মওলানা ভাসানী

১.মিডিওকার নয় জায়ান্ট বাঙালির সন্ধানে
জাহেলি ও জালেমি হিন্দুত্ববাদের ছায়াতলে যে বাঙালি আত্মপরিচয় গড়ে তোলা হচ্ছে সেটা হল একটা নতজানু ও গোলাম আত্মপরিচয়। ভারত রাষ্ট্রের উপগ্রহ রাষ্ট্র হিশাবে যে বাংলাদেশ গড়ে তোলা হচ্ছে সেই বাংলাদেশ হল লিলিপুটের বাংলাদেশ; বা বড়জোর মিডিওকারের বাংলাদেশ। আমার ধারণা অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী লেখক ফাহাম আবদুস সালাম তার সম্প্রতি প্রকাশিত বইতে বাঙালির যে “মিডিওক্রিটি”র তত্ত্ব-তালাশ করেছেন সেখানে তিনি এই কথাই বলতে চেয়েছেন যে এই হিন্দুত্ববাদী জাহেলিয়াত ও জুলুমের নাতিজা হল এই লিলিপুটের বাংলাদেশ বা মিডিওকারের বাংলাদেশ।

কিন্তু বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয় কি শুধুই লিলিপুটের বা মিডিওকারের? গৌড়, লখনাউতী, পান্ডুয়া কিংবা সোনারগাঁয়ে গড়ে ওঠা স্বাধীন সুলতানী বাংলা ও বাঙালি তো মধ্যযুগে মাথা তুলে দাঁড়ানো এক অনন্য ও সমৃদ্ধ উত্তর-পূর্ব ভারতীয় জনপদ ও সভ্যতা। সুলতান ইলিয়াস শাহ ও হোসেন শাহ যে শাহী বাংলা গঠন করেছিলেন সেটা তো শৌর্য বীর্যে সোনার বাংলা হয়ে উঠেছিল। পরবর্তীকালে মুঘল ও নবাবী বাংলা সেই সমৃদ্ধ কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি, শিল্প ও সংস্কৃতির ধারাকে শুধু ধরেই রাখে নাই বরঞ্চ বাড়িয়ে তুলেছিল। টাকায় আট মন ধানের কাহিনী তো আর এমনি এমনি তৈরি হয় নি।

এরপরে ১৭৫৭ সালের পলাশী যুদ্ধ ও ১৮৫৭ সালের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপর্যয়ের পর থেকে ঔপনিবেশিক যুগে ইংরেজ ও বর্ণ হিন্দুর যৌথ আধিপত্য বাংলার এই সমৃদ্ধ ও উৎকর্ষমুখী জনপদটিকে ছারখার করে ফেলে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে এদেশের স্বাধীন কৃষিজীবিদের অত্যাচারী ও শোষক জমিদারদের অধীনস্থ প্রজা বানানো হয়।

এইভাবে বাঙালি মুসলমানকে ঔপনিবেশিক শাসনকালে যে লিলিপুট ও মিডিওকার বানানো শুরু হয়েছিল তার বিরুদ্ধে বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষক ও মধ্য শ্রেণির ধারাবাহিক আন্দোলন সংগ্রামে যারা নেতৃত্ব দিয়েছি্লেন তারা তো কেউ লিলিপুট বা মিডিওকার ছিলেন না। এই প্রসঙ্গে নাম নিতে হয় শহীদ তীতুমীর, হাজি শরীয়তুল্লাহ, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, মওলানা ভাসানী, কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখের। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রে বাংলার পূর্বাংশের যোগদান ছিল এইসব ধারাবাহিক আন্দোলনের-ই সম্মিলিত ফলাফল।

কিন্তু ভৌগোলিক স্বাধীনতা হাসিল করার পরেও মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক পরাধীনতা ও “অসাম্প্রদায়িক” বাঙালিত্বের নামে ক্রমাগত হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় প্রভাব বলয়ে ঢুকে পড়ার ফলে আবার সেই চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কালের মত গোলামী ও ক্ষুদ্রকায় আত্মপরিচয়ের ঘেরাটোপে আটকে পড়ছে আজকের বাঙালি মুসলমান। এখন তাই বাঙালি মুসলমানের মাথা হিসাবে যাদের দেখছেন তাদের অনেককেই লিলিপুট বা মিডিওকার-ই মনে হবে।

অথচ আপনি যদি সুলতানী, পাঠান, মুঘল ও ব্রিটিশ-হিন্দু জমিদার বিরোধী আজাদি আন্দোলনের নেতৃস্থানীয় মানুষগুলিকে ভাল করে দেখেন তাহলে তাদের কিন্তু লিলিপুট বা মিডিওকার মনে হবে না। তাদের বরঞ্চ এস এম সুলতানের চিত্রকলার বাঙালির মত একেকজন জায়ান্ট বা অধিমানবই মনে হবে। আর এরাই আমাদের আকাবির, এরাই আমাদের সোনালি সিলসিলা।

২.মুসলিম লীগ থেকে আওয়ামী মুসলিম লীগ
১৯৪৭ এ পাকিস্তান কায়েম হয়ে যাবার অব্যবহিত পরে পূর্ব বাংলার মুসলিম লীগের নেতৃত্বে দুটি ধারা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। এর একটি ছিল ঢাকার নবাব পরিবারের উত্তরাধিকার খাজা নাজিমউদ্দীন গং এর উর্দুভাষী আশরাফ মুসলিমদের হাতে। আর দ্বিতীয় ধারাটি ছিল কলকাতার উর্দুভাষী ব্যারিস্টার হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর হাতে। তাঁর সঙ্গে আরো ছিলেন বর্ধমানের আবুল হাশিম। আবুল হাশিম একধরণের বিপ্লবী ইসলামের প্রবক্তা ছিলেন। এক্ষেত্রে তিনি মওলানা আজাদ সুবহানি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। যেহেতু সোহরাওয়ার্দী এবং আবুল হাশিম—দুজনের ভিত্তি ছিল পশ্চিম বঙ্গ, সেহেতু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরে পূর্ব বাংলায় তাঁরা দুজন দুর্বল হয়ে পড়েন। অন্যদিকে মওলানা ভাসানী পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরে তাঁর রাজনৈতিক ক্ষেত্র আসাম থেকে বিযুক্ত হন। অথচ খাজা নাজিমঊদ্দীন গং এর নেতৃত্বে যে মুসলিম লীগ তা মওলানা ভাসানীকে ও’ন করার মত মেজাজের অধিকারী ছিল না।

এই প্রেক্ষাপটে মওলানা ভাসানী পূর্ব বাংলার ভূমিপুত্র মুসলিম জাতীয়তাবাদীদের রাজনৈতিক প্লাটফর্ম হিশেবে ১৯৪৯ সালে সূচনা করেন ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’—যার অর্থ হল জনগণের মুসলিম লীগ। অর্থাৎ এটিও মুসলিম লীগ তবে এটি আশরাফ উর্দুভাষীদের নেতৃত্বে পরিচালিত হবার জন্য তৈরি হয়নি। এটিও সেই সময়ে মুসলিম জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ছিল, তবে এর নেতৃত্বে থাকবে এদেশের বাংলাভাষী সাধারণ শ্রেণি—এটাই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য ও বিশেষত্ব।

এই বয়ানের আরেকটি বড় নিদর্শন হিশেবে আমরা দেখতে পাই আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম সাধারণ সম্পাদককে। তিনি হলেন টাঙ্গাইলের জননেতা শামছুল হক। শামছুল হক একজন ইসলামীয় বিপ্লবী ছিলেন। তিনিও মওলানা আজাদ সুবহানির রবুবিয়াত রাজনৈতিক দর্শনের অনুসারী ছিলেন। তাঁর সঙ্গে সহকর্মী হিশেবে যোগ দেন সেসময়ের তরুণ ছাত্র ও যুব নেতা শেখ মুজিবুর রহমান এবং খন্দকার মোশতাক আহমদ। এদের সবাইকে আমরা পাকিস্তান আন্দোলনের সক্রিয় ছাত্র ও যুব কর্মী হিশেবে দেখেছি। সবাই কমবেশি মুসলিম জাতীয়তাবাদী-ই ছিলেন।
এই আওয়ামী মুসলিম লীগ পরবর্তীকালে মুসলিম জাতীয়তাবাদ পরিত্যাগ করে ক্রমাগত “অসাম্প্রদায়িক” বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধারক ও বাহক হিশেবে আওয়ামী লীগ হয়ে উঠতে থাকে সেটি হল এক বহুল আলোচিত গল্প।

৩. মওলানা ভাসানী ও আজকের বাংলাদেশ

একজন রাজনৈতিক নেতা হিশেবে মওলানা ভাসানীর ব্যক্তিত্বে অনন্য ইতিবাচকতার সমাহার ঘটেছিল। বিপুল জনপ্রিয়তার উত্তুঙ্গে উঠেও তিনি সাধারণ মানুষের মত জীবন যাপন করতেন। ব্যক্তিগতভাবে তার সততা ও নির্লোভ চরিত্র প্রশ্নাতীত।
তার রাজনীতি তৃণমূলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। তিনি শুরু করেছিলেন জমিদার বিরোধী কৃষক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। জমিদারদের শোষণ থেকে বাংলা ও আসামের কৃষকদের মুক্তির প্রশ্নেই তিনি পাকিস্তান আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এদিকে দেওবন্দ মাদরাসা ও মওলানা আজাদ সুবহানী সূত্রে তার ভেতরে এক ধরনের ইসলামীয় বিপ্লবী চেতনাও কার্যকর ছিল। এসব কারণে তিনি মুসলিম লীগের ইংরেজি শিক্ষিত উচ্চবিত্ত ও সামন্ত নেতৃত্বের সঙ্গে বেশিদিন কাজ করতে পারেন নি।

১৯৪৯ সালে তাঁর নেতৃত্বে মধ্যবিত্ত বাঙালি মুসলিমদের মুখপাত্র হিশেবে আওয়ামী মুসলিম লীগের সূচনা হয়েছিল। সেখান থেকেও তিনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর প্রো-ওয়েস্টার্ন লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পলিসির সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গড়ে তোলেন। এই পার্টি শুরু থেকেই ছিল কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি শোষিত জনতার স্বার্থের মুখপাত্র।

এই সময়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর শীতল যুদ্ধের পরিবেশে তিনি আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী রাজনীতির বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়েছিলেন। একারণে তিনি বামপন্থীদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলেছিলেন। ষাটের দশকে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে সোভিয়েত-চীন বিভক্তি দেখা দিলে তিনি সেখানে চীনের পক্ষ অবলম্বন করেছিলেন। এভাবে তিনি ষাট দশকের শেষ প্রান্তে এসে পূর্ব বাংলার শ্রেণী সংগ্রাম ভিত্তিক বিপ্লবী রাজনীতির একজন প্রকাশ্য মূলধারাস্থিত প্রতীক নেতায় পরিণত হতে পেরেছিলেন।

কিন্তু সময়ের প্রবল বাঙালি জাতিবাদী রাজনৈতিক জোয়ারে তার শ্রেণিবাদী রাজনীতি ভেসে গিয়েছিল। তিনি সময়ের কন্ঠস্বর শুনতে পান নি। যে কারণে তার বিপুল জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তার সময়োপোযোগী সিদ্ধান্ত নেবার অপারগতার ফলে তার আকাঙ্খিত বিপ্লব বেহাত হয়ে যায়। ১৯৭১ এর রাজনৈতিক সংকট ও স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে তিনি প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ অব্যাহত রাখলেও তা আর আগের মত দানা বাঁধেনি। তবে ফারাক্কা বাঁধের প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের সম্ভাব্য মরুকরণের প্রতিবাদে তিনি যেভাবে ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাড়িয়েছিলেন তা আজকের বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও শিক্ষণীয়। তিনি একজন সর্বজন শ্রদ্ধেয় রাজনৈতিক বুজুর্গ ও মুরুব্বী ব্যক্তিত্বে পরিণত হতে পেরেছিলেন।

তিনি বাঙালি মুসলমানের স্বাধীন, স্বতন্ত্র, নৈতিক উৎকর্ষের অধিকারী, অথেন্টিক ও অর্গ্যানিক নেতৃত্ব—যিনি রাষ্ট্র ও সমাজে সেবামূলক, পালনবাদী আদল ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। তার আদর্শ, কর্ম, অনুশীলন ও দৃষ্টান্ত অবলম্বন করে যদি এদেশের নতুন নেতৃত্ব শ্রেণি দায়িত্ব পালনে সংগঠিত ও সক্রিয় হয়ে ওঠে তাহলে এদেশে জাহেলিয়াত ও জুলুম মুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র গঠিত হওয়া সম্ভব।