মূল্যবোধের মূল মাপকাঠি কোনটি

সময়ের বিবর্তনে একটা জিনিস মোটামুটি কন্সট্যান্ট অবস্থায় বারবার দেখা যায়। তা হচ্ছে ধর্মকে পিছনে ফেলে ‘অগ্রবর্তী’ মানসিকতার জোরে তথাকথিত ‘অনগ্রসর’ সমাজকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা। এই কাজ সেই হযরত আদম (আঃ) এর জমানা থেকেই হয়ে এসেছে, এখনো হচ্ছে, এবং কিয়ামতের আগ পর্যন্ত হতে থাকবে। নবীজী (সাঃ) এর দেয়া ভবিষ্যৎবাণী অনুযায়ী (মহান আল্লাহ্‌ থেকে প্রাপ্ত তথ্য থেকেই তিনি তা বলেছেন) কিয়ামত তখনই আসবে যখন পৃথিবীর একজন মানুষের মনেও আল্লাহ্‌র বাণী থাকবে না। এর মানে কি সারা দুনিয়া তখন থাকবে স্বেচ্ছাচারীতার করতলে, নাকি ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে মানুষকে বিপথে পরিচালিত করা হবে — তা আল্লাহই ভালো জানেন।

এই আলোচনায় যাওয়ার আগে আমাদেরকে চিন্তা করতে হবে, ধর্ম কী? ধর্ম হচ্ছে মহান সর্বশক্তিমানের পক্ষ থেকে প্রেরিত কিছু দিকনির্দেশনা যা মানুষকে ইহজীবনে চলার পথ বাতলে দেয়। এই বাতলানো পথে চললে আছে পরকালে বিশাল পুরস্কার এবং একই সাথে বিশাল শাস্তি থেকে মুক্তি। ভালো এবং খারাপের মধ্যে পার্থক্য গড়ে তোলার প্রাথমিক কাজ ধর্মই করে দেয়। মূলত সমাজের বিধিবিধান ও রীতিনীতির মূলে রয়েছে ধর্ম। সমাজের মূল ভিত্তি বা কংকাল হচ্ছে ধর্ম এবং সেই কংকালের উপর চামড়া-গোস্ত হিসেবে সামাজিক আচার আচরণ তৈরি হয়।

এখন ধর্মই যদি সমাজের মূল ভিত্তি হয়ে থাকে তাহলে তো আপনি বলতেই পারেন: সমাজের রীতিনীতি অনুসরণ করলেই তো ধর্ম অনুসরণ করা হচ্ছে, তাহলে সমস্যা কোথায়? সমস্যা হচ্ছে সমাজ পরিবর্তনশীল। সমাজের ভিত্তি ধর্মের উপর হলেও এর সাথে আরো অনেক কিছু মিলে আছে। দেখা যায়, কালের বিবর্তনে এই চামড়া-গোস্তের ওজন কংকালের ওজনকে ছাড়িয়ে যায়। তখনই সমাজ হয়ে পড়ে ধর্ম বিচ্যুত। সমাজে বিভিন্ন অকাজ-কুকাজও তখন গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে, যা ধর্মের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়।

আপনাকে মনে রাখতে হবে, ধর্ম হচ্ছে একমাত্র ভিত্তি যা ধ্রুব। পৃথিবীর শক্তিশালী ধর্মগুলোর সরাসরি উৎপত্তি হয়েছে, অথবা প্রচন্ডভাবে প্রভাবিত হয়েছে, আসমানী কিতাব থেকে যা আল্লাহ্‌ মানব ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে মানুষকে রাস্তা দেখাতে পাঠিয়েছেন। এর শুরু হয়েছে হয়েছে হযরত আদম (আঃ) থেকে এবং শেষ হয়েছে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর সময়ে এসে। এই আসমানী কিতাবের কয়েকটি চিরতরে হারিয়ে গেছে, কিছু এখনো টিকে আছে। তবে মুসলমানেরা বিশ্বাস করেন যে সর্বশেষ নাজিল্কৃত আসমানী কিতাব কুরআন শরীফই একমাত্র গ্রন্থ যা শুরু থেকে এখন পর্যন্ত অবিকৃত আছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে।

এখন ধর্মের কথা এবং শিক্ষা আপনার কাছে ভালো না-ও লাগতে পারে, কিন্তু ধর্ম হচ্ছে ধর্ম। আপনি ধর্ম মানতে পারেন, না-ও মানতে পারেন। সেটা আপনার ব্যাপার। মানলে আপনি ধার্মিক, জীবনকে ধর্ম অনুযায়ী চালাতে অনীহা থাকলে আপনি আস্তিক কিন্তু অধার্মিক, যদি ধর্মে (পক্ষান্তরে সর্বশক্তিমানে) বিশ্বাসই না করেন, তবে আপনি নাস্তিক; যদি আপনি ধর্ম আছে না নেই, র্সৃষ্টিকর্তা আছে না নেই তা নিয়ে দোলাচালে থাকেন তবে আপনি ‘agnostic’ যার বাংলা হচ্ছে ‘অজ্ঞানবাদী/অজ্ঞেয়বাদী’ (যথার্থ অনুবাদ বলেই মনে করি)। আপনি যদি ধর্ম মেনে চলেন তবে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলতে হবে, ধর্মে যা ভালো বলেছে তাকে ভালো এবং ধর্মে বর্ণিত খারাপকে খারাপ হিসেবে মানতে হবে। হাজার বছর ধরে নবী পাঠিয়ে আল্লাহ্‌ এই কথাই সকলকে শিক্ষা দেয়ার চেষ্টা করেছেন।

অন্যদিকে সমাজ কী? সমাজ হচ্ছে সমষ্টিবদ্ধ মানুষ। সামাজিক আচার আচরণ হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট জনপদে বাস করা দলবদ্ধ মানুষের সামষ্টিক চিন্তাভাবনার প্রকাশ। যে এই সামাজিক আচার আচরণ মেনে চলে না তাকে সমাজ সমাদর করে না। কারো ভিতরে যদি সামাজিক রীতিনীতি মেনে না চলার প্রবণতা অতিমাত্রায় বেড়ে যায় তবে এক পর্যায়ে তাকে সমাজ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়তে হয়।

সমাজ কারা চালায়? সমাজ চালায় মানুষ। মানুষ কী চায়? সে চায় স্বাধীনতা, ইচ্ছা মতন যা খুশি তা করার স্বাধীনতা, মনের খায়েশ মেটানোর স্বাধীনতা। অন্যদিকে ধর্ম কী চায়? ধর্ম চায় মানুষকে একটি নির্দিষ্ট গন্ডির মধ্যে বেঁধে রেখে একটি বাসযোগ্য পৃথিবী তৈরি করতে যেন তা একটি পাগলা গারদে পরিণত না হয় যেখানে যে যা খুশি তাই করে বেড়াচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই অধার্মিক মানুষ ধর্মকে দেখে একটি শৃঙ্খল হিসেবে, তার স্বাধীনতার খর্বকারী হিসেবে, তার জীবনের পরিপূর্ণ বহিঃপ্রকাশের অন্তরায় হিসেবে। তারা কী চায়? তারা চায় ধর্মকে পিছনে ফেলে তাদের মনের মতন করে সমাজকে গড়ে তুলতে, যেখানে কোনো লোকলজ্জা ও চক্ষুলজ্জার ভয় ছাড়াই সবাই যে যা খুশি করতে পারবে।

এখন আপনি এই ব্যাপারে মত দিতে পারেন যে, ‘যে যা খুশি’ করতে পারবে না কেননা সে একটি সমাজে আছে, সমাজ তাকে এই কাজ করা থেকে বিরত রাখবে। এই কথা বলার সময় আপনি হয়তোবা ভুলে যাচ্ছেন যে, এই সমাজটা হচ্ছে জোটবদ্ধ মানুষের চিন্তাভাবনার প্রতিচ্ছবি। বিশেষ করে ক্ষমতাবান গোষ্ঠী যেভাবে চায়, সমাজ সেভাবেই আস্তে আস্তে করে রূপান্তরিত হয়। মানুষ তার খায়েশ চরিতার্থ করার জন্যে সমাজকে পরিবর্তিত করে ফেলে। এই কাজ সাধারণত রাতারাতি হয় না, ধীরে ধীরে হয়। তবে যত সময় যায় এই পরিবর্তনের গতি বাড়তে থাকে। প্রথম রূপান্তর হতে সময় অনেক লাগলেও পরবর্তীতে অনেক রূপান্তর রাতারাতিও হয়ে যেতে পারে।

এই কারণেই আমাদের দেশে বর্তমানে সুদ সামাজিকভাবে স্বীকৃত (আমাদের নবীজী (সাঃ) বলেছিলেন, এমন এক সময় আসবে যখন রাস্তার ধুলোর মধ্যেও সুদ মিশে থাকবে)। ছেলে-মেয়ে সোশ্যাল ড্রিংকার (সামাজিক অনুষ্ঠানে গেলে একটু আধটু মদজাতীয় জিনিসপত্র দিয়ে গলা ভেজায়) এইটা অনেক মা-বাবা বা স্বামী-স্ত্রী মেনে নিয়েছেন। এমনকি অনেক সামাজিক সার্কেলে আনন্দের শুরুই হয় মদ দিয়ে, মদ না খাওয়াই সেখানে অস্বাভাবিক। নারী স্বাধীনতা ও ব্যক্তি স্বাধীনতার নামেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে অশ্লীলতাকে প্রশ্রয় দেয়া হচ্ছে। দূর্নীতিকে সবাই খারাপ বললেও সমাজের একটি বিশাল অংশ কোনো না কোনোভাবে দূর্নীতির সাথে জড়িত। সমাজ দূর্নীতিকে পছন্দ না করলেও মেনে নিয়েছে। একইভাবে, বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কও এখন আর একেবারে রাখঢাক করে হয় না। ভাবখানা এমন যে কেউ নিঃসঙ্গ বোধ করলে তাঁর জন্যে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক করা যেন বৈধ! সমকামীতার খড়গ তো এখন আমাদের মাথার উপরেই ঝুলছে।

সামাজিক রূপান্তরের ধারায় এখন এমন সময় এসেছে যে আগে যাকে সবাই খারাপ বলতো, এখন আর তাকে কেউ জোরালোভাবে খারাপ বলে না; বললেও তা বলতে হয় ইনিয়ে বিনিয়ে। কিছু জিনিস এমন হয়ে গেছে যে, খারাপ জিনিসকে খারাপ বললে এখন আবার সমাজ থেকে উলটো খারাপ কথা শুনতে হয় যে বক্তার মানসিকতা ততটা ‘মুক্ত’ নয়! তার মানে দাঁড়াচ্ছে যে, আপনি নিজের খায়েশের বশবর্তী হয়ে যখন কাজ করবেন তখন আপনি হয়ে উঠবেন ‘মুক্তমনা’। যারা তা সমর্থন করবে না তারা হচ্ছেন ‘গোঁড়া মৌলবাদী’!

২০১০-এর দশক থেকে সমকামীতা বেশ সমাজসিদ্ধ হয়ে গেছে। পশ্চিমা বিশ্ব তো বটেই, বাংলাদেশের মতন মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশেও একটি গোষ্ঠী সমকামীতাকে সমাজে গ্রহণযোগ্য করানোর জন্যে উঠেপড়ে লেগেছে। কে জানে, সামাজিক বিবর্তনের এই ধারায় পশুর সাথে মিলনে আগ্রহীরাও কি ভবিষ্যতে তাদের দাবী নিয়ে মাঠে নেমে যাবে যে, তাদের ‘চাহিদা’-র প্রতিও সম্মান দেখাতে হবে? নবীজী (সাঃ) এর হাদীসে ভবিষৎবাণী এসেছে যে এমন এক সময় আসবে যখন নির্লজ্জ মানুষ প্রকাশ্য স্থানে যৌনকার্যে লিপ্ত হবে। তার মানে দাঁড়াচ্ছে এক সময় এই কাজ করাকেও সমাজের একটি অংশ তাদের অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলবে। কীভাবে তারা তা করবে? সামাজিক নিয়মকানুন ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলের মাধ্যমে। আগামীকালকেই কেউ যদি এই কাজ করে ফেলে, তবে আমি নিশ্চিত সমাজে বেশ হইচই পড়বে, কিন্তু সাথেসাথে আরেকটি দলও দাঁড়িয়ে যাবে এই বলে যে, যার যা ইচ্ছা করার অধিকার আছে।

সমাজ আজকে যা ভালো বলছে কালকে তা ভালো না-ও বলতে পারে, আবার ঠিক উল্টোটাও হতে পারে। আজকের ঘৃনিত কাজটিই কালকে সমাজে সিদ্ধ হয়ে যেতে পারে। আবার সমাজের চোখ ফাঁকি দিয়েও আপাতদৃষ্টিতে ভালো কিছু মানুষ অনেক খারাপ কাজ করে যাচ্ছেন। সমাজের জনপ্রিয় সেই ‘ভালো মানুষ’ কিন্তু দরজার পিছনে অনেক খারাপ কাজ করেও ভালো মানুষ হয়ে দেশ ও দশের কল্যাণে কাজ করার সবক দিয়ে যেতে পারেন। কেউ জানতেও পারবে না তার আসল কীর্তির খবর, যদি না কেউ তা সামনে নিয়ে আসে। সামনে আনলেও তার একটি সমর্থক গোষ্ঠী দাঁড়িয়ে বলবে এটা ব্যক্তি স্বাধীনতা। জীবন নিয়ে যা খুশি করার স্বাধীনতা নাকি প্রত্যেক ব্যক্তির রয়েছে (যেমন, পূর্ণবয়স্ক দুজন মানুষ একসাথে সম্মতি দিলেই নাকি সবকিছু করা যায়)! আরেকটা মজার ব্যাপার হলো, ধর্মীয় বিধিবিধানকে পরিষ্কারভাবে লঙ্ঘন করার পরেও একটি গোষ্ঠী আবার বলতে থাকেন, আমাকে ধর্ম দিয়ে বিচার করতে আসবেন না, আমি ধার্মিক, ধর্ম আমার মনের ভিতর! এই ফাঁপা গলাবাজিও সামাজিক বিবর্তনেরই একটি ফল।

তাই আসুন, ক্রমাগত রঙ বদলাতে থাকা পচনশীল এই সমাজকে খুশি করার চেষ্টা বাদ দিয়ে ধর্মকে আঁকড়ে ধরি। ধর্মের দেখানো পথে যে সত্যি করে হাঁটার চেষ্টা করে সে দরজার সামনে এবং পিছনে দুই জায়গাতেই এক রকম, কারণ সে বিশ্বাস করে যে তার বিধাতা সবই দেখছেন। একজন সত্যিকারের ধার্মিক মানুষের কাছে ভন্ডামির জায়গা নেই (উল্লেখ্য ভুল আর ভন্ডামি কিন্তু এক না, আশা করি বুঝতে পারছেন)। আর আপাতদৃষ্টিতে ধার্মিক কোনো মানুষ যদি বুঝেশুনে ক্রমাগত তা করে যেতেই থাকে তবে বুঝতে হবে যে সে ধর্মকে নিয়ে ভন্ডামি করছে, শুধু নিজের সামাজিক সুবিধার কাজেই লাগাচ্ছে, আর কিছু না।

সমাজে বিবর্তন হবেই। চাইলেও আপনি তা ঠেকিয়ে রাখতে পারবেন না। মহানবী (সাঃ) এর প্রদত্ত ভবিষ্যৎবাণীও সত্যি হবেই এবং এক সময় কিয়ামত আসার পরিস্থিতি তৈরি হবেই। প্রশ্ন হলো, এই সময়ের স্রোতে আপনি কোন দলের ভিতরে থাকবেন? স্বাধীনভাবে যা খুশি তা করাকে বৈধতা দিয়ে সমাজে ‘মুক্তমনা’ হিসেবে বাহবা নিতে সোচ্চার? নাকি, নিজেকে সামলে চলে মনের গভীরের অনেক খায়েশ বিসর্জন দিয়ে পরকালের ভালো ফল পেতে বদ্ধপরিকর? আপনার সিদ্ধান্তের উপরেই নির্ভর করবে আপনার আসল ভবিষ্যৎ।

আল্লাহ্‌ আমাদের সকলকে সঠিক বুঝ দান করে সঠিক রাস্তায় চলার তৌফিক দান করুন, আমীন।