পম্পেই নগরী

যৌনতা, ব্যভিচার, বিকৃত পাপাচার আর অবাধ্যতা যখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন সেই নগর শহর ধ্বংস হয়ে যায়। অবিশ্বাসী ও নাস্তিকরা তবুও স্বীকার করেনা, এসব ধ্বংসের কারণ কী। অনেকে বলে, প্রকৃতি নাকি এসব সহ্য করেনা।

ব্যভিচার, সমকামিতা ও পতিতাবৃত্তির কারণে অতীতে বহু জাতি ধ্বংস হয়েছে। কিছু জাতির বিবরণ কোরআন ও হাদিসে রয়েছে। আবার কিছু জাতির কথা উল্লেখ করা না হলেও কোরআনের ভাষ্য থেকে জানা যায়, এগুলোর বাইরেও বহু জাতি রয়েছে, যাদের পাপাচারের কারণে তাদের ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।

ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি ধ্বংস করেছি কত জনপদ, যার অধিবাসীরা ছিল জালিম (পাপাচারী) এবং তাদের পরে সৃষ্টি করেছি অন্য জাতি।’ (সুরা : আম্বিয়া, আয়াত : ১১)

খ্রিস্টপূর্ব ৮০ শতাব্দীর দিকে এই শহরটিতে রোমান সাম্রাজ্যের অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়। আর সেখানে গড়ে ওঠে রোমান সাম্রাজ্যের অন্যতম শিল্পবন্দর। তখন থেকেই রোমানরা সেখানে বসবাস শুরু করে। ক্রমান্বয়ে সেটি হয়ে ওঠে সমকালীন বিশ্বের অন্যতম বিত্ত-বৈভব আর অভিজাত নগরী। রোমান আর গ্রিক বণিকদের ব্যবসা-বাণিজ্যের মূল কেন্দ্রে পরিণত হয় এই শহর। ভূমধ্যসাগরের উপত্যকায় ভিসুভিয়াস পাহাড়ের পাদদেশে নেপলস শহরের পাশেই গড়ে উঠেছিল শহরটি।

শহরটি বাণিজ্যনগরীর পাশাপাশি ধীরে ধীরে সারা দুনিয়ার শ্রেষ্ঠতম বিনোদননগরীর মর্যাদাও অর্জন করতে সক্ষম হয়। কারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বিপুল সমাহার কাজে লাগিয়ে রোমানরা এটিকে অপরূপ সজ্জায় সজ্জিত করতে পেরেছিল। গড়ে উঠেছিল নানা ধরনের বিনোদনকেন্দ্র, যার টানে সমগ্র পৃথিবীর ভ্রমণপিপাসু অভিজাত সমাজ ভিড় করতে থাকল সেখানে।

যৌনতায় ছিল এরা অন্ধ। শুধু যৌনকার্যের জন্য প্রতিটি বাড়িতে নির্মিত হতো আলাদা স্থাপনা। বাড়িঘরের দেয়ালে দেয়ালে অঙ্কিত হতো নগ্ন পর্ণচিত্র। নিজেরা তো যৌনতায় ডুবে থাকতই, সেই সঙ্গে নিজের ছেলে-মেয়েদের দিয়েও বণিক ও পর্যটকদের যৌন বিনোদনের ব্যবস্থা করতে তারা পিছপা হতো না। এমনকি তারা নিজেরা পশু-পাখির সঙ্গেও যৌন বিকৃতির পিপাসা মেটাত।

তাদের সন্তুষ্টির জন্য ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা থেকে সুন্দরী রমনীদের আনা হত। এই স্থানের অন্যতম বড় ব্যবসা ছিল দেহ ব্যবসা। এ নগরীতে ছিল গ্যালাডিটরিয়াম স্টেডিয়াম, যেখানে দু’জন বন্দি সৈনিক ছেড়ে দেয়া হত একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য আর শর্ত জুড়ে দেয়া হত, যে বেঁচে থাকবে শুধুমাত্র সে মুক্তি পাবে। তখন দুই সৈনিক একজন অপরকে খুবই নৃশংসভাবে হত্যা করত। এ নৃশংস হত্যা দেখে গ্যালারির মানুষ পৈচাশিক মজা পেত।

এভাবেই দিন দিন তৎকালীন আসমানি ধর্ম খ্রিস্টবাদ থেকে বিচ্যুত হতে থাকে তারা। ক্রমান্বয়ে শহর ছেড়ে চলে যেতে থাকেন সব ধর্মযাজকরা। ধর্মীয় চিন্তা-চেতনায় উজ্জীবিত ইউরোপের কনজারভেটিভ ধর্মীয় সম্প্রদায় পম্পেই শহর পরিভ্রমণ থেকে বিমুখ হতে শুরু করে। এমনই এক অমানবিক, ঘৃণ্যতম ও বর্বরোচিত সমাজব্যবস্থা যখন সেখানে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল, তখনই নেমে এলো মহান স্রষ্টার ক্রোধের আগুন। জীবন্ত মমিতে পরিণত হলো অনাচার আর পাপাচারের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত থাকা মানুষগুলো।

৭৪ খ্রিস্টাব্দের এক ভরদুপুর। আত্মহারা খোদাবিমুখ পম্পেই অধিবাসীরা আনন্দ-উল্লাসে নিজেদের মত্ত রেখেছিল। পম্পেই নগরীর বাসিন্দারা আল্লাহর অবাধ্যতায় এতটাই নিমগ্ন ছিল যে, তারা পশুপালের সঙ্গেও যৌনচার করতে দ্বিধাবোধ করত না। এখানে নারী পতিতালয়ের পাশাপাশি পুরুষ পতিতালয়ও ছিল। এখানকার মানুষ হযরত ঈসা (আঃ) এত প্রচারিত ধর্মের পথ পরিহার করে যুক্ত হতে থাকে নানা পাপাচারে। তাদের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে সকল মুসলমানেরা এ নগরী ত্যাগ করে চলে যায়। ঠিক সেই সময় আল্লাহ তা’য়ালার পক্ষ থেকে নেমে আসে কঠিন থেকে কঠিনতর আজাব। সেদিন সকালে কেউ বিশ্রামে ছিল কেউ বা পাপাচারে ব্যস্ত ছিলো। ঠিক সেই সময় গর্জে ওঠে ভেসুভিয়াস আগ্নেয়গিরি। এই আগ্নেয়গিরি থেকে নির্গত লাভা আর ছাই প্রায় ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটার উচ্চতায় ওঠে তারপর আচরে পরে পম্পেই নগরীতে। কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে সকল প্রানের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যা এ নগরী থেকে। যে অবস্থাতে তারা ছিলেন সেভাবেই তাদের শরীর ঝলসে কয়লায় পরিনত হয়।

অবাক করা বিষয় হচ্ছে, দুই হাজার বছরের পুরনো এই ধ্বংসলীলা থেকে এখনো অবিকৃত অবস্থায় তাদের দেহগুলো পাওয়া যাচ্ছে। যে যেভাবে ছিল, অবিকল সেভাবেই পড়ে আছে। মহান স্রষ্টা আগত প্রজন্মকে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ দেওয়ার জন্য তাঁর নিদর্শন নৈপুণ্যতায় এসব মৃতদেহকে বছরের পর বছর মাটির নিচে সযত্নে সংরক্ষণ করেছেন।

তথ্যসূত্র
1. কালের কণ্ঠ (১৮/১০/২০১৯)
2. HISTORY. COM EDITORS
3. SMITHSONIAN MAGAZINE
4. ভিডিও ডকুমেন্টারি – https:// youtu. be/oYh0RzI_jQQ