স্থানীয় মার্কেটিং প্রতিনিধি

শেষ পর্যন্ত নিবন্ধনের আওতায় আসছেন মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালরা। বিদেশ গমনেচ্ছু কর্মীদের প্রতারণার হাত থেকে রক্ষায় রিক্রুটিং এজেন্সির হয়ে কাজ করা সারা দেশের মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালদের নিয়মের মধ্যে আনতে এই উদ্যোগ নিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালদের পরিবর্তিত নাম হবে ‘স্থানীয় মার্কেটিং প্রতিনিধি’। আগামী ৭ মার্চের মধ্যে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে তাদের প্রয়োজনীয় সংখ্যক এই মার্কেটিং প্রতিনিধি নিয়োগের নিমিত্তে রিক্রুটিং এজেন্সিকে নির্দেশনা প্রদানে সহযোগিতা করার জন্য বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিকে (বায়রা) চিঠি দিয়েছে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)।

বায়রার প্রশাসক বরাবর পাঠানো ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, গত ৭ অক্টোবর প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদ ও বায়রার সাথে অনুষ্ঠিত সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক রিক্রুটিং এজেন্টদের প্রতিনিধি নিয়োগের বিষয়ে মন্ত্রণালয়, বিএমইটি ও বায়রার সমন্বয়ে গঠিত কমিটি গত ২২ অক্টোবর এক সভায় মিলিত হয়। ওই সভায় অবৈধ দালালদের প্রতারণা থেকে বিদেশ গমনেচ্ছু কর্মীদের রক্ষা করার উদ্দেশ্যে রিক্রুটিং এজেন্টদের প্রতিনিধিদের পদবি নির্ধারণ, নিয়োগ প্রক্রিয়া, সংখ্যা এবং প্রতিনিধিদের দায়িত্ব ও আচরণ বিষয়ে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এই সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক আগামী ৭ মার্চের মধ্যে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে প্রয়োজনীয় সংখ্যক প্রতিনিধি নিয়োগের নিমিত্তে রিক্রুটিং এজেন্সিকে নির্দেশনা প্রদানসহ বিএমইটিকে অবহিত করার জন্য বলা হয়েছে।

এ বিষয়ে বিএমইটির পরিচালক (উপসচিব-কর্মসংস্থান) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান ভূইয়া নয়া দিগন্তকে বলেন, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো বায়রার সদস্য। তাই এই সংগঠনের প্রশাসক বরাবর চিঠি দিয়ে ৭ মার্চের মধ্যে এজেন্সিগুলোর ‘স্থানীয় মার্কেটিং প্রতিনিধি’র তালিকা বিএমইটি বরাবর পাঠানোর অনুরোধ করা হয়েছে।

বৈধভাবে বিদেশে কর্মী পাঠাতে রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স দেয় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। এসব প্রতিষ্ঠানের নামেই বিদেশে যান কর্মীরা। কিন্তু দেখা যায়, যে এজেন্সির মাধ্যমে তারা বিদেশ যাচ্ছেন, তার নামও জানেন না বেশির ভাগ কর্মী। তারা চেনেন এলাকার পরিচিত দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগী। অথচ তাদের মাধ্যমেই লেনদেন করেই রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশ যাচ্ছেন। এতে করে দিনের পর দিন বেড়েই চলছে অভিবাসন ব্যয়। দালালদের খপ্পড়ে পড়ে নানা প্রতারণা ও হয়রানির খবর প্রতিনিয়তই দেখা যায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ায়।

অভিবাসন ব্যয় কমানো এবং হয়রানি বন্ধে অনেক দিন ধরেই মধ্যস্বত্বভোগীদের বৈধ প্রক্রিয়ায় আনার পরামর্শ দিয়ে আসছিল অভিবাসন খাতের বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রামরু। ২০১৮ সালে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির পক্ষ থেকেও এমন পরামর্শ দেয়া হয়। শেষ পর্যন্ত দেরিতে হলেও নিবন্ধনের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করতে গত ৮ অক্টোবর একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয় প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সভায়। অবশেষে এসব মধ্যস্বত্বভোগীকে নিবন্ধনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) মহাপরিচালক মো: শামছুল আলমকে প্রধান করে গঠিত কমিটির সভার প্রথম বৈঠক গত ২২ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বেসরকারি খাতে কর্মী পাঠানো এজেন্সিগুলোর মালিকদের সংগঠন বায়রার প্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন। ওই বৈঠকের কার্যবিরণী থেকে জানা যায়, অবৈধ দালালদের প্রতারণা থেকে বিদেশ গমনেচ্ছু কর্মীদের রক্ষা করার উদ্দেশ্যে রিক্রুটিং এজেন্টের প্রতিনিধি নিয়োগের লক্ষ্যে গঠিত কমিটির সভায় দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগী বা রিক্রুটিং এজেন্সির প্রতিনিধিদের ‘স্থানীয় মার্কেটিং প্রতিনিধি’ নামে নিয়োগ দেয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

রিক্রুটিং এজেন্টদের ‘স্থানীয় মার্কেটিং প্রতিনিধি’ নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পর্কে কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, রিক্রুটিং এজেন্টরা নিজস্ব প্রক্রিয়ায় নিজেদের প্রতিনিধি নিয়োগ পূর্বক বিএমইটিকে অবহিত করবে। প্রতিনিধিদের নিয়োগ ও তাদের সব দায় রিক্রুটিং এজেন্ট বহন করবে। নিয়োগকৃত প্রতিনিধিদের জীবনবৃত্তান্ত, জাতীয় পরিচয়পত্র, পুলিশ সনদ (নিজ থানা থেকে সংগৃহীত) ও নিয়োগপত্রসহ বিএমইটিকে অবহিত করবে। রিক্রুটিং এজেন্সির প্রতিনিধি সংখ্যা কতজন হবে সে বিষয়ে ওই সভায় সিদ্ধান্ত হয়, রিক্রুটিং এজেন্ট প্রয়োজনীয় সংখ্যক প্রতিনিধি নিয়োগ করবে। তবে একই প্রতিনিধি একাধিক রিক্রুটিং এজেন্ট নিয়োগ করতে পারবে না। রিক্রুটিং এজেন্টরা নিয়োগকৃত প্রতিনিধিদের তালিকা বিএমইটিতে দাখিল করবে। বিএমইটি রিক্রুটিং এজেন্টদের তালিকা বিএমইটির সার্ভারে অন্তর্ভুক্ত পূর্বক ওয়েবসাইটে প্রকাশ করবে।

রিক্রুটিং এজেন্টদের প্রতিনিধিদের দায়িত্ব ও আচরণ কেমন হবে, সেই প্রসঙ্গে ওই সভায় সিদ্ধান্ত হয়, রিক্রুটিং এজেন্ট কর্তৃক নিয়োগকৃত প্রতিনিধি স্থানীয়ভাবে উপযুক্ত কর্মী সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্টের কাছে উপস্থাপন করবেন। একটি রিক্রুটিং এজেন্সি কর্তৃক নিয়োগকৃত প্রতিনিধি অন্য কোনো রিক্রুটিং এজেন্সির কার্যক্রমের সাথে সম্পৃক্ত হতে পারবেন না। রিক্রুটিং এজেন্টের প্রতিনিধিরা বিদেশে গমনেচ্ছু কর্মীর সাথে বা এ সংক্রান্ত কোনো প্রকার আর্থিক লেনদেন করতে পারবেন না। কর্মীর অভিবাসন সংক্রান্ত সব কার্যক্রমের জন্য বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী (রিক্রুটিং এজেন্ট লাইসেন্স ও আচরণ) বিধিমালা-২০১৯ এর ৭(২) ধারা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্ট ও নিয়োগকৃত প্রতিনিধি উভয়ই দায়ী থাকবে।

শ্রমবাজার সংক্রান্ত বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, সৌদি আরব যেতে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা ব্যয় নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার। অথচ বেসরকারি খাতে একজন পুরুষ অভিবাসী দেশটিতে যেতে ৩ লাখ থেকে সাড়ে ৪ লাখ টাকা বা তারও বেশি খরচ করেন। সরকার বিভিন্ন দেশে অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণ করে দিলেও কোনো দেশের ক্ষেত্রেই সরকার নির্ধারিত ফি নেয়া হয় না।

দালালদের খপ্পড়ে পড়ে হাজারো বিদেশগামী সর্বস্ব হারান। তাদের দায়িত্ব নেয় না কোনো এজেন্সি। তাই এসব মধ্যস্বত্বভোগীকে তালিকাবদ্ধ করে নিয়মের মধ্যে আনার উদ্যোগ নেয় প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়। সারা দেশে রিক্রুটিং এজেন্সির হয়ে কাজ করা মধ্যস্বত্বভোগীদের সংশ্লিষ্ট এজেন্সির পরিচয়পত্র দিয়ে তাদের নিবন্ধন করা হলে দালালদের দৌরাত্ম্য অনেকটাই কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সূত্রঃ নয়া দিগন্ত