বই পড়ার মুশকিল

বই পড়া নিয়ে প্রচুর কথা আছে। অনেক ধরনের বই-পত্রও বাজারে পাওয়া যায়। শিক্ষার যেসব সমস্যা আছে সেগুলোকে পাশকাটাতে না পারলে বই পড়াটা তেমন কোন কাজে আসে না। শিক্ষার অনেক সমস্যার মধ্যে এক নাম্বার সমস্যা হলো, একালে শিক্ষার সাথে জ্ঞানের আরও পরিষ্কার করে বললে আত্মজ্ঞানের কোন সম্পর্ক নাই। ফলে বই পড়ার বিষয়টা অতি জটিল। আমরা ট্রেডিশনালি যেভাবে নিজেদের শিক্ষিত করি তার সমস্যা বুঝতে পারলে দেখা যাবে বই পড়া একটা কঠিন কর্ম।

আমরা অনেকে মনে করি প্রচুর পড়লেই বুঝি একটা বিশাল ব্যাপার হবে। এগিয়ে থাকা যাবে। বই পড়ার সাথে সমাজের অন্য অনেকরকম প্রতিযোগিতার মিল আছে। আধুনিক মানুষ বই পড়েন একটা আত্ম-অহংকে পরিতুষ্ট করতে। ভারতীয় লেখক আবুল বাশারের মতো অনেকেই মনে করেন, বই পড়ার অহংকারটাও একধরণের সৌন্দর্য, চরিত্রে ঐ বস্তু কিছুটা থাকলে মানুষকে সুন্দর দেখায়। আর বই তো বাড়ি সাজানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপকরণও হয়ে উঠেছে। ফলে বইমেলাতে সৌখিনদের প্রচুর আনাগোনাও থাকে। আবার অনেকে সবাই যে ধরণের বই পড়েন তার থেকে নিজেকে আলাদা করার জন্য খুব আন-কমন বই-পত্র নিয়ে নাড়াচাড়া করেন। ইউনিক পাঠরুচি গড়ে তুলতে চান। বা মনে করেন, খুব আন-কমন বই-পত্র পড়লেই বিশাল কিছু অর্জন করা যাবে। আসলে আপনি কি পড়েন তাতে কিছু যায় আসে না। মূল কথা হলো আপনি কীভাবে পড়েন?

মহান দার্শনিক হাইডেগার যেমন বলেন,
“Tell me how you read and I’ll tell you who you are”
-Martin Heidegger.
আপনি কি পড়েন সেটা বড় কথা না, আপনি কীভাবে পড়েন সেটাই আপনার পরিচয় তৈরি করে।

শিক্ষার অনেক সমস্যার মধ্যে এক নাম্বার সমস্যা হলো, একালে শিক্ষার সাথে জ্ঞানের আরও পরিষ্কার করে বললে আত্মজ্ঞানের কোন সম্পর্ক নাই

আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষ- কোন কিছু কীভাবে পড়তে হয় তা না জেনেই শিক্ষিত ও পণ্ডিত হয়ে যান। তথাকথিত শিক্ষার অহংকারে একটা জাতি যে কতোটা মূর্খ হতে পারে তা বাংলাদেশকে না দেখলে কেউ বুঝবে না। আমি বই পড়ার বিষয়টা সাধারণত এভাবে বলি, বই একটা অস্ত্র বা যন্ত্রের মতো। আপনি যদি চালাতে না জানেন দুনিয়ার সবচেয়ে উন্নত একে৪৭ দিলেও আপনি কিছু করতে পারবেন না, অথবা মিস অপারেট করে দেখা যাবে নিজের শরীরেই গুলি করে বসেছেন। ঘটিয়ে ফেলেছেন অঙ্গহানি। ভাল বই আপনার হাতে থেকেও লাভ নাই। আপনি যদি না জানেন- কীভাবে আপনি পড়বেন?

অনেক সময় চারপাশে প্রচুর বই-পূজারি দেখা যায়, যাদের সরল বাংলায় আমরা বুকিস লোকজন বলি, এরা আমাদের বিরক্তির কারণ হয়। দুনিয়ার সাথে, জীবনের সাথে তাদের কোন সংযোগ থাকে না। বিশেষ করে হাইব্রিড মধ্যবিত্তের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি। আমাদের মতো অনুন্নত কিন্তু আধুনিকতাকামী সমাজে বই পড়ার চর্চাটা একটা অহংকার হিসেবে বেশ ভালই জায়গা করে নেয়। বই পড়ার অহংকারটা সাংস্কৃতিকভাবে খুব গুরুত্ব পায়। এ ধরণের প্রবণতা বুকিশ জেনারেশন তৈরি করে। অনেকে বলবেন এই জাতি তো বই-ই পড়ে না। শিক্ষার হারই এখনও আশা জাগানিয়া স্তরে পৌঁছেনি ফলে যারা বই পড়ে, যাই পড়ুক তাদের অবশ্যই আলাদা গুরুত্ব আছে। নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো, কিন্তু এই কানা পদে পদে হোঁচট খাইতে খাইতে এতোটা জনবিচ্ছিন্ন, আত্মবিকারগ্রস্ত ও নার্সিসাস হয়ে ওঠে যে এগুলো তখন সমাজের বোঝায় পরিণত হয়। ফলে হরে দরে বই পড়াটাকে খুব বিশাল ক্রেডিট আমি দিতে চাই না।

ক.মনে রাখতে হবে বইপড়া একটা রিস্কি কাজ। পরিষ্কার করে বলি, বই পড়াটাকে যখন আত্ম-জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম হিসেবে নেয়া হয়- তখন এটা ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক উভয়ভাবে রিস্কের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এটা তথ্যগত(বিসিএস বা পাশ করা বা চাকরির জন্য ইউটিলিটিরিয়ান/ব্যবহারবাদী) পড়ার বেলায় হয় না। হয়, চিন্তাগতভাবে নিজেকে মোকাবেলা বা আবিষ্কার করার ক্ষেত্রে।

হাভার্ড-এর আইনের শিক্ষক মিশেল স্যান্ডেলের একটা আলাপে বিষয়টা প্রথম বুঝতে পেরেছিলাম, যদিও উনি অন্য প্রসঙ্গে আলোচনা করেছিলেন কিন্তু তখন এই ভাবনাটা মনে জেগেছিল। বেন্থামের মোরাল রিজনিং পড়তে গিয়ে বিষয়টা আরও পরিষ্কার হলো । আমরা যখন নিজের ভাবনার আলোকে, পদ্ধতিগতভাবে চিন্তা করে নিজের সিদ্ধান্ত নিতে পারি তখন তো একটা নতুন মানুষের জন্ম হয়। একজন লেখক/ দার্শনিক আপনাকে শুধু নতুন তথ্য দেয় না, সে দেয়- নতুন আইডিয়া, দুনিয়াকে নতুন করে দেখবার উস্কানি। আইডিয়ার একটা প্রভাব আছে। এই উস্কানির মধ্যে আপনি যদি সচেতন বা অবচেতন ভাবে পড়েন তখন আর চিন্তাশূন্য থাকতে পারেন না। ভাবনাহীন থাকতে পারেন না। আপনি ক্রমেই জড়িয়ে যান নতুন করে দেখে ফেলা জগতের সাথে। শুরু হয় মোকাবেলার পর্ব। শুরু হয় লড়াই। আপনার চেনা আরামের জগতকে নিজেই বিনাশ করে দিতে শুরু করেন। উলট-পালট ব্যাপার ঘটে যায়। এই জন্যই দেখবেন, প্রথমেই কেউ বই-পত্র পড়ার মধ্য দিয়ে সংশয়বাদী, বিজ্ঞানবাদী ও পশ্চিমা-আধুনিকতাবাদীদের দীর্ঘকালের ভক্ত ও রেডিক্যাল সেকুলার হয়ে ওঠে। এর কারণ হলো, দুনিয়ার জ্ঞান-বিদ্যার সেকুলারাইজেশন ও সবকিছুর উপর বিজ্ঞানবাদিতার যে আধিপত্য কায়েম হয়েছে তা বুঝতে পারার মতোন ক্রিটিক্যাল চর্চার ও পড়ার তরিকা প্রথম প্রথম আমরা বুঝতে পারি না।

তথাকথিত শিক্ষার অহংকারে একটা জাতি যে কতোটা মূর্খ হতে পারে তা বাংলাদেশকে না দেখলে কেউ বুঝবে না

আধুনিক সেকুলার ট্রেডিশনের সবকিছুকে জ্ঞান অন্যগুলোকে অ-জ্ঞান বা অবিদ্যা মনে করেই আধুনিক মানুষ নিজেকে আলোকিত করতে চায়। ফলে এই আলোকিত মানুষ হওয়া আর জীবনের স্বাভাবিক, সহজ ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া একই কথা হয়ে দাঁড়ায়। এই পয়েন্টে আরও অনেক কথা বলা দরকার। কিন্তু লেখা বড় হয়ে যাবে। পরে কখনও বলা যাবে। আলোকায়ন পর্বের সমস্যা নিয়ে অনেক ক্রিটিক আছে। নিচের আলোচনায় জ্ঞানের প্রতি আধুনিকতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির সমস্যার আলোকে অপঠিত বইয়ের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনায় এই বিষয়টির চিন্তাশীল পর্যবেক্ষণ থাকছে। তাই এখানে এতোটুকুই থাক। বিষয়টা অনেকটা ইনোসেন্সি/সরলতা হারানোর মতো। যখন আপনি এই সভ্যতার হারামিপনাটা বুঝে ফেলেন, তখন দুনিয়ার জীবনে আপনি বাঁচেন ডাল-ভাত খেয়ে, কিন্তু যাপন করেন আপনার চিন্তার জগতটায়। তখন রাজনৈতিকভাবে আপনি বাধ্য হন আপনার বর্তমানকে মোকাবেলা করতে। আর না করলে নিজের সাথে প্রতারণা করতে হয়। বেঁচে থাকতে হয় আত্মপ্রতারক হয়ে। তখন কাগুজে বিদ্যার গর্বকে অবলম্বন করে আত্মশূন্যতা আড়াল করতে হয়। এটারই প্রতিযোগিতা এখন শিক্ষার নামে চালু আছে।

ফলে বই পড়া একটা রিস্কি কাজ। নিজের জগতের সাথে নতুন চিন্তার, আইডিয়ার এবং আত্মআবিষ্কারের এক লড়াইয়ের ধরণই হলো বই পড়া। এমন তো হতে পারে- আপনি একটা মতাদর্শকে গ্রহণ করে বিপ্লবী কর্মকাণ্ড শুরু করে দিতে পারেন। এবং নিজের জীবনকে রিস্কে ফেলে দিতে পারেন- বাস্তব বিবেচনাতেও। আর সেটা না করলেও অন্তত মনোজগতের লড়াইটা তো বন্ধ থাকে না। নিজের জগত ভেঙে নতুন জগত মানে
নতুন মানুষ তৈরি হওয়ার এই রিস্কে নিজেকে নিয়োজিত করাই তো বই পড়া। ফলে সব দিক থেকে এটা একটা রিস্কি কাজ।

এর বাইরে যেগুলা পড়া হয় সেগুলা হয়, চাকরির জন্য, নয় ফুটানি দেখানোর জন্য, না হয় ইতরামি/ধান্ধার ব্যাপার। সেগুলার কথা বলছি না। তবে এটা অর্জন করতে হলে আগে জানতে হবে আসলে কীভাবে পড়তে হয়।যেটা আমরা বেশির ভাগই জানি না। কীভাবে আসলে পড়তে হয়? এটা না জানলে কিন্তু সমস্যা। তখন যা ঘটে তা হলো- বই পড়লেই আপনি প্রকৃত ‘শিক্ষিত’ হবেন এমন কোন গ্যারান্টি নাই। আপনি মূর্খও হতে পারেন।

এই দিক থেকেও কিন্তু রিস্ক আছে। ট্রাকে ট্রাকে বই পড়া লোক অনেক সময় সাধারণ বিষয়টা বুঝতে পারেন না। কাণ্ডজ্ঞান না থাকলে বই আপনাকে খুব বেশি সাহায্য করতে পারবে না। ঢাকার এক বুদ্ধিজীবী, যিনি কথায় কথায় কিতাবি রেফারেন্স দিয়ে লোকজনকে চমকে দিতে পছন্দ করেন, তিনি কমপক্ষে পাঁচ ট্রাক বই পড়ে শাহবাগকে বলেছিলেন দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ। সে না বোঝে মুক্তিযুদ্ধ না বোঝে শাহবাগ। বুকিস হলে অবস্থা কেমন হয় এটা তার ভালো উদাহরণ হতে পারে।

খ.
“A good book is more intelligent than its author. It can say things that the writer is not aware of.” —Umberto Eco

বই নিয়ে আলাপ হলে উমার্তো একোর কথা না বলে পারা যায় না। বই নিয়ে তাঁর অনেক লেখাতে যেমন অদ্ভুত অদ্ভুত কথা আছে, বই বিষয়ে একটা বড় বই-ই আছে উনার, ‘This is not the end of book’ নামে। সেটা নিয়ে অন্য সময় আলাপ করা যাবে। যা বলছিলাম, একটা বই কিন্তু লেখকের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান হতে পারে। লেখকের কাছে বইটার যে বক্তব্যটা বা উদ্দেশ্যটা গুরুত্ব পেয়েছে পাঠক সেটার বাইরে এমন জিনিস আবিষ্কার করতে পারে যা লেখক কখনও ভেবেই দেখেন নাই। এমন অনেক লেখক আছেন। আমি একজনের কথা বলতে পারি। হুমায়ূন আহমেদের বেলায় এটা ঘটেছে। তার বই ও চরিত্র একটা ফেনোমেনা হয়ে উঠেছিল। কিন্তু উনার সাক্ষাৎকার বা আত্মস্মৃতি পড়লে দেখা যায় সেইসব লেখাতে যে এমন ব্যাপার ছিল এটা তিনি আবিষ্কার করেছেন পাঠকদের কাণ্ডকারখানা দেখেই। ফলে একোর কথা খুবই জুতসই মনে হচ্ছে। একোর লাইব্রেরি ও বই নিয়ে অনেক কথার একটি কথা বিখ্যাত দার্শনিক নাসিম নিকোলাস তালিব তাঁর অন্যতম সেরা বই ‘দ্যা ব্ল্যাক সোয়ান’ এর প্রথম অধ্যায়েই আলোচনা করেছেন। এটা অল্প একটু উল্লেখ করেই আজকের মতো শেষ করবো।

ট্রাকে ট্রাকে বই পড়া লোক অনেক সময় সাধারণ বিষয়টা বুঝতে পারেন না। কাণ্ডজ্ঞান না থাকলে বই আপনাকে খুব বেশি সাহায্য করতে পারবে না

একো বিরল প্রজাতির এক লেখক । বিপুল বিষয়ে উনার আগ্রহ ছিল। কত বিষয় নিয়ে যে লিখেছেন, বিস্ময়করভাবে। কিন্তু পুরোমাত্রায় একজন দার্শনিক। আবার একই সাথে বাচ্চাদের বই লিখেছেন। আবার বেস্টসেলার উপন্যাসও লিখেছেন। চিন্তাশীল দুনিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছেন। একটা এনসাইক্লোপেডিক চরিত্র। এবং উনার বিশাল এক ব্যক্তিগত পাঠাগার ছিল। তাতে ৩০ হাজারের ওপরে বই। এবং যেসব ভিজিটর আসতো তাদের তিনি দুইটা ক্যাটাগরিতে ভাগ করেছেন। একদল রিএ্যাক্ট করতো- ওয়াও, কী বিস্ময়কর লাইব্রেরী তোমার বলে চোখে কপালে তুলে ফেলতেন। আর একদল, খুব ক্ষুদ্র একটা শ্রেণি মনে করেন, একটা সমৃদ্ধ ব্যক্তিগত পাঠাগার কোনভাবেই ego-boosting appendage বা অহংবর্ধক লেজুড় বিশেষ না বরং একটা গবেষণা উপকরণ। এর পরে তালেব লিখেন, Read books are far less valuable than unread ones. পড়া বইগুলো না পড়া বইগুলোর চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ। এই কথা বলার মধ্যদিয়ে তালেব আমাদের যে কথাটা বুঝাইতে চান তা ঠিক এতোটা সরল না। তিনি মানুষের জ্ঞানের সমস্যার দিকে আমাদের দৃষ্টি ফেরাতে চান।

লাইব্রেরিতে বই সংযোজনের সাথে সাথে আরও যে বিষয়গুলো সম্পর্কে আমরা ওয়াকিবহাল থাকি না তা হলো- আমরা আরও জ্ঞান-উপকরণ সংগ্রহ করতে থাকি, বইয়ের তাকে না পড়া বইয়ের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। আর আমরা বৃদ্ধ হতে থাকি তখন না পড়া বইগুলো আমাদের দিকে তাকিয়ে ভয় দেখাতে থাকে। আয়ু ভয় জেগে ওঠে। এভাবে আপনি যত জানার চেষ্টা করবেন ততই আপনার না পড়া বইয়ের সংখ্যা বাড়তে থাকবে। এই না পড়া বইগুলো লাইব্রেরিতে আছে বা থাকে কিন্তু এগুলা একই সাথে এন্টি-লাইব্রেরি। এরা কোন ভাবেই আপনার লাইব্রেরির পঠিত সব বইয়ের মতো আপনাকে পরিপূর্ণতার তৃপ্তি দিতে চায় না। লাইব্রেরিকে ধারণ করতে চায় না। বাইরেই থাকতে চায় (একো এই ভাবে এন্টি-লাইব্রেরির লজিক ফর্মুলেট করেন)।

বইয়ের তাকে না পড়া বইয়ের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। আর আমরা বৃদ্ধ হতে থাকি তখন না পড়া বইগুলো আমাদের দিকে তাকিয়ে ভয় দেখাতে থাকে

সাধারণত আমরা জ্ঞানকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি মনে করি, এবং এটাকে বৃদ্ধি ও সংরক্ষণ করতে চেষ্টা করি। এটাকে আমরা একটা অলঙ্কারের মতো মনে করি। মানুষের এমন ধারণা একোর লাইব্রেরি সংক্রান্ত ভাবনাকে প্রভাবিত করেছে। এই জানার প্রক্রিয়াটার মধ্যে একটা অসাম্য বা বায়াস আছে যা আমাদের মানসিকতাকে নিয়ন্ত্রণ করে। মানুষ বিপরীত কোন কিছুর দিকে যেতে চায় না। সে কি পড়ে নাই তা সে বলতে চায় না। এখানে একটা প্রতিযোগিতার ব্যাপার আছে। কিন্তু মানুষ যা পড়ে নাই, তা যদি বলতো সেটা খুবই ভালো ব্যাপার হতো। জ্ঞান শুধু জানার ভুবনেই পরিভ্রমণ করে না। না জানার দুনিয়াতেও এটার গুরুত্ব বিপুল। একইভাবে অপঠিত বইয়ের দুনিয়ার দিকে তাকালে দেখতে পাবো আমরা যা জানি তা নিয়ে খুবই সিরিয়াস কিন্তু যা জানি না তা নিয়ে সিরিয়াস না। এভাবে পড়ার মধ্যদিয়ে একটা অভিজ্ঞতাবাদী, যেটাতে সুবিধা পাই, ভালো লাগে সেটা নেবো বাকিগুলো এড়িয়ে যাবো এমন পলায়নপর(স্কেপিস্ট) মানসিকতার তৈরি হয়। তাই না পড়া বইগুলো আমাদের অনেক বেশি কিছু বলে। আমাদের ক্ষুদ্রতাকে চ্যালেঞ্জ করতে থাকে। আমাদের ইমপিরিক্যাল জ্ঞানের বাইরেও বিশাল জগতের ইশারা জারি রাখে এই বিপুল না পড়া বই। ফলে দেখা যাচ্ছে বই পড়াতে যেমন জ্ঞানের ব্যাপার আছে (যদি আমরা জানি কীভাবে পড়তে হবে) তেমনি না পড়ার জগতেও আছে। যা আপনি জানেন না। বা কোনভাবেই পুরোটা জানতে পারবেন না।

অনেক মহান বই না পড়েই আপনাকে মারা যেতে হবে। তাই বলে সেই জ্ঞান-বিশ্বের প্রতি আপনার অবজ্ঞার মধ্য দিয়ে আপনি নিজের জ্ঞানের বাহাদুরি জাস্টিফাই করতে পারবেন না। ফলে জ্ঞানের জগতের এই সব জেনে ফেলার, চূড়ান্ত জ্ঞান অর্জনের যে বিজ্ঞানবাদী প্রলোভন তা বাকোয়াজি। একোর এই চিন্তার মূল গুরুত্ব এখানেই। এ কথা থেকে আবার মনে করবেন না যে, কোন কিছু না পড়েই বা সেই বিষয়ে না জেনেই তা নিয়ে মতামত দেয়া, উইসফুল চিন্তাকেই বিশাল দর্শন মনে করার প্রক্রিয়াকে সমর্থন করছি। ওগুলো একধরণের স্টুপিডিটি। যারা মনে করেন, কোন বিষয় জানার জন্য পদ্ধতিগত চিন্তার দরকার নাই। একাডেমিক শিক্ষার বাজে সংস্কৃতিতে বিরক্ত হয়ে, নিজে আরও মূর্খ থেকে যাবে আর আধুনিক, ডিজিটাল মিডিয়ার মধ্যে আধা-কাব্যিকতা করে সব কিছু নিয়ে র‍্যাটরিক্যালি/বাকোয়াজিপূর্ণ মতামত দিয়ে নিজের বুদ্ধিজীবীতাকে জাহির করবে -এগুলো এক কথায় ননসেন্স।

গ.
বই কীভাবে পড়তে হবে তার কোন একক নির্দিষ্ট তরিকা নাই। তবে কীভাবে পড়ার দরকার নাই সেটা উপরের আলোচনাতে যেহেতু কিছুটা পরিষ্কার হওয়ার কথা ফলে এখন আমরা একটা আভাস পেয়ে যাবো আসলে কীভাবে পড়তে হবে। নিজের শিক্ষার বা পূর্ব ধারণার বইরে মানে কোন প্রিকনসেপশন এর বাইরে এসে আত্মআবিষ্কারের বা নিজের সাথে বইয়ে ধারণকৃত চিন্তার বা আইডিয়ার সাথে কথা বলার ধরণ আকারে বই পড়া শুরু করতে পারলে কীভাবে পড়তে হবে সেটা বই-ই বলে দেবে। তাই হাইডেগারের কথাটা একটু ঘুরিয়ে এখানেও বলা যায় আন-লার্ন করার মধ্য দিয়ে শুরু করতে হবে। শিক্ষার, জানার বা কোন ধরণের জ্ঞানের গৌরবজনিত উত্তেজনা থেকে বই পড়ার কোন ফয়দা নাই। বিষয়ের প্রতি প্রেমময়ভাবে ঝুঁকে পড়তে হবে, নিজেকে একদম সঁপে দিতে হবে, একদম শূন্য থেকে শুরু করতে হবে। অনেকটা প্রকৃত ভাবেই প্রেমে পড়ার মতো করে। কোন ধান্ধা বা পারপাসকে আমলে না দিয়ে প্লে-ফুল ভাবে বইয়ের সাথে সংযোগ তৈরি করা জ্ঞানের স্বাস্থ্যের জন্য সহায়ক হয়। বই কীভাবে পড়তে হয় তার তরিকা দেখতে হলে মহান চিন্তক ও লেখকরা কীভাবে পড়েন তা আমলে দেয়া যেতে পারে।

জ্ঞান শুধু জানার ভুবনেই পরিভ্রমণ করে না। না জানার দুনিয়াতেও এটার গুরুত্ব বিপুল

কোন একটা বইয়ের, যেমন প্লেটোর রিপাবলিকের পাঠ হওয়ার ইতিহাস (বইয়েরও বাইয়োগ্রাফি লেখা হয়,যেমন- Plato’s REPUBLIC ; A Biography by Simon Blackburn.) এমন বই-পত্র খেয়াল করলেই দেখা যাবে, বইটা যেভাবে পঠিত হয়েছে সেই প্রভাব সেই সময়ে, সমাজে, চিন্তায় ব্যাপকভাবে পড়েছে। কালে কালে সেইসব বইয়ের পাঠ সমাজকে প্রভাবিত করেছে। সেই পাঠ পাল্টেছে, সমাজে সেই পরির্বতনের প্রভাবও পড়েছে। কুরআন বাইবেল তো আছেই। চিনের সমাজকে বুঝতে কনফুসিয়াসের চিন্তার পাঠ সময়ে, কালে, যুগে যুগে কীভাবে পরির্বতন হয়েছে তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একই ভাবে তেমন কিছু বইকে কোন কোন সমাজে ক্লাসিকের মর্যাদা দেয়া হয়। কেন কোন বই ক্লাসিক আর কোন বই ক্লাসিক না তা সাংস্কৃতিক রাজনীতির প্রশ্নের আলোকে সহজেই ভাবতে পারা যায়। আমি ক্লাসিক ধারণার বিরোধী। আমি মনে করি যে বইগুলো অতীতে লেখা হয়েছে কিন্তু এখনও পড়া হয় বা প্রাসঙ্গিক মনে করা হয় সেইগুলা কনটেমপোরারি। কারণ বইটার পাঠ আমরা অতীতে গিয়ে করি না। করি বর্তমানে।

ধরেন, একই রিপাবলিক বা এ্যারিস্টটল পড়ে একজন হন, হেগেল, একজন হাইডেগার একজন সরদার ফজলুল করিম। এই বিষয় নিয়ে লাঁকার আলোচনাও দরকারী। কিছু লেখা আছে যার মধ্যে প্রচুর স্পেস থাকে,নিজের চিন্তাকে বিকশিত করার পরিসর থাকে, সেগুলো পড়া হয় রাইটারসুলভ ভঙ্গিতে। কিছু লেখাতে পাঠক মানে যিনি পড়েন তিনি কোন স্পেস বা নিজের জন্য কোন পরিসর খুঁজে পান না। পড়েন, হয়তো অবসরের জন্য বা কোন দরকারে বা ওপরে যেভাবে বলা হয়েছে -সেইসব কারণে। সেগুলোতে কোন স্পেস থাকে না তার জন্য। মনে রাখতে হবে কোন বই-ই পূর্ণাঙ্গ বই না। তার মধ্যে অনেক স্পেস ও নিজের (পাঠকের) চিন্তার বিকাশের ইশারা থাকে। রোলা বার্থের ডেথ অব অথর তো খুব পরিচিত থিসিস। বইয়ে লেখকের মৃত্যু ঘটে জিন্দা থাকে টেকসট।এই ধারণার ক্রিটিক অবশ্য করা হয়েছে নানান ভাবে।

যাহোক, শুধু প্রকৃত অলেখকই সার্বিকভাবে পূর্ণাঙ্গ বই লিখতে চেষ্টা করেন। কোন ফাঁক যাতে না থাকে সেই চেষ্টাতে মরিয়া থাকেন। বইয়ের অর্থ তৈরি হওয়ার এক অসীম দুনিয়া রয়েছে। দেরিদার লেখা-লেখি ও লেখার দর্শন পড়লে এই বিষয়ে আগ্রহী পাঠক উপকৃত হবেন। তাই পূর্ণাঙ্গ কোন লেখা এই অধমও আজ পর্যন্ত লিখতে পারি নাই। ভবিষ্যতেও পারবো সেই আশা করি না।

ঘ. বই পড়ার মুশকিল বিষয়ক আলোচনায় প্রকাশনী ও একটি সমাজে কি ধরণের বই পড়া হয় সেই বিষয়েও
আলাপ দরকার। বাণিজ্যের জন্য স্বাভাবিকভাবেই গল্প-উপন্যাসের বাজার ভালো হবে। কারণ আমরা যে বাস্তবতায় বাস করি, তার থেকে কম-বেশি সবাই পালাতে চাই। বা ভিন্ন জগতে পরিভ্রমণের এমন সুযোগ উপন্যাস, গল্পকে চাহিদার শীর্ষে নিয়ে আসবে তাতে আর আবাক হওয়ার কি আছে। বাংলাদেশে এবং কিছুটা পশ্চিমবঙ্গেও প্রবন্ধ বা চিন্তাশীল লেখালেখির লেখক যেমন তৈরি হয় নাই, পাঠকও তৈরি হয় নাই। এর কারণ ‘পাঠ’ করার তরিকার বা পাঠ-সংস্কৃতি নির্মাণের জন্য আরও যেসব কার্যক্রম দরকার তা আমাদের সমাজে নাই। প্রদীপ বসু এই দিকগুলো নিয়ে ভালো কাজ করেছেন। তারঁ লেখালেখিতে পাঠক এই দিকগুলো বুঝতে পারবেন (দেখুন: বাঙালি জীবনের তত্ত্বতালাশ-প্রদীপ বসু, পরম্পরা প্রকাশনী-২০১৬ বইটি)।

তারপরেও প্রকাশনীরগুলোর একটি ব্যবসায়িক অস্তিত্বের পাশাপাশি এক ধরণের সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক পজিশন আছে। থাকে। আপনি যে কোন বই যে কোন প্রকাশনীকে বের করতে দেখবেন না। তাদের একটা বিবেচনা থাকে। একটা সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পজিশন থাকে। কখনও টাকা দিয়ে লেখক নিজেই তাদের ব্যানারে বের করলেও সেই ধরণের লেখক ও বইকে তারা এপ্রিশিয়েট করে না। কোন রকম আগ্রহ দেখায় না। ফলে একটি সমাজের প্রকশনীগুলোর সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পজিশন আপনি ধরতে পারলে কোন ধরণের জ্ঞানের মার্কেটিং তারা আগ্রহ নিয়ে করেন, কেমন সমাজ তৈরি হচ্ছে তা কিছুটা হলেও বুঝতে পারা সম্ভব। এই জন্য বিশাল বিশাল পুঁজির প্রকাশনীগুলো একই মালিকানায় বিভিন্ন নামে বাণিজ্যের বিস্তার ঘটিয়ে থাকে। যাদের সব বিভাজন সত্ত্বেও বাজার তাদের দখলে থাকে। পৃথিবীর বেশির ভাগ বড় বড় প্রকাশনীর মালিক ইহুদিরা। অনেকটা কোকাকোলার মতো ব্যাপার। কোক পছন্দ না হলে সেভেনাপ খান। অসুবিধা নাই। তাতে রুচির ভিন্নতাও চর্চা হলো আবার মুনাফাও একচেটিয়া করা গেল। এই একই ব্যাপার প্রকাশনীর জগতেও আছে। এক পুঁজির বহু ব্র্যান্ড। আবার কখনও কখনও একই সংস্কৃতির বয়ানে ধারণ করে বহু প্রকাশনী। খুব কমই কেতাবি অর্থেও গণতান্ত্রিক মানসিকতার বা সব ধারার চিন্তার প্রতিনিধিত্ব করে এমন প্রকাশীর দেখা মেলে।

বইটা যেভাবে পঠিত হয়েছে সেই প্রভাব সেই সময়ে, সমাজে, চিন্তায় ব্যাপকভাবে পড়েছে

আগেই বলেছি, একটি সমাজে কি ধরণের বই পড়া হচ্ছে এটা দিয়ে আপনি যতটা না সেই সমাজকে বুঝতে পারবেন তার চেয়ে বেশি ভালো বুঝতে পারবেন একটি বই আসলে কীভাবে পড়া হচ্ছে তা বুঝতে চেষ্টা করলে।রাশিয়ার সমাজে সবচেয়ে বেশি বই পড়া হয়। প্রায় ৭০ ভাগ মানুষের বাড়িতে পাঠাগার আছে। তাতে সেই সমাজকে আপনি অন্যদের থেকে এগিয়ে রাখতে পারবেন না। আবার কোন সমাজে উপন্যাস বা চটি বেশি পড়া হয় নাকি দর্শনের বই বেশি পড়া হয়- তা দিয়ে আপনি সেই সমাজকে বুঝতে চেষ্টা করলে ভুল করবেন। কীভাবে পড়া হয় মানে, কোন বইয়ের কী ধরণের রিডিং/ন্যারেটিং সমাজে ডমিনেন্ট হয় তা বুঝতে না পারলে এই ধরণের পরিসংখ্যানগত তথ্য কোন কাজে আসবে না।

এই প্রসঙ্গে অনেক কথা বলা যায়। উদাহরণ হিসেবে ইরানী লেখক-এক্টিভিস্ট আজার নাফিসীর আলোচিত বই, ‘রিডিং ললিতা ইন তেহরান’ ভালো দৃষ্টান্ত। যদিও লেখিকার পজিশনের সাথে একমত হওয়ার সুযোগ নাই কিন্তু এই পদ্ধতিটার তারিফ করতে হয়। আমাদের সমাজে বেশির ভাগ লেখক, গবেষক কি পড়া হচ্ছে তাতেই সমাজের প্রবণতা আবিষ্কার করে বিশাল কাজ করে ফেলেছেন -এমন একটা ভাব নিতে দেখা যায়। আসলে এতে কিছুই তেমন ধরা যায় না। কেবল চলতি ফ্যানাটিক ট্রেন্ডটা দেখা হয়। কিন্তু কোন বই সমাজে কীভাবে পড়া হয় তা সেই সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থা বুঝতে সাহায্য করে। লম্বা আলাপ না করে উদাহরণ দেই, বেশ কিছু ইসলামী বই বাজারে আসলে একদল লোক খুশিতে মাশআল্লাহ, আলহামদুল্লিাহ বলে ইসলামী জ্ঞানের জোয়ার শুরু হয়ে গেছে বলে খুশিতে ফেটে পড়বেন। অন্যদল বলবে, দেশটাতে মৌলবাদ, জঙ্গিবাদের জয় জয়াকার, দেশটা মূর্খদের দখলে চলে গেল। তাতে আসলে কি বোঝা গেল? দুইটাই ফ্যানাটিক। হুজুগে। এবার ধরেন, আরজ আলী বা হুমায়ুন আজাদের বইকে বিশাল জ্ঞানের, দর্শনের ধারক-বাহক বলে প্রচারের ফলে, এগুলার পাঠক তৈরি হওয়ার মধ্যদিয়ে একশ্রেণির লোক খুব খুশি হলো। দেশটা প্রগতির শীতল ছায়াতলেই আছে বলে খুব খুশিতে এই ধারার কাজকে আরও এগিয়ে নিতে প্রচার-প্রসারে নিয়োজিত হলো। অন্যদল এটাকে ঈমান ধ্বংসের মিশন বলে প্রচার করলো। দুই দলেই খুব উত্তেজনা হলো। প্রচুর ফাইট হলো। এটাতে বেশ ভালো বিনোদন হতে পারে কিন্তু তাতে কাজের কাজ কিছু হয় না। যদি আমরা অনুসন্ধান করতাম হুমায়ুন আজাদকে কীভাবে পড়া হয়েছে বা হচ্ছে যার ফলে এমন মূর্খ প্রগতিশীল তৈরি হচ্ছে? এতো এতো ইসলামী বই যে বের হচ্ছে কিন্তু ইসলামের মৌলিক শিক্ষার ধারে কাছেও নাই মানুষ, তাইলে এগুলো কীভাবে পড়া হচ্ছে আসলে? তা হলেই বুঝতে পারা যাবে আমরা জানি না বই কীভাবে পড়তে হয়। জানলে আজাদ বা আরজ আলীর বইকে সমাজের মূলধারা করা হতো না। এগুলার বিষয়বস্তুর গুরুত্বটা এই সমাজে তৈরি হওয়ার কারণ খুঁজলেই এই দেশের সেকুলার ধারার অশিক্ষা ও আধুনিকতাবাদী অসুখটা ধরতে পারবেন।

একধরণের অনুভূতি উস্কে দিয়ে সোশাল মিডিয়া গরমের চেনতাবাদী মানে শাহবাগী ও পাশলাবাদীদের সমস্যাটা বুঝতে পারবেন। এবং ক্ষমতার প্রশ্নে এই দুইটাই কীভাবে ফ্যাসিবাদের দোস্ত হয়ে ওঠে তাও ধরতে পারা সম্ভব হবে। তাই একটি সমাজে একটা বইয়ের কীধরণের ‘পাঠ’ বা বয়ান তৈরি হবে তা সব সময় শুধু মাত্র বইকে ব্যাখ্যার রাজনীতিই(পলিটিক্স অব হারমিউনিটিকস) ঠিক করে দেয় না। ঠিক করে দেয় সেই সমাজের জ্ঞান-তাত্ত্বিক ইতিহাস বা জেনেওলজি। তা না হলে হুমাযুন আজাদ টাইপের পার মর্ডানিস্ট, পশ্চিমের আইডিয়ার নকলবাজ, সেন্টিমেন্টার-নার্সিসিস্ট লেখক মূলধারার পূজনীয় হয় কি করে? কেউ কেউ বাংলার সক্রেটিস বলে নাচানাচি কীভাবে করেন আমি বুঝতে পারি না? এই ধরণের লেখালেখি পড়ার জন্য যে ধরণের চিন্তাশীল চর্চা সমাজে থাকতে হয় তা না থাকার ফলেই এগুলা এতোটা প্রভাব বিস্তারী হয়েছে।

জ্ঞান বা বিদ্যার সেকুলারায়নের প্রবল প্রতাপের কারণেই এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। আমরা চিন্তার সিলসিলা ও ক্রিটিক ধরে পড়তে পারলে এই অবস্থা হইতো না। আবার ধরেন, স্যাটানিক ভারসেস বইটা নিয়ে খুব হইচই হলো, যারা অবশ্য হইচই করে এরা না পড়েই করে সেটা আমরা কম বেশি জানি। কিন্তু যারা পড়লো তারা কী কোন ধরণের রিডিং হাজির করেছেন? কেন বইটা সমস্যাজনক তার তো ক্রিটিক্যাল রিডিং থাকতে হবে! তা না করে দেখা গেল একদল পক্ষে আর একদল বিপক্ষে বিভক্ত হয়ে গেল। মনে রাখতে হবে, প্রতিক্রিয়ার চেয়ে পারসেপশন গুরুত্বপূর্ণ। এই বইটা একটা ফিকশন। অনেকে এটা ফিকশন আকারে পড়েছেন। এর বাইরে তাদের কাছে এটার আর কোন গুরুত্ব নাই। এর সাথে ধর্ম বিশ্বাসের কোন সম্পর্ক নাই। এখন অন্যরা হয়তো আরেক রকমভাবে পড়েছেন তো সেই রিডিংও আমাদের খতিয়ে দেখতে হবে। এবং কারা কীভাবে একটা বইকে পড়ছেন তার মধ্যদিয়ে সেই সমাজের চিন্তাশীলতার স্বভাব জানা সম্ভব।

এবং এটা জানার পরেই একজন লেখক ও চিন্তক নিজের কাজ কী হবে তা সহজে ঠিক করতে পারবেন। একটা বইয়ের রিডিং এক এক সমাজে এক এক রকম হয়। মানে সমাজভেদে ভিন্ন হয়। সেই সমাজের সভ্যতার ও দার্শনিক পাটাতনের নিরিখেই রিডিং/পাঠ তৈরি হয়। কলোনিয়াল আমলের কথা ভাবতে পারেন। পশ্চিমা সভ্যাতার আলোকে স্থানীয়দের ইতিহাস ও আত্মপচিয় নির্মাণের ফলে এমনকি বাইবেলকেও কলোনিয়াল শাসনের আলোকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। স্থানীয়দের উপর শাসন কায়েমকে তারা নাম দিয়েছিল আলোকিতকরণ প্রকল্প। এই প্রকল্পের বাহন ছিল বই। স্থানীয়দের ভাষা, ইতিহাস, চিন্তা সবই পশ্চিমারা নতুন করে নির্মাণ করে নিয়েছিল। অসংখ্য বই লেখা হয়েছিল। সেইসব বইকে প্রচারিত করা হয়েছিল, পাঠ করার রেওয়াজ গড়ে তোলা হয়েছিল শাসনের অনুকূলে।

এমনকি বাইবেলকেও কলোনিয়াল শাসনের আলোকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। স্থানীয়দের উপর শাসন কায়েমকে তারা নাম দিয়েছিল আলোকিতকরণ প্রকল্প

এই প্রকল্পের ফলে একদল আলোকিত মানে গোলামে পরিণত হয়েছিল আর ভারতবর্ষের কপালে জুটেছিল না খেয়ে মরার যুগ। ভারবর্ষের যতগুলা দুর্ভিক্ষ হয়েছে সবই উপনিবেশ কায়েমের পরে। এর আগে অন্তত না খেয়ে মরার রেকর্ড নাই। কিন্তু এখন অনেক এশীয় চিন্তক বই লিখে পশ্চিমকে নাড়িয়ে দিয়েছেন। তার কলোনিয়াল বয়ানকে ছত্রখান করে ফেলেছেন। পশ্চিম এগুলা গ্রহণও করেছে। পশ্চিমের ভীতকে নাড়িয়েও দিয়েছে কিন্তু ভেঙে ফেলতে পারে নাই। দেখা যায় সেই কাজের উপযোগী ভাষ্য ও পাঠ-কাউন্টার পাঠ তৈরি হয়ে যায়। নিজেদের দার্শনিক ভিত্তির আলোকে অপশ্চিমী একটি গ্রন্থের পশ্চিমাকরণ করা হয়ে যায়। অনুবাদ ও ভাষ্য তৈরির বিপুল কর্মকাণ্ড এই প্রক্রিয়াকে সহজ করে দেয়। এই প্রসঙ্গে গ্যাটের কথা স্মরণ করা যেতে পারে, ‘মানুষ আসলে তাই শোনেন, সে যা বোঝেন।’ কাজেই এই বুঝ তৈরির প্রক্রিয়াই একটি সমাজের চিন্তাশীলতার প্রকৃতি বুঝতে সাহায্য করে। ফলে সব দিক থেকেই বই পড়া মানে রিডিং একই সাথে পলিটিক্যাল এক্ট বা কর্ম।

ঙ.
ওপরের কথাগুলো আবারও একটু ঝালাই করে আজকের মতো শেষ করি। আমাদের মনে রাখতে হবে- বই পড়ে মানুষ কিন্তু শুধু শিক্ষিত হয় না, মূর্খও হয়। কারণ, বইয়ে যত ভালো কথাই থাকুক না কেন রিডিং তৈরি হয় মনে, মগজে। কাগজের পৃষ্ঠায় কোন জ্ঞান থাকে না। থাকে ইশারা, চিহ্ন। কলব বা দিলে জ্ঞানের বা সত্যের আকুতি না থাকলে অনেক বই পড়েও এবং প্রচুর বইয়ের মাঝে থাকা সত্ত্বেও মানুষ বর্বরই থেকে যায়। এই কারণে বই পড়ার প্রচলন বেড়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চাও যত বেড়েছে, নিষ্ঠুরতার ধরণেরও অগ্রগতি হয়েছে। কথাকথিত আধুনিক, বিজ্ঞানবাদী যুগ নিষ্ঠুরতায় যে কোন দিক থেকে অনাধুনিক কালকে ছাড়িয়ে গিয়েছে। এগুলা নিয়ে প্রচুর গবেষণা আছে।

যাক সে কথা। ফলে পাতা খুলে, পৃষ্ঠা উল্টে উল্টে যে ভাবে আমরা বই পড়ি তাতে কেবল পড়াই হয়,‌‘পাঠ’ করা হয় না। একটা বই পড়া ও পাঠ করার মধ্যে তফাত আছে। পাঠ করা মানে এঙ্গেজ হওয়া। যেটা খুব জরুরী। আপনি কত বই পড়লেন সেই জাহিরি কোন কাজে আসে না। আমাদের সমাজে চিন্তার সাথে এঙ্গেজ না হওয়ার ফলে দেখা যায় একটা লোক ফুকো নিয়ে কাজ বা গবেষণা করেন, বা লাঁকা নিয়ে কথা বলেন, এদের গুরু হিসেবে প্রচার করেন। কিন্তু নিজের রাজনৈতিক পজিশনের বেলায়, হাজার বছরের বাঙালি চেতনার ফেরিওলা।

ফ্যাসিবাদের তরিকার বাইরে ভাবতে পারছেন না। নামজপা এইসব পন্ডিতির ফলে জ্ঞানচর্চার সত্যানুসন্ধানী ধারা গড়ে ওঠে নাই। চিন্তার নামে, দর্শনের নামে একধরণের সোফিস্ট বা ছদ্ম বুদ্ধিজীবীতাই বিস্তার লাভ করেছে। মহান দার্শনিক এপিকট্যাটাসের মতো বলতে চাই-‘Don’t just say that you have read books. Show that through them you have learn to think better’

অনেক লোক প্রচ্ছদ দেখেন। কিছু লোক ভূমিকা পড়েন। অনেক মানুষ সমালোচকদের বিশ্বাস করেন। খুব কম লোকই আমাদের সারবস্তুর খবর রাখেন

আপনি অমুককে পড়েছেন, তমুক আপনার প্রিয় লেখক, এটা পড়েছেন, সেটা পড়েছেন- এইসব না দেখিয়ে,দেখান যে, আপনি তাদের পড়ার মধ্যদিয়ে তাদের চেয়ে সমৃদ্ধ চিন্তা করেন। কিন্তু এটা না করে আমাদের এখানে এক দল সোফিস্ট বা ছদ্ম লেখক-চিন্তকদের পড়ে তাদের চেয়ে আরও নিকৃষ্ট জেনারেশন তৈরি হচ্ছে। এই জন্য হুমায়ূন আজাদকে পড়া, তসলিমা নাসরিনকে পড়ার পরে আরও নিকৃষ্ট সেকুলার ধারার লেখক তৈরি হয়েছে। বইপত্রে বাজার ভরে গেছে। এই ধারার লেখকরা নিজেদের কাজ নিয়ে বিপুল আত্মগরিমাতে মজে থাকে। দলীয় ভাবধারার আলোকে চালু হওয়া মেলাকে চেতনার বাতিঘর রক্ষার আয়োজন মনে করে অনেক শ্রম ও অর্থ দিয়ে বই মেলাকে বিরাট অনুষ্ঠানে পরিণত করেছে। কিন্তু তাতে বই পড়ার সামাজিক প্রভাব শূন্য। দেখানোপনার এক বিরাট অনুষঙ্গ এই বইমেলা। যার সাথে বইপত্রের বাজার বিশ্বমানের করা ও লেখালেখির উন্নতির কোন সম্পর্ক নাই।

যে লেখক- পাঠক সমাজ ও রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক বয়ানের গোলাম তার বই-পত্রের পাঠ আমাদের কতটা ফায়দা দেবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যে লেখক নিজেই স্বাধীন না তার বই স্বাধীন হতে পারে না। তাই ফ্যাসিবাদের কালে বই লেখা ও পড়া মোটেই আরামের কাজ না। বই পড়া মানে, বইটার কনটেন ও তার স্পিরিটের সাথে যাওয়া। সেই স্পিরিটের সাথে নিজের পরিচয় ঘটানো ও মোকাবেলার মধ্যদিয়ে বই পড়াটা ‘পাঠ’ হয়ে ওঠে। টেকসট ও কনটেকসট/বই ও বইয়ের সামগ্রিক প্রেক্ষাপট -এর বিস্তৃত মোবাকাতও মোকাবেলার মধ্য দিয়ে অসংখ্য অর্থ তৈরি হতে থাকে একটি বইয়ের। কাজেই কোন অর্থটা সমাজে ডমিনেন্ট/প্রধান্য পাচ্ছে তা খেয়াল করা দরকার। সেটার আলোকে সাংস্কৃতিক পরিচয়ের যে রাজনীতি গড়ে ওঠে তাকে মোকাবেলার একটি ধরণ হলো, বইয়ের বয়ানের ডিকনট্রকাশন। দেরিদার এই পদ্ধতির আমি বাংলা করেছি, অবিরাম নির্মাণ।

বই পড়া একটি প্লে ফুল কর্ম। এটাকে স্থির-নির্দিষ্ট পাঠে আটকে রাখার রাজনীতির বিরুদ্ধে স্বাধীন চিন্তার লেখক ও পাঠকদের সক্রিয় প্রতিরোধ দরকার। আমি একোর চিন্তায় অনুপ্রাণিত হয়ে যে কথাটা বলি-একটা বই সম্পর্কে, পাঠক, সমালোচক, প্রচারক যা বলেন, বই নিজে তার চেয়ে বেশি বলার সক্ষমতা রাখে। জোলার কথা দিয়ে শেষ করি- We are like books. Most people only see our cover, the minority read only the introduction, many people believe the critics. Few will know our content.-Emile Zola

আমরা (মানুষ) বইয়ের মতো। অনেক লোক প্রচ্ছদ দেখেন। কিছু লোক ভূমিকা পড়েন। অনেক মানুষ সমালোচকদের বিশ্বাস করেন। খুব কম লোকই আমাদের সারবস্তুর খবর রাখেন।

Advertisements