জাফর ইকবালের হাসিতে আড়াল হয়নি বাংলাদেশের গভীর ক্ষত

এই কয়েকদিন ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবালের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনায় চারপাশে যা পরখ করেছি তা ভয়াবহ বাংলাদেশের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আমার ফেসবুকে সামান্য কয়েটি লাইন লিখেছিলাম। ওইসব নিরীহ বক্তব্য ঘিরে আমাদের চারপাশের ফাঁপা সুশীলরা তো বটেই, আমার অনেক কাছের মানুষও যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন এতে নিশ্চিত হয়েছি– বাংলাদেশের সমাজ এখনো ঠিকঠাক মতো বোঝার জন্য তারা প্রস্তুত নন। তাদের ওই নাদানপনার জন্য আমার কোনো আফসোস নেই। তবে তাদের কথার জবাব দিতে গিয়ে সমাজে যে প্রতিক্রিয়া দেখেছি এর ব্যাখ্যা কোথাও চোখে না পড়ায় এতদিন পর হলেও লিখতে বাধ্য হয়েছি।

ক.
ড. জাফর ইকবালের আক্রান্তের ঘটনায় মিডিয়া যেভাবে ঢালাও ‘বুদ্ধিজীবী’দের ওপর হামলা’, ‘মুক্তচিন্তার ওপর হামলা’ বলে প্রচার শুরু করেছে তা কেবলই মূর্খতা নয়। এর পেছনে আছে ‘সন্ত্রাসবাদ’-এর নামে ইসলামের সঙ্গে অনন্ত যুদ্ধের মতাদর্শগত সম্পর্ক। অন্যদিকে সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে জাফর ইকবালের পূর্ব শত্রুতার ঘটনাটা নিয়ে কেউ কোনো প্রশ্ন তোলেনি। বর্তমান সরকার যে অ্যাকশন মুডে আছে এতে জঙ্গি দেশে থাকার কথা নয়। কিছুদিন আগে প্রশাসন থেকে ঘোষণা দেয়া হয়েছে, দেশে আর কোনো হামলা চালানোর ক্ষমতা ওইসব ‘জঙ্গি’দের নেই। ফলে এরপর ওই ঘটনার জন্য ঢালাও জঙ্গি জিকির সন্দেহ তৈরি করে। আমি লিখেছিলাম, এটি রাজনৈতিক কোনো শত্রুতাও হতে পারে। পরে দেখি এটি নিয়ে খবরও প্রকাশ করেছে প্রথম আলো। আক্রমণকারীর পরিবারের পরিচয় প্রকাশ হলে দেখা গেল তারা ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতি করেন। হত্যা চেষ্টাকারীর চাচা সরকারি দলের রাজনীতিতে পোস্টধারী নেতা। তাকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। এরপরই আমরা দেখলাম, হামলাকারীর পরিচয় গোপন করে সবচেয়ে জঘন্য সাংবাদিকতার পরিচয় দিল চেতনা ও আলোর ফেরিওয়ালা হিসেবে নিজেদের জাহির করা গণমাধ্যমটি। প্রথমে আক্রমণকারীর স্বজনরা যে সরকারি দলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত তা প্রকাশ করা হলেও পরে তা খবর থেকে মুছে ফেলা হয়। অবশ্য সামাজিক মাধ্যমগুলোর কল্যাণে এটি মুছে ফেলা যায়নি, সব জায়গায় ওই স্ক্রিন শট ঘুরেছে। আর জনগণ দেখেছে, এক হামলাকারীর পরিচয় কীভাবে নির্মাণ করা হচ্ছে আর মিডিয়া কীভাবে এতে ক্ষমতার প্রচারযন্ত্রের ভূমিকা রাখছে। যাক, এটি নিয়ে বেশি কথা খরচের দরকার নেই।

তাইলে আমরা দেখলাম, হামলাকারী ধরা পড়ার পরও তার ‘পরিচয় নির্মাণ’-এর রাজনীতি চললো। অন্যদিকে বিচার বিভাগের ওপর আস্থা রাখার ইচ্ছা কার না থাকে! কিন্তু কোনো পাগলও এখন বিচার বিভাগের ওপর আস্থা রাখে না। এখন আর এখানে বিচার হয় না। শাস্তি দেয়া হয় মাত্র। পছন্দ না হলে বা প্রয়োজন পড়লে শাস্তি দেয়া হয়। কাজেই হামলাকারী ধরা পড়ার পরও এর বিচার নিয়ে আশাবাদী হওয়ার কারণ নেই। আমরা তা আশাও করি না। বরাবরের মতো হামলার কারণ বের করার আগেই কোনো তদন্তের আগেই মুখস্থ সব খবর ছড়িয়েছে। আশাবাদী জাফর ইকবাল অবশ্য বিচার নয়, ভুল পথ থেকে ফিরে আসার ডাক দিয়েছেন।

খ.
আমি বলেছিলাম, জাফর ইকবাল কোনো বুদ্ধিজীবী নন। তিনি শিশুসাহিত্যিক। তাও অতি গড়পড়তা এক লেখক। তার সৃজনশীলতা বিদেশি সিনেমা ও আবেগী মধ্যবিত্তময় পরিসরের মধ্যে সীমাবদ্ধ। হ্যাঁ, তারাই তাকে বুদ্ধিজীবী বলতে পারেন যারা যে কোনো ঘটনা কান্না-কাটির মাত্রা দিয়ে বুঝতে চান। ওই অতি আবেগীরা তাকে বুদ্ধিজীবী মনে করতেই পারেন। আমার কথা শুনে হাসবেন না। কিন্তু সত্যি হচ্ছে, একমাত্র আবেগ ও চেতনা কোটায় তিনি বুদ্ধিজীবী হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন। নইলে অন্তত বুর্জোয়া অর্থেও কোনো বুদ্ধিজীবীর যা বৈশিষ্ট্য থাকতে হয় এর ছিটেফোঁটাও তার মধ্যে নেই। বুদ্ধিজীবী কে, সমাজে তার কী ভূমিকা- এটি নিয়ে গ্রামসি, অ্যাডওয়ার্ড সাইদ বা চমস্কি-দের ভাবনার কথা বলা যায়। তবে আজ জটিল আলোচনা করবো না। সব বাদ দিলেও এটি আমরা বুঝি যে- বুদ্ধিজীবী বলতে যার সমাজ ও রাজনীতি নিয়ে মোটামুটি প্রাধমিক ধারণা থাকবে, সৎভাবে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করবেন। তিনি দল করতে পারেন। কিন্তু বুদ্ধিজীবিতার নামে কোনো একটি দলের মুখপাত্র হলে, লেখা-লেখি করে একটি দলের প্রচার সম্পাদকের মতো দায়িত্ব পালন করলে তাকে আমরা বুদ্ধিজীবী বলতে পারি না, বলবোও না।

অধ্যাপক জাফর ইকবাল আক্রান্ত হয়েছেন বলেই যে শিশুসাহিত্যিক থেকে বুদ্ধিজীবী হয়ে যাবেন তা মনে করি না। এটি হলে সমাজের জন্য খারাপ উদাহরণ তৈরি হবে। আপনি চিন্তা-ভাবনা করেন বা না করেন, সমাজ-রাজনীতি বোঝেন বা না বোঝেন- কোপ খাইলেই বুদ্ধিজীবী হয়ে যাবেন- এটি একটি ভয়াবহ প্রবণতা হবে। আপনার ওই মানসিকতা শহুরে মানুষের বাইরে সাধারণ মানুষের মনেও যে প্রশ্ন তৈরি করে এর রাজনীতি ও প্রভাব আরো ভয়াবহ। কেউ আক্রান্ত হয়েছে শুনলেই সাধারণ মানুষ মনে করে, ওহ! তাইলে লোকটা মনে হয় নাস্তিক, মানে, ইসলাম বিদ্বেষী বা ব্লগার অথবা শাহবাগী ছিল। কাজেই এটির ফলে মুসলমানপ্রধান সমাজে আপনার জায়গা হারিয়ে যাচ্ছে। এটি শাহবাগীরা কবে বুঝবেন জানি না।

অন্যদিকে ওই বিষয়টি ঢালাওভাবে বুদ্ধিজীবী সমাজের ওপর আক্রমণ বলে প্রচার সমাজে বাড়তি আতঙ্ক তৈরি করবে। সবাইকে ট্রমায় ফেলে দেবে। তাই বলেছিলাম, ‘শিশুসাহিত্যিক’ আক্রান্ত হয়েছেন। ওই জঘন্য ঘটনায় ভালো ব্যাপার হলো, অপরাধী ধরা পড়েছে। তবে আমরা চাই অপরাধীর প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ হোক, পরিচয় নির্মাণের রাজনীতি দেখতে চাই না।’

সবার আগে দরকার জাফর ইকবালের পরিচয় ঠিক করা। তাই বলেছিলাম, ‘শিশুসাহিত্যিক’ আক্রান্তের ঘটনাটি জাতীয় বুদ্ধিজীবিতা ও জ্ঞানের ওপর হামলা হিসেবে প্রচারের রাজনীতিটা আমাদের ক্ষতি করবে। এটি বলায় আমার বিরুদ্ধে অশিক্ষিত কয়েক সুশীল যে প্রশ্ন রেখেছেন তা আরো হাস্যকর মনে হলেও এতে সমাজের গভীর ক্ষত পরিষ্কারভাবে প্রকাশিত হয়েছে। এদিকটি নিয়ে কথা বলার জন্য আজ লিখছি।

আমাদের ওই সাহিত্যগ্রস্ত সমাজে যারা নকল গল্প বানান, যারা সব কিছুতে এক চিমটি আবেগ, এক চিমটি একাত্তর, এক চিমটি চেতনা মিশিয়ে পাবলিককে চোখে পানি আনতে সাধনা করে তারা একটি সমাজের বুদ্ধিজীবী হলে ওই সমাজে ফ্যাসিবাদই থাকবে

গ.
অবাক হয়ে দেখলাম, জাফর ইকবালের আক্রমণের ঘটনায় আমাদের সমাজের রিঅ্যাকশন অন্য সব কিছুর মতো বিভক্ত ছিল। আরো অবাক হয়ে গেলাম আমাদের মিডিয়া, সাংবাদিক, প্রগতিবাদীরা এখনো শাহবাগের প্রভাব বুঝতে পারেনি। শাহবাগের আগের বাংলাদেশ আর পরের বাংলাদেশের তফাত না বুঝতে পারার কারণে তারা একই চক্রে ঘুর ঘুর করতেছেন। আর কয়েকদিন পর পর হায় হায় করে উঠতেছেন। কেউ আক্রান্ত হলে মশাল মিছিল করতেছেন। আর কয়েকজনকে নিয়ে মোমবাতি জ্বালাচ্ছেন। ওইসব ‘সেকুলার রিচুয়াল’ তারা করতে চান করুন। সেটি নিয়া কথা নেই। কথা হইলো, শাহবাগ থেকে কোনো শিক্ষা না নিলেও তাদের অবস্থা যে রাজনৈতিকভাবে তো বটেই, সামাজিকভাবে কতটা ভয়াবহ অবস্থায় ঠেকেছে তা আশা করি বুঝতে পারেন।

দেখলাম, ফেসবুক ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোয় যখন আক্রান্ত হওয়ার খবরটা ছড়ালো তখন সঙ্গে সঙ্গেই পক্ষ-বিপক্ষ তৈরি হয়ে গেল। ও পক্ষ-বিপক্ষের খেলায় অতি বিপন্ন বোধ করছেন তথাকথিত প্রগতিশীলরা। তাদের বেশির ভাগই সাবেক শাহবাগ জমায়েতের সঙ্গে ছিল।

যখন কেউ জাফর ইকবালকে ক্রিটিক করছেন, তার লেখার সমালোচনা করছেন, কোনো না কোনোভাবে তার ফ্যাসিবাদের পক্ষে ভোকাল থাকার সমালোচনা করছেন, আরেক মহাপণ্ডিত নাহিদ সাহেবকে নিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থায় বিপ্লব আনার নামে, ডিজিটালের নামে গোটা জেনারেশনটিকেই ‘টাল’ করে ফেলছেন বলে অভিযোগ তুলছেন তখন তার আক্রান্ত হওয়ার দিনে সবাইকে ঢালাওভাবে তার পক্ষে দাঁড় করানোর একটি উগ্র সেকুলার ও শাহবাগের ওই পুরনো প্রচেষ্টা দেখছি। এটি তারা করছেন নিজেদের শাহবাগকেন্দ্রিক মতাদর্শগত জায়গাটার ভবিষ্যতের কথা ভেবে। কিন্তু তারা এখনো বুঝছেন না- যে দেশে আইন ও সন্ত্রাসের ফারাক মুছে যায়, জনগণ কেবল সংখ্যা মাত্র ওই দেশে কেউ আক্রান্ত হওয়ায় জনগণের নিন্দার দুই পয়সার গুরুত্ব নেই। এরপরও মানুষ মাত্রই যে কোনো ব্যক্তি তো বটেই, নিরীহ জীব বা পশুর ওপরও যদি নিষ্ঠুরতা করা হয় তাহলে এর প্রতিবাদ করতে হবে, প্রতিরোধ করতে হবে- এটিই স্বাভাবিক। অনেকে জাফর ইকবালের ১০০টি নিন্দা লিখেও পরে লিখেছেন- ওই হামলার প্রতিবাদ জানাই, অপরাধীকে শাস্তি দেয়া হোক। কিন্তু সমাজে মতাদর্শগত যে বিভাজন পরিষ্কার হয়ে গেছে তাও এখন বেশ উদামভাবে দেখা যাচ্ছে। ওই ঘটনায় প্রগতিশীলদের উদ্বেগে ও আচরণে সমাজের গভীর ক্ষতটা প্রকাশিত হয়ে গেছে। ওই ক্ষত শাহবাগ দিয়ে শুরু ফ্যাসিবাদের সংস্কৃতি হয়ে দিন দিন আনো গভীর করা হচ্ছে।

দেখলাম প্রগতিবাদীরা আগে প্রশ্ন করছেন, আপনি ওই হামলার পক্ষে, না বিপক্ষে। আসলে প্রশ্নটি হলো, আপনি ‘জঙ্গিবাদ’-এর পক্ষে, না বিপক্ষে। এর মানে এমন একটি জঘন্য হত্যা প্রচেষ্টার পক্ষেও জনগণ থাকতে পারে। জনগণ নীরবে এর পক্ষে চলে যাচ্ছে- এই গভীর প্রবণতাটি তাদের উদ্বেগের মাধ্যমে বের হয়ে আসছে। অন্যদিকে যারা শাহবাগের পক্ষের বা ওই ডিজিটাল চেতনার পক্ষের তাদের সামাজিক অবস্থান বা জনমতের কাছে অবস্থান কতটা তলানিতে তাও বুঝতে পারা যায়। ফলে ওই যে উদ্বেগ এর গভীর রাজনৈতিক পাঠ প্রয়োজন।

যারা জাফর ইকবালকে শিশু বুদ্ধিজীবী বা শিশুসাহিত্যিক বলেন তাদের কাছে কেন আগে ওই প্রশ্নের জবাব দিতে হবে যে, ভাই, আমি এই আক্রমণের বিপক্ষে। কিন্তু তিনি খুব বাজে লেখক! আশ্চর্য। এ কোন বাংলাদেশ! অনেকে বলবেন, এটি ওনাকে সামালোচনার রাইট টাইম নয়। আমি বলবো, এটিই সঠিক সময়।

সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাস্থ্যটা বাজে অবস্থার সময়েই সবচেয়ে বেশি টের পাওয়া যায়। আমাদের এই সাহিত্যগ্রস্ত সমাজে যারা নকল গল্প বানান, সব কিছুতে এক চিমটি আবেগ, এক চিমটি একাত্তর, এক চিমটি চেতনা মিশিয়ে পাবলিককে চোখে পানি আনতে সাধনা করে তারা একটি সমাজের বুদ্ধিজীবী হলে ওই সমাজে ফ্যাসিবাদই থাকবে। কাজেই এখনই সময় ওই আবেগী সাহিত্য আর বুদ্ধিজীবিতার রাজনৈতিক সংস্কৃতির ও অর্থনৈতিক পার্থক্যটাকে পরিষ্কারভাবে হাজির করার। কাজেই যারা ওই সঠিক কাজটি করেছেন তাদের এই পক্ষ-বিপক্ষের চালনিতে ফেলে বিব্রত করা উদ্যোগ থেকেই এটি পরিষ্কার যে, বাংলাদেশর সমাজের রূপটা কতটা বদলে গেছে। জাফর ইকবালের শরীরে সব মিলিয়ে ২৬টি সেলাই পড়েছে, অনেক বড় ক্ষত হয়েছে। কিন্তু সমাজের ক্ষতটা আরো গভীর। শাহবাগের অন্যতম চিয়ার লিডার জাফর ইকবালকে আওয়ামীপ্রধান ও অনির্বাচিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী দেখতে যাওয়াতে তিনি বুস্টআপ হয়েছেন বলে মিডিয়ায় খবর এসেছে। তার পাকা মোচের আড়াল থেকে বিরাট হাসির ছবিও মিডিয়ায় দেখে সুন্দর লেগেছে। তিনি ক্যাপ পরে ক্ষত আড়াল করে প্রিয় ক্যাম্পাসেও ফিরেছেন। কিন্তু ওই ঘটনায় সমাজের যে গভীর ক্ষত প্রকাশিত হলো তা ঢাকা বা উপশমের কোনো পথ তো দেখা গেল না, দেখা যাচ্ছেও না।

সমাজে ধর্ম একটি নীতিশাস্ত্র, বিশ্বাস বা মতাদর্শ হিসেবে টিকে আছে বা আগের চেয়ে শক্তিশালী হচ্ছে। এর রাজনৈতিক ও মিলিট্যান্ট রূপও আছে। আছে আল কায়েদা, আছে তালেবান, আছে আরএসএস। বৌদ্ধ সন্ত্রাসীও আছে। কাজেই ওই বিশ্বাসের সঙ্গে দার্শনিক ও যোগাযোগের পথ-প্রক্রিয়া বন্ধ করে পক্ষ-বিপক্ষ বানিয়ে রাজনীতি করলে আক্রমণ ও প্রাণহানি আর ব্যক্তি পর্যায়ে থাকবে না, ডেকে আনবে যুদ্ধ

ঘ.
জাফর ইকবাল ঘটনায় আবারও পুরনো আস্তিক-নাস্তিক তর্ক সমাজে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। মূলত ওই তর্ক ঘিরেই যে পক্ষ-বিপক্ষ বিভাজনটা পোক্ত হয়েছে তা বুঝতে বিরাট সমাজ বিজ্ঞানী হওয়ার দরকার নেই। কিন্তু জাফর ইকবাল যখন আক্রমণকারীর প্রতি গান্ধীবাদী পজিশন শো করলেন, তার নিরাপত্তা ও সুস্থতার জন্য উদ্বেগ প্রকাশ করলেন তখন মিডিয়ায় খবর হলো। কিন্তু এতে কি সমাজের চিত্র পাল্টে গেল? ওই হিংসার আগুনে ঘি ঢালা কি বন্ধ হলো? না তা হলো না। বিচার, আইনের শাসন, গণতন্ত্র, জনগণের অধিকার- এসব প্রশ্ন আমলে না নিয়ে তিনি কেবল মুখস্থ চেতনার নিরিখে এই বিতর্কিত সরকারের সহযোগী হিসেবে ভূমিকা পালন করছেন। মাঝে মধ্যে তিনি রোমান্টিক প্রতিবাদ করেন। কিন্তু কোনোভাবেই সরকারকে চটাতে চান না। এই যে অন্ধভাবে অন্যায়ের পক্ষ নিয়ে তিনি গান্ধীবাদী সাজলেন এতে মিডিয়ায় তার মাহাত্ম প্রচার হলেও সমাজের কোনো লাভ হলো না। ওই হিংসার শিকার হওয়ার প্রক্রিয়া বন্ধ করার জন্য একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য গলা না খুলে গান্ধীবাদী সাজার এই পপুলিস্ট প্রবণতা অবশ্য জাফর ইকবালের সঙ্গে বেশ মানানসই।

আরো একটি বিষয় বলতে হবে, ওই ঘটনায় যারা মশাল মিছিল, মোমবাতি প্রতিবাদ করেছেন, মানে, তথাকথিত প্রগতিশীল পক্ষের সঙ্গে জাফর ইকবাল চালাকি করেছেন। ঘটনাটার সময় যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক প্রধান পরামর্শক লিসা কার্টিজ ঢাকায় ছিলেন। বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের আবাসভূমি তা পশ্চিমিদের বার বার দেখানোর জন্য একটি সক্রিয়তা এখন আর গোপন কোনো ব্যাপার না। ফলে ওই ঘটনার সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক না খুঁজে সরকারি লোকজন ও মিডিয়া যে জঙ্গিবাদী বয়ান খাড়া করলো, জাফর ইকবালও এর অংশ হয়ে গেলেন হাসপাতাল থেকে বের হয়েই। তিনি কোরআন পড়েছেন, আল্লাহর রহমতে বেঁচে আছেন- এসব কথা জোরেশোরে প্রচার হতে দেখা গেল। তার আক্রান্ত হওয়ার সময় একদল লোক বিভিন্ন সময় তার সংশয়বাদী ধর্ম বিশ্বাস প্রকাশ করে এমন কিছু বক্তব্য, ভিডিওচিত্র প্রচার করেছে সামাজিক মাধ্যমে। ওই দলের লোক মনে করে, কেউ নাস্তিক হলে তারে মারলেই কী? বরং মারাই উচিত। সামাজের মেজরিটি যেহেতু বিশ্বাসের ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ সেহেতু ওইসব ঘটনার মৌন সম্মতি উৎপাদনের একটা প্রচেষ্টা একদল লোক করে থাকে।

এটি শাহবাগের, বিশেষ করে বললে থাবা বাবা প্রবণতার ভায়াবহ কাউন্টার প্রপাগান্ডা। তো ওই অবস্থায় দেখা গেল, জাফর ইকবাল তার বিজ্ঞানবাদী ভক্তকুলকে হতাশ করে কতটা খাঁটি মুসলমান ওই বয়ান প্রচার করে চলেছেন। এটি যে প্রগতিবাদী, বিজ্ঞান পূজাটিদের জন্য আরো কঠিন আঘাত ছিল এতে সন্দেহ নেই।

ঙ.
বাংলাদেশের সমাজে একটি ধর্মযুদ্ধের সামাজিক, রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক পরিমণ্ডল তৈরি হয়ে রয়েছে। আরওেই পরিমণ্ডল তৈরিতে যেসব ‘অগ্রসৈনিক’রা ভূমিকা রেখেছেন তারা আজ বিপন্ন বোধ করছেন। একাত্তরের পর যেমন অনেক মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী লোক মহান চেতনার পক্ষের লোক হয়ে গেছে তেমনি শাহবাগের পরে একদলকে দেখা যাচ্ছে বিশাল অ্যান্টিশাহবাগি, অ্যান্টিচেতনার ক্যানভাসার হয়ে যাচ্ছে। তাদের একটি অংশ ব্যাপক ফটকাবাজ, পপুলিস্ট। তারাও এই ঘৃণার সংস্কৃতির চাষবাস করছেন। কখনো চেতনার পক্ষে, কখনো বিপক্ষে। নিজের সুবিধামতো পজিশন পাল্টে বিপ্লব চালিয়ে যাচ্ছেন।

এ প্রসঙ্গে আবার ওই পুরনা প্রশ্নটি আলোচনা করা যায়। ‘মানবিকতা’র সমস্যা নিয়ে। এই যে বিজ্ঞানবাদী, প্রগতিবাদী লোকজন যে কোন বিশ্বাস ও ধর্মকে, বিশেষ করে ইসলামের বিরুদ্ধে খেয়ে না খেয়ে পশ্চিমি অরিয়েন্টালিস্ট বা কলোনিয়াল মানসিকতা থেকে ঘৃণায় নিয়োজিত আছেন তাদের ওই বিজ্ঞানের স্বর্ণ যুগেও অন্যতম প্রধান তর্ক ছিল বিজ্ঞানের মাধ্যমে ‘মানবিকতা’র সংরক্ষণ সম্ভব কি না। দেখা গেছে, এ পর্যন্ত বিজ্ঞানকে যে যত ভালোভাবে রপ্ত করেছেন তিনি তত বেশি নিষ্ঠুর হয়ে উঠেছেন। এটিকে জটিল দার্শনিক-রাজনৈতিক দিক থেকে কেউ চাইলে বুঝতে পারেন আর সহজে বুঝতে চাইলে বাংলাদেশের দিকে তাকালেই হবে। ডিজিটাল-পূর্ব বাংলাদেশের নিষ্ঠুরতা ও ডিজিটালকালীন নিষ্ঠুরতা- দুটির পরিসংখ্যান মেলালেই আমার কথার অর্থ পরিষ্কার হয়ে যাবে।

ওই অবস্থায় সমাজে ধর্ম একটি নীতিশাস্ত্র, বিশ্বাস বা মতাদর্শ হিসেবে টিকে আছে বা আগের চেয়ে শক্তিশালী হচ্ছে। এর রাজনৈতিক ও মিলিট্যান্ট রূপও আছে। আছে আল কায়েদা, আছে তালেবান, আছে আরএসএস। বৌদ্ধ সন্ত্রাসীও আছে। কাজেই ওই বিশ্বাসের সঙ্গে দার্শনিক ও যোগাযোগের পথ-প্রক্রিয়া বন্ধ করে পক্ষ-বিপক্ষ বানিয়ে রাজনীতি করলে হত্যা ও প্রাণহানি আর ব্যক্তি পর্যায়ে থাকবে না, ডেকে আনবে যুদ্ধ। যে যুদ্ধ এখন সারা দুনিয়ায় কোনো না কোনো ধরনে চলছে। এই লেখায় কোনো জটিল আলাপে যাবো না। আরেকটি প্রসঙ্গ তুলেই শেষ করি।

জাফর ইকবাল সুস্থ হয়েই এক আলোচনায় বলেছেন, ‘আমি রাজনীতি বুঝি না। আমি বোকা-সোকা মানুষ।’ যারা বাংলাদেশে মধ্যবিত্তময় রবীন্দ্র চেতনা আর বিজ্ঞানবাদিতার মিশেলে একটি প্রজন্ম তৈরির জন্য কাজ করে যাচ্ছেন এবং একটি বিরাট সংখ্যক তরুণদের কাছে ‘জাফর স্যার’ বলতে জ্ঞান, আলো, প্রগতি তাদের সঙ্গে আমার যখনই কথা হয় তখনই তারাও একই কথাই বলেন- রাজনীতি বুঝি না, পছন্দ করি না।

অবশ্য তারা ভালো চাকরি চান, ভালো খাইতে চান, ভালো পরতে চান, সুন্দরী বৌ চান, হ্যান্ডসাম স্বামী চান। দেশের সব ভালো ভালো জিনিস ভোগ করতে চান। তারা শিক্ষাকে মনে করেন ভোগের যোগ্যতা অর্জনের প্রধান মাধ্যম। জাফর ইকবালরা চিন্তাহীন, সমাজের অন্য মানুষের জন্য দরদহীন, পিওর কনজিউমারিস্টিক প্রজন্ম তৈরি করছেন। যারা চরমভাবে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ভোগের মধ্যে জীবনকে দেখেন তাদের কাছে ওই ধরনের ব্যক্তিই অনুসরণীয়। কিন্তু তারা এবং তাদের গুরুরা রাজনীতি ঘৃণা করেন– এই হলো তাদের শিক্ষার অবস্থা। যে রাজনীতিটা ঠিক হলে ওইসব ঠিক হবে সেটিই তারা ঘৃণা করেন। এই পলায়নপর মানসিকতার প্রচারই তাদের হিরোইজম। তো এই ধরনের অন্ধ কনজিউমারিস্টিক জেনারেশনের কাছে জাফর ইকবালরাই তারকা। এতদিন মিডিয়াও ওই লোকদের এমনভাবে প্রচার করেছে যে, হাজার হাজার ছেলে-মেয়েদের মনে ‘জাফর স্যার’ টাইপের আইডল হওয়ার স্বপ্ন তৈরি হয়েছে। এটি৫ই শহুরে ফুর্তিবাজ জেনারেশন। ওই জেনারেশনের ওপর ভর করেই টিকে থাকে ডিজিটাল সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা।

জাফর ইকবাল টাইপের ব্যক্তিদের নিরপেক্ষতার নামে ফ্যাসিবাদের সংস্কৃতির সেবকরা ভয়াবহ ক্ষতি করছেন সমাজের। তারা আবার বলবেন, আমি লীগ করি না, বঙ্গবন্ধু করি। অবশ্যই সমাজের যে কোনো নাগরিকের রাজনৈতিক মত থাকবে, দল করার স্বাধীনতা থাকবে। তবে নিরপেক্ষতার ভান করে একটি অবৈধ ক্ষমতার পক্ষে দাঁড়ালে অবশ্যই তাদের গণশত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে সামাজিকভাবে বয়কটের ডাক দিতে হবে। তাদের যে কোনো পজিশনকে খুব শক্তভাবে ক্রিটিক করতে হবে। এছাড়া জেনারেশনকে ওই প্যাঁচ প্যাঁচে আবেগী আগ্রাসন থেকে রেহাই দিয়ে সৎসাহস ও চিন্তাশীল রাজনৈতিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য থিওরিটিক্যাল-বুদ্ধিবৃত্ত্বিক চ্যালেঞ্জ অব্যাহত রাখতে হবে। বাংলাদেশকে হীনম্মন্য, শিক্ষার নামে পঙ্গু জেনারেশন তৈরির কারখানা বানানো চলবে না। এ জন্য ওই কারখানার পেছনের চালকদের থামাতে হবে।