সুন্দরী হাঁস

মাস্কড ফিনফুট বা কালোমুখ প্যারাপাখি। স্থানীয়রা বলেন ‘সুন্দরী হাঁস’। দেশের মধ্যে একমাত্র সুন্দরবনেই দেখা মেলে এ জলচর পাখির। সারা দুনিয়াতেই এ পাখির মোট তিনটি প্রজাতিই হুমকির মুখে। তবে এর মধ্যে সর্বাধিক ঝুঁকিতে আছে সুন্দরী হাঁস। প্রজাতিটি এখন ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) ‘মহাবিপন্ন’ তালিকায় স্থান পেয়েছে।

সর্বশেষ এক সমীক্ষায় সুন্দরবনজুড়ে ৪০ থেকে ৮০ জোড়া প্রাপ্তবয়স্ক সুন্দরী হাঁসের সন্ধান মিলেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিপন্ন এ মাস্কড ফিনফুট পাখি সংরক্ষণে এখনই উদ্যোগ না নিলে দ্রুতই এটি পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাবে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক পক্ষিবিজ্ঞান বিষয়ক ‘ফর্কটেইল: জার্নাল অব এশিয়ান অরনিথলজি’ সাময়িকীতে মাস্কড ফিনফুট পাখির বিপন্ন অস্তিত্ব সম্পর্কে ভয়ানক আশঙ্কার কথা তুলে ধরা হয়েছে। ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়, বার্ড লাইফ ইন্টারন্যাশনাল, ওয়াইল্ড লাইফ কনজারভেশন সোসাইটি এবং থাইল্যান্ডের মাহিদল বিশ্ববিদ্যালয়ের সংরক্ষণ বিজ্ঞানী ও পাখিবিশারদরা এ গবেষণাটি করেছেন।

গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, সারা বিশ্বে মাস্কড ফিনফুটের সংখ্যা খুবই কম। আর এ সংখ্যা প্রতিনিয়ত কমছে। বাংলাদেশ ছাড়াও যেসব দেশে এ পাখি দেখতে পাওয়া যায়, সেখান থেকে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখেছেন, সারা পৃথিবীতে প্রাপ্তবয়স্ক এ পাখির সংখ্যা ৩০৪টির বেশি না। আগে যা ভাবা হতো এ সংখ্যা তার চেয়ে অনেক কম।

সুন্দরবনের স্বাদুপানির জলাভূমিতে বসবাস কালোমুখ প্যারাপাখির। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়াসহ এশিয়া মহাদেশের কয়েকটি দেশে জঙ্গলবেষ্টিত নদীতে কালোমুখ প্যারাপাখির দেখা মেলে। মানুষের উপদ্রব আর ক্রমহ্রাসমান বনভূমি-জলাভূমি প্রজাতিটিকে মহাবিপন্নের কাতারে ঠেলে দিয়েছে।

গবেষণা প্রতিবেদনটির প্রধান লেখক সায়েম ইউ চৌধুরী সুন্দরবনে কয়েক বছর ধরে মাস্কড ফিনফুট পাখি নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি বলেন, প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত প্রমাণ করে, এ পাখি এখন শুধু বাংলাদেশ ও কম্বোডিয়াতে প্রজনন করে। সাম্প্রতিক সময়ে থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়াতে এ পাখি দেখা যায়নি। যেখানে এক সময় নিয়মিত দেখা যেত। সাম্প্রতিক জরিপ ও বিভিন্ন গবেষণায় প্রকাশিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে আমরা এদের বৈশ্বিক সংখ্যা হিসাব করেছি। তাতে দেখা যাচ্ছে, একই আকৃতির অন্যান্য জলজ পাখির চেয়ে এ পাখির বিলুপ্তির ঝুঁকি অনেক বেশি।

গবেষণাপত্রে বেশকিছু সুপারিশও করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, মাস্কড ফিনফুটের প্রজনন মৌসুমে সংশ্লিষ্ট এলাকায় মানুষের যাতায়াত সীমাবদ্ধ করা, সূক্ষ্ম সুতার মাছ ধরার জাল নিষিদ্ধ করা এবং সমতলের জলাভূমির বাসস্থান রক্ষায় পদক্ষেপ বাড়ানো।

বাংলাদেশে পাখিটির সংখ্যা নিয়ে একটি জরিপ করা হয়েছিল ২০০৯ সালে। সেই জরিপে ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ কালোমুখ প্যারাপাখি থাকার তথ্য দিয়েছিলেন গবেষকরা। সম্প্রতি নতুন এক জরিপে বাংলাদেশে কালোমুখ প্যারাপাখির সংখ্যা ১০৮ থেকে ৩০৪টির মধ্যে নেমে এসেছে বলে জানানো হয়েছে।

সুন্দরবনের স্বাদুপানিবেষ্টিত এলাকাগুলোতেই বিচরণ কালোমুখ প্যারাপাখির। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে এগুলোর বিচরণক্ষেত্রে লোনাপানি ঢুকে পড়ছে। এর ওপর রয়েছে মানুষের উৎপাত। স্থানীয় জেলেরা কালোমুখ প্যারাপাখি শিকার করে। এমনকি তারা ডিম এবং ছানাও সংগ্রহ করে থাকে।

২০১২ সালে একজন গবেষক সুন্দরবন এলাকায় ৬৮ জন জেলের সাক্ষাত্কার নিয়েছিলেন, যাদের মধ্যে ৩৮ জনই পাখিটি শিকারের কথা স্বীকার করেছিলেন। সাক্ষাত্কারে উঠে আসে, ২০০৭ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত জেলেরা অন্তত ১৬টি প্রাপ্তবয়স্ক কালোমুখ প্যারাপাখি, ১৫টি ছানা ও চারটি ডিম সংগ্রহ করেছিলেন।

সাম্প্রতিক এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, নানা উপদ্রবের কারণে এসব পাখির সুন্দরবনের উপকূলীয় এলাকা থেকে সরে গিয়ে ভূমিবেষ্টিত এলাকাগুলোতে বাসা বানানোর প্রবণতা তৈরি হয়েছে। সুন্দরবনজুড়েই পাখিটির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসছে বলেও গবেষণায় উঠে এসেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক মো. মঈনুদ্দিন খান বণিক বার্তাকে বলেন, মাস্কড ফিনফুট নিয়ে আলাদা করে কোনো উদ্যোগ এ মুহূর্তে নেই। তবে সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্পের আওতায় এ বনের বেশকিছু বিলুপ্তপ্রায় বন্যপ্রাণীর ওপর গবেষণা হবে। সেই তালিকায় মাস্কড ফিনফুটও রয়েছে। এর মাধ্যমে সুন্দরবনে প্রজাতিটির বর্তমান অবস্থা জানার চেষ্টা করা হবে। একই সঙ্গে তাদের সংরক্ষণের উপায় নিয়েও কাজ করা হবে।

সূত্রঃ বণিক বার্তা