স্পিলবার্গের ক্যামেরায় বিশ্বযুদ্ধের বেদনা

বিশ্বচলচ্চিত্রের এক জাদুকরী নাম স্টিভেন স্পিলবার্গ। বিচিত্র সব চরিত্র আর কাহিনী নিয়ে তার কাজ! একদিকে যেমন বানিয়েছেন শিশুতোষ সিনেমা, তেমনি বানিয়েছেন সায়েন্স ফিকশন কিংবা যুদ্ধের সিনেমা। শিন্ডলার’স লিস্ট সিনেমাটি কোন তালিকায় রাখা যায়, তা নিয়ে তর্ক চলবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। এ সিনেমায় একদিকে যেমন ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যুদ্ধের নির্মমতা, অন্যদিকে বলছে মানবিকতার গল্প। যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে যারা গায় সাম্যের গান, আঁকে মানবিকতার চিত্র, তাদের কী বলা যায়?

শিন্ডলার’স লিস্ট এমনই একটি সিনেমা, যে আপনাকে ধ্বংসস্তূপ আর মৃত্যুকূপে দাঁড়িয়ে শোনাবে জীবন জীবনের জন্য। মানুষ মানুষের জন্য। স্পিলবার্গের নির্মাণ, শিল্পীদের অভিনয় ছাপিয়ে এ সিনেমায় হিরো হয়ে উঠেছে গল্প। কীভাবে? তার আগে জেনে রাখুন, সিনেমাটি নির্মিত হয়েছে সত্য ঘটনা অবলম্বনে। তাও পৃথিবীর ইতিহাসের ভয়াবহতম যুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে। বুকার পুরস্কারজয়ী লেখক থমাস কেন্যালির উপন্যাস শিন্ডলার্স আর্ক থেকে তৈরি হয়েছে ছবির চিত্রনাট্য। সিনেমার গল্প নািস বাহিনীর নির্মমতা ঘিরে।

১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বর। জার্মান বাহিনীর কাছে মাত্র দুই সপ্তাহের যুদ্ধে পোলিশ বাহিনী পরাজিত হয়। জার্মান বাহিনীর দখলে চলে যায় পোল্যান্ড। জার্মান বাহিনীর চোখের বিষ ইহুদিদের জন্য অশনিসংকেত। নািস বাহিনীর নির্দেশে সারা দেশ থেকে দলে দলে ইহুদি জড়ো হতে থাকে ক্রাকোও শরণার্থী শিবিরে। তাদের মনে ক্ষীণ আশা, এখানে এ যাত্রায় হয়তো তারা টিকে যেতে পারেন। এরই মাঝে আগমন ঘটে অস্কার শিন্ডলারের। সুদর্শন মানুষটি জাতে জার্মান ব্যবসায়ী, নািস পার্টির সমর্থক। পোল্যান্ডে তার আগমন নিজের ভাগ্যের চাকা সচল করতে। গোপনে তিনি যোগাযোগ করতে থাকেন ইহুদি ব্যাবসায়ীদের সঙ্গে। মূল লক্ষ্য তাদের কাছ থেকে মূলধন সংগ্রহ করে ব্যবসার সূচনা। তাকে সাহায্য করার জন্য নিযুক্ত করেন ইহুদি ব্যাংকার ইটজ্যাক স্টার্নকে। শুরু হয় তাদের ব্যবসা। শিন্ডলার সেনাবাহিনীর জন্য কুকারিজ তৈরি করেন। শ্রমিক হিসেবে যোগ দিতে থাকেন ইহুদি বাসিন্দারা। স্টার্ন ইহুদিদের ভেতর থেকে শ্রমিক সংগ্রহ করতে থাকেন। এর বড় কারণ ছিল, ইহুদিদের সস্তা শ্রমে খাটানো যায়। এখানে আবির্ভাব ঘটে নািস বাহিনীর সেনা অফিসার অ্যামন গোথের। ইহুদিদের ওপর অত্যাচারে তিনি কুখ্যাত। ইহুদি হত্যা করে এক ধরনের দানবীয় আনন্দ অনুভব করতেন। তিনি নির্বিচারে হত্যায় মেতে ওঠেন। এদিকে শিন্ডলারের শ্রমিকদের অনেকেই মরতে থাকেন গোথের হাতে।

একজন জার্মান হয়েও এ হত্যাযজ্ঞ তার কাছে চরম অবিচার মনে হয়। তিনি গোথের সঙ্গে বন্ধুত্ব শুরু করেন তার শ্রমিকদের রক্ষা করতে। গোথ কিছু ঘুষের বিনিময়ে রাজি হয়ে যান। কিছুদিন পরপর নািস বাহিনীর ট্রেন আসে ক্রাকোওয়ে। তারা নিয়ে যায় সুস্থ-স্বাভাবিক ইহুদিদের গোপন কোনো এক্সপেরিমেন্ট বা গ্যাস চেম্বারে হত্যা করার জন্য। হাজার হাজার মানুষ হত্যা করে পুড়িয়ে ফেলা হয়। শিন্ডলারের মনে গভীর ছাপ ফেলে যায় এসব ঘটনা। এ মানুষগুলোকে রক্ষায় তিনি এক কৌশল বের করেন। তিনি তার শ্রমিকদের নিয়ে নিজ শহরে চলে যেতে চান। কিন্তু গোথ তাতে রাজি নন। অবশেষে প্রচুর টাকার বিনিময়ে গোথ রাজি হন। শুরু হয় শিন্ডলারের লিস্ট তৈরি। এটাই শিন্ডালার’স লিস্ট। কিন্তু গল্প এ পর্যন্ত এমন সাদামাটা হলে কি সেই সিনেমা নিয়ে আজ আলোচনা করতে হতো? এরপর শুরু হয় শত শত মানুষের জীবন নিয়ে সম্ভাবনা আর শঙ্কা। নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচানোর চেষ্টা। রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা নিয়ে যুদ্ধের দিকে তাকিয়ে থাকা

এবং চার হাজার মানুষকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েও অতৃপ্তি এবং নিয়তিকে বরণ করে নেয়া। একরাশ বিষাদে ছেয়ে যায় দর্শকের হূদয়।

সিনেমাটিতে শিন্ডলার চরিত্রে অভিনয় করেন লিয়াম নেসন, স্টার্ন চরিত্রে বেন কিংসলে এবং গোথের ভূমিকায় রালফ ফিনস। অস্কারে ১২টি বিভাগে মনোনয়ন পাওয়া এ সিনেমা জিতে নেয় সাতটি অস্কার, যার মধ্যে সেরা ছবির পুরস্কারের পাশাপাশি সেরা চলচ্চিত্রকার হিসেবে স্পিলবার্গও পুরস্কৃত হন। আইএমডিবি বিশ্বসেরা ছবির তালিকায় ষষ্ঠ অবস্থানে থাকা শিন্ডলার’স লিস্ট-এর রেটিং ৮ দশমিক ৯।

যারা মনে করেন স্পিলবার্গের ছবি মানেই স্পেশাল অ্যাফেক্ট, ডাইনোসর, ভিনগ্রহের মানুষ; তাদের জন্য এ ছবি দেখা অবশ্য কর্তব্য। স্পেশাল অ্যাফেক্ট দূরের কথা, এ ছবিতে স্পিলবার্গ সামান্যতম রঙের ব্যবহার করতেও বহুবার ভেবেছেন। ছবির বিষয়বস্তুর সঙ্গে সংগতি রেখেই সাদা-কালো চিত্রায়ণ করেছেন। সরল ভঙ্গিতে ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম এক অধ্যায়ের গল্প বলে গেছেন স্পিলবার্গ।

সূত্রঃ বণিক বার্তা

Advertisements