই আহ্বানে প্রধানত ইহুদিদের আর সাথে অন্য যেকোনো বিরোধীদের হত্যা করেছিলেন। তাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে দুনিয়াতে সেই প্রথম – আন্তর্জাতিক আদালত, জাতিসঙ্ঘ, মানবাধিকার সনদ ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে নানান সংগঠন গড়ে উঠে এবং এখান থেকেই ‘এথনিক ক্লিনজিং’-এর অপরাধে ‘সর্বোচ্চ শাস্তির’ সুপারিশ করা হয়। সেকালের জার্মানির ন্যুরেমবার্গ ট্রায়ালে হিটলারের বন্ধুদের বিচার হয়েছিল। পরে এই আইনের আরো ভুলত্রুটি সংশোধন করে নতুন করে ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট অ্যাক্ট ২০০১’ [ICC act 2001] গৃহীত হয়েছে। যেখানেও এই অপরাধের শাস্তি যাবজ্জীবন কারাগার। প্রতিটা আধুনিক রাষ্ট্রের কনস্টিটিউশনে একইভাবে একাজকে এমন অপরাধ বলে গণ্য করে রাখার কথা।

এথনিক ক্লিনজিং কথাটাঃ
দুনিয়ায় এখন সবচেয়ে বড় অপরাধের নাম “এথনিক ক্লিনজিং”। তবে নামটা আইনি ও ভদ্রভাষায় হাজির করা হয়েছে বলে অনেকের কাছে অস্পষ্ট লাগতে পারে। এথনিক [ethnic] এই শব্দকে খাস বাংলায় এটাকে বলি আমরা ‘জাতি’। তবে এটা ধর্ম, খাদ্যাভ্যাস, সংস্কৃতি, ভাষা ইত্যাদির ভিত্তিতে যাকে জাতি বা জনগোষ্ঠি বলে বুঝানো হয় সেই অর্থে। আর ক্লিনজিং [cleansing], এটা বলে বুঝানো হয় কোন জনগোষ্ঠির প্রতিটা সদস্যকে খুন করার কল্পনা বা হুমকি-মূলক ততপরতা। গত ১৯৭১ সালের সময় এটাই আরেক শব্দে বর্ননা করা খুব চালু ছিল যেমন বলা হত “পোড়া মাটির” নীতি। সম্ভবত সেখানে ব্যাখ্যার কল্পনাটা হল, একটা জনগোষ্ঠির যেখানে বসবাস সেই ভুখন্ডের সবকিছুকে আগুন লাগিয়ে পুরিয়ে দেয়া, এভাবে নির্মুল করা। অর্থাৎ যেখানে অবশেষ কেবল যা বাচে [residue] তা হল পোড়ামাটি-টা এই কল্পনা। আর বাংলা ভাষায় ক্লিনজিং শব্দ বাংলায় সবচেয়ে পরিচিত শব্দ হল ‘নির্মুল’। যেমন খেয়াল করেন, শাহরিয়ার কবিরে সংগঠন “ঘাতক-দালাল নির্মুল কমিটি” – এই নামের মধ্যে নির্মুল শব্দটা্কে। এখানে মজার তামাসা হল, শাহবাগে বসে একদিকে তারা “ন্যুরেমবার্গ ট্রায়ালের” মত জামায়াতের (কার্যত বুঝাতে চায় ইসলাম ধর্মের নিকুচি) বিচার চেয়েছে। অথচ এই বিচার যারা চাচ্ছে তেমন এক সংগঠনের নামই আবার নির্মুল কমিটি! মানে ক্লিনজিং করতে চাওয়াদের কমিটি।

সারা দুনিয়ায় এখন “গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেমে” সবচেয়ে ঘৃণ্য অপরাধের নাম “এথনিক ক্লিনজিং”। মানে কোন জাতি বা জনগোষ্ঠিকে নির্মুল বা মুছে ফেলার চেষ্টা ও কাজ। এটাই বড় আন্তর্জাতিক অপরাধ মানা হয়! তাই কাউকে “নির্মুল” করে দিবার অথবা মুছে ফেলে দিবার জন্য পাবলিকের মাঝে উস্কানি তোলা বা ক্লিনজিং – এক কঠিনতম অপরাধ। মোদী সেই অপরাধী এবং সেটা করতেও বেপরোয়া!

কিন্তু ভারতে এনিয়ে এখনো আমরা সুপ্রিম কোর্টের বিচারককে, সুয়োমোটো[Suo Moto] মানে কোন অভিযোগকারীর অপেক্ষায় না থেকে বিচারক নিজেই ঘটনা আমলে নিয়ে মামলার প্রক্রিয়া শুরু করা্; এর কোনো খবর নেই। এটা “জনস্বার্থ সমুন্নত রাখতে মামলাও” [Public Interest Litigation (PIL)] এর মতনও। তাও করা হয় নাই। আর ভারতীয় নির্বাচন কমিশন? তাদের নাম নিলে আমাদেরকেই যেন উলটা তওবা পড়তে হবে ! চলতি ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চের মধ্যে উত্তরাখন্ড ও উত্তরপ্রদেশ এ’দুই রাজ্যেই বিধানসভা নির্বাচন পরিচালনা করতে আসা এই কমিশনেরই দায়িত্ব। কাজেই সবচেয়ে সম্মুখসারির উপযুক্ত অথরিটি হল এই কমিশন! কিন্তু তারাও মনে হচ্ছে, তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে। আর মোদি সরকারের কথা আর কী বলব? প্রধান বেনিফিশিয়ারি হিসাবে বরং এঘটনায় ন্যায্যত মোদির সরকারের বিরুদ্ধেই মামলা হওয়ার কথা। কিন্তু না, অমিত শাহ উল্টা নিশ্চিত করছেন কথিত ‘সাধুদের’ যেন কেউ স্পর্শ না করে।

‘ঘৃণার সম্মেলন’ এখন কেন?
সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হল, হরিদ্বারে এই ‘ঘৃণার সম্মেলন’ এখন কেন? কেন গত ১৭ থেকে ১৯ ডিসেম্বর হরিদ্বারে ‘ধর্মসংসদ’ এর এই আয়োজন! আমরা জানি না ঠিক কিসের প্রতিবাদে তাদের এই হুঙ্কার? কোথাও কি মুসলমানরা কোনো সাম্প্রতিক ঘটনায় আপত্তি বা বাধা দিয়েছিল? না, এমন কোনো রেফারেন্স কথিত সাধুরাও দেয়নি। অর্থাৎ এ থেকে পরিষ্কার, এর উদ্দেশ্য একটাই – দুই মাস পরে নির্বাচন। আর তাতে সব হিন্দুভোট যেন বিজেপি বাক্সে যায় এই অনুমানে যতটা ব্যাপকভাবে পারা যায় এক মুসলমান ঘৃণা তীব্রতর করে হিন্দু-জোশ তোলা। আর মুসলমানদের বিরুদ্ধে যথেচ্ছ হুমকি গালাগালি দিয়ে হিন্দু-জোশ তোলার সমতুল্য এফেক্ট আর কী কিছু হতে পারে?

আবার এদের এই কথিত ‘ধর্ম-সংসদ’ শব্দটাই দেখুন। সংসদ শব্দটা দোজাহান-বাচক কোনো শব্দ নয়। শব্দটা কেবল বৈষয়িক দুনিয়া-কেন্দ্রিক। কারণ সংসদ মানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের একত্রে শলাপরামর্শের জন্য বসার নির্দিষ্ট স্থান। আর জনপ্রতিনিধি শব্দটা আমাদের এই বস্তুগত দুনিয়ার, কেবল এই জাহানের শব্দ। আমরা আল্লাহ বা সৃষ্টিকর্তাকে আমাদের প্রতিনিধিরূপে নির্বাচন করি না। আমাদের সম্পর্ক তা নয় বলেই সব ধর্মতত্ত্ব সেই সাক্ষ্য দেয়। কাজেই এই ধর্ম-সংসদ কী জিনিস? সোনার পাথরের বাটি- এরকম? যদি আবার ভুল শব্দে তারা ‘ধর্মের ক্ষমতা’ বুঝাতে চেয়ে থাকেন তো তবে এভাবে বর্ণনা করার অথরিটি তাদের কে দিয়েছে? দুনিয়ার কোনো রাষ্ট্রই তাদের এই অথরিটি দিতে পারে না।

তা হলে এরা কারা? এরা হলো ধর্মীয় গুণ্ডা যাদের মোদির দল ভাড়া করেছেন এই আসন্ন নির্বাচনী মৌসুমে।

তবে এতই ঘৃণ্য অপরাধীদের সম্পর্কে খুবই সীমিত দুই একটা ভারতীয় মিডিয়া রিপোর্ট করেছে। টিভি-মাধ্যমের মধ্যে করেছে এনডিটিভি, টেক্সট রিপোর্ট ও সাক্ষাৎকারে সবচেয়ে বিস্তারিত ও ডিটেইল রিপোর্ট করেছে বরাবরের মতো ‘ওয়াইর’ (WIRE) এই ওয়েব পত্রিকাটা। এ ছাড়া সবার আগে রিপোর্ট করেছে কুয়িন্ট (QUINT), দা প্রিন্ট করেছে এদের সবার থেকে নিয়ে, তা হলেও করেছে। এছাড়া বিজেপি সমর্থক এসব আখড়াগুলো কেমন এর বর্ণনা দিয়েছে এরা। অবশ্য যেসব মিডিয়া কিছুই বলে নাই, তাদের মুখ বন্ধ করতেও তো অর্থ লেগেছে!
বাংলাদেশে আমরা কত গভীর বিপদে আছে এর ভাল প্রমাণ হল কোন প্রগতিবাদী টু শব্দ করছে না। কোন একটা ছোট বিবৃতিও নাই; যেন মোদি যেহেতু ভারতের নেতা অতএব তিনিই হলেন “প্রগতিবাদের নেতা”। যেখানে এমনকি পাকিস্তানের ইমরান সরকার এই ঘটনার সিরিয়াসনেস বুঝাতে পাকিস্তানের ভারতীয় হাইকমিশনকে ডেকে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানিয়েছে। তারা এটাকে “ফ্যাসিজমের জন্মদাতা বাবা হওয়া” [beget fascism] বলে চিহ্নিত করেছে। কারণ আগেই প্রতিবাদী সচেতনতার লিড না নিলে আমরা তিনদেশের সাধারণ মানুষ এই ফ্যাসিজমের উন্মাদনায় এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে যেতে পারি!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]

Advertisements