তাবলীগ জামাতের প্রতিষ্ঠাতা

ইসলাম নামক সূর্য ফারান পর্বতের চূড়া হতে উদ্ভাসিত হয়ে হেযাযভূমি আলোকিত করে। দেখতে দেখতে তার আলোকরশ্মি এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকা মহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। মুসলিম শাসকদের শাসন অর্ধপৃথিবীর উপর প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু বৃত্তবৈভবের লোভ এবং প্রভাব-প্রতিপত্তির আকাঙ্ক্ষা মুসলমানের দাওয়াত ও তাবলীগের মূল মিশনকে ভুলিয়ে দেয়। সূফীদের তরবিয়াত খানকায়ে এবং মাদরাসার পঠন-পাঠন চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। আর ভারত উপমহাদেশের অবস্থা এর বিপরীত ছিলনা। ঠিক এমন সময়ে বিংশ শতাব্দীতে হিন্দুস্থানে এমন এক মহান মনিষীর আগমণ ঘটে যিনি যুগের স্রোতকে ঘুড়িয়ে দেন এবং বাতাসের গতিবেগ রুখে দেন। তিনি এমন এক জামাতের সূচনা করেন,যে জামাতের সাথে সংযুক্ত হয়ে কোটিরও অধিক মুসলমান বিশ্বের ১৫০ টিরও অধিক দেশে নিজেই নিজের ব্যয়ভার বহন করে আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত পৌছানো এবং এক মুসলিমকে প্রকৃত মুসলিম তৈরীতে নিরত রয়েছেন। ইসলমি ইতিহাসে এর দৃষ্টান্ত সুদীর্ঘ এক হাজার বছরেও দেখা যায় না। কোটি কোটি মুসলমানের জীবনে এই জামাত বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করেছে। বিশ্ববাসীর নিকট এই মিশন ‘তাবলীগ জামাত’ নামে পরিচিত। আর এই মহান জামাতের প্রতিষ্ঠাতা হযরত মাওলানা ইলিয়াস কান্ধলবী রহ.।

ভারতের উত্তর প্রদেশ ইসলামের জন্য উর্বর ভূমি। এখানে অনেক প্রসিদ্ধ আলেম,মনিষী, সমাজ সংস্কারক জন্মগ্রহণ করেছেন। এই উত্তর প্রদেশের কান্ধালায় মাওলানা ইলিয়াস র. ১৮৮৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মাওলানা মুহাম্মদ ইসমাঈল। তিনি একজন আল্লাহ্ভীরু আলেম ছিলেন। বাহাদুর শাহ জাফরের আত্নীয় ইলাহী বখশের সন্তানদের পড়াতেন। যার বাংলো আজকের নিজামুদ্দীন মারকাজের পাশেই ছিল। উক্ত বাংলোর এক ফটকে মাওলানা ইসমাঈলের হুজরা ছিল। উক্ত বাংলোর ফটকের পাশে ‘বাংলাওয়ালী মসজিদ’ নামে ছোট একটি মসজিদ ছিল। মাওলানা ইলিয়াস র. এর পিতা মাওলানা ইসমাঈল ও বড় ভাই মাওলানা মুহাম্মদ সাহেব এখানে ও ‘মেওয়াত’ নামক এলাকার বিভিন্ন স্থানে বাচ্চাদের দ্বীনি শিক্ষা দিতেন। মাওলানা ইলিয়াস র. এর মাতা কুআনের হাফেজা এবং ইবাদতগুজার ছিলেন। (আবুল হাসান আলী নদবী, হায়াতে শায়খুল হাদীস যাকারিয়া কান্ধলবী)

মাওলানা ইলিয়াস র. শিশুকালেই কুরআনের হিফজ সম্পন্ন করেন এবং প্রাথমিক শিক্ষা নিজ ঘরে ও গ্রামে অর্জন করেন। এরপর তিনি বড়ভাই ইয়াহইয়া কান্ধলবীর সাথে মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী র. সান্নিধ্যে থেকে ১০ বছর আধ্যাত্মিক সাধনা করেন। ১৯০৮ সালে তিনি দারুল উলুম দেওবন্দে শায়খুল হিন্দ মাহমুদ হাসান র. এর নিকট বুখারী ও তিরমিজীর দরস নেন। এরপর মাওলানা খলিল আহমদ সাহারানপুরির নিকটও বায়া’আত হোন। এর ২ বছর পর তিনি মাজাহিরুল উলুম সাহারানপুরে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯১২ সালে তিনি বিবাহ করেন। এর তিন বছর পর তিনি হজব্রত পালন করতে হেযায গমণ করেন। হজ থেকে ফেরার পর তাঁর বড় ভাই মাওলানা ইয়াহইয়া কান্ধলবী র.(শায়খুল হাদীস যাকারিয়া কান্ধলবীর পিতা,বুখারির ভাষ্যগ্রন্থ লামিউদ্দারারি, তিরমিজীর ভাষ্যগ্রন্থ আলকাউকাবুদ্দুররী এর লেখক) ইন্তিকাল করেন। এর দু বছর পর মাওলানা মুহাম্মদ সাহেবও মৃত্যুবরণ করেন। যিনি তার পিতার স্থলে নিজামুদ্দীনের মসজিদ ও মাদরাসার দেখাশোনা করতেন। এসময় সবাই তাকে সাহারানপুর ছেড়ে নিজামুদ্দীনের দেখাশোনার জন্যে দিল্লী আগমণের আহবান জানান। তিনি নিজামুদ্দীন চলে আসেন এবং বড় ভাইয়ের স্থলাভিষিক্ত হোন।

মাওলানা ইলিয়াস র. যখন বাংলাওয়ালী মসজিদে দ্বীনি কাজ আঞ্জাম দিচ্ছিলেন তখন সেখানে মেওয়াতের অধিবাসীরা যাওয়া আশা করত। মেওয়াতের ভক্ত- মুরিদগন তাঁর নিকট মেওয়াত আগমণ করার আহবান করেন। তিনি তাদের নিকট শর্ত দেন যে, আমি অবশ্যই আসবো,তবে তোমরা নিজেদের গ্রামে মক্তব চালু করবে। অতঃপর মাওলানা ইলিয়াস র. যখন মেওয়াত গমণ করেন সেখানে ১০ টি মক্তব প্রতিষ্ঠা করে আসেন। এর কিছু দিনের মধ্যে সেখানে কয়েক শত মক্তব প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯২৪ সালে হযরতজ্বী দ্বিতীয়বার হজব্রত পালনে মক্কা গমণ করেন। ফিরে এসে যখন তিনি মেওয়াতের দ্বীনি কাজের অগ্রগতির খোঁজ খবর নিলেন,তখন তিনি হতাশ হলেন। মেওয়াতের সাধারণ মুসলিমদের মধ্যে কোন পরিবর্তন লক্ষ করলেন না। মক্তবগুলোতে এক বিশেষ শ্রেণী দ্বীনি শিক্ষার অবদান রেখে চলেছে কিন্ত মেওয়াতের সাধারণ মুসলমানের মক্তবে গিয়ে দ্বীন শিক্ষা অসম্ভব ছিল। তখন হযরতজ্বী এই সিদ্ধান্ত নিলেন যে, ‘মানুষকে ডেকে দ্বীন শেখানো হবে না,বরং মানুষের কাছে গিয়ে তাদের দ্বীন শিখানো হবে। তাদের ঘর থেকে বের করে মসজিদ পর্যন্ত নিয়ে আসা হবে এবং তাদের ইসলাম ও দ্বীনের বুনিয়াদী বিষয়গুলো শিখিয়ে নিষ্ঠাবান(প্রাকটিসিং) মুসলিম বানানো হবে।’

এসময় মেওয়াতে এক বিশাল ইসলাহি ইজতেমার আয়োজন করা হয়। হযরতজ্বী সেখানে আগমন করেন এবং শ্রোতাদের বয়ান করেন। তিনি তাদের জামাত নিয়ে আশ-পাশের গ্রামে বের হবার আহবান করেন। এর এক মাস পর মেওয়াতের পার্শ্ববর্তী গ্রামে প্রথম জামাত বের হয়। তারা সিদ্ধান্ত নেন পরের জুমা সোনা মসজিদে আদায় করবেন। হযরতজ্বী সেখানে আগমন করেন এবং তাদের গুরুত্বপূর্ণ নসিহত করেন ও দিকনির্দেশনা দিতে থাকেন। এভাবে দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ শুরু হয় এবং মেওয়াতের অনেক জামাত বিভিন্ন এলাকায় বের হতে থাকে। হযরতজ্বী প্রতি জুমার নামাজের পর তাদের কারগুজারি শুনতেন,নতুন জামাতের পরিকল্পনা করতেন এবং বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দিতেন। ১৯৩৮ সালের ১৪ মার্চ হযরতজ্বী, হাজী আব্দুল্লাহ দেহলবী,আব্দুর রহমান,মাওলানা ইহতেশামুল হক কান্ধলবীর সাথে মক্কার সুলতানের সাথে সাক্ষাতের জন্য হেযায গমণ করেন। সুলতান জালালুদ্দীন মালিক সম্মানের সাথে মসনদ থেকে উঠে এসে তাকে ও তাদের দলকে বরণ করে নেন। সুলতানের অতি সন্নিকটে বসিয়ে তাবলীগের কারগুজারি মনোযোগ দিয়ে শুনেন। হযরতজ্বী এসময় প্রায় ৪০ মিনিট তাওহীদ,শরিয়ত ও সুন্নাহর উপর বয়ান করেন। বিদায়কালেও তিনি মসনদ থেকে নেমে সম্মানের সাথে তাদের বিদায় জানান। মক্কা মদীনার নেতৃস্থানীয় আলেমগণ তাকে দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে হেযাযভূমিতে ২ বছর অবস্থান করার অনুরোধ করেন। কিন্তু তিনি হিন্দুস্থানে দাওয়াতি কাজের ক্ষতিগ্রস্ত হবার আশঙ্কায় দেশে প্রত্যাবর্তনের ইচ্ছা পোষণ করেন। হেযায থেকে ফিরে এসে তিনি আরো উদ্যমের সাথে তাবলীগের কাজে মনোনিবেশ করেন।

আলীগড়, দিল্লী, বুলন্দশহর,কান্ধলা,সাহারানপুর প্রভৃতি অঞ্চলে তাবলীগের জামাত প্রেরণ শুরু করেন। হযরতজ্বীর ১৮ বছরের দিন-রাতের নিরলস পরিশ্রম আলোরমুখ দেখতে থাকে। হিন্দুস্থানের দূর দূরান্তে জামাত রওয়ানা হওয়া শুরু করে। আলেমগণ ও সাধারণের মধ্যে এক দ্বীনি চেতনার আবহ তৈরী হয়। সাইয়্যিদ আবুল হাসান আলী নদবী র. এর উপর আলোকপাত করতে গিয়ে লেখেন,’যেখানে কোন মসজিদ দেখা যেত না সেখানে গ্রামে গ্রামে মসজিদ তৈরী হয়। দেখতে দেখতে উপমহাদেশে হাজার হাজার মসজিদ তৈরী হয়। অসংখ্য মক্তব ও আরবি মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। হাফেজের সংখ্যা হাজার থেকে লাখে উন্নিত হয়। আলেমের সংখ্যাও দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে। হিন্দুয়ানী অবয়ব ও লেবাসের প্রতি ঘৃনা সৃষ্টি হতে থাকে এবং ইসলাম ও শরঈ লেবাসের মর্যাদা অন্তরে বসে যায়। হাত থেকে কড়ি ও শরীর থেকে পৈতা ছুড়ে ফেলে দিতে থাকে। দাড়িহীন পুরুষেরা দাড়ি রাখা শুরু করে,শরাবখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। সুদি লেনদেন কমে আসে,হত্যা- রাহাজানি দূর হতে থাকে। অসততা, ঠকবাজি অন্যান্য অসৎ চরিত্র সংশোধন হতে থাকে,হানাহানি-মারামারি নিঃশেষ হতে থাকে,শিরিক-বিদ’আত,রসম-রেওয়াজ থেকে মানুষ তওবা করতে শুরু করে।’

ফকির ও দরবেশি চরিত্রের একজন দাঈ, আলেমে দ্বীন শুধু মেওয়াতে বিপ্লব সংগঠন করেননি বরং তাঁর প্রতিষ্ঠিত মুবারক জামাত সমগ্র বিশ্বে এমন এক বিপ্লব প্রতিষ্ঠা করেন যার উদাহরণ ইসলামের ইতিহাসের কোন পৃষ্ঠা বা পাদটীকায় খুঁজে পাওয়া যায় না। অধ্যাপক খালিক আহমদ নিযামী বলেন,’বিগত শতাব্দীগুলোতে কোন বুযুর্গই চিশতিয়া সিলসিলার সংস্কারমূলক মৌলিক নীতিগুলো এমনভাবে চুষে নিতে সক্ষম হোননি,যেমনটি মাওলানা ইলিয়াস সক্ষম হয়েছেন।’(তারিখে মাশায়িখে চিশত)
বিংশ শতাব্দীর এই মহান দাঈ,মুবাল্লিগ ও আলেমে দ্বীন, যিনি দাওয়াত ও তাবলীগের ময়দানে এক ইতিহাস সৃষ্টি করেন ১২ জুলাই ১৯৪৪ সালে এই নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে চলে যান।

তথ্যসূত্রঃ

ক.আবুল হাসান আলী নদবী,আদদাঈয়াতুল কাবির আশশায়িখ মুহাম্মাদ ইলিয়াস আল-কান্ধলবী ওয়া দাওয়াতুহু
খ. নকি আহমদ নদবী,বায়োগ্রাফি অব মাওলানা মুহাম্মদ ইলিয়াস কান্ধলবী র.

লেখক: শিক্ষক,গবেষক

Advertisements