মিডিয়া - মিডিয়া, মতাদর্শ ও বাণিজ্য-বাসনা - সত্য ও নিরপেক্ষ সংবাদ

মিডিয়ার চরিত্র বোঝা এ সময়ের গুরুত্বপূর্ণ কাজ । মিডিয়া ‘গণমাধ্যম’ অনুবাদে হাজির হয়ে তার মধ্যকার আমলাতান্ত্রিক-ব্যবসায়িক অবয়বকে সুকৌশলে লুকিয়ে রাখে। মিডিয়া নানাভাবেই নিজেকে উপস্থাপন করতে চেষ্টা করে ‘সৎ’, ‘পবিত্র’ ও ‘জনমতের প্রতিফলনকারী’ প্রতিষ্ঠান হিশেবে । কিন্তু আজকাল প্রতিফলন তত্ত্ব দিয়ে মিডিয়াকে আর বোঝা যাবেনা । কারণ বাস্তবতাকে তুলে ধরার পাশাপাশি মিডিয়া নতুন বা ছদ্ম বাস্তবতা তৈরি করে থাকে । আমাদের বাস্তব দুনিয়া আর আমাদের বাসনার মাঝখানের ফাঁকা অংশটুকুতে মিডিয়া জায়গা করে নেয় । এভাবে মিডিয়া এক হাইপার রিয়ালিটি তৈরি করে আমাদেরকে দৈনন্দিন চমকের মধ্যে রাখে, এবং তাই আমরা মিডিয়াকে প্রশ্ন করতে ভুলে যাই। বিশেষ বাস্তবতায় মিডিয়া তার মনস্তাত্ত্বিকভাবে মানুষকে প্রভাবিত করার ক্ষমতাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে। মিডিয়ার পরিসরে রাজনীতি আর ব্যবসা তখন যুগপৎভাবে চলে ।

আজকের পৃথিবীতে মিডিয়া সামাজিক বা ঐতিহাসিকভাবেই অধিপতি শ্রেণীর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান । মিডিয়া কোন বিষয়কে গুরুত্ব দিবে, কোনটিকে লুকাবে –তা প্রায়শই বিশেষ বিশেষ স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর সাথে তাদর সংযোগ ও সম্পর্ক দিয়ে নির্ধারিত হয় । তাই কর্পোরেট ক্যাপিটালিজমের এই যুগে মিডিয়ার স্বাধীনতা ও দায়বদ্ধতার মানে হোল, জনস্বার্থ ও ব্যবসায়িক- রাজনৈতিক স্বার্থের মাঝরেখা বরাবর বা ছেদ বিন্দুতে অবস্থান করা । চমস্কি তো বলেই দিয়েছেন, মিডিয়া যেমন আমাদের তথ্য, আনন্দ আর বিনোদন দ্যায়, তেমনি এটি আমাদের মধ্যে কিছু বিশ্বাস, মূল্যবোধ আর আচরণ প্রোথিত করে দেয় যা আমাদেরকে সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সমগ্রতার মধ্যে স্থিত রাখবে । মিডিয়া একটি consciousness industry যার মধ্য দিয়ে ওয়াল্টার লিপম্যান কথিত manufacture of consent ঘটে । তাই শাসক শ্রেণী মিডিয়াকে নানাভাবে ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ করতে চায় । তাই শাসক শ্রেণী মতপ্রকাশের স্বাধীনতার দোহাই দিয়ে নিজেদের অনুগত মিডিয়া তৈরি করে যাতে ভিন্নমতকে অনুপুস্থিত রাখা যায় বা পুঁজির নিরাপত্তার স্বার্থে যতটুকু না রাখলেই নয়, ততটুকু রাখা যায়। বিশেষ বয়ানকে প্রতিষ্ঠা, উৎপাদন ও পুনরুৎপাদনে মিডিয়ার জুরি নেই। মিডিয়া, আলথুসার কথিত আইডিওলজিকাল স্টেট এপারেটাস বা মতদর্শ তৈরির কারখানাও বটে।

মিডিয়াকে ফ্যাসিবাদ ব্যবহার করে এবং মিডিয়াও প্রায়শই সোৎসাহে ব্যবহৃত হয়। থিওডোর এডোরনো ভিকটিমের উপর দায় চাপানোর সংস্কৃতিকে ভয়াবহ ফ্যাসিস্ট আচরণ বলে অভিহিত করেছেন(ONE OF THE MOST SINISTER FEATURES OF THE FASCIST CHARACTER)।ক্ষমতার জরুরী মুহুর্তে মিডিয়ার এই ফ্যাসিস্ট আচরণ প্রতিনিয়তই দেখে থাকি আমরা। মনোবিশারদ উইলিয়াম রাইয়ান “ব্লেমিং দ্য ভিকটিম” টার্মটি ১৯৭১ সালে প্রথম তাঁর এক বইয়ে ব্যবহার করেন। এটি দিয়ে তিনি এমন একটা মতাদর্শকে বুঝান যা বর্ণবাদ বা সামাজিক অন্যায়কে ন্যায্য প্রতিপাদনে ব্যবহৃত হয়।

বাস্তবের টিভি যখন বন্ধ থাকে, মনের টিভি তখনো খোলা থাকে। এমনকি, বিজ্ঞাপনগুলোও আমাদেরকে ভোক্তা বা সম্ভাব্য ভোক্তাই ভাবে। আপনি যখন একটা “ফেয়ার এন্ড লাভলী” কেনেন, তখন আসলে দুটি জিনিস কেনেন।

এক. পণ্যটি আর, দুই. এই মতাদর্শ যে, ফর্সা মানেই সুন্দর। বিজ্ঞাপনী নারী যখন ক্রিম ব্যবহার করে ঝকঝকে ফর্সা হয়ে উঠে তখন তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে “স্বামীরা তো এমনই হয়”। মানে, স্বামীরও প্রিয় হতে হবে ফর্সা বউ ৷ বউকে ফর্সা করতে স্বামী কিনতে থাকবে ফেয়ার এন্ড লাভলী। স্ত্রীও তার বান্ধবীকে উৎসাহ দিতে থাকবে ” ফেয়ার এন্ড লাভলী” ব্যবহারে। ফুলে উঠবে কোম্পানি আর আমরা “ফর্সা মানেই সুন্দর” এই মতকে আদর্শ ভেবে ক্রমাগত অস্থির থেকে হতে থাকবো অস্থিরতর । লাক্সের বিজ্ঞাপনের “আমি স্টার হয়ে যাই” বলাটা প্রতিটি নারীকে, এমনকি পুরুষকেও, সাবান ব্যবহার নামক ক্রিয়ার ভেতর দিয়ে অবচেতনে যুক্ত করে দেয় দীপিকা বা ঐশ্বরিয়ার সুরভি, সৌন্দর্য আর সুঘ্রাণের সাথে । এইভাবে মিডিয়া, টিভি, বিজ্ঞাপন আমাদেরকে নতুন পরিচয়ে পরিচিত করে যার নামঃ ভোক্তা। অথবা মতাদর্শের গ্রহীতা । পুঁজিবাদ, বা ভোগবাদি মতাদর্শের নিসংশয় গ্রহীতা হয়ে উঠি আমরা, প্রায় অজান্তেই। আমরা নির্দিষ্ট পণ্যের পছন্দের বৃত্তে আটকে পরি ও তাকেই আমরা স্বাধীনতা ঠাওরাতে অভ্যস্ত হই, আত্মতুষ্টির ঢেকুর তুলি।

চিহ্নায়নের এজেন্সি হিসেবে মিডিয়ার অপরিসীম প্রভাব আছে আমাদের জীবনে । যাকে অনেকে বলেন, অনেকটাই সন্তানের উপর পিতা-মাতার প্রভাবের মতই । বিশেষত, টিভি মিডিয়া তার বহুবর্ণীল উজ্জ্বল স্ক্রিনে যে মায়া বাস্তব বা অর্ধসত্য নির্মাণ করে , নিজস্ব ছাকুনির মাধ্যমে যে অংশটুকু তুলে নেয় সমাজদেহ থেকে , তার তলানিতে পরে থাকে বাস্তবতার আরও আরও চেহারা ও অবয়ব । এই উপরিবাস্তবকেই Baudrillard বলেছেন ‘Loss of the Real’। যাহোক, সমাজে ভিন্নমতের নানা মিডিয়ার উপস্থিতি প্রয়োজন যাতে এক মিডিয়া যা হারায় আরেক মিডিয়া তা ধরে রাখতে পারে । ফলে পরিবেশনের মধ্যে যে রাজনীতি থাকে তা বুঝে জনগণ তার কর্তব্য নির্ধারণ করতে পারে । ফলে, কণ্ঠস্বর স্তব্ধ না থাকার কারণে সশস্ত্রতার মধ্য দিয়ে নিজের উপস্থিতিকে জানান দেয়ার বাধ্যবাধকতা থাকেনা ।

তাই বুঝা যায়, মিডিয়া সরল সমতলে কাজ করেনা । সমাজে মিডিয়ার নানা কাজের বিরোধিতার ধারাকে ম্রিয়মাণ করে রাখলে মিডিয়া খুব সহজেই গণবিরোধী চরিত্র নিতে পারে । তাই প্রয়োজন একদিকে মিডিয়ার গণনজরদারি আর আরেকদিকে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মিডিয়াকে ইতিবাচক শক্তি হিশেবে প্রতিপালন । এই দ্বৈত দায়িত্ব সমাজের সুষ্ঠু বিকাশের শর্ত । আমাদের সমাজ কতটুকু প্রস্তুত ?

২.
আধুনিক বাণিজ্যিক বা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো পুঁজিবাদের ইন্টারনাল ডিনামিক্স মেনে চলে । দান বা সমাজসেবার নামে তারা যা করে তার পেছনে থাকে মুনাফার লোভ, চতুর বাণিজ্যবুদ্ধি ও ব্যবসাচিন্তা ।অনেকের কাছেই যা প্রতীয়মান হয় সমাজসেবা বা সমাজকর্ম ব’লে ,তা নিরেট ব্যবসাকৌশল ছাড়া কিছু নয় । দরিদ্রদের নিয়ে চিন্তা ক’রে কত লোক বড়লোক হলো তার হিশাব নাই !কিন্তু, এতে দারিদ্র্যের পুনরুৎপাদন বন্ধ হয় নাই ।

সম্পদের দারিদ্র নয় শুধু, দরিদ্র মেধা নিয়ে বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও কথাটি সমান প্রাসঙ্গিক।

আধুনিক ব্যবসা মনস্তত্ত্বানুসারে, ক্রেতার জন্য ফ্রি পণ্য সরবরাহ করা , ক্রেতাকে নেটওয়ার্কের মধ্যে রাখা,ক্রেতাসমাবেশ করা, প্রতিনিয়ত বিজ্ঞাপন করে যাওয়া ভোক্তাকে আটকে ফেলে নির্দিষ্ট ‘চয়েস’ এর বৃত্তে, এবং তখন ঐ ভোক্তাই এই বৃত্তাবদ্ধতাকে মনে করে স্বাধীনতা । বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানের দান-খয়রাত ও ‘সেবামুলক’ (আসলে আত্নস্বার্থমূলক) )কর্মকান্ডকে তার কাছে মনে হয় মহৎ মানবিকতা । ক্রেতা ধরে রাখার কৌশলকে মনে হয় উদ্যম ও আন্তরিকতার পরাকাষ্ঠা।তখন ওই ক্রেতাই হয়ে উঠে কোম্পানীর অঘোষিত ‘এজেন্ট ’, অসচেতন বাজারি প্রচারক । অফিসের চাকচিক্য , আয়োজনের সমারোহ, মুখে লেগে থাকা হাসিও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে প্রযোজিত থাকে ব্যবসালয়ে । ক্রেতা সাময়িক মুগ্ধতা ও ঘোরে এসবের অনেক কিছুই ধরতে পারেনা । এভাবে পুঁজিবাদী প্রতিষ্ঠান, মুনাফাকামী সংস্থা ক্ষতি করে ,ও দখলে নেয় আপনার মনোজগত, ভাবনার ক্ষমতা । আখেরে আপনি হয়ে উঠেন প্রশ্নহীন কলের পুতুল । চাবিও দেয়া লাগেনা , চাবি দেয়াই থাকে, ও চাবি দেয়ার কার্যক্রম প্রতিনিয়ত চলতেই থাকে। ‘গুডউইল’ নির্মাণপ্রচেষ্টা বাণিজ্যবিস্তারের সাথে যুক্ত —এই ভাবনাও তখন মস্তিস্ক থেকে অপসৃত হয় ।

‘গুডউইল’ নিজেই পুঁজি যা বিনিয়োগকৃত হতে হতে মুনাফার্জনের পথকেই প্রশস্ত করে । আবাল ভোক্তা নিজের সুখে তখন নিজেই নৃত্যরত । পুঁজিবাদ, বিজ্ঞাপনী সভ্যতা, মিডিয়ায় পত্রবাজি বাহিরকে যতটা চাকচিক্যময় ক’রে দেখায়, ভেতরটা আসলে ততটাই শুন্য থাকে। সমস্ত সরবতার পেছনেই থাকে মানি মোটিভ ও পাওয়ার ইন্টেন্ট।

জেরেমি সিব্রুকের একটি নিবন্ধ পড়েছিলেম গার্ডিয়ান পত্রিকায় । সেখানে দেখানো হয়েছে, দারিদ্র একটা ‘স্ট্রাকচারাল নেসেসিটি’ যেটা পুঁজিবাদের দরকার হয় নিজের মহত্ত্ব ও প্রয়োজনীয়তাকে ন্যায্য প্রমাণ করতে। দরিদ্র(সম্পদ/চিন্তা) শুধু গ্রহীতা হওয়ার বাস্তবতার কারণে ন্যায়-অন্যায়,ন্যায্য-অন্যায্যের বোধ হারায়,ও সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম থেকে পিছু হটে, নির্বিকার থাকে । রাষ্ট্র যখন স্বেচ্ছায় নিজেকে গুটিয়ে রাখে ‘ডিস্ট্রিবিউটিভ জাস্টিস’ নিশ্চিত করা থেকে, তখন ‘নানা প্রতিষ্ঠান’ সেবা ও জনকল্যাণের নামে গড়ে তোলে ‘প্রফিট নেটওয়ার্ক’ যা অনেকের কাছেই প্রতিভাত হয় “সোসাল সার্ভিস” হিসেবে।

চিন্তার দারিদ্র্য ও পশ্চাতপদতা যতটা ক্ষতি করে ততটা আর কিছুতে করেনা । তাই সমস্ত আরোপিত মুল্যবোধ ও মহত্ত্বকে প্রশ্ন করা শিখতে হবে । সমাজে বিদ্যমান কোন ভাবনাকেই প্রশ্নবিহীনভাবে মেনে নেয়া যাবেনা । যা কিছুই চিন্তাকে স্তম্ভিত করে দেয় ,যা কিছুই আপনার ভাবনাকে আটকে ফেলে, এমন সব ফ্রেমবদ্ধতার সাথেই দরকার সমালোচনা ও পর্যালোচনামূলক বোঝাপড়া । ভাবনার অভ্যাস স্থগিত হয়ে গেলে মানুষ যন্ত্রের অধিক কিছু আর থাকেনা । ছবি ও কথার বিজ্ঞাপনী ইন্দ্রজাল থেকে কিছুটা মুক্ত হয়ে সজ্ঞানে চিন্তার ও পর্যালোচনার অভ্যাস করলে গড়ে উঠবে সহনশীলতা,খসে পড়বে অনেক ভুয়া মহত্ত্বের আস্তরণ, ও ভেংগে পড়বে রুগ্ন চিন্তার স্বার্থমগ্ন ভিত্তি।

লেখকঃ প্রাবন্ধিক ও চিন্তক। সম্পাদক : চিন্তাযান।