জার্সির লালে আড়াল নগ্ন সত্য

বাংলাদেশ ক্রিকেট কাঠামো নিয়ে আমি সব সময়ই কঠোর সমালোচনা করছি। এটি অনেকেরই পছন্দ হয় নাই। যেখানে দল বিশ্বকাপের কোয়ার্টার খেলতেছে, অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ডকে টেস্টে হারাইতেছে সেখানে আমার সমালোচনা না পছন্দ হওয়াই স্বাভাবিক যদি না আপনি পুরো দৃশ্যটি ঠিকভাবে দেখে থাকেন।

উইন্ডিজের দ্বীতির সারির দলের কাছে পরাজয়ের পর যে মাতমটি দেখছি সেটা বরং আমাকে বিস্মিত করছে। বর্তমানে যে ফাটকাবাজী চলতেছে তাতে এ ফল কি খুব বেশি অস্বাভাবিক? আমার ত মনে হয় না। বরং, এমন একটি ফলের জারুরাত ছিলো যেটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে বাস্তবতাটা দেখায় দিতে পারে।

আমি কেন এমটা বলতেছি? একটা দল যখন টেস্ট খেলা শুরু করে তখন ‘জেতার জন্য নামবো’ ধাচের বাক্য প্রসব করার আগে বেশ কয়েটা ধাপ পার হয়ে আসতে হয়। পাচ দিন খেলার অভ্যাস রপ্ত করা, ড্র করতে শেখার পর আসে ‘জেতার জন্য’ খেলতে নামা। বাংলাদেশ এই বেসিকটা ঠিক কবে রপ্ত করেছে? আপনি আতশ কাঁচ দিয়ে তন্ন তন্ন করে খুজতে পারেন; বাংলাদেশ বৃষ্টির সাহায্য ছাড়া টানা তিনটা ম্যাচ ড্র করেছে এমন নজির পাবেন না।

আবশ্যিক একটা ধাপ পার হবার ক্ষেত্রে আমরা সাহায্য নিলাম ফাটকাবাজীর। বোর্ডে অধীনে ক্রিকেট আগাইছে; শুধু মাত্র এইটা সাবুদ করার জন্য আমরা পরিত্যক্ত এক ফর্মুলায় ফেরত গেলাম। টুটা ফাটা পিচ বানাও, তিন-চার স্পিনার খেলাও। এইটা ভারত ষাটের দশকে করতো। এবং এর অসাঢ়তা উপলব্ধি করে নিজেরাই তা বাতিল করছে। ফল? বিদেশের মাটিতে ভারতের নিয়মিত সাফল্য।
আমাদের মধ্যে একটা দেখানোর প্রবণতা জেকে বসছে। যার ফলে মাঝ নদীতে আমরা আতকা ব্রীজ দাড়ায় থাকতে দেখতে পাই। যেইটা দেখায় উন্নয়ন শব্দের মর্মার্থ আমাদের নসিহত করা হয়। একই পথে অজি-ইংলিশ বধ দেখায় আমাদের ক্রিকেটের অগ্রযাত্রা দেখানো হইছে। এবং মানুষ সেটা গিলছেও। বাংলাদেশের খেলা থাকলেই ফেসবুকে আমরা এইটার অকাট্য সাবুদ দেখতে পাই।

টেস্ট হুতাশে হয় না। এইটা আপনারে রপ্ত করতে হবে পরীক্ষিত ফর্মুলাতে যায়াই। যেইটা বড় দল গুলা অনুসরণ করে। টেস্ট স্ট্যাটাস পাবার দুই দশক পরেও আমরা একটা পূর্ণাঙ্গ প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটের কাঠামো পাই নাই যেটা ক্রিকেট সংস্কৃতি তৈরী করবে, ক্রিকেটকে ‘আগায়’ নিবে।
আপনার বেসিক যদি ঠিক না থাকে আপনি কালভেদ্রে সাফল্য পাইতে পারেন। তবে নিয়মিত আপনার নসিবে বেইজ্জুতিই জুটবে। যেটা করে গেছে আফগানরা। কদিন আগেই টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়া একটা দল আমাদের বলে কয়ে হারায় গেছে! দ্বীতিয় সারির দল নিয়ে উইন্ডিজ ইতিহাস তৈরী করলো।

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে যে পুরো আলোচনায় বোর্ডের সমালোচনা করলেও যারা মাঠে নেমে খেলেন তারা আলোচনায় উহ্য কেন? খুব সরল বিষয়টা। বাংলাদেশ দলের অধিকাংশ খেলোয়াড়ই গড়পরতা মানের। আপনি পঞ্চ পান্ডবকে বাদ দিয়ে দেখুন একটা উদাম সত্য আপনার চোখের সামনে ভেসে উঠবে। আমার এ বয়ানের বিপরীতে তীব্র পতিক্রিয়া আসলেও তা আমি বদলাবো না। আর এদের নিয়ে একটা নোংড়া খেলা খেলছে মিডিয়া।

আপনি লক্ষ্য করলে একটা শিরোনাম প্রায় দেখবেন; ইনিংস বড় করতে ব্যর্থ হলেন অমুক। বড় ইনিংস খেলা অভ্যাসের বিষয়। সেটা আমাদের খেলোয়াড়দের আছে? আপনি পুরো দলের ব্যাটসম্যানদের দিকে নজর দিন। দেখুন ত, ঘরোয়া আসরেই তারা কয়টা বড় ইনিংস খেলেছে? যে অভ্যাসই আপনার নাই, সেটা বলে কয়ে করে দেখানো এত সহজ না।

আমাদের স্পিনারদের মধ্যে সাকিব ছাড়া বাকিদের পুরো নির্ভর করতে হয় পিচের উপর। তাইজুল সময়ের সাথে শিখেছেন, যার সাবুদ গেলো ম্যাচে দেখছি আমরা। কিন্তু মিরাজকে নিয়ে যে হাইপটা তোলা হয় তা কতটা হাস্যকর সেটি ত মেয়ার্সরা দেখায় দিলেন। পিচ থেকে টার্ন না পাওয়ায় পুরো দিন তিনি ভেবে পান নাই কি করবেন! আমি তার দোষ দি না। তার মানে যতটুকু কুলোয় তিনি তা করেছেন। কিন্তু সে মানটাকে বাড়ায় দেখায় মিডিয়া একটা আজগুবি প্রত্যাশা তৈরী করে।

পেসার ছিলেন মোস্তাফিজ। তার সমালোচনারও কিছু দেখি না। কাল ভেদ্রে দুয়েকটা ম্যাচে নামায় দিয়ে তার কাছে ওয়াসিম আকরাম সুলভ ম্যাজিক আশা করাই ত অন্যায়। পেসারদের শরীর তৈরী হয় খেলার মধ্য দিয়ে। সেটা তৈরী করার জায়গা টেস্ট না; প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট। সেখানেই যখন কাজ হয় না, আপনে টেস্টে কি আশা করেন?

সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো; এ ম্যাচের পর হা হুতাশ হবে। মিডিয়া কিছু গাই গুই করবে। প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট নিয়ে একটা গৎবাধা আলোচনা হবে। তারপর ঢাকা টেস্টেই সেই নোংরা ফর্মুলার প্রয়োগ হবে। তাতে যদি জেতে তাহলে একটা বিশাল দম্ভক্তি প্রসব হবে। যা হবে না তা হলো সত্যের মুখোমুখি হওয়া। আর এই প্রতারণাই ক্রিকেটকে টেনে নিবে আধারের দিকে।

শেষ করার আগে বোর্ডের একটা সাফল্যের কথা বলি। বাংলাদেশের ম্যাচ থাকলেই ফেসবুক গরম। পক্ষে বিপক্ষে আলোচনা সমালোচনা চলে। এইটারই একটা দিক দেখায় বলতেছি বোর্ডের সাফল্যটা কই। বিগত কয়েক বছরের মধ্যে দুইটা আলোচনা সবচেয়ে বেশি মাঠ গরম করছিলো। একটা হলো, বাংলাদেশের জার্সিতে লাল কই? আর আরেকটা হলো, বাংলাদেশের জায়গায় বেক্সিমকো লেখা কেন। পুরা কাঠামোর অসাঢ়তা বাদ দিয়া যখন আলোচনা হয় লালের কম বেশি নিয়া তখন বলতেই হয় মিডিয়া ব্যবহার করে মূল জায়গা থেকে নজর সরায় নিতে বোর্ড পুরাপুরি সফল।