মার্কিন গণতন্ত্র সম্মেলন

গত ৯-১০ ডিসেম্বর ২০২১, প্রেসিডেন্ট বাইডেন আয়োজিত “ডেমোক্র্যাসি সামিট” [Democracy Summit] সমাপ্ত হয়েছে। যদিও করোনার কথা ভেবে এটা অন-লাইন বা ভার্চুয়াল সামিট ছিল। রয়টারের তথ্য মতে ১০০ এরও বেশি দেশ এখানে অংশ নিয়েছিল। বাইডেন একে নাম দিয়েছিল “ডেমোক্র্যাসি সামিট”। যেটা আসলে কার্যত স্ট্রাটেজিক “ডেমোক্র্যাসি সামিট” বা একে বাংলায় বললে এটা হয়ে যায় “কৌশলগত ‘গণতন্ত্র’ সম্মেলন”। কিন্তু কৌশলগত কেন? এর মানে কী?



ছলনার কৌশলঃ

বাইডেনের মূল সংকট হল কোন মানদন্ড ছাড়া তিনি ডেমোক্রাসি শব্দটা এস্তেমাল করতে চান। আর এভাবে আমাদের মত অনেক দেশেই আমেরিকা অবরোধ আরোপ করতে চান এবং বিশেষ করে চীনের উপরে অবরোধ আরোপ না হলেও অন্তত বিব্রত করতে চান। কিন্তু কাজটা তিনি করেছেন বা তার করার পথটা অসৎ। যেমন ঘটনা হল আমাদের মত সেসব দেশ এমনকি চীনেও উপযুক্ত ও স্পষ্ট “জন-প্রতিনিধিত্বশীল” রাষ্ট্র থাকা বা না-থাকার ঘাটতি আছে। কিন্তু আমেরিকা কোন মানদন্ড কাউকে ডেমোক্রাসির রাষ্ট্র বলে দাওয়াত দিচ্ছেন বা কাউকে বাদ দিচ্ছেন তা প্রতকাশ করে নাই। ফলে সামিটে দাওয়াত দিয়েছে মূলত বাইডেনের আমেরিকার এখনকার সংকীর্ণ রাষ্ট্রস্বার্থের ভিত্তিতে। এটাই সেই বড় অসততা! এটা হতে নুন্যতম আমেরিকা বা অন্যকোন দেশের রাষ্ট্রস্বার্থের উর্ধে, তা পরোয়া না করে। এবং ইন্ডিপেন্ডন্ট মানদন্ডে। আমেরিকা যে তা মেনে করে নাই এর বড় প্রমাণ হল আমেরিকা কোথাও তার মানদন্ড প্রকাশ করে নাই। ফলে এটা অস্বচ্ছ আর তাই অসততা হয়েছে। একারণে সামিটের গায়ে কালি লেগে গেছে।

আমাদের দেশে ‘কৌশল করা’ শব্দের একটা অর্থ হল ছলনা করা। ফলে কৌশলের সোজা কমন মানুষের বুঝ হল যে কেউ যখন যা বলবে তা করবে না বা করবে আরেকটা – এটাই কৌশল। ঠিক এ’অর্থেই বাইডেনের আমেরিকা এক “ডেমোক্র্যাসি সামিট” ডেকেছিলেন। এর অর্থ হল আমেরিকা যাকে যাকে “গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র” মনে করে তারাই এই সম্মেলনে দাওয়াত পেয়েছিলেন। কিন্তু তবু কথা বা কিন্তু আরও আছে। আমেরিকার এই মনে করাটা হয়ত আগে আমেরিকা ‘মনে করত’ হলেও হবে না। এখনকার বাইডেন সরকারের নিজ লাভালাভের মানদণ্ড দিয়ে যদি বলেন তা হলেই কেবল সেটা “গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র” বলে মানা হবে।

এক কথায় বললে, বাইডেনের ‘ডেমোক্র্যাসি সামিট’ এতই দেউলিয়া যে, এর ‘ডেমোক্র্যাসি’ ধারণার কোনো সংজ্ঞায় যাওয়ার মুরোদ নেই। তাই দেয়া হয়নি বা কাজ করে না। কোনো ক্রাইটেরিয়াই নেই। কী কী থাকলে ‘ডেমোক্র্যাসি’ মানা হবে তাও জানা যায় না। তারা বলতে পারেন না। যেন এটা কেবল বাইডেন প্রশাসনের স্বার্থের খেয়াল যে, তারা কাকে কাকে ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ মনে করবে।

কেন এটা এমন হয়ে গেলঃ
এমনিতেই বাইডেনের সমস্যা দাড়িয়েছিল কাকে ডাকবেন আর কাকে না। বা অন্যভাবে বললে, কারা “গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র” তা বলতে না পারলে ডাকবেন কী করে? অথবা কোন রাষ্ট্রকে ডেকে বসা মানে তো হয়ে যাবে বাইডেন তাহলে ঐ রাষ্ট্রকে তাহলে আপনাতেই বাই ডিফল্ট [by default] গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র মনে করছেন। এছাড়া বাইডেনের মনে আরো এক বড় “চোরামি” তো কাজ করছেই যে তিনি চীনকে বিব্রত করবেন কোপাবেন!

তাই সব মিলিয়ে খুব সহজ সেই একই পন্থা অনুসরণ করেছেন!। তা হল যেমন, কোনো ঘটনাকে তারা ‘টেররিজম’ বলবেন বা বলেন? এরও কোনো সংজ্ঞা বা মানদণ্ড এখনো নেই। কখনো দেয়া হয়নি। এভাবেই চলছে। আর আছে এর বদলে তাদের একটা তালিকা। ওই তালিকায় যেসব রাষ্ট্রের নাম আছে সেটাই তখন থেকে টেরর বা জঙ্গি রাষ্ট্র। এই হল অসততার স্টাইলটা। বুশের আমল থেকে এ ব্যবস্থা চালু আছে আমেরিকায় এবং তা এখনো বহাল করে রাখা আছে। এমনকি জাতিসঙ্ঘেরও টেরর রাষ্ট্রের কোনো সংজ্ঞা বা ক্রাইটেরিয়া নেই। সেখানেও একই পদ্ধতি। এগুলোকেই বলা যায় ‘মাতবর’ রাষ্ট্রগুলোর বৈষয়িক মানে বিষয়-আশয়ের স্বার্থের ভিত্তিতে ওই তালিকায় নাম ঢুকানো বা বের করা।

কাজেই এটা পরিষ্কার, বাইডেন প্রশাসনের চেয়ে বড় মানবাধিকারের দোকানদার ও স্বার্থবাজ আর কেউ নেই। আমাদের ব্যবহারিক অসুবিধা এবং কঠিন সমস্যাটা হল, ক্ষমতাবান প্রধান রাষ্ট্রগুলোর সমর্থন ছাড়া হিউম্যান রাইট লঙ্ঘনের ইস্যুতে সেই লঙ্ঘনকারী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ আসার কোনো সুযোগই নেই। একমাত্র এখন এক বিকল্প হল যতটুকু যা সম্ভব তা হল, বিশ্বজুড়ে ব্যাপক জনমতের চাপ কোন ইস্যুতে যদি তৈরি করা যায়। কিন্তু প্রতিটি রাষ্ট্রের বেলায় এমন গ্লোবাল জনমত তৈরি প্রায় অসম্ভব। তবুও আমাদের লড়তেই হবে, এটা বটম লাইন। এ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

থিঙ্কট্যাংক ফেলো এরা কী বলেনঃ
গত লেখায় আমেরিকান “ফরেন পলিসি” পত্রিকায় মাইকেন কুগেলম্যানের নিয়মিত ‘সাউথ এশিয়া ব্রিফিং’-এর কথা বলেছিলাম। এটা সাপ্তাহিক ব্রিফিং বা কলামের মত। চলতি এই সপ্তাহে সেই কুগেলম্যানও বাইডেনের ‘ডেমোক্র্যাসি সামিটকে’ ইস্যুতে সম্ভবত সরাসরি সমর্থক হওয়াটার বিপদ বুঝেছেন। তাই তিনি কিছুটা সমালোচক হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ মনে করেছেন। তিনি আগেই স্বীকার করে নিচ্ছেন যে, ‘ডেমোক্র্যাসি সামিটে’ দাওয়াতি কারা হবেন এ নিয়ে কোনো সংজ্ঞা বা মানদণ্ড এখানে নেই। তিনি লিখছেন তালিকায় নাম থাকা না থাকা নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে আর এতে এই অনুমান তৈরি হয়েছে যে, বাইডেন প্রশাসন ‘অযোগ্য দাওয়াত-দাতা’ […controversy over the list of participating countries, coupled with the perception that the United States is an unfit host……]। কুগেলম্যানের ভাষায় ‘আনফিট হোস্ট’ এবং তিনি বলছেন, দক্ষিণ এশিয়ার নিমন্ত্রিত দেশের তালিকা দেখে বোঝা গেছে, এই সামিটে দাওয়াত পাওয়ার যোগ্যতা বা একমাত্র মানদণ্ড ডেমোক্র্যাটিক পারফরম্যান্স ছিল না; এটি প্রমাণিত। মানে, অন্য অনেক কিছু ছিল। কুগেলম্যান এমনকি ব্রিটিশ ফ্রিডম হাউজের র‌্যাংকিংয়ের সাথে তুলনা নিয়ে এসে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে, বাইডেন কোনো মানদণ্ডই মানেননি, এখানে অনুসরণ করেননি।

“The Biden administration’s Summit for Democracy, hosted virtually today and Friday, comes at a moment of global democratic backsliding. However, controversy over the list of participating countries, coupled with the perception that the United States is an unfit host, has accompanied the event. The South Asian invitees prove democratic performance isn’t the sole criterion for a seat at the summit.” – Michael Kugelman,

এবার তিনি সরাসরি লিখেছেন, আসলে এশিয়ার যেসব দেশের নাম তালিকায় রাখলে ‘আমেরিকার রাষ্ট্রস্বার্থ হাসিল হয়’ (বেস্ট সার্ভ ইটস কারেন্ট ইন্টারেস্ট) সেসব দেশের নামই ওখানে রাখা হয়েছে; অর্থাৎ বাইডেনের তালিকার গরমিলের বোঝা এতই ভারী যে, তিনি সোজা এর দায়দায়িত্ব নেননি; ঝেড়ে ফেলে দিয়েছেন। উল্টো নিজেই সমালোচকদের দলে ভিড়ে গেছেন।

থিংকট্যাংক ফেলোঃ

এখন আরেকজনের নাম করব তিনিও মাইকেল কুগেলম্যানের মতোই থিংকট্যাংক ফেলো- আলী রিয়াজ; তিনি কিন্তু একেবারে ‘ধরাশায়ী’ হয়ে গেছেন। সম্ভবত তিনি ভেবেছেন থিংকট্যাংকের সিনিয়র বা জুনিয়র ফেলো হওয়ার কাজটা হল – উপস্থিত আমেরিকান প্রশাসনের পক্ষে সাফাই দেয়া। এমন ভাবাটা এশিয়ান অরিজিন মানুষের সমস্যা কি না, জানি না। আলী রিয়াজ ‘ডেমোক্র্যাসি সামিট’ ইস্যুতে কুগেলম্যানের উল্টো অবস্থানে গিয়ে বাংলাদেশের মানবজমিন পত্রিকায় [বাইডেনের গণতন্ত্র সম্মেলন আলী রীয়াজের মূল্যায়ন] বিরাট এক সাক্ষাৎকারে বাইডেনের পক্ষে ব্যাপকভাবে সাফাই জোগানোর চেষ্টা করেছেন।

বলাবাহুল্য, সাফাইটা দাঁড়ায়নি। কারণ, সম্ভবত কতটা উজানে বাওয়া যায় তারও তো কিছু সীমা থাকে! কারণ বাইডেনের রাষ্ট্রস্বার্থের খেয়ালে যে তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে তার স্বপক্ষে সাফাই তিনি কোথা থেকে আনবেন?

এমনকি বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা কী? গত ২০০৭ সালে এই একই কথিত ‘গণতন্ত্র’, মানবাধিকার আর দুর্নীতিবিরোধী কথা বলে আমেরিকান গণতন্ত্রী যারা ‘তাদের’ আগমন ঘটেছিল। কিন্তু বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া ছিল এর পরিণতি! এটা কে অস্বীকার করতে পারবে? তা হলে আলী রিয়াজ আজ কোথা থেকে কী আর সাফাই আনবেন? কী সাফাই দেবেন? এরা গণতন্ত্রী???

তাই বাইডেনের ‘গণতন্ত্র’ সম্মেলন আসলে হয়ে গেছে কৌশলগত ‘গণতন্ত্র’ সম্মেলন; অর্থাৎ কৌশলগত; মানে যা বলে তা করে না; করে আরেকটি। ছলনা করে। নানান নখরাও করে। কেন? ইংরেজি স্ট্রাটেজিক শব্দটার বাংলা করা হয় কৌশলগত বা কৌশলী। তাই আমরা দেখেছি আলী রিয়াজের মানবজমিনে দেয়া বক্তব্যে তিনি উপায়ন্ত না পেয়ে নিজের ইজ্জত ঢাকতে শেষে এই ‘স্ট্রাটেজিক” শব্দটা এনেছেন। অর্থাৎ তিনি সংজ্ঞাহীনতা বা মানদন্ড না থাকার সব অভিযোগ স্বীকার করে নিয়েই যেন বলেছেন, ‘পাকিস্তান ও ভারতকে আমন্ত্রণ জানানোর কতগুলো কৌশলগত কারণ রয়েছে। শুধু যে গণতান্ত্রিক বিবেচনাই প্রাধান্য পেয়েছে, তা নয়। এর কারণ যুক্তরাষ্ট্রকে এ অঞ্চলে ও অন্যান্য অঞ্চলে তার কৌশলগত যে নীতি আছে, সে দিকে গুরুত্ব দিতে হয়েছে। এ কথা এখন আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ভারতকে এখন আর আমরা কোনো অবস্থাতেই ‘গণতান্ত্রিক দেশ’ বলতে পারব না।’

পাকিস্তান এবং ভারতকে আমন্ত্রণ জানানোর কতগুলো কৌশলগত কারণ রয়েছে। শুধু যে গণতান্ত্রিক বিবেচনাই প্রাধান্য পেয়েছে সেটি নয়? এর কারণ যুক্তরাষ্ট্রকে এই অঞ্চলে এবং অন্যান্য অঞ্চলে তার কৌশলগত যে নীতি আছে সেদিকে গুরুত্ব দিতে হয়েছে। একথা এখন আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ভারতকে এখন আর আমরা কোনো অবস্থাতেই গণতান্ত্রিক দেশ বলতে পারবো না” – আলী রীয়াজের মূল্যায়ন মানবজমিন

এখানে তিনি পুরো সারেন্ডার করেছেন; অর্থাৎ তার গণতন্ত্র এখন আর বিশেষণ ছাড়া শুধু গণতন্ত্র নয়। এর বিশেষণ এখন ‘কৌশলগত’ এই শব্দটা সামনে জুড়ে দিয়ে। তবুও সাফাই দেয়ার চেষ্টা বন্ধ করেননি। তাই এবার কৌশলগত শব্দের আমদানি। অথচ কে না জানে যা কৌশলগত তা আর কোনো ক্রাইটেরিয়া বা মাপকাঠি নয়। এটা একান্তই বাইডেনের আমেরিকার নগদ লাভালাভের স্বার্থ!

ইমরানের রসিক জবাবঃ
তবে আমেরিকান দাওয়াত মানে গণতন্ত্রের সার্টিফিকেট বেচা বিক্রিটার মধ্যে এক চরম তামাশা ঘটিয়ে দিয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। তিনি এই দাওয়াতে যেতে অপারগতা (decline) জানিয়েছেন [Pakistan declines US democracy summit invitation]। সাথে বলেছেন, তারা চীন-আমেরিকা এমন দলাদলি বা ব্লক ভাগাভাগিতে পড়তে চান না! [We don’t want to enter bloc politics: PM] বলাই বাহুল্য এ’এক ইমরানের ভাল “স্মার্ট মুভ”।

যা হোক, মনে হচ্ছে আলী রিয়াজ কুগেলম্যানের কাছে জেনে নিতে পারতেন যে, থিংকট্যাংক ফেলোর চাকরি নেয়া মানেই আমেরিকান প্রশাসনের সিদ্ধান্তের দায় নিয়ে ‘পক্ষে’ লিখতেই হবে তা নয়। দায় না নিয়েও এবং সাথে সমালোচনা করে বা নিদেনপক্ষে অন্যরা কী সমালোচনা করেছে তার প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেও সেসব উল্লেখ করে কথা বলা সম্ভব।

তবে আলী রিয়াজের লম্বা সাক্ষাতকারে সমস্যা হয়তো অন্যখানে এবং তা আরো জটিল হয়ে গেছে; মুল কারণ সম্ভবত আলী রিয়াজ অহেতুক কমিউনিস্ট ও নন-কমিউনিস্ট ভাষ্যের বিতর্কে ঢুকে গেছেন। একালে কোনো রাষ্ট্র আর কমিউনিস্ট কি না, এটা কোনো ফ্যাক্টর বা ইস্যুই নয়। যেমন স্বৈরাচার বা ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র হতে গেলে তাকে কমিউনিস্ট হতে হবে, তা তো নয়। মোদির হিন্দুত্ববাদ নিশ্চয়ই কমিউনিজম নয় বা এই দোষে দুষ্ট নয়। আবার আজ পুতিনের রাশিয়া নিজেও দাবি করে না যে, সে কমিউনিস্ট রাষ্ট্র। এছাড়া একালে ব্যতিক্রম বাদে প্রায় সব রাষ্ট্রই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সক্রিয় সদস্য হয়ে গেছে; কারণ এই সক্রিয় সদস্যপদ না থাকলে রাষ্ট্রের বৈদেশিক বাণিজ্য সুবিধা থাকে না। আর না থাকলে মানুষকে কাজ দেয়া খাবারসহ দেয়া এসব রাষ্ট্র চালানোই মুশকিল, একালে প্রায় অসম্ভব। এই মাপকাঠিতে চীন-রাশিয়া সবাই আর কমিউনিস্ট কি না সে প্রশ্ন তোলা এমন কমিউনিস্ট কে আছেন? অন্তত কমিনিস্টদের নিজের এই মাপকাঠি অনুসারে! আর চীনের ক্ষেত্রে এমন প্রশ্ন তো আরো অচল। কারণ আমেরিকা ক্রমশ আরো দুর্বল হচ্ছে এভাবে সব সক্ষমতা হারিয়ে ফেললে তাকে সরিয়ে চীন গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম বা অর্থনীতির নেতার আসনে বসতে যাচ্ছে। কাজেই সে কমিউনিস্ট কি না, এটা নিয়ে আর কী করবেন? অবশ্য অভ্যন্তরীণভাবে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি পুরনো বক্তব্যের সাফাইয়ের ওপরই চলে এবং কমিউনিজম-২ বলে কিছু একটা করার ভাবনা আছে, এ কথা ভাবছে।

কাজেই আলী রিয়াজ যেমন লিখছেন, “সারা বিশ্বের দিকে তাকালেই বোঝা যাবে দুটো আদর্শিক অবস্থান তৈরি হয়েছে যার একটির প্রতিনিধিত্ব করে যুক্তরাষ্ট্র। অপরটির প্রতিনিধিত্ব করে চীন ও (বলা যায়) রাশিয়া” – এগুলো একেবারেই ভুয়া কথাবার্তা এবং অচল মুখস্থ কথাবার্তা। একালে এটা আর কোন বুদ্ধিমানের পর্যবেক্ষণ বা মিনিংফুল অবজারভেশন হয়নি। তবে ‘ডেমোক্র্যাসি সামিট’কে কমিউনিজমের বুদ্ধি বা ক্রাইটেরিয়া দিয়ে সাফাই ব্যাখ্যা দেয়া আসলেই বেশ অভিনব। তা হলে চীন যখন গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের নেতা হবে (ইতোমধ্যেই অনেকদুর আগিয়েছে), তখন কথিত ‘আদর্শিক অবস্থান’ জিনিসটা কোথায় থাকবে?

আসলে আমাদের ভেবে কথা বলতে হবে। পুরনো কমিউনিজম কী শিখিয়েছে তাই শেষ কথা বা সবচেয়ে জ্ঞানের কথা মেনে নেয়াটাই তো ভিত্তিহীন এবং তা অবাস্তব, ননপ্র্যাকটিক্যাল। পুরান কথা আকড়ে ধরা নয়, বরং পর্যালোচনা, নিরন্ত্রর পর্যালোচনাই তো রাস্তা!

কথা আরো আছে। এই যে গণতন্ত্র শব্দটা আমেরিকা চালু করল মডার্ন রাষ্ট্র সম্পর্কে এটা তো মূল শব্দ বা ধারণা কোনটাও নয়। মূল ধারণামূলক শব্দটা হল ‘রিপাবলিক’ [republic] বা মডার্ন রিপাবলিক। অথচ এই ধারণাটাই ছুড়ে ফেলে দিয়ে আমেরিকা কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে গিয়ে শব্দটি বদলে আনা হল নতুন শব্দ ‘গণতন্ত্র’। এর পেছনের মূল কারণ সোভিয়েত ইউনিয়ন বা চীন – এ’দুই রাষ্ট্রই তাদের স্ব স্ব বিপ্লবের পরে নতুন রাষ্ট্রের নামের মধ্যে এই “রিপাবলিক” শব্দটা রেখেছিল। ইউএসএসআর (USSR) এই নামের মধ্যে ‘আর’ মানে রিপাবলিক। ওদিকে চীনের আনুষ্ঠানিক নাম পিআরসি (PRC) বা পিপলস রিপাবলিক অব চায়না। অর্থাৎ এখানেও ‘রিপাবলিক’ শব্দ হাজির। তাই আমেরিকার পক্ষে কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলো রিপাবলিক নয়, তা বলা সম্ভব হচ্ছিল না; যদিও তাদের ক্ষমতা কাঠামোতে সমস্যা আছে। তাই আবার সেই আমেরিকান কৌশল খাটানো বা স্ট্রাটেজি!

রিপাবলিক শব্দটি ফেলে দিয়ে প্রমিনেন্ট করা হলো নতুন শব্দ ‘গণতন্ত্র’কে। আর তাতে সবচেয়ে জোর দেয়া হল, যা কমিউনিস্ট দেশে নেই বা দুর্বল অপুষ্ট; এর একটা যেমন ভোট বা নির্বাচন। যার মূল এবং মৌলিক ধারণাটা হল জনপ্রতিনিধিত্ব। অথচ আমেরিকান কথিত “গণতন্ত্রের” ধারণায় জনপ্রতিনিধিত্ব ধারণাটার গুরুত্বই নেই। সামনে আনা হয় না। ভোট মানেই গণতন্ত্র আর এই ভোটের ধারণার নিচে চাপা দিয়ে ফেলে রাখা হয়েছে। আবার ওদিকে যেমন বাক-ব্যক্তির স্বাধীনতা; অর্থাৎ যেসব শব্দ উচ্চারণ করলে কমিউনিস্টরা বিব্রত হবে সেসব শব্দকে সামনে আনা হয়েছে। এতে গ্লোবাল আইডিয়ার লড়াইয়ে আমেরিকা মাইলেজ পেয়েছে, সন্দেহ নেই বিশেষ করে কোল্ড ওয়্যারের আমলে। কিন্তু সবচেয়ে ক্ষতি হয়েছে রাষ্ট্রবিষয়ক ধারণাগুলো বোঝাবুঝিতে, রাজনীতির বোঝাবুঝির ক্ষেত্রে। রাজনীতি বা রাষ্ট্র মানে তা নেমে এসেছে ভোটাভুটিতে। এ ছাড়া সবচেয়ে ক্ষতি করেছে রাষ্ট্রবিষয়ক ধারণার বিকাশ ঘটতে না দিয়েও এই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় ছেদ ঘটানো হয়ে গেছে।

যেমন কেন রিপাবলিক ধারণাটা? এটি যে মনার্কি[monarchy] বা রাজতন্ত্রের বিপরীতে রাজতন্ত্রের পেট চিরে একটি নতুন ধারণা বা সমাধান তা ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে – আমেরিকার এই গণতন্ত্র শব্দটি এনে। যেমন আরো গুরুত্বপুর্ণ একটা দিক হল, ব্যক্তি মানুষের উন্মেষ, এর ইতি ও নেতি দিক, পারসোনাল লিবার্টি, রাইট টু লাইভ, বেঁচে থাকার বা জীবনের অধিকার এমনকি খোদ রাজনীতি বা রাজনৈতিকতা শব্দটার অর্থ কী? এসব কিছুকে আড়ালে ফেলা শুধু নয়, কবরে মাটিচাপা দেয়া হয়ে গেছে। আর সব কিছুকে নামিয়ে আনা হয়েছে ‘গণতন্ত্র’ আর ভোটাভুটিতে। কোল্ড ওয়্যারের যুগের এই আমেরিকা-সোভিয়েত এই ব্লক রাজনীতির ধারণার আড়ালে। অথচ আজো এসব বাজে তর্ক- আমেরিকা-সোভিয়েত ঠাণ্ডা যুদ্ধে কার পক্ষে মাইলেজ আসবে- সেসব নিজ অযোগ্যতাতেই এখন আপনাআপনিই ক্ষয়ে লুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। কারণ প্রশ্নটা আমেরিকা না সোভিয়েত- কে ভালো এর তর্ক একেবারেই নয়। কারণ আমাদের জানতে ও চিনতে হতো ও হবে রাষ্ট্রকে। নিজের রাষ্ট্র ও সমাজকে গড়তে। আমরা আমেরিকা না সোভিয়েত রাষ্ট্রের সমর্থক হব মামলাটা সেটা নিয়ে কখনই নয়।

তবে আমেরিকার সমালোচনা করা হচ্ছে মানে চীনা বা কমিউনিস্ট রাষ্ট্র আদর্শস্থানীয় তা নিশ্চয়ই নয়। কমিউনিস্টদেরও বয়স মানে রাষ্ট্র অভিজ্ঞতাও শত বছর হয়ে গেল। লেনিনের প্রথম গনভোটে পরাজিত বা অভিজ্ঞতা সুখকর হয় নাই বলে জন-প্রতিনিধিত্ব ধারণার বাস্তবায়ন নিয়ে আর ভাবা যাবে না এর কোন মানে নাই। এছাড়া গ্লোবাল পলিটিক্যাল দিকটা নিয়েও চীনকে ভাবতেই হবে। চীন নিজে আভ্যন্তরীণভাবে আজ ক্ষমতাসীনদের নিয়ন্ত্রিত আছে থাকছে সেটা হতেই পারে। কিন্তু কাল নাও থাকতে পারে! মানুষের বাস্তবায়নযোগ্য আকাঙ্খায় লাগাম পরিয়ে রাখা যায় না। এছাড়া গ্লোবাল পলিটিক্যাল বলেও আলাদা কিছু আছে ; কিন্তু গ্লোবাল নেতৃত্বের দৃশ্যপটের আস্থা অর্জনও কম জরুরী। এদিকগুলো ছাড়া চীনের কেবল গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা হওয়াটা আদৌও কতটা সম্ভব অথবা কতটা সুখকর অভিজ্ঞতা ও সফল বা শান্তিপুর্ণ থাকবে সে প্রশ্ন থেকেই যায়। কাজেই আমাদেরটাও “আমাদের মত গণতন্ত্র” – এটা মুখরক্ষায় বা সার্বভৌমত্বের অজুহাতে বলা যায় হয়ত কিন্তু অর্থ হয় না। আর অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা-চিকিতসা-বাসস্থান এসব মানুষের ভোগ-সংশ্লিষ্ট ফলে বৈষয়িক বিষয়গুলোকে ১৯৬৬ সালে কোনমতে জোড়াতালিতে জাতিসঙ্ঘের দলিলে কমিউনিস্ট মানবাধিকার বলে তালিকাবদ্ধ করা হয়েছে বটে। কিন্তু সরি, এই পাঁচটার একটাও “রাজনৈতিক” ধারণাই নয় বৈষয়িক-ভোগের ধারণা – যা রাজনৈতিক নয়। ফলে যা “রাজনৈতিক” ধারণা নয় তা “অধিকার” হবে কী করে? সবার আগে “রাজনীতি” শব্দের অর্থ ধরতে পারতে হবে। মানুষ কেবল ভোগী এক মেশিন তো নয়। সে আপাদমস্তক পলিটিক্যাল। এসব কথার অর্থ বুঝতে হবে। এর উপর আবার মানুষের স্পিরিচুয়াল আকাঙ্খা আছে। তাকেও জায়গা করে দিতে হবে। এসব ছোটখাট বিষয় নয় বরং গভীর দর্শনের বিষয়। মানুষকে অনেক দূর যেতে হবে, আবার অনেক কিছু বাকি! ওদিকে কমিউনিস্ট অর্জনও নিশ্চয় অনেক। কিন্তু সব শেষ নয় অবশ্যই। বহু সংস্কারই বাকি!

আমাদের আগের প্রসঙ্গে ফিরি। একালে এসে কে কমিউনিস্ট আর কে মেন-স্ট্রিম এসব কোল্ডওয়ারের ভাগাভাগি কমে এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে নাই-ই। তবু অনেকের জন্য সম্ভবত এটা কষ্টসাধ্য যে, একটা মনার্কি সিস্টেমের বিপরীতে রিপাবলিক-কে বুঝতে হবে এবং তুলনা করে। এছাড়াও এটা না বুঝলে জানা যাবে না যে, রাজতন্ত্রে ব্যক্তি-মানুষ বলে কিছু নেই। ছিল না কেন? ধারণাটাই নেই, তখনও উন্মেষ ঘটে নাই তাই। আমেরিকা কী করে ‘লিবার্টির’ আমেরিকা হয়ে উঠেছে; আমেরিকান হিস্ট্রি গুরুত্বপুর্ণ সেই ইতিহাসে কমিউনিস্টদের আগ্রহ নেই। আগ্রহ হল, আমেরিকা কী করে ‘গণতন্ত্র’ নামে একটি ধাপ্পাবাজির প্রচারক হয়েছে অথবা এটা দিয়ে সোভিয়েতকে হারিয়েছে, সেখানে।

ইতিহাসে এক গোত্র বা ট্রাইবাল [tribal] সমাজ পেরিয়ে অনেক পরে ব্যক্তি মানুষের উন্মেষ হয়েছে তাও আবার রাজতন্ত্রের যুগের শেষপ্রান্তে এসে। তাও তাতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ব্যক্তির উন্মেষের খবর হয়নি, জানা হয়নি অনেক সমাজে। যেমন যেকারণে আমেরিকা তালেবানদের পশ্চাৎপদ বলে সুযোগ নেয় কিংবা এই সুযোগে ইসলাম পশ্চাৎপদ বলে প্রপাগান্ডা করতে ভালোবাসে। আর এসব বলাবলিকে কাজে লাগাতে চায় এভাবে যে, ওরা পশ্চাৎপদ; কাজেই তালেবানদের এখন আমেরিকান আধিপত্য মেনে নিতে হবে, কায়েমের কাজে লাগতে হবে। অথচ নিজেরা যে কথিত ‘গণতন্ত্রের’ প্রচারে লেগে আছে যেটা স্রেফ ভোটাভুটি আর আমেরিকার তাতে স্বীকৃতি। অথচ এসবের বিপরীতে আমাদের দরকার নিজ রাজনীতি ও রাষ্ট্রধারণার বিকাশ, নিজ রাষ্ট্র গড়ে তোলা। ট্রাইবাল সমাজের অভ্যাস রীতি কেন ব্যক্তি-উন্মেষ হয়ে যাওয়া সমাজে খাটবে না সেটা আগে উপলব্দি করা।

একালের আমেরিকা আরো ভয়ঙ্কর। একটা উদাহরণ দিব, বাকিটা সবাই বুঝবে। ইটিআইএম- ইস্টার্ন টার্কিস্তান ইসলামিক মুভমেন্ট (ETIM)। নাম শুনে অনেকের বুঝতে কষ্ট হতে পারে, তাই চিনিয়ে দেই। এরাই হলো চীনা উইঘুরের সশস্ত্র সংগঠন। এই সংগঠন সম্পর্কে এক আমেরিকান থিঙ্কট্যাংকের তথ্য-ভাষ্য এখানে। এই সশস্ত্রতা, এদের এখনকার বসবাস ও তৎপরতা আফগানিস্তানে আশ্রয় নিয়ে।

বুশের আমল থেকেই এরা টেরর বা সন্ত্রাসের দল হিসেবে আমেরিকান ও ইউএনের লিস্টে তালিকাভুক্ত। কিন্তু তা এখন ‘ছিল’ বলতে হচ্ছে; কারণ ডোনাল্ড ট্রাম্প তো খুবই বুদ্ধিমান ও ধূর্ত করিৎকর্মা। তিনিই এই ইটিআইএম দলকে নিজ সন্ত্রাসবাদের তালিকা থেকে মুক্ত করে দিয়েছেন। অথচ ২০০২ সালের ডিসেম্বরে আফগানিস্তান, কিরঘিজস্তান, আমেরিকা ও চীন [Afghanistan, Kyrgyzstan, the United States, and China] এদের সবার আবেদনে জাতিসংঘ এই সংগঠনকে তালিকাভুক্ত করেছিল। এনিয়ে আমেরিকান ট্রেজারি ডিপার্ট্মেন্টের এই বিবৃতি এখানে। তাহলে ট্রাম্পের উদ্দেশ্য কী? খুবই ‘মহৎ’! আর ইটিআইএম এখন কী নিয়ে ব্যস্ত ও কোথায়?

পাকিস্তানে চীনা অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পের শেষ নেই। তেমনই এক প্রকল্পের এলাকায় ভেতরের ঘটনা। প্রকল্প কম্পাউন্ডের ভিতরে সেটাও কয়েক মাইল বলে তাদের অভ্যন্তরীণ নিজস্ব বাস সার্ভিস চালু করা আছে, যা দিয়ে ইঞ্জিনিয়ার থেকে শ্রমিক বা যেকোনো কর্মী চলাচল করে থাকে। তেমনই এক বাসে বোমা বেঁধে রেখে তা দিয়ে হামলা পরিচালনা করে ইটিআইএম। আর এতে ঐ বাস পাশের নদীর তীরে বা খাদে পড়ে যায়। এতে ১৩ জন চীনা ইঞ্জিনিয়ার মারা যান। আর এ হামলার নায়ক ইটিআইএম এর এক কর্মী।

ট্রাম্পের তালিকামুক্তি কেন তা আমরা নিশ্চয় বুঝলাম। এখানে এনিয়ে একটা ইন্ডিয়ান রিপোর্ট আছে। কিন্তু খেয়াল করতে হবে; তা হলে এটা কি চীনের সাথে আমেরিকার স্বার্থবিরোধ লড়বার ‘গণতান্ত্রিক’ পদ্ধতি! কী তামাসা! না, তাই বলে এটা ভাবার কারণ নেই যে, বাইডেন এসব থেকে দূরে। অথবা ট্রাম্প একমাত্র গণতন্ত্রী, আর বাইডেন তা নয়! ট্রাম্প এই তালিকামুক্তি দিয়েছিলেন ক্ষমতা ছাড়ার অল্প আগ দিয়ে। মানে হল, এর পুরো ‘লাভালাভ’ ও পারফরম্যান্স সব ক্রেডিট এবং বাকি অনুমোদন বাইডেনের নামে।

এরপরে আরো ঘটনা হল, তালেবানরা গত আগস্টে কাবুলে ক্ষমতা দখলের আগে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে তাদের নেতারা এক সাক্ষাৎ করেছিল। ওই মিটিং শেষে তালেবানরা প্রকাশ্যেই মিডিয়াকে জানিয়েছিল, এমন সশস্ত্র গ্রুপগুলো যারা আফগানিস্তানে আশ্রয় নিয়ে অন্য দেশে সশস্ত্র তৎপরতা চালাচ্ছে তাদের আর আশ্রয় দেয়া হবে না”। আমরা অনেকেই জানি এখনকার আফগানিস্তানে আইএস (কে) বা খোরাসান গ্রুপ যারা তালেবানদের চেয়েও আরো রেডিক্যাল ও আলাদা, তাদের কামনা তালেবানরা যেন বিফল ও পরাজিত হয়, তারা অপেক্ষা করছে। এদিকে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে ঐ সাক্ষাতের পরে ইটিআইএম (ETIM) এরপর থেকে অবাধে আফগানিস্তানে চলাচল সীমিত করে ফেলে শুধু না তারা ঐ আইএস (কে) এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রটেকশনে থেকে তৎপরতা চালু রেখেছে। এরই এক ততপরতা ছিল পাকিস্তানের ঐ চীনা প্রকল্পে হামলা।

চীন-আমেরিকার স্বার্থবিরোধ থাকতেই পারে; থাকা খুবই স্বাভাভবিক!। কিন্তু সেই বিরোধে আপার-হ্যান্ড পেতে ইসলামী সশস্ত্র গ্রুপকে লেলিয়ে দিতে হবে, ব্যবহার করা হবে? এটা কোন গণতন্ত্র?

তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল, বাইডেনের ‘গণতন্ত্র’ – এই বুলির মূল কথা কী?


যেটা আমেরিকার সংকীর্ণ রাষ্ট্রস্বার্থ, সেটাই গণতন্ত্র!

তা হলে বাইডেনের এই ‘ডেমোক্র্যাসি সামিট’ কী বস্তু? আলী রিয়াজ আমাদের গণতন্ত্রের ‘দুটো আদর্শিক অবস্থান তৈরি’ শিখিয়েছেন। আমরা নিশ্চয় এখন এর মর্মবস্তু বুঝতে পেরেছি। আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থটাই হল আমেরিকান ‘গণতন্ত্রের আদর্শ’।

তা হলে আমাদের বাংলাদেশের সরকার সে তো অবশ্যই নিপীড়ক; গুম-খুন থেকে পায়ে গুলি, নিশীথ ভোট ইত্যাদি সকল ইস্যুতেই তের বিরুদ্ধে অভিযোগের এখানে শেষ নেই। আমরা সবাই এসব নিয়েই আছি, নিরন্তর ভুগছি।

এখন এতে আমেরিকা যদি আগ্রহ নেয় তার মানে যেটা ‘আমেরিকার রাষ্ট্রস্বার্থ সেটাই গণতন্ত্র!’ চলবে এখানে? এই সূত্র অনুসারে এগিয়ে আসে তা হলে আমাদের এখন খোঁজ নিতেই হয় যে এখানে আমেরিকার রাষ্ট্রস্বার্থটা মানে গণতন্ত্রটা ঠিক কী? আর তা এবার কী মুল্যে?

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]

Advertisements