মানুষের বৈজ্ঞানিক আধিপত্য এবং পরিবেশবাদ

আঠারো শতাব্দীর শুরুতে পৃথিবীর জনসংখ্যা ছিল ১ বিলিয়ন, আর উনিশ শতকের শুরুর দিকে তা ছিল ১.৬ বিলিয়ন। সেই সংখ্যাটাই মাত্র ১ শতাব্দীর ব্যবধানে এখন দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭.৮ বিলিয়নে।

হাজার হাজার বছরের মানব ইতিহাসে মাত্র দুই শতাব্দীর ব্যবধানে পৃথিবীর জনসংখ্যা কখনো প্রায় ৮ গুণ বৃদ্ধি পায় নাই। অথচ এর মাঝে স্মরণকালের সবচেয়ে প্রাণঘাতী মহামারি ও বিশ্বযুদ্ধ গুলো সংঘটিত হয়েছিল।

জনসংখ্যার এই নজিরবিহীন বিস্ফোরণ ছিল মানুষের বৈজ্ঞানিক অগ্রযাত্রার সর্ববৃহৎ মাইলফলক। গত দুশো বছরের ইতিহাসে মানুষ মহামারি রোধক টীকা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা ও খাদ্য নিরাপত্তা সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রকৃতির অবাধ্য শক্তিকে যেভাবে বশ করেছে তারই প্রত্যক্ষ ফলাফল স্বরূপ আমরা এই ডেমোগ্রাফিক বিস্ফোরণ দেখেছি।

তবে প্রকৃতির শক্তিকে বস করে এই জনসংখ্যার বিকাশ মানবকেন্দ্রিকতার বিচারে একটি অভূতপূর্ব অর্জন হলেও এটি ছিল পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরিবেশগত বিপর্যয়। খুব সহজ ভাষায় বলতে হলে- প্রকৃতি আসলে কোনভাবেই ভোগবাদী মনুষ্য জাতের ৮ বিলিয়নের এই অপ্রাকৃতিক বৃদ্ধির জন্য প্রস্তুত ছিল না।

পৃথিবীর অন্যসব প্রাণী প্রকৃতির নিয়মের কাছেই নিজেদের নিয়তিকে সমর্পণ করে এবং প্রকৃতির সাথেই নিজেদের মানিয়ে নেবার চেষ্টা করে। মানুষও লক্ষ বছর ধরে এভাবেই বিকশিত হয়েছিল। কিন্তু বৈজ্ঞানিক অগ্রযাত্রাই মানুষকে সর্বপ্রথম সমর্পণের বদৌলতে আধিপত্য করতে শেখায়।

মানুষের এই আধিপত্যই পৃথিবীর ইকোসিস্টেমের জন্য সবচেয়ে ভয়ংকর হুমকি হয়ে দাড়ায়। কিন্তু সমস্যাটা হলো মানুষ কিভাবে হুমকি সৃষ্টি করছে তা চিহ্নিত করতেই মানুষের এক শতাব্দী লেগে যায়। জলবায়ু বিপর্যয় তার ছোট্ট একটি নমুনা। শিল্প বিল্পবের নামে আমরা যে পৃথিবীর জ্বলবায়ুকে ধ্বংস করছিলাম, তা নিশ্চিত হতেই আমাদের হাতের সময় ফুরিয়ে যায়।

যেমন ধরুন আমের মকুলের একাংশ ঝরে যায়, মুরগির ১৫ টা বাচ্চা থেকে সব ধকল পেরিয়ে সবশেষে ৮-৯ টার মত বেঁচে থাকে… এটাই ছিল সার্ভাইভাল অব দ্যা ফিটেস্ট, যা জীব বিবর্তন ও প্রাণের অস্তিত্ব ধারাবাহিকতার খুব মৌলিক একটি নিয়ম। কিন্তু মানুষ ভ্যাক্সিনেশন, মেডিসিন ও নানান বৈজ্ঞানিক আধিপত্যের মাধ্যমে তার সবগুলো সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখতে চায় এবং এই চাওয়া তার খুব স্বাভাবিক প্রবৃত্তি।

কিন্তু সমস্যা হলো, আধিপত্য অর্জন প্রক্রিয়ায় আমরা যে প্রকৃতির টিকে থাকার অনেক মৌলিক নিয়মের ব্যত্যয় ঘটাচ্ছি এবং নানান টীকানির্ভর হয়ে স্বাভাবিক টিকে থাকার ক্ষমতাকে দুর্বল করে তুলছিলাম, এর সুদূর প্রসারী প্রভাব কি হবে তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখন অনেক দুশ্চিন্তায় ভুগছে।

জনসংখ্যা বিস্ফোরণের পর আমরা আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা থেকে শুরু করে পরিবেশগত নিরাপত্তার জন্য একের পর এক যে আধিপত্যবাদী মহড়া দেখাচ্ছি সেসব কিছুর ভবিষ্যৎ নিয়েই আমরা এক অনিশ্চিত যাত্রায় রয়েছি। অধিক উৎপাদনের জন্য কৃত্রিম সার, জেনেটিকালি মডিফাইড খাবার, ব্রয়লার মুরগি, হাইব্রিড মাছ এসব কিছুই আমাদের আধিপত্যবাদী অনিশ্চিত অগ্রযাত্রা।

এরপর আমাদের ভোগবাদী লাইফস্টাইল টিকিয়ে রাখার জন্য অনন্ত প্রবৃদ্ধির অর্থনীতি, আকাশ পাতালের সব রিসোর্স চুষে খাওয়া, রেস্টুরেন্ট বিলাসের জের ধরে সমুদ্র তলদেশ হতে অভূতপূর্ব সব মৎসকূল নিধন, নতুন বিনির্মাণ ও জিডিপির লোভে বন-জঙ্গল বিনাশ, এসবই আসলে আমাদের আধিপত্যবাদী সফরের রকমফের।

আমাদের এই আধিপত্যবাদী ধ্বংস যাত্রা আরো বেশি ভয়ংকর হয়ে দাঁড়িয়েছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির শক্তিতেই। আগে মানুষ সমুদ্রে ১ মাস লড়াই করে এক টন মৎস শিকারকেই সৌভাগ্য ভাবতো, কিন্তু যন্ত্রশক্তি এই লালসাকে ১ দিনে ১ হাজার টন মৎস নিধনকে ছাড়িয়েছে।

এখন আপনি হয়তো বলবেন সমস্যা তো যন্ত্রশক্তির না, মানুষ নৈতিক হলেই পারে। কিন্তু সত্যটা হচ্ছে, যন্ত্রশক্তির প্রয়োগের সাথে যখন আমাদের উন্নততর জীবন ও মুনাফার প্রশ্ন জড়িয়ে পড়ে, তখন মানুষ শত চাইলেও স্রেফ নৈতিকতা দিয়ে নিজ আধিপত্যবাদের লাগাম টানতে পারে না। বেঁচে থাকার জন্য মানুষ পৃথিবীর অন্যসব প্রাণীকে ধ্বংস করে হলেও নিজের আধিপত্য চাইবে।

এজন্যই আমি মনে করি সমস্যাটা এখানে স্রেফ নৈতিকতার নয়, প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করে মানুষের এমন মহা-প্ররাক্রমশালী হয়ে উঠাই বরং ‘ইনহেরেন্টলি প্রব্লেমেটিক’ ছিল। অর্থাৎ অনেকগুলো প্রাণীর মধ্যে একটি বিশেষ প্রাণীর অধিকতর শক্তিশালী হয়ে ওঠা প্রকৃতির ভারসাম্য কে নষ্ট করেছে।

পৃথিবীর ইতিহাসে আর কখনোই স্রেফ মানুষের অস্তিত্ব গোটা দুনিয়ার অস্তিত্বকে সংকটাপন্ন করেনি।

এই সংকট আরো প্রকট হয় মানুষ বিজ্ঞানবাদী ডেলুশ্যুনে ভুগে তার ট্র্যাডিশনাল নৈতিকতাকে নাকচ করে দিয়ে সম্পূর্ণ মানবকেন্দ্রিক (anthropocentric) নতুন স্বেচ্ছাচারী, স্বার্থপর ও আপেক্ষিক নৈতিকতা বিনির্মাণ করে। মানুষের এই বিজ্ঞানবাদী আপেক্ষিক নৈতিকতা তার আধিপত্যবাদী ধ্বংসযজ্ঞের অন্যতম পথিকৃৎ হয়ে কাজ করেছে। কারণ এই বিজ্ঞানবাদী এনলাইটেনমেন্টই মানুষকে ইশ্বরের স্থানে আসীন করে প্রকৃতি বসের স্বেচ্ছাচারী লাইসেন্স দিয়েছে।

উল্লেখ্য যে বিজ্ঞানবাদ কি করে মানুষকে তার ইশ্বর, জগৎ ও অস্তিত্ব নিয়ে ফল্স ডেলুশুনে ভুগিয়ে একটি নতুন মোরাল অর্ডার ও ওয়ার্ল্ডভিউ বিনির্মানে সহায়তা করেছে তা নিয়ে রুপার্ট শেলড্রেক বা ডেভিড বার্লিংসকির মত বিজ্ঞানীদের বেস্টসেলার বইগুলো পড়তে পারেন।

যাহোক মূল কথায় ফিরে আসি। বিজ্ঞান নিয়ে আমরা যে বন্দনায় মেতে উঠে তার নেপথ্যে আমাদের সেকুলার, মানবকেন্দ্রিক ও মানুষের ইশ্বর হবার অভিলাষী মনস্তত্বই কাজ করে। আমরা অনন্তকাল বেঁচে থাকার খায়েশে মজেছি বা পার্থিব জীবনকে তার ভঙ্গুরতা সহ আলিঙ্গন না করে দুনিয়াকে বেহেশতে বানানোর মিথ্যা নেশায় মগ্ন হয়েছি।

বিজ্ঞান হয়তো অনেক জ্ঞানতাত্বিক সফিস্টিকেশন দিয়েছে, অতীতের যেকোন সময়ের চেয়ে আমরা এখন অনেক বেশি জানি নিঃসন্দেহে। তবে আমরা যদি অজানা ভবিষ্যতের অনাবিষ্কৃত জ্ঞানের মানদণ্ডে আমাদের বর্তমানকে বিচার করি, তাহলে আমাদের বিদ্যমান বুদ্ধিবৃত্তিক অহংকার আসলে আপেক্ষিক মূর্খতা ও ইলুশন বৈ কিছুই না।

এজন্যই আমি বলি আমাদের পূর্বপুরুষরা যে জোনাকির আলোয়, কোকিলের কুহুতানে এবং শরতের শিশির ছটায় যে অসাধারণ ও সমৃদ্ধ প্রাকৃত জীবন যাপন করেছে, এতসব বৈষয়িক অগ্রযাত্রার পরেও কৃত্রিম সোডিয়াম আলোয় আর মেকডোনাল্ড বিলাসিতায় ডুবেও আমরা পূর্বপুরুষদের চেয়ে খুব বেশি কোয়ালিটি জীবন যাপন করছি না। পূর্বপুরুষদের প্রাকৃত অতীত নিয়ে আপনার যে ঔণ্যাষিকতা ও বর্তমান নিয়ে শ্রেষ্ঠত্বের প্রবোধ তা স্রেফ আধুনিকতাবাদী মগজায়নের প্রভাব। আপনার পূর্ব পুরুষ হয়তো ৪০ বছর বয়সে কলেরায় আক্রান্ত হয়ে শান্তিতে নিঃসহায় আত্মসমর্পণ করেছিল। হয়তো তাদের জীবনের ক্ষণভঙ্গুরতাই তাদের অনেক মানবিক করে রেখেছিল। পক্ষান্তরে আপনি বড়জোর হাজারটা মেডিসিন নিয়ে এই ভঙ্গুর জীবনের যাতনাকেই দীর্ঘায়িত করেছেন। এর বেশিকিছু না।

অমরত্ব নিয়ে অধুনা মানুষের এই মিথ্যা অবসেশনগুলো আবার কিছু নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে এই করোনা মহামারীতে এসে।

মানবেন্দ্রিক যে ওয়ার্ল্ডভিউ দিয়ে আমরা এই সভ্যতার সবগুলো মিথ্যা পাটাতন বিনির্মান করেছি, পরিবেশকেন্দ্রিকতা দিয়ে আমাদের সেই দার্শনিক বিভ্রমগুলো আবার ভাংতে হবে।
এজন্যই বর্তমান সময়ের সব পরিবেশবাদীরা আমাদের আবার প্রকৃতির কাছেই ফিরে যাবার নসিহত করেন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ঘাড়ে সাওয়ার হয়ে যে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম সৃষ্টি করেছি, তা ভেঙে আবার ‘লোকালিজম’ এবং ‘মিনিমালিজম’ এর পথে হাঁটা ছাড়া আমাদের পৃথিবীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।

এই পরিক্রমায় আমাদের জীবনে হয়তো আর আইফোন ম্যাক্সপ্রোর আভিজাত্য থাকবে না, প্রতিমাসে নতুন জামা কেনার সৌখিনতা থাকবে না… কিন্তু এই প্রকৃতির কাছে ফিরে আসা ছাড়া আমাদের আসলেই কোন ভবিষ্যৎ নেই।

কর্পোরেট বিজ্ঞান হয়তো আপনাকে এই সত্য কথাটা কখনো শেখাবে না। নাওমি ক্লেইনের মতন লেখকদের এজন্যই পশ্চিমা সভ্যতার শত্রু হিসেবে চিহ্নই করা হয়, কারণ তারা গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের এই পরিবেশ বিধ্বংসী যাত্রার পথে প্রতিবন্ধক।